তরুণ মজুমদারের জন্ম বাংলাদেশের বগুড়া জেলায়, ৮ জানুয়ারি ১৯৩১। উত্তম-সুচিত্রা অভিনীত "চাওয়া পাওয়া" সিনেমা পরিচালনার মধ্যে দিয়ে ১৯৫৯ সালে চলচ্চিত্র জগতে পদার্পণ করেন তরুণ মজুমদার। এরপর একের পর এক বাণিজ্যসফল ছবি তৈরির মধ্যে দিয়ে বাংলা চলচ্চিত্রে স্থায়ী আসন অর্জন করেছেন। তাঁর পরিচালিত বিখ্যাত ছবির মধ্যে কয়েকটি হলো : সংসার সীমান্তে, গণদেবতা, শ্রীমান পৃথ্বীরাজ, ফুলেশ্বরী, দাদার কীর্তি, ইত্যাদি। শেষ জীবনে লেখালিখি শুরু করেছিলেন। "সিনেমাপাড়া দিয়ে" নামের আত্মজীবনী লিখে সর্বস্তরের পাঠকের প্রশংসা লাভ করেছেন। মৃত্যুর ঠিক আগে শেষ করেছিলেন তাঁর একমাত্র উপন্যাস "ঘরের বাইরে ঘর"। মৃত্যু - ৪ জুলাই ২০২২ কলকাতায়।
শেষ হয়ে গেলো। এতো জলদি! দুই খণ্ড মিলিয়ে প্রায় ৮৫০ পাতার বই। তাও মনে হচ্ছে আরেকটু বড় হলেই তো পারতো! শতো শতো মানুষের ভিড় তরুণ মজুমদারের গল্পে। আর কতো বিচিত্র তাদের গল্প!সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, শচীন দেব বর্মণ, রাজেন তরফদার প্রমুখদের মতো গুণী মানুষের গল্প যেমন আছে, তেমনি আছে গ্রামবাংলার অখ্যাত অনাম্নী মানুষের গল্প যারা শ্যুটিং এর সময় মনপ্রাণ দিয়ে সাহায্য করেছেন তরুণ মজুমদারকে। কোনো ঘটনা পড়ে হো হো করে হেসে উঠতে হয়, কোনোটা পড়ে মুখ ভার হয়ে যায় আর কোনোটা পড়ে অনাবিল আনন্দে মন ভরে ওঠে। একেকটা সিনেমার শ্যুটিং নিয়ে আলাদা একেকটা সিনেমা তৈরি করা সম্ভব।"গণদেবতা"র শ্যুটিং এর গল্প রীতিমতো রোমাঞ্চকর। এ হেন একটা বইয়ের পরের খণ্ড পাওয়া যাবে না ভাবলেই বুকটা ভার হয়ে আসে। তরুণবাবু, আপনি আরো একহাজার পাতা লিখলেও আমরা গোগ্রাসে গিলতাম সেসব লেখা। মৃত্যু আপনাকে অসময়ে কেড়ে নিলো, এ এক অপূরণীয় ক্ষতি।
বইটা পড়তে পড়তে আরেকটা আফসোসে আক্রান্ত হচ্ছিলাম এতো সুন্দর বইটা শেষ হয়ে আসছে... ও হ্যা, মহানায়কের মহাপ্রয়াণ দিয়ে দ্বিতীয় পর্বের সমাপ্তি কিন্তু আধুনিকদের সাথে তরুণ মজুমদারের কাজের বিবরণী আর নাই। ইশ!
বই পড়ে একটা মানুষের গোটা জীবনের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান, ধ্যান-ধারণা জেনে ফেলার যথাযথ উদাহরণ হতে পারে "সিনেমাপাড়া দিয়ে" গ্রন্থদ্বয়। প্রথম খন্ডে তরুণ মজুমদারের সিনেমাপাড়াতে প্রবেশ এবং উত্থান এর গল্প পেয়েছিলাম। এবারে মিলল সেখানে তার জয়জয়কার এর গল্প। সেসব গল্প এতোই দুর্দান্ত ভঙ্গিমায় লেখা যে পড়তে গিয়ে মনে হচ্ছিল আহা! মধু, মধু!!
সিনেমা নিয়ে মানুষের আগ্রহ তো বহুবছর আগে থেকেই। সেই সঙ্গে আগ্রহ সিনেমার সঙ্গে জুড়ে থাকা ব্যাক্তিদের নিয়েও। যার ফলে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা কিংবা ম্যাগাজিন তাদের নিয়ে ছাপে চিত্তাকর্ষক সব গল্প। মাঝেমধ্যে ভূয়া কিংবা অর্ধ-সত্য খবর ছাপিয়েও খবরের কাটতি বাড়ানোর প্রচেষ্টা করা হয়। তরুণ মজুমদার নিজে পরিচালক ছিলেন। যার ফলে তার সঙ্গে পরিচয় ঘটেছে সিনেমাপাড়ার বহু চরিত্রের। তিনি সেসব চরিত্রের স্বরূপ বর্ণনা করেছেন। তাদের ঘিরে চমৎকার সব গল্প বলেছেন। এই গল্পগুলো আমাদের দেখিয়ে দেয় সংবাদ কিংবা ম্যাগাজিনে ছাপা খবর থেকে তারা কতোটা আলাদা। এই ধরুন সত্যজিৎ এর কথা। তাকে বিভিন্ন সময় দাম্ভিক মানুষ হিসেবে দেখানো হয়েছে। অথচ এই বইতে আমরা তার সম্পর্কে যেসব গল্প পাই তাতে দাম্ভিকতার ছোঁয়াটুকু অব্দি নেই। উত্তম-সুচিত্রাকে ঘিরে কতোই না বিচিত্র গল্প। তারাও যে কতো চমৎকার মানুষ ছিলেন তার উদাহরণ তরুণ মজুমদার বহুবার টেনেছেন। ঋত্বিক ঘটকের বলা, "রবি শালা তো সেটটা ভালোই বানিয়েছে এবার তুমি শালা ছবিটা ভালো করে বানাও" এই কথাটাতে কতোটা পারস্পরিক সৌহার্দ্য ছড়িয়ে আছে তা আমাদের বুঝতে কষ্ট হয়না।
সিনেমা তৈরীর গল্প নিয়ে প্রথম পড়েছিলাম সত্যজিৎবাবুর লেখা "একেই বলে শ্যুটিং" বইটা। অতি ছোট আকারের বইটা পড়ে জানার প্রতি আরো তুমুল আগ্রহ জন্মেছিল। এবারে প্রায় সাড়ে আটশ পাতায় তরুণ মজুমদার বর্ণনা বারবার ঘুরেফিরে এসেছে সিনেমা তৈরীর ধাপগুলো।
প্রথমেই আসে গল্প বাছাই করে লেখকের কাছ থেকে সিনেমাস্বত্ব নেয়ার ব্যাপার। সেখানে বহু লেখকের সাথে জড়িয়ে থাকা মজারসব গল্প পাওয়া গেল। এরপরই আসে গল্প থেকে সিনেমা তৈরীর উপযোগী করে চিত্রগল্প লিখে ফেলা। এই কাজটা পরিচালক তরুণ মজুমদার নিজ হাতেই করতেন। ঠিক এই লেখালেখির কাজটাই আসলে তাকে সিনেমাপাড়া দিয়ে বইটাকে দুর্দান্ত ভঙ্গিমায় উপস্থাপনে সাহায্য করেছে। পরবর্তী ধাপে আসে উপযুক্ত চরিত্র বাছাই। এই অংশে আমরা বেশ কয়েকটি মজার গল্প পাই। একবার তো এমন হয় যে ফুটবল খেলার মাঠ থেকে ধরে আনা এক কিশোরকে পছন্দ হয়ে যায় নায়কের চরিত্রে। তবে সবচেয়ে আকর্ষণীয় গল্পগুলো এসেছে লোকেশন বাছতে গিয়ে। কখনো পুরো গ্রামবাসীর সাহায্য পেয়ে মুগ্ধ হয়েছেন কখনোবা ডাকাতের কবলে পড়ে আত্মারাম খাঁচাছাড়া হওয়ার দশা। এছাড়া শ্যুটিং এর সময়কালে ঘটা বিচিত্র ঘটনাবলী তো রয়েছেই। তবে শ্যুটি শেষে ছবি এডিটিং এর যে গল্প বলে গেছেন তা অন্যগুলোর তুলনায় কম জমজমাট। গোটা বইজুড়েই মানুষের কাছ থেকে পাওয়া অপ্রত্যাশিত ভালোবাসার গল্পরাই প্রাধান্য পেয়েছে।
তরুণ মজুমদার এই সিনেমাপাড়ার গল্প আরো লিখতে চেয়েছিলেন। শেষ করার তাকে আগেই পাড়ি জমাতে হয়েছে পরপারে। আমরা বঞ্চিত হলাম আরো কিছু চমৎকার গল্প জানার সুযোগ থেকে। দুই খন্ড মিলিয়ে প্রায় সাড়ে আটশ পাতার বই পড়েও আফসোস রয়ে গেল।
তরুণ মজুমদার পরিচালিত 'ভালোবাসা ভালোবাসা' আমাদের আমলের অনেকেরই দেখা। 'আমাদের আমল'টা বুঝায়া বলা দরকার। এই ২০০০ সালের পরপর যারা স্যাটেলাইট টেলিভিশন দেখাে সুযোগ পাইছে, তারা। আমি অবশ্য কার্টুন দেখতাম। ২০০৫ সালে যখন পোলাপান ইটিভি বাংলার (নাকি আলফা বাংলা?) সেকালের সিরিয়াল 'ধ্যাৎতেরিকা' নিয়া আলাপ করত, আমি সেসব জানতাম না। তবু কোনো না কোনোভাবে তাপস পাল, দেবশ্রীর সিনেমাটা দেখা হয়ে গেছিল। ইটিভি বাংলাতে সেসময় কলকাতার ভালো ভালো সিনেমা দেখানো হইত। তরুণের এই সিনোমাটা ছিল টালিগঞ্জের সুসময়ের শেষ পর্বের সিনেমা।
তরুণ মজুমদারের কথা এরপর পাই ঋতুপর্ণ ঘোষের 'ফার্স্ট পার্সন' বইয়ে। কথাটা অনেকটা এরকম ছিল যে তরুণ মজুমদারের মতো ভালো সিনেমাওয়ালার কথা বাংলা সিনেমার দর্শক ভুলে যাচ্ছে। এরপর তরুণ মজুমদার নিয়ে খোঁজ লাগানোর কথা ছিল আমার, তবে নানা কারণে হয়ে ওঠে নাই। মজার ব্যপার ২০১০ সালে একটা ডিভিডি কিনছিলাম 'মেঘে ঢাকা তারা' দেখার জন্য। সেখানে তরুণের 'শ্রীমান পৃথ্বীরাজ'ও ছিল। তবে প্রিন্টের দশা এতো বাজে ছিল যে আর দেখা হয় নাই।
তরুণ মজুমদার শুরু করব সেটা ঠিক করছিলাম ঋতুর বই পড়েই। দেখতে শুরু করি গত বছর, মার্চের দিকে। আইএমডিবি দেখে বুঝলাম তার বেশ কয়েকটা সিনেমা আমি আগেই দেখে ফেলছি। দাদার কীর্তি, পথ ও প্রসাদ অন্যতম। কিন্তু যখন দেখলাম বালিকা বধূ তারই পরিচালনায়, তখন ধাক্কা খাই। আরো ধাক্কা খাই 'কাঁচের স্বর্গ' দেখে। ঐ আমলে এমন থিম চিন্তা করে সিনেমা করার সাহস খুব কম পরিচালকেরই ছিল। তরুণ মজুমদারের কুহেলিও দেখা ছিল। তারও আগে দেখা ছিল 'পলাতক'। তরুণ মজুমদারকে চেনার আগে তার সিনেমার গানের লাইন আমার ফেসবুকের বায়োতে রাখা। এহেন লোকের আত্মজীবনী পড়ব না, তাও হয় নাকি।
দুই খন্ডের বইটাকে আত্মজীবনী না বলে স্মৃতিকথা বলা ভালো। সিনেমার দুনিয়ায় তার পদার্পন থেকে শুরু করে নানা সময়ে নিজের অভিজ্ঞতা থেকে শুরু করে সিনেমাপাড়ার নানা গল্প তিনি বলেছেন। একদম চল্লিশের দশক থেকে আশির শুরু পর্যন্ত আছে এই দুই বইয়ে। দেবকীকুমার থেকে আছেন মৌসুমী চ্যাটার্জি পর্যন্ত। অজয় কর, রাজেন তরফদার থেকে রাজেশ খান্না অমিতাভ বচ্চন পর্যন্ত। তরুণ মজুমদার এমন এক ��্যক্তি যিনি সাদাকালো থেকে শুরু করে ডিজিটাল রেকর্ডিং পর্যন্ত সময়কে দেখেছিলেন। সিনেমা জগতের নানা ঘটনা থেকে শুরু করে সিনেমার সেইসব টেকনিক্যার বিষয়ও আছে তার লেখায়।
তরুণ মজুমদারের এ বই কলকাতা ও মুম্বাইয়ের সিনেমাপাড়ার ভেতরের গল্পগুলো বলে। তবে বইটা তরুণ মজুমদারের সিনেমার মতো ভালোর কথা বলে। তরুণ নিজে একজন পজিটিভ মানুষ, তাই পজিটিভ সব ঘটনাই বলেছেন। সিনেমাপাড়ায় সেকালে চলা সম্মান, কথা দিয়ে কথা রাখা থেকে শুরু করে বিপদে আপদে পাশে দাঁড়ানোর কথাই আছে বেশি। তিক্ততার কথা যে একদম নেই তা না, তবে নানা সময়ে যে স্নেহ ও সম্মান তরুণ নিজে পেয়েছেন বা অন্যদের পেতে দেখেছেন সেকথাই আছে বেশি করে।
উত্তম কুমার, সুচিত্রা সেনের সহায়তা, সত্যজিৎ রায়ের বন্ধুসুলভ আচরণ, ঋত্বিক ঘটকের পাগলামি, ভি শান্তারামের স্নেহ, বিমল রায়ের প্রতিভা, গুলযার ও রাখী গুলযারের বেড়ে ওঠা থেকে শুরু করে কত গল্প যে আছে তার বলে শেষ করা যাবে না। আরো আছে নানা সময়ে নিজের এক একটা শুটিং করার অভিজ্ঞতা। তরুণ প্রচুর আউটডোর শুটিং করেছেন আর সেখানে পেয়েছেন গ্রামের মানুষদের সহযোগিতা৷ ডাকাতের পাল্লায়ও পড়েছেন। সব গল্পই করেছেন তিনি। করেছেন বাংলাদেশের গল্পও। আদি নিবাস তার বাংলাদেশে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর এসেছেন কয়েকবার। সঙ্গ দিতেন তাকে কবি জসীম উদদীনের পুত্র। একটা সিনেমাও করার কথা ছিল। সে সময়কার এফিডিসি নিয়ে করা তরুণ মজুমদারের একটা কথা দিয়ে শেষ করি। এফিডিসি নিয়ে তিনি বলেছিলেন, এখানে এমন অনেক প্রযুক্তি আছে যা কলকাতায় ভাবাও যায় না।
*তরুণ মজুমদারের মৃত্যুর দিন (৪ জুলাই, ২০২২) বণিক বার্তায় তাকে নিয়ে একটা আর্টিকেল হইছিল, আমার করা। বাংলাদেশে সম্ভবত আর কেউ করে নাই।
তরুণ মজুমদারের সঙ্গে আমার যখন পরিচয় তখন তরুণ মজুমদার কে আমি জানতাম না। এমনকি তখন ছবির পরিচালকই যে ক্যাপ্টেন অব দ্য শিপ, তাও জানতাম না। এখন পরিচালকের নাম দেখে ছবি বাছি, দেখি। তখন অভিনেতা-অভিনেত্রীরাই আলো কেড়ে নিতেন। অন্তত আমাদের মতো সাধারণ দর্শকদের চোখে, বলা ভালো পুচকে দর্শক। পথ ও প্রাসাদ বলে একটি ছবি রয়েছে তরুণ মজুমদারের, শ্রেষ্ঠাংশে সন্ধ্যা রায় আর উৎপল দত্ত। আর একজন শিশু অভিনেতা নজর কেড়েছিলেন, ছবিটি বিদেশী একটি গল্পের ছায়া অবলম্বনে বানানো। কতবার যে দেখেছি ছবিটা, খুব ভালো লাগত! পরে বড় হয়ে চাঁদের বাড়ি দেখেছিলাম। অনেক ছবিই আসলে টিভিতে দেখেছি! কিন্তু সেগুলো যে তরুণ মজুমদারের তখন না জানলেও এখন জানি। সিনেমাপাড়া দিয়ে দুই খণ্ড পড়তে পড়তে তাঁর অনেক ছবির পেছনের কাহিনী আর নানা কলাকুশলীদের সম্পর্কে জেনে সময়টা তো চমৎকার কেটেছেই, চোখ খুলে গেছে মানুষ সম্পর্কে বিশেষত চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট মানুষ সম্পর্কে, অন্য ভাবে ভাবারও। উত্তম-সুচিত্রার চাওয়া পাওয়া ছবিটি পরিচালনার মাধ্যমে যাত্রিক পরিচালক গোষ্ঠীর সূচনা। সেখানে তরুণবাবুর পাশাপাশি ছিলেন আরো দুজন। পরবর্তীতে সে গোষ্ঠীটি ভেঙে গেলেও তরুণ মজুমদার লম্বা সময় ধরে একজন স্বনামধন্য পরিচালক হিসেবে নিজের আসনটা পাকা করে রাখেন। দীর্ঘ ক্যারিয়ারের বদৌলতে তাই তাঁর ঝুলিতে উত্তম-সুচিত্রা-সত্যজিৎ এর ভুরি ভুরি গল্প যেমন আছে, তেমনি রয়েছে প্রসেনজিৎ-ঋতুপর্ণা-কোয়েলের গল্প ও। সমস্ত গল্পই বলতে চেয়েছিলেন তিনি, সময় পেলেন কই! তাই একেবারে শেষদিকের ছবিগুলো সম্পর্কে নেই কোন গল্প বই দুটিতে। তবে যা রয়েছে তাও কম নয়। ননস্টপ ভূরিভোজ বলা যায় একে। চলচ্চিত্র সম্পর্কে ন্যূনতম আগ্রহ রয়েছে এমন পাঠকের পাতে সিনেমাপাড়া দিয়ে এর দুই খণ্ডই অত্যন্ত উপাদেয় হিসেবে বিবেচিত হবে। সত্যজিৎ রায়কে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন তরুণ। ফুলেশ্বরী ছবির একটি গানের মাধ্যমে তাঁকে ট্রিবিউট ও দিয়েছেন। সুচিত্রা সেনের সাথে সুসম্পর্ক থাকলেও এবং শেষ দিন পর্যন্ত সুচিত্রা সেনের প্রতি শ্রদ্ধা থাকলেও একটা বিশেষ কারণে সম্পর্কটা তিক্ত হয়ে যায়। আসলে মিসেস সেনের ব্যক্তিত্বে জেদটা একটা অত্যাবশকীয় অঙ্গ ছিল। সন্ধ্যা রায় তরুণ মজুমদারের সর্বাধিক ছবির শিল্পী এবং জীবনসঙ্গী হলেও তাঁর সম্পর্কে বিশেষ কথাবার্তা নেই। থাকলে ভালো লাগত আরো। তবে এটা তো আর জীবনকাহিনী নয়, চলচ্চিত্রযাত্রার টুকরো স্মৃতিচারণ। তাই যে ছবিতে যা গুরুত্বপূর্ণ এবং মনে রাখার মতো সেসবই এসেছে বারবার। শেষ হয়ে যাওয়ায় আফসোস হচ্ছে। আরো কত কত মজার ঘটনা থেকে বঞ্চিত রয়ে গেলাম ভাবতে এক ধরনের কষ্টও হচ্ছে আসলে!
বইয়ের দ্বিতীয় খণ্ডটা শেষ করার পর সত্যিই আর কিছু লিখতে ইচ্ছে করে না। শুধু রাগ হয়। রাগ হয় লেখকের ওপর— তাঁর এই 'টুকরো কথা'গুলো শেষ করার সুযোগ পেলেন না বলে। রাগ হয় মহানায়কের ওপর— তাঁর চলে যাওয়ার মুহূর্তেই তো থমকে গেছিল এই স্মৃতিচিত্রণ। ভীষণ রাগ হয় অলংকরণ শিল্পীর ওপর। রঞ্জন দত্ত নিজের জীবনের বোধহয় শ্রেষ্ঠ কাজ করেছেন এখানে। কিন্তু চরিত্রদের এমন বাস্তবিক, এত জীবন্ত করে ফুটিয়ে না তুললে কি আমরা পারতাম লেখকের সঙ্গে সেই সময়টাতে এমনভাবে বুঁদ হতে? পারতাম না। তাই নেশা কেটে যাওয়ার রাগটা তাঁর ওপরে ঝাড়তে হয় বইকি। রাগ হয় প্রকাশকের ওপর। বইয়ের নামে এই যে দু'খানা ভিডিও ক্যাসেট তাঁরা আমাদের হাতে গুঁজে দিলেন, এবার এর সিকোয়েলটা কে বানাবে? কী করে জানব এর পরের তিনটি দশকের কথা, ব্যথা, গান আর গল্প? আর জানতে পারব না সে-সব। মানুষটা চলে গেলেন এই ক'দিন আগে। রেখে গেলেন তাঁর অবিস্মরণীয় সিনেমাগুলো, বেশ কিছু গল্প ও রচনা, আর এই কাজটি। যদি বইটা এখনও না পড়ে থাকেন, তাহলে প্লিজ পড়ুন। এমন বই কালেভদ্রে হয়।
শেষ হয়ে গেলো!!!!!! দুই খন্দের অমূল্য রত্নখানি শেষ হয়ে গেলো। অবশেষে হুট করে দ্বিতীয় খন্ডও শেষ হয়ে গেলো। আফসোস পরের অংশগুলো আর জানা হবে না। কারণ ইতমধ্যেই মৃত্যুবরণ করেছেন তরুণ মজুমদার। আহারে.................. কি একটা আফসোস রেখে গেলেন তিনি। চিত্রনাট্যকার ছিলেন তাই তার লেখাও যে সরেস হবে এটা নতুন কি।
দুই খন্ডের ৮৫২ পাতা যেন নয়। নস্টালজিয়ার একটা ঝাঁপি খুলে বসেছিলেন লেখক। সিনেম নিয়ে যাদের আগ্রহ আছে তাদের জন্য তো এটা অবশ্য পাঠ্য। এই বই সিনেমাপ্রেমীদের জন্য অবশ্যপাঠ্য বেশ অনেকগুলো কারণে।
১. বাংলা সিনেমার স্বর্ণযুগ কিংবা শুরুর দিকের গল্প যাদের জানার ইচ্ছে এর চেয়ে ভালো বই আর হয় না। কি প্রতিকূল আর সীমাবদ্ধতার মধ্যে দিয়ে আজকে বাংলা সিনেমা(বিশেষত কলকাতার সিনেমা) এই পর্যায়ে এসেছে তার একটা মোটামুটি গ্রাফ পাওয়া যায়।
২. এতদিন যে মানুষগুলোকে শুধু স্ক্রিনের পর্দায় দেখতাম আর তাদের অভিনয় প্রতিভা নিয়ে মুগ্ধ হতাম তাদের জীবন নিয়ে কত অজানা কথা জানা যাবে দুই খণ্���ের এই রত্নে হিসাবে নেই। এখন থেকে সাদা কালো যুগের কোন মুভি দেখা হলে একটা আলাদা আবেগ কাজ করবে। কারণ এতদিন যদিও তাদের অভিনয়েই মুগ্ধ হয়ে ছিলাম আজকে থেকে যোগ হলো তাদের অগ স্ক্রিনের গল্প। মনে হচ্ছে যেন এরা আরও পরিচিত।
একটা সিনেমা মানে সিনেমা নয় তার সাথে জড়িয়ে থাকা কতশত গল্প। তরুণ মজুমদার কাজ করেছেন অনেক বছর। স্বাভাবিকভাবেই তার সাথে মন কষাকষি কম মানুষের হয়নি। কিন্তু ভদ্রলোক তাদের নিয়ে একটি কথাও বলেননি। যদিও তারা তাদের গল্পের প্রয়োজনে এসেছিলেন গল্প শেষে তাদের প্রস্থান ঘটে। তাদের নিয়ে বিষেদাগার করে একটি শব্দঅ খরচ করেননি। উদাহরণস্বরূপ, ছবি পরিচালনার শুরুতে যাত্রিক(তরুণ মজুমদার, শচিন মুখোপ্যাধায় এবং দীলিপ মুখোপ্যাধায়) নামে উনারা মুভি পরিচালনা করলেও পড়ে তাদের মধ্যে মতানৈক্য হলে আলাদা হয়ে যান। কিন্তু যতক্ষণ তাদের যাত্রিকের গল্প বলেছেন একটুও খাটো করে বলেলনি। যখনই তাদের সাথে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেলো সুন্দর করে নিজের গল্প বলে গেলেন। কি সুন্দর! আজকাল বিচিং ছাড়া কেউ কি এরকম লিখে? হয়তো সিনেমাপাড়ার গল্প বলবেন বলেই কলম ধরেছেন, তাই নিজের ব্যক্তিগত জীবন কিংবা অর্জন নিয়ে যেটুকু না বললে নয় সেটুকু ছাড়া কিছুই বলেলনি।
বইটা শেষ করে একটা কথাই বলতে চাই, এখন কলকাতার সাদা-কালো যুগের যে সিনেমাই দেখি না কেন সবগুলো সিনেমা খুব আগ্রন নিয়েই দেখবো। গল্প কিংবা অভিনয় তো আছেই। তখন মনে হবে তরুণ সাহেব তো এই মুভির কথাও বলে গিয়েছেন। বলেছেন খুচরো কিছু গল্পও। কিংবা এই অভিনেতার তো এমন সেমন তরুণ সাহেবের থেকে জানলাম।
I thoroughly enjoyed reading this book and found myself captivated by its characters. I highly recommend it to anyone looking for a compelling read. The characters in the story are wonderfully crafted, and their down-to-earth personalities offer a refreshing perspective. What I found most intriguing is that the characters, we admire as superheroes are with incredibly human qualities. It's only after delving into the pages of this book that one can truly appreciate the depth of their humanity. Overall, a fantastic read that I would recommend to anyone looking for a new perspective
পড়তে শুরু করলে একটানে শেষ না করে উপায় থাকে না। দুটি খন্ড পড়তে গিয়েই এক অবস্থা। সারারাত জাগা। পড়তে হবে আবার, একটু একটু করে। সবচেয়ে ভালো লাগে, খুব সহজভাবে, লেখার অংশ হিসেবে গান কবিতা তুলে দেওয়া; উপরি পাওনা কালজয়ী যেসব গল্পের ভিত্তিতে বানানো তাঁর সিনেমা, সেগুলির ছোট ছোট ব্যাখ্যা। তাঁর মতো করে। তিনিও তো স্রষ্টা, তাঁর নিজের ব্যাখ্যার আলোতে সৃষ্টি কে দেখার অনুভূতি অন্যরকম। লাভ আমার আরো এই, আরো ভালো ভালো বই পড়ার, আর গান শোনার ইচ্ছে জাগিয়ে দিলেন।