ডাকবাক্সের খোঁজে বাংলাদেশের কথাসাহিত্যিক ও কবি বিমান ধরএর লিখিত পত্রকাব্য। এটি চলিত ভাষায় লেখা প্রথম পত্রকাব্য। লেখকের প্রথম প্রকাশিত বই। চিঠিগুলোর রচনাকাল ২০১৬ থেকে ২০১৯। পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয় ২০২০ খ্রিস্টাব্দের অমর একুশে বইমেলায়।
প্রকাশনা তথ্যাদিঃ লেখক ২০১৬ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত দূরে থাকা প্রেমিকার কাছে যেসব চিঠি লিখেছিলেন, সেগুলো থেকে বাছাইকৃত কিছু চিঠি নিয়ে ২০২০ সালের বইমেলাতে 'ডাকবাক্সের খোঁজে' প্রকাশ করেন। বইটি প্রকাশ করে নৃ প্রকাশন। মুদ্রিত মূল্য ১৮০ টাকা। প্রচ্ছদ অলঙ্করণ করেন অরূপ বাউল। উৎসর্গপত্রে লেখা ছিল, 'জোনাকি- যার জন্য কবিতা আঁকি।'
সারসংক্ষেপঃ বইটিতে শুধু চিঠির আদলে লেখা কবিতাগুলো যুক্ত করা হয়েছে। যেখানে প্রেমিকাকে কাছে না পেয়ে প্রকৃতির মাঝে তাকে খুঁজে ফিরছে এক বিরহী প্রেমিক। অনবদ্য ছন্দময় গদ্যে লিখিত 'ডাকবাক্সের খোঁজে' লেখকের ভাষায় 'এক প্রেমিকের প্রলাপ'।
ফ্ল্যাপঃ কোন এক ফাল্গুনের সকালে দেখা হয়েছিল দু'জনের। সেই থেকে প্রণয়। তারপর প্রয়োজন ঠেলে দিল শত মাইল দূরে। বিরহ এলো। কিন্তু তার শক্তি নেই বিচ্ছেদ ঘটানোর। শুধু মাঘের কুয়াশার মতো অস্পষ্ট করে দিল সব।
সেই কুয়াশা প্রেমিকের চোখে প্রেমিকার রহস্যময় হাসি হয়ে ধরা দিল। যে মাছরাঙা ছোঁ মারল হেমন্তের সন্ধ্যায়, তা যেন প্রেমিকার হাসি হলো। আর শারদীয় আকাশের গিরগিটি চরিত্র? সে তো দেখা হওয়া- না হওয়ার দোদুল্যমানতা।
'ডাকবাক্সের খোঁজে' তিন কাঁঠালের জঙ্গলে- কচুরিপানার দঙ্গলে কাউকে খুঁজে ফেরা সেই প্রেমিকের প্রলাপ। যা হয়ত কিশোরকে এগিয়ে নিয়ে যাবে ভবিষ্যতে। আর যারা পার হয়ে এসেছেন তারুণ্যের মহাসড়ক, তাদের ফিরিয়ে নিয়ে যাবে কাদা মনের যৌবনে।
'ডাকবাক্সের খোঁজে' সবার কথা হোক। ফিরিয়ে আনুক আবার কাঁপা হাতে লুকিয়ে লেখা চিঠির দিন। বদ্ধ গরমের রাতে চাদরে নিজেকে মুড়ে কেউ পড়ুক সেই রক্তের শ্লোক।
চিঠির যে হৃদয় নিঙড়ানো আবেগ তা আমরা এই মোবাইল ফোন এর যুগে অনুভব করতে পারি না। "ডাকবাক্সের খোঁজে" বই টার প্রতিটা পাতায় এই আবেগ অনুভব করা যায়। যে কথাগুলো অনেক সময় মুখে বলতে পারি না আমরা কিন্তু আমাদের মনের অলিতে-গলিতে ঐ কথা গুলোর সাবলীল দৌড় ঝাঁপ, সেসব কথা চিঠিতে পূর্ণ ভাবাবেগ এর সাথে প্রকাশ করতে পারাটা একটা শিল্প। সেই শিল্পের পরিপূর্ণ ব্যবহার "ডাকবাক্সের খোঁজে" হয়েছে। চমৎকার একটি বই। ❤️
২৬ ঘন্টার মধ্যে বই শেষ করার পর মনে হল এই যে এমন বই যদি কেউ দ্রুত শেষ করার তাগিদ দেয়, তবে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হওয়া উচিত। রহস্য রোমাঞ্চ শিশুকিশোর রাত জেগে এক নিঃশ্বাসে শেষ করে বই কি! কিন্তু ডাকবাক্সের খোঁজে এমন একটা বই যার রস আস্বাদন করতে হবে তারিয়ে তারিয়ে, দু এক পাতা পড়ে চোখ বুজে মর্মমূলে গেঁথে নিতে হবে মর্মার্থ, আবার দু পাতা পড়ে বলে উঠতে হবে-আহা!সাধু! সাধু!
বইয়ের মুখবন্ধে দাবী করা হয়েছে এই সাহিত্যকর্মটি একটি পত্রকাব্য।আমি দ্বিমত পোষণ করতে চাই। এ চিঠি নয়,কাব্য নয়, এ হল অফিয়ার্সের বীণার ঝংকার। প্রেমিকা ইউরিডিসের জন্য যে অর্ফিয়াসের বাদনযন্ত্র চিরকাল গেয়ে চলেছে বিরহী করুণ সুর, সেই সুর এসে অক্ষরের চিত্রলিপি এঁকেছে লেখকের কলমে।
উনিশ শতকে দিকে যে কলাকৈবল্যবাদের সূচনা হয়েছিল তার মূলমন্ত্র ছিল Art for the art's sake.অর্থাৎ অর্থ নয়, কীর্তি নয়, স্বচ্ছলতা নয়, কেবল এক বিপুল বিস্ময়, সৃষ্টির আনন্দে কেবল সৃষ্টি করে চলা। সেই সৃষ্টির আনন্দ যখন পাঠকে সঞ্চারিত হবে তবেই সে সাহিত্য, সেই শিল্পকর্ম সার্থক। বিমান ধরে ডাকবাক্সের খোঁজে এই কলাকৈবল্যবাদের এক অনুপম নিদর্শন বলে আমার মনে হয়েছে। পাঠক পড়তে পড়তে সেই অদেখা প্রেমিক প্রেমিকার প্রেমের দোলায়, কথার ছন্দে যেভাবে দুলেছে, বিরহে পুড়েছে, আমার ধারণা লেখকও এই শিল্প গড়তে গিয়ে সেই আনন্দই পেয়েছিলাম। কারণ কেবল মস্তিষ্ক দিয়ে লিখলে ভালোবাসার অনুররণ এত তীব্রভাবে প্রকাশিত হয় না, লিখতে হয় হৃদয় দিয়ে।
আবার বছর দুই এক পর আমি ফিরে আসব এই বইটার কাছে। কোন বর্ষা মেদুর সন্ধ্যায় প্রেমিকের অপেক্ষায় চায়ের পেয়ালা হাতে নিয়ে আমি আওড়াবো.."যে জলে তুমি পা ডোবাও, সে জলে আমি যে ডুবি" অথবা "চলে এসো,না ফুটুক বাগানের ফুল, না ডাকুক মধুকণ্ঠ,আগুন নাই লাগল পলাশ -শিমুলে,এই হেমন্তে কতটুকু পাবে জানি না। তবে দিতে পারি সবটুকু।চলে এসো।তোমার জন্য আমায় তুলে রাখলাম।"