‘শৈত্যপ্রবাহ’ কথাসাহিত্যিক ওয়াসি আহমেদের গল্পসংকলন। গ্রন্থটিতে মোট আটটি গল্প সংকলিত হয়েছে। প্রথম গল্প ‘ছয় মিটার দূরত্ব’-এ মানুষের অন্তর্নিহিত বোধ ও স্বপ্ন-কল্পনা এবং এই ব্যস্ত সময়ের দ্বান্দ্বিকতা পরম নিষ্ঠায় তুলে ধরেছেন গল্পকার। প্রতিটি মানুষের ভেতরে একটি হননেচ্ছা বিরাজ করে। কারও ভেতর তা প্রকাশ্য হয়, কারও অপ্রকাশ্য; কিন্তু মনের অবচেতনে, স্বপ্নের মায়াজালে সেই ইচ্ছা পাখা মেলে। নিজেকে শেষ করার প্রবল স্পৃহায় পীড়িত হয় মানুষ। গ্রন্থের শিরোনামীয় গল্প ‘শৈত্যপ্রবাহ’-এ আছে একজন অফিস কেরানীর কর্মজীবন শেষের কথা। আহমদ হোসেন সারাজীবন এক অফিসে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করলেও কখনো কাক্সিক্ষত মূল্যায়ন পাননি। কিন্তু কর্মজীবন শেষে অফিস যখন তাকে ঘটা করে বিদায় জানাচ্ছিল তখন তিনি এক নিদারুণ অস্থিরতায় ভুগতে থাকেন। এতদিনের সহকর্মী ও ঊর্ধ্বতনদের সুকথাগুলো তার কানে ঢুকলেও মনের মধ্যে বেজে উঠছিল অন্তিমের সুর। তিনি তার অতীত দিনের ভালো কাজের মন্দ কাজের হিসাব মেলাতে মেলাতে একসময় জীবন থেকেই যেন ছুটি নিয়ে নিলেন। আবার ‘অভয়ারণ্যে’ পাওয়া যায় এক আইনের লোকের কথা। যে বাইরে থেকে দেখতে কঠিন, কিন্তু ভেতরটা জলের মতো নরম। কর্তব্যের জন্য তাকে অনেক জঘন্যতম কাজ করতে হয়। কিন্তু এই লোকটিই আবার উপন্যাস পড়ে অঝোরধারায় কাঁদে। যাদেরকে সে কর্তব্যের খাতিরে মারধর করেছে, কষ্ট দিয়েছে, তারাই কেউ কেউ তার স্বপ্নে ফিরে এসে তাকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলে। তার সেই ‘অদ্ভুত’ আচরণের কোনো ব্যাখ্যা খুঁজে পান না স্ত্রী। আদতে প্রত্যেকের ভেতরেই যে একজন মানবিক মানুষ বাস করেন এ গল্পে তা ফুটে ওঠে। গ্রন্থটির অন্যান্য গল্পেও ছড়িয়ে আছে শহর-গ্রামের সহজ-সরল মানুষের দুঃখ-বঞ্চনা, হাসি-আনন্দের ছবি।
ওয়াসি আহমেদের জন্ম ১৯৫৪ সালে, সিলেট শহরের নাইওরপুলে। স্কুলের পাঠ বৃহত্তর সিলেটের নানা জায়গায়। পরবর্তী শিক্ষাজীবন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কবিতা দিয়ে লেখালেখির শুরু। ছাত্রাবস্থায় প্রকাশিত কবিতা সংকলন ‘শবযাত্রী স্বজন’। কথাসাহিত্যে, বিশেষত গল্পে, মনোনিবেশ আশির দশকে। প্রথম গল্প সংকলন ‘ছায়াদণ্ডি ও অন্যান্য’ প্রকাশিত হয় ১৯৯২ সালে। পুস্তকাকারে প্রথম উপন্যাস ‘মেঘপাহাড়’ প্রকাশ পায় ২০০০ সালে। সরকারি চাকরিজীবী হিসেবে কূটনীতিকের দায়িত্ব পালনসহ কাজ করেছেন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নানা অঙ্গনে। লেখালেখির স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ দেশের প্রায় সব প্রধান সাহিত্য পুরস্কার।
গল্পগুলো বইয়ের নামের মতোই,হিমশীতল। গল্পে বেশি কিছু ঘটে না। অনেক চরিত্র বাইরে জড়, স্থবির; কিন্তু তাদের ভিতরে চোরাস্রোত বয়ে চলেছে জীবনের, ক্ষয়ের, ব্যর্থতার, লজ্জার, অপরাধবোধের। সবচেয়ে ভালো লেগেছে অভয়ারণ্য, ছয় মিটার দূরত্ব,জানালা আর বেগম জাহানারার আব্রু।অভয়ারণ্য, বই পড়ার সূত্র ধরে এক পুলিশ সদস্যের দ্বান্দ্বিক ব্যক্তিজীবন ও পেশাজীবন নিয়ে লিখিত আলেখ্য,শুধু লেখকেরই নয়;সমগ্র বাংলা সাহিত্যেরই একটি উল্লেখযোগ্য গল্প। রূপান্তরকামী মানুষের তীব্র অন্তর্দাহ নিয়ে লিখিত "অবমানব" এর মতো গল্প বাংলা সাহিত্যে খুব বেশি রচিত হয় নি।ওয়াসি আহমেদের গল্পের মর্মার্থ বুঝতে বেশিরভাগ সময়ই গল্পের শেষ লাইন অবধি অপেক্ষা করতে হয়।সব গল্পই সমানভাবে আকৃষ্ট করতে পারে না।তবে তার ব্যর্থ গল্পও উচ্চাকাঙ্ক্ষী।
"মুক্তিলাভের আকাঙ্কা পরম আকাঙ্কা", সংকলনের প্রথম গল্প "ছয় মিটার দূরত্ব" পড়ে এটাই মাথায় এলো সবার আগে।
ওয়াসী আহমেদের লেখা পড়ে আমার মাথায় ঘোরে দুটো লিটারেরি টার্ম; ম্যান ভার্সেস সেল্ফ, ম্যান ভার্সেস সোসাইটি। খানিকটা স্লাইফ অফ লাইফ হলেও ওয়াসী আহমেদের লেখায় মানব মনের অন্তর্দাহ বেশ প্রকট হয়ে ধরা দেয়।
ম্যান ভার্সেস সেল্ফ বা সোসাইটির যেই দ্বন্দ তাড়িয়ে বেড়ায় মানুষকে সেটা থেকেই মুক্তি লাভের আশায় নিরন্তর এক জীবন অতিবাহিত করে মানুষ। একারণেই প্রথম "গল্প ছয় মিটার দূরত্ব" সংকলনের প্রথম গল্প হিসেবে আমার কাছে পারফেক্ট মনে হয়েছে। বইটার নাম এই নামে দিলেও সমস্যা ছিল না৷ যদিও বইটার নাম গল্প "শৈত্যপ্রবাহ" সংকলনটির লিখনশৈলী বেশ ভালোভাবেই ধারণ করে। নামের মতো গল্পের শব্দের বুনন একটা হীমশীতল আবেশ রেখে যায় পাঠক মনে।
ওয়াসী আহমেদের লিখনশৈলী বরাবরই একটু জটিল মনে হয় আমার কাছে। শেষ পর্যন্ত গিয়েও কখনো গল্পের মমার্থ ধরতে পারি না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পড়েছি; একজন লেখকের লিখনশৈলীর সবচাইতে শক্তিশালী দিক এটাই।
"মজা! মজা পেতেই মানুষ বাঁচে, আর যখন নিশ্চিত হয়ে যায় মজার আশা-টাশা বরবাদ, তখন অবসরে যায়, অসুখে পড়ে, মৃত্যুর অপেক্ষা করে বা নিজে নিজেই ডেকে আনে মৃত্যুকে। নতুন করে মজা পাওয়ার আশা নেই, তাই মুক্তির ব্যাপারটা তখন কারো কারো মধ্যে লাগামছুট হওয়া বিচিত্র নয়। তারা তখন উদ্যোগী হয়েই মৃত্যু আহ্বান করে..."
- ওয়াসি আহমেদ।
আটটি গল্পের এই সংকলনের শ্রেষ্ঠতম গল্প "বেগম জাহানারার আবরু।" বাংলা একাডেমী পুরস্কার প্রাপ্ত লেখক ওয়াসি আহমেদের গল্পের ভাষা এবং বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্যে চমকে উঠতে হয় প্রতিবার। 'অভয়ারণ্য', 'জানালা' এবং 'শৈত্যপ্রবাহ' ও বিশেষ ভালো লেগেছে। বাকি গল্পগুলো রচনার শিল্পগুণে স্বতন্ত্র হলেও তেমনভাবে নজর কাড়তে পারেনি।
ওয়াসি আহমেদের কয়েকপৃষ্ঠার গল্পগুলো পড়লে কয়েক'শ পাতার উপন্যাস পড়ার অনুভূতি হয় আমার । এতো দারুণ, গভীর আর ন্যাচারালভাবে উনি গল্প বলেন যে প্রতিবার'ই উনাকে নতুন করে আবিষ্কার করি। এই সংকলনে “অবমানব” নামের তৃতীয়লিঙ্গের মানুষদের নিয়ে লেখা গল্পটি আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে। যারা উনার লেখা পড়েননি পড়ার অনুরোধ রইলো।
কোনোপ্রকার চেনাজানা ছাড়াই হঠাৎ ইন্টারনেটে ঘুরতে ঘুরতে একদিন আবিষ্কার করি ওয়াসি আহমেদকে, দু-চারটা গল্প ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল, পড়ে দেখি দারুণ! বেশ পাকা হাতের এই লেখক ছোটগল্পে যে ভালোরকমের এক্সপেরিমেন্ট চালিয়েছেন তা তাঁর গল্পগুলো পড়লে যে কারোই বোধগম্য হওয়ার কথা। ভিন্ন ধাঁচের, গতানুগতিকের বাইরে বাক্যালাপ, মুগ্ধ করেছে, এমন মুগ্ধতা যে আগ বাড়িয়ে কিছু বলব সে সাহস পাচ্ছি না। যদি ইচ্ছা করেন, চৈতন্য প্রকাশনী থেকে গল্পসমগ্র আছে। উপন্যাসও আছে চৈতন্যে। এই গল্পকারের যে কোনো লেখায় তুমুল আগ্রহী হয়ে রইলাম আমি।