আমরা যারা কিছুমিছু পড়াশোনা করেছি তাদের কাছে চার্লস ডারউইন আর বিবর্তন প্রায় সমার্থক শব্দ। ডারউইন সাহেবের এই যাত্রাটা মুটেও সহজ ছিল না। না মানসিক ভাবে, না শারীরিকভাবে। এতদিনকার প্রতিষ্ঠিত বাইবেলের বিরুদ্ধে বলতেও ত সাহস লাগে।
বিগল নামক জাহাজে করে ১৮৩১ থেকে ১৮৩৬ পর্যন্ত দীর্ঘ পাঁচটা বছর পুরা দুনিয়া চক্কর দিতে হয়েছিল তাকে। এই দীর্ঘ সফরে তিনি ৫৪৩৬টি নমুনা সংগ্রহ করেন আর ৭৭০ পাতা জুড়ে এক মহাকাব্যিক ডায়েরি লিখেন।
আমাদের এই বইটি শুরু হয়েছে বিগলের প্রথমদিনের যাত্রা থেকে। এই অংশটা আমরা জানবো নাম পুরুষ বা Third person এ। এরপর বিগল যখন গ্যালাপাগোস দ্বীপে হাজির হয় তখন থেকে বই এগিয়ে চলে ডারউইন সাহেবের ডায়েরির পাতা ধরে উত্তম পুরুষ বা First person এ। আবার বইয়ের শেষে গিয়ে দেবজ্যোতিবাবু নাম পুরুষে সংক্ষেপে ডারউইনের গবেষণা এবং অরিজিন অব স্পিসিস বই প্রকাশ হওয়াতক বিষয়গুলো সংক্ষেপে জানিয়েছেন পাঠককে যা কি না বইটিকে সম্পূর্ণতা দিয়েছে। আর বইয়ের মাঝে দেয়া টীকা টিপ্পনীগুলো খুব দরকারী ছিল।
ডারউইন সাহেবের বিশাল ডায়েরি থেকে তাত্তিক ও জটিল অংশগুলো বাদ দিয়ে আমপাঠকের উপযোগী করে বইটা করার জন্য দেবজ্যোতিবাবুর ধন্যবাদ প্রাপ্য। বিবর্তন তত্ত্বের পেছনের গল্পটা জেনে আনন্দিত হলাম। বইটা পেপারব্যাক হলেও সুন্দর ও মজবুত তবে কিছু টাইপো রয়েছে। আশা করি ২য় সংস্করণে সেগুলো ঠিক করা হবে।
চার্লস ডারউইনের নাম শুনলেই মানুষের পূর্বপুরুষ বানর থেকে এসেছে নাকি মানুষ ও বানর একই পূর্বপুরুষ প্রাণী থেকে এসেছে অর্থাৎ বিবর্তনতত্ত্ব নিয়ে আমাদের মনে প্রশ্ন উঁকিঝুঁকি মারে। কিন্তু দেবজ্যোতি ভট্টাচার্যের সম্পাদিত ও লিখিত ডারউইনের ডায়েরি নামক এই গ্রন্থে মানুষ ও বানরের কোন প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা করা হয়নি। সুতরাং কেউ যদি এই তত্ত্বের ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে বইটি পড়তে চাইলে তাকে হতাশ হওয়া লাগতে পারে।
দীর্ঘ চার বছরের সুদীর্ঘ সমুদ্র অভিযান শেষে ডারউইন প্রাণী আর উদ্ভিদের ৫৪৩৬ টি নমুনা জড় করেছিলেন। নমুনাদের বিষয়ে লিখেছিলেন ৩৬৮ পাতা জুড়ে খুঁটিনাটি বিবরণ সেই সাথে ৭৭০ পাতা জুড়ে লিখেছিলেন তার মহাকাব্যিক অভিযানের ডায়েরি। লেখক দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য মূলত এই সুবিশাল ডায়েরি থেকে খুঁজে আনা এন্ট্রি গুলো দিয়েই বইটি (পৃষ্ঠাসংখ্যা ২৪০) সাজিয়েছেন।
১৯৩১ সালে প্লাইমাউথ বন্দর থেকে বিগল নামের একটি জাহাজে ২৪ বছরের এক ছোকরা আটলান্টিক মহাসমুদ্রে যাত্রা শুরু করে। মূলত তার চেনা একজন পাদ্রী, কেমব্রিজের রেফারেন্ড হেন্সলো তাকে খবর দেয়, বিগল নামের একটি জাহাজ সমীক্ষার কাজে রওনা হচ্ছে দক্ষিণ আমেরিকার দিকে। সে কথা শুনে বাবার কাছ থেকে খানিক টাকা নিয়ে তড়িঘড়ি মোটা ভাড়া গুনে জাহাজে চড়ে বসেছিল সে। ছোকরা হয়তো লাতিন আমেরিকার একেবারে দক্ষিণতম প্রান্তে তিয়েরা দেল ফুয়েগো পর্যন্ত যাত্রা করে ক্ষান্ত দিত। কিন্তু জাহাজ যখন রিও ডি জেনইরো গিয়ে পৌঁছায় তখন একটি ঘটনা ঘটে। এখানে ইংল্যান্ড থেকে জাহাজীদের নামে চিঠিপত্র আসে। আর একটি চিঠিতে ছোকরা জানতে পারে তার প্রিয় বান্ধবী ফ্যানের বিয়ে হয়ে গেছে দেশে। পুরুষ মানুষ প্রেমে আঘাত পেলে যে ঈশ্বর আসনও টলিয়ে দিতে পারে তার একটি দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করল এই ছোকরা। সে সিদ্ধান্ত নিল আর ফিরে না যাওয়ার। পুরোপুরি মনোনিবেশ করল প্রকৃতির গভীর বৈচিত্রের দিকে। তারপর সৃষ্টি হল ইতিহাস। বাইবেলের ঈশ্বরের সৃষ্টি নিখুঁত পৃথিবী ও প্রাণিজগতের বিশ্বাসে চিড় ধরায় এই ছোকরা। পরিণত বয়সে তার বিবর্তনতত্ত্ব আলোড়ন তুলেই গতি মন্থর করে না জীববিজ্ঞানের গবেষণার ধারা ও সিদ্ধান্তগুলো আমূল পাল্টে দেয়। পরবর্তীতে জেনেটিক্স বিবর্তনতত্ত্বকে আরও শক্ত মাটির উপর প্রতিষ্ঠিত করেছে। আর বুঝতেই পারছেন সেই ছোকরা আর কেউ নয় চার্লস ডারউইন।
বিগল জাহাজে জাস্ট ডারউইন একের পর এক মহাসাগরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা দ্বীপগুলোতে ভ্রমণ করেছেন। তার ভেতর সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপপুঞ্জ হল গ্যালাপাগোস। এই দ্বীপপুঞ্জ ছিল ইংরেজ জলদস্যুদের আস্তানা। উত্তর আমেরিকার স্পেনের কলোনি গুলো থেকে যখন সম্পদ ভর্তি জাহাজ স্পেনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করতো তখন ইংরেজ জলদস্যুদের জাহাজ তাদের আক্রমণ করত ও সম্পদ লুট করত। ব্রিটিশ রাজ পরিবার এইসব জলদস্যুদের ইন্ধন দিত ও পৃষ্ঠপোষকতা করত। এমনকি এই কথাও শোনা যায় ক্যাপ্টেন ফিট্জ্রয়কে বিগলের সমীক্ষা ছাড়াও দায়িত্ব দেওয়া হয় গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জে এইসব জলদস্যুদের অবকাঠামগত সুযোগ সুবিধা নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করার জন্য। গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জের আদিনাম গুলো এই জলদস্যুদেরই দেওয়া।
পরবর্তীতে স্পেন এই দ্বীপগুলো দখল করে নেয় এবং নতুন স্প্যানিশ নামকরণ করে। কিন্তু ডারউইন তার লেখায় ব্রিটিশ জলদস্যুদের দেওয়া নাম গুলোই ব্যবহার করেছেন। ডারউইন এই দ্বীপপুঞ্জেই তার বিবর্তন তত্ত্বের অন্যতম সূত্র ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের ফিঞ্চ পাখিদের খুঁজে পেয়েছিলেন। ডারউইনের পর্যবেক্ষণ গুলো দেখার জন্য বর্তমানে এই দ্বীপপুঞ্জে প্রতিবছর ২ লক্ষাধিক পর্যটক ভিড় করে। সুতরাং বিবর্তন তত্ত্বকে বোঝার জন্য এই দ্বীপপুঞ্জকে একটি প্রাকৃতিক গবেষণাগার বলা যেতেই পারে।
বিগল জাহাজে ডারউইন ফকল্যান্ড, গ্যালাপাগোস, তাহিতি, নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, কোকোজ আইল্যান্ড, মরিশাস, উত্তামাশা অন্তরীপ, সেন্ট হেলেনা, অ্যাসেনশান ইত্যাদি দ্বীপপুঞ্জ সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন তারিখে এন্ট্রি যোগ করেছেন। এসব এন্ট্রিতে ডারউইন মূলত ঐ সকল দ্বীপের ভূপ্রকৃতি, জীবজগৎ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতির ব্যাপারে বিভিন্ন তথ্য যোগ করেছেন।
ডারউইন ইংল্যান্ডের মিশনারীদের নিয়ে বেশ গর্বিত ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন এইসব অঞ্চলে ইংরেজ মিশনারিরা আত্মত্যাগ এবং অভূতপূর্ব পরিশ্রমের মাধ্যমে স্থানীয় আদিবাসী ও বাসিন্দাদের ভেতর সভ্যতার আলো পৌঁছে দিয়েছে। ডারউইন একটি জায়গায় বলছেন, মিশনারিদের দ্বারা সমুদ্রব্যাপী ছড়িয়ে থাকা এসব দ্বীপে ব্রিটিশ সভ্যতার ভ্রুনো ধীরে ধীরে বিকশিত হচ্ছে। তবে মরিশাসে প্রথম ভারতীয়দের দেখতে পান ডারউইন। তিনি বাদামি বর্ণের ভারতীয়দের ভেতর সৌন্দর্য খুঁজে পান এবং ভারতীয়দের স্বভাবের বেশ প্রশংসা করেন।
সম্পাদক ও লেখক দেবজ্যোতি ভট্টাচার্যের টীকা ও গল্পগুলো ডায়েরি এন্টিগুলোকে একঘেয়ে হতে দেয় নি বরং আরও আগ্রহোদ্দীপক করে তুলেছে। জীববিজ্ঞান নিয়ে যাদের বাড়তি আগ্রহ কাজ করে তাদের বিন্দুমাত্র হতাশ করবে বলে মনে হয় না৷ অনেক জানার মাঝেও কিছু অজানার সন্ধান তারা আশা করি পাবেন।