বুধ গ্রহে চাঁদ উঠেছে’র দশটি গল্প। গল্পের ফাঁকে গল্প। চরিত্রের ওপারে অন্য চরিত্র। তারা সবাই তাদের মতন। নিজস্ব। প্রতিটি চরিত্রের দেখবার পৃথিবী আলাদা। কেউ তোলে সুর, কেউ জানে ভাষা, কেউ বাঁচে অনুরণনে। মানুষেরা শুধু চরিত্র হয়ে ওঠেনি গল্পগুলোতে। নিসর্গ স্থান করে নিয়েছে গল্পের ভাঁজে ভাঁজে। তাই বিন্যাকুড়ির তোতামিয়া, লাল সুতা বাঁধা টিয়া পাখি, হলুদ লাল ছোপের ফিতা সাপ, ব্রহ্মপুত্র কিংবা রূপসা, বিলম্বি গাছ এমনকি নানা রঙের মুখোশও হয়ে ওঠে চরিত্র। নানা ঢঙের চরিত্রেরা মিলে যায় এক সূত্রে এসে—অপেক্ষা। তারা সবাই অপেক্ষায় আছে।
Kizzy Tahnin is a contemporary Fiction Writer currently living in Bangladesh. Kizzy is a free spirited soul who is aware of and understands the wider world - and their place in it. She writes to create the world that no one ever seen, the characters no one ever met before.
She has written 3 books and numerous stories both published and yet to be published in national and international literary magazines. Her stories are being translated and published into English.
Publications in Bangla: 1. Der Nambari 2.Budh Grohe Chad Utheche 3.. Ache Ebong Nai 4. Iccher Manchitra
She is a development worker by profession and has been working for more than 7 years to promote and safeguard Culture and Heritage. In early 2016, The Department of Foreign Affairs and Trade of Australia selected Kizzy from Bangladesh for their documentary, named “Story of My Life“ https://www.youtube.com/watch?v=eNTok....
গল্পগুলোর সাধারণ বিষয় : অপেক্ষা। অপেক্ষা প্রেমের, অপেক্ষা সুদিনের, অপেক্ষা সুন্দর একটি সকালের। কিযী তাহনিনের লেখা ঝরঝরে। ভাষায় এক ধরনের গীতিময়তা আছে। গল্পের প্লট জোরালো না হলেও টানা পড়ে ফেলা যায়। ঠিক যতোটুকু ভালো হলে "চমৎকার " বলা যায় বেশিরভাগ গল্পই সে স্তর পর্যন্ত পৌঁছায়নি কিন্তু লেখিকার মধ্যে সম্ভাবনা প্রচুর। তার অন্য বই পড়ার ইচ্ছা রইলো।
বুধ গ্রহে চাঁদ উঠেছে একটা গল্পগ্রন্থ। ১০ টা ছোটগল্প আছে এই বইয়ে। পৃষ্ঠাসংখ্যা ১০২। দাম ধরা হয়েছে ২৯০ টাকা। কমিশনের পর আমি কিনেছি ২২০ টাকায়। গল্পগুলো হলো:
বিন্যাকুড়ির আকাশ-পাতাল বিলম্বি টান মধ্যদিনের গান একটি সম্পূর্ণ রঙিন সিনেমা মনোভূমির জল আমি মেশিনঘরের রিসিপশনিস্ট ফিওনা ফ্যাশনিস্তার মুখোশ বিলাস আষাঢ়ে হলেও হতে পারে প্রেম বুধ গ্রহে চাঁদ উঠেছে
আমার ব্যক্তিগতভাবে যে গল্পগুলো বেশি ভালো লেগেছে সেগুলো হলে বিন্যাকুড়ির আকাশ-পাতাল, বিলম্বি টান, একটি সম্পূর্ণ রঙিন সিনেমা, বুধ গ্রহে চাঁদ উঠেছে, আমি মেশিনঘরের রিসিপশনিস্ট, আষাঢ়ে।
আমার ইচ্ছা ছিল এবারের বইমেলায় যে বইগুলো পড়ে একটু অন্যরকম মনে হবে সেগুলো নিয়ে লিখব। কিযী তাহনিনের এই বইটা পড়েছি বেশ আগে। একটু সময় লেগে গেল লিখতে।
সময় নিয়ে লেখার কারণ আছে। কিযীর লেখার যে স্টাইল তা একেবারে আলাদা। স্বতন্ত্র। ওঁনার মতো আর কাউকে পাইনি। কথাটা বিশ্বাস করি বলেই বলছি। ভালো বা খারাপ লেখা সে পরের হিসাব। তাঁর লেখা আলাদা ধাচের।
প্রথমে যখন পড়বেন তখন আপনি গদ্যের প্রথম লেয়ারে পিছলে চলে যাবেন। মনে হবে এত সহজ সরল করে বলা! তখনই নিজের মনে সন্দেহ জাগবে, এত সহজ তো হবার কথা নয়! নিশ্চয়ই এর মধ্যে কোনো ঘাপলা আছে। আপনি দ্বিতীয়বার পড়বেন। তখন সহজ গল্পটার দ্বিতীয় লেয়ারে গিয়ে পৌঁছবেন।
এভাবেই আপনি চান বা না চান অসংখ্য আলাদা আলাদা লেয়ার আবিষ্কার করবেন। ইংরেজিতে বলে, রিড বিটুইন দ্য লাইনস।
কিযীর গল্পের ভেতরে গল্প আছে, লাইনের মধ্যে লাইন, শব্দের ভেতরে শব্দ। প্রথমবার চোখ এড়িয়ে যাবে এমন অনেক ব্যাপার আপনি পরেরবার আবিষ্কার করবেন। পড়লাম, তারপর মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দিলাম- এমন নয় ওঁনার লেখা। কিযীর দেখার চোখ আলাদা। ভাষা মৃদু, মোলায়েম। নীচু স্বরে কথা বলেন। ‘কথা বলা’ বলতে আমি লেখা বুঝিয়েছি। জাহির করেন না কিছু। সিদ্ধান্ত দিয়ে দেন না কোনো ব্যাপারে। জহির রায়হানের গদ্যের মতো ছোট ছোট বাক্য। মাঝে মাঝে কোনো বাক্য এক শব্দে শেষ হয়ে যাবে। বর্ণনা এত ডিটেইল যে চিত্রনাট্য বলেও ভুল হতে পারে। কোনো চিৎকার চেচামেচি আপনি পাবেন না। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেছিলেন, ‘কবিতায় চিৎকার করতে নেই।’
আমিও বিশ্বাস করি সুনীলের কথাটা। কিযী’র গদ্যেও কোনো চিৎকার চেচামেচি নেই। গল্প লিখে পৃথিবীতে বিপ্লব ঘটিয়ে দেবার মতো মহান কোনো দায়িত্ব তিনি নিজের কাঁধে তুলে নেননি। তাঁর কিছু কথা আছে। তিনি তাঁর মতো করে মৃদু স্বরে নিজের কথা বলে যান। সেই স্বরের সাথে আপনার একবার যদি সিংক হয়ে যায় নেশায় পরিণত হবে। নতুন এক পৃথিবীর দরজা খুলে যাবে আপনার সামনে। গদ্যে বিষণ্ণতার ছাপ আছে। স্পষ্ট সে ছাপ। শীর্ষেন্দুর মতো। বুক হু হু করে।
সব ভালো বললে হয় না। তাই একটা নেগেটিভ কথা বলি। একেবারে শেষে এসে বলছি। না বললেও চলত। কিন্তু বলে ফেলা ভালো। তা হলো, তাঁর লেখায় মানুষের মনের আদিম অন্ধকার অনুপস্থিত। অন্তত আমি পাইনি। তার চরিত্রগুলোর মধ্যে কোনো যৌন আকাঙ্ক্ষা নেই। তার তিনটি বই পড়ার পর আমি এ বিষয়টা উপলব্ধি করেছি।
যৌনতা যে খুব বেশি দরকার তা নয়। এই ব্যাপারটা ছাড়াই পৃথিবীর অনেক মহৎ সাহিত্য লেখা হয়েছে। ভবিষ্যতেও হবে। এটা আমার ব্যক্তিগত সমস্যা- কামনা বাসনা ছাড়া মানুষগুলোকে আমার রক্তমাংসের মানুষ বলে মনে হয় না।
কিযী আরও লিখুন। আপনার মতো করেই লিখুন। আমি বা আমরা সিংক করে নেব আপনার লেখার সাথে।
তাঁর এই বইয়ের একটা গল্প ইংরেজিতে অনুবাদ হয়েছে। আমেরিকার একটা ম্যাগাজিনের জন্য। 'বিলম্বি টান' গল্পটার নাম। সে-ই গল্প ইংরেজিতে পড়ার সৌভাগ্যও আমার হয়েছে।
তাঁর গল্প আরও অনুবাদ হোক। গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে যাক।
দশটি গল্পের হাট 'বুধ গ্রহে চাঁদ উঠেছে'। প্রথম গল্পটা পড়া শুরু করার পরই বুঝতে পারলাম, কিযী তাহনিনের লেখার বিশেষত্ব হলো তার নিজস্বতা। গল্প বলার ধরন বাকি দশজন গল্পকারের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। এতটাই আলাদা যে, আমি হয়তো পরবর্তীতে তার নতুন কোনো লেখা পড়লে অচিরেই বলে দিতে পারব, এটা কিযী তাহনিনের লেখা। এই বিশেষ একটা কারণের জন্যই তার লেখা স্থান পাবে বহুগুণ উচ্চতায়। অথচ গল্পগুলো আহামরি কোনো বিষয়কে কেন্দ্র করে লেখা নয়। প্রতিটি গল্পই আমাদের খুব পরিচিত। আমাদের ব্যক্তিত্বের ব্যাখ্যা। তা সত্ত্বেও গল্পগুলো সহজ এবং কঠিন। কঠিন, কারণ তার লেখা প্রতিটি গল্পের আড়ালে লুকিয়ে থাকে আরও গল্প। ঠিক যেমন মায়ের গর্ভে লুকিয়ে থাকে ছোট্ট সন্তান। প্রথম পড়ায় হয়তো এই লুকোচুরি খেলায় লুকিয়ে থাকা গল্পটাকে ছুঁয়ে ফেলা সম্ভব হবে না৷ কিন্তু দ্বিতীয়বার পড়ার পর একটু একটু করে বুঝা যাবে রহস্যের মতো সাধারণ ঘটনা। বইয়ের দশটি গল্পের একটি যোগসূত্র হলো 'অপেক্ষা'। প্রতিটি চরিত্র আপনার অথবা আমার মতো অপেক্ষায় আছে। আমার নিজের জীবনের সাথে গল্পগুলো কতটুকু মিলেছে? চলুন একটু পরখ করে দেখি...
প্রথম গল্প থেকে শুরু করা যাক। সেই কবে একবার দেশে দেশী এক টাকার হলুদ কয়েন নিয়ে মাতামাতি হয়েছিল, আপনাদের মনে আছে? আমি তখন বেশ ছোট। ঝাপসা মনে পড়ে। তারপর থেকে হলুদ কয়েনের চল প্রায় উঠেই গেলো। এখন তো বলতে গেলে এক টাকা, দুই টাকা খুব মূল্যহীন৷ দুই টাকার কয়েনে ভিক্ষুকরাও মুখ ভেংচি কাটে। তবু আমাদের বাসার আলমিরা, ড্রয়ার কিংবা পড়ার টেবিলের আনাচেকানাচে এক টাকার বহু হলুদ কয়েন পড়ে আছে বলে আমার ধারণা। আমার ছোট ভাই উচ্ছ্বাস প্রায়ই খেলার ছলে একটা একটা করে সেইসব কয়েনের দুয়েকটা খুঁজে বের করে। তারপর বসুন্ধরা পকেট টিস্যুর একটা খালি প্যাকেটে জমা করে রাখে। ওটা তার ওয়ালেট। আমি বলি, "ভাইয়্যু, এক টাকা দিয়ে কী করবা? ওটা কেউ নিবে না তো..." সে বলে, "কেন, সামনের দোকানের আঙ্কেল তো আমাকে মিল্ক চকোলেট দেয়।" আমি ভাবি, তাই তো! এক টাকার কয়েন আমাদের কাছে মূল্যহীন হতে পারে, কিন্তু উচ্ছ্বাস কিংবা গল্পের টুকু পাগলা, ঝুমকা আর সুদীপের কাছে খুব মূল্যবান। এই এক টাকায় 'জেগে ওঠে ঈদ, বিন্যাকুড়ির হাটে'।
এমন অনেকদিন হয়েছে, পাখিটার 'টুকুর টুকুর' শব্দে আমার ঘুম ভেঙেছে। আমার ঘরের কাঁচের জান��লায় ঠোঁট রেখে সে আমাকে ডাকে, "ওঠো বন্ধু, সকাল ফুরিয়ে যাচ্ছে..." গায়ের রঙ হলুদ, দেখতে ভারি মিষ্টি। আমি পর্দা ঠেলে ওকে একটু সময় চোখ জুড়িয়ে দেখে নিই৷ কারণ আমি জানি, জানালা খুলে দেওয়ার সাথে সাথেই ও উড়ে পালাবে। মানুষগুলোকে তার বড্ড ভয় করে। প্রথমদিকে ডানা ঝাপটে সে দূরে কোথায় যে চলে যেত আর ফিরে আসত না। এখন সাহসী হয়েছে। একটু দূরে একটা জবা গাছের ডালে বসে থাকে৷ পাতা খায়, ফুল খায়৷ আর আমার দিকে ঘুরে ঘুরে তাকায়। 'বিলম্বি টান' আমাকে আহমদ ছফার 'পুষ্প, বৃক্ষ ও বিহঙ্গ পুরাণ' এর কথা মনে করিয়ে দিলো। ভালো থাকুক সরকারি কলোনির লাল ফিতা বাঁধা টিয়া। ভালো থাকুক হলুদ-লাল ফিতা সাপ। ভালো থাকুক আমাকে ভয় পাওয়া হলুদ বরণ নাম না জানা পাখি। পাখি হতে চাওয়া প্রতিটি প্রাণ হয়ে উঠুক একেকটা টিয়া কিংবা পায়রা।
করোনার সেই সময়ে আমার চুল কাটা হয়নি দীর্ঘদিন। শেষের দিকের কথা। সেদিন শুক্রবার। ছুটির দিন। বাসায় বাজার নেই। এই থেকে শুরু। মা-বাবার মাঝে তুমুল ঝগড়া। এক ডাল থেকে অন্য ডাল। এক গাছ থেকে ভিন্ন-ভিন্ন গাছ পর্যন্ত ছড়িয়ে গেলো নির্লজ্জ-বেহায়া কথাদের মিছিল। মিড-লাইফ ক্রাইসিস অথবা করোনার করুণাহীন দাপটের ফলাফল। ছোট ভাই এইসব চিৎকার-চেঁচামেচি উপেক্ষা করার ভান করে একমনে রঙ ক্ষয়ে যাওয়া রিবিস্কিউবটা ঘুরাচ্ছে। বাম থেকে ডানে, উপর থেকে নিচে। আমিও চুপচাপ বের হয়ে গেলাম বাসা থেকে। খুব পড়েছি রবীন্দ্রনাথ থেকে ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়ের ক্লাসিক উপন্যাস। অনেক শিখেছি প্রেম-ভালোবাসা। বাস্তবতা 'মধ্যদিনের গান' এর মতন। এবার চুলগুলো কেটে আসা যাক।
"খোদার হিসাব পরিষ্কার বুবু, সবাইকে কিছু না কিছু দেখার ক্ষমতা দিসে। তোমরা দেখো দুনিয়া, আমি দেখি সময়।" মাঝে-মাঝে আমার খুব ইচ্ছা করে ব্যাগ গুছাই। নিরুদ্দেশ হই। নিজেকে চেনা খুব দরকার। খোদা দেখার ক্ষমতা দিছে। অন্তত দুনিয়াটাই না-হয় দেখি। কিন্তু সাহস করতে পারি না। ভীষণ ভীতু মনে হয় নিজেকে। মকবুল 'দি গ্রেট রওশন সার্কাস দলের' সুখী সদস্য হোক। তার সিদ্ধান্তকে সাদুবাদ জানাই। সে সময় দেখার মতো বিশাল ক্ষমতার অধিকারী। নিজেকে ক্ষমতাচ্যুত করাটা বোকামো হতো। মকবুলদের জীবন স্বাধীনতায় ভরপুর থাকুক। এমন মকবুলদের নিয়ে তৈরি হোক এক-'একটি সম্পূর্ণ রঙিন সিনেমা'!
পরম শ্রদ্ধেয় কবি নির্মলেন্দু গুণ এক সাক্ষাৎকারে বলছিলেন, "মৃত্যু হলো এক প্রকার লজ্জা। আর কিছু দিন বাঁচতে না পারার লজ্জা।" ভেবে দেখলাম কথাখানার জোর আছে বটে। তার জন্য অবশ্য গভীর উপলব্ধি প্রয়োজন। ২০০৬ সাল। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি শামসুর রহমান, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল কলেজে চিকিৎসাধীন। প্রধানমন্ত্রী গেলেন তার সাথে দেখা করার জন্য। কবি তার দুটো ইচ্ছার কথা জানালেন। প্রথম, তিনি বাংলাদেশের সুবর্ণ জয়ন্তী পর্যন্ত বেঁচে থাকতে চান। দ্বিতীয়, বঙ্গবন্ধুর শতবর্ষ উদযাপন করতে চান। প্রধানমন্ত্রী তাকে আশ্বাস দিলেন, তিনি বাঁচবেন। কিন্তু জন্ম-মৃত্যু কি আর প্রধানমন্ত্রীর হাতে? হঠাৎ মৃত্যু কড়া নাড়ল কবির ভাগ্যে। আজগর আলী খানের 'মনোভূমির জলে' কি এমন মৃত্যুর কোনো প্রতিবিম্ব ভেসে উঠে না? বোধহয় নীরবে, গভীরে কোনো বিকেলবেলায় আবছা ভেসে উঠে। রূপসা নদীর কাছেই কোথাও লুকিয়ে আছে সেই মৃত্যু।
বছর দশেক আগের কথা। একবার পাড়ার এক বড় ভাই তার বাপসম্পদের শেষ অংশটুকু বিক্রি করেছে। পাঁচ শতক জমি। প্রতি শতক লাখ টাকা দামে। তখনকার পাঁচ লাখ টাকা বিশাল অংক। আগপিছ না ভেবেই ডেস্টিনি না কীসে যেন একটা বিনিয়োগ করে দিলো। প্রথম দিকে পরপর ছয় মাস ভালোই লাভ আসছিল। লাভের টাকায় সে মহাখুশি। বাড়ি করল, বাড়ির সামনে পান-চুরুটের দোকান দিলো। তার আর চিন্তা কী! টাকা তো দ্বিগুন হয়ে ফিরবেই। কিন্তু ফিরল কি? তিন বছরে তিন লাখ টাকা আদায় করেছিল৷ আর পেয়েছে কোম্পানির 'গিফ্ট'— চাবির রিং, ক্যালেন্ডার, গুঁড়া দুধ, চুলের তেল, লোশন। তিন লাখে যে আটকালো, লাভ দূরে থাকুক, আসলখানাও পুরোপুরি আর ফিরল না। 'লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু।' তারপর থেকে ধার-দেনা করেই চলছে জীবন। দোকানটা এখন আর নেই। যে ছেলের গায়ের রঙ ছিল দুধের মতো সাদা, হাসলে চাঁদের মতো জ্বলজ্বল করত মুখ, তার চোখের নিচে এখন গভীর কালি। ছেঁড়া লুঙ্গি পরে হেঁটে বেড়ায় পাড়ার এমাথা-ওমাথা। মাঘে হোক বা 'আষাঢ়ে', কারো কাছে একশো-দু'শো টাকা খুঁজতে তার মাথা হেঁট হয় না এখন।
"এই সন্ধ্যার মুখে যখন পাখি ঘরে ফেরে, সন্ধ্যা বাতাসে সময় কেমন পাখির মতন হয়ে যায়, ছটফটে, তখন আমার কী সাধ্যি, এই মাদকতাময় অনুরোধ উপেক্ষা করি।" অদ্ভুত রহস্যময় জীবনে কতকিছুই না ঘটে! প্রতিটি মানবজীবনে কত উঠানামা! রিসিপশনিস্ট আর নায়িকা সুলতানার জীবনের গল্প তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। গল্পকার তার নিজস্ব কথাগুলোকে আলতো ভাষায়, নরম স্বরে এবং খুব সহজ করে শব্দ থেকে বাক্যে, বাক্য থেকে গল্পে পরিণত করেছেন। পড়তে পড়তে একসময় মনে হলো, 'আমি মেশিনঘরের রিসিপশনিস্ট'। কী অদ্ভুত! যে নিয়মিত জীবনে আমরা একইসাথে খুব অভ্যস্থ ও বিরক্ত, সেই জীবনের চিত্রও কোনো কোনো গল্পে ফুটে উঠেছে। যেমন 'ফিওনা ফ্যাশনিস্তার মুখোশ বিলাস'। আমাদের বাস্তবতার আঁধারে লুকিয়ে থাকা প্রকৃত সত্তার সত্য স্বীকারোক্তি।
তার লেখা এতটাই শক্তিশালী আর প্রখর যে, গল্প পড়ার সময়ে সাদ্দার স্ট্রিটের লিটন হোটেল, সেই স্প্যানিশ ক্যাফে, ইস্টার্ন প্লাজা, মোতালেব টাওয়ার সবকিছু পরিচিত মনে হচ্ছিল। এমনকি একমাত্র প্রেমের গল্পটার শেষ অংশে অংশুমালী আর ওয়ার্দা যে নিয়ন আলোর বেঞ্চিটার দিকে এগিয়ে গেলো, আমার মনে হলো সেই বেঞ্চিটার সাথেও আমার কত পুরনো পরিচয়! জয়নুল আবেদিন আর কানিজ ফাতেমাকে মনে হলো ঘরের মানুষ৷ তাদের সংলাপগুলোকে মনে হলো ঘরের সদস্যদের কথোপকথক। লেখার মাধ্যমে পাঠকের সাথে এই যে সংযোগ স্থাপন করতে পারা, এটুকুতেই লেখকের সার্থকতা বলে মনে করি।
কয়েকটা গল্প মনে বিশেষভাবে দাগ কেটেছে। উল্লেখযোগ্য: 'বিন্যাকুড়ির আকাশ-পাতাল', 'বিলম্বি টান', 'একটি সম্পূর্ণ রঙিন সিনেমা', 'আমি মেশিনঘরের রিসিপশনিস্ট', 'আষাঢ়ে' এবং অবশ্যই 'বুধ গ্রহে চাঁদ উঠেছে'। প্রতিটি গল্পের কথা খুব সাবলীল অথচ গভীর। তাড়াহুড়ো নেই। লেখায় পাঠককে খুব শক্ত করে বেঁধে রাখার প্রবণতা নেই৷ তবু পাঠক আটকে যাচ্ছে। চাইলেও ছেড়ে দিতে পারছে না। এই ব্যাপারটা দারুণ!
আমি চাইব, কিযী তাহনিন নিজের মতো করে আমাদের সবার জীবনের গল্পগুলো লিখতে থাকুন। আমরা তার লেখায় নিজেদের মতো করে খুঁজে নিব নিজেদেরকে।
গল্পকার কিযী তাহনীনের জন্মদিন শুভ হোক। 🌸
📙 বই : বুধ গ্রহে চাঁদ উঠেছে লেখক : কিযী তাহনীন প্রকাশক : পাঠক সমাবেশ প্রচ্ছদ মূল্য : ২৯০ টাকা
শব্দের পিঠে শব্দের বুনন এতটা মায়াময় হতে পারে তা বইটা পড়ার আগে বুঝতে পারিনি। অদ্ভুত এক ভালো লাগা আর বিষণ্ণতা লেপ্টে ছিল যেন প্রতিটি গল্পের গায়ে। জীবনকে মাইক্রোস্কোপের নিচে রেখে ম্যাক্রো লেভেলে দেখার মতো ছিল যেন ব্যাপারটা! একেকটা গল্পের থেকে আরেকটা গল্পের ভেতর যেন যোজন যোজন দূরত্ব, তবু জীবন জীবন মিল!
বইতে মোট গল্প ছিল দশটি। মোটেও এক বসায় পড়ার মতো বই না এটা। তাহলে গল্পগুলোকে আলাদাভাবে ফিল করা যায় না৷ যতটুকু সম্ভব সময় নিয়ে পড়লেই কেবল একেকটা গল্পে, কিংবা আরো বড় পরিসরে একেকটা জীবনে ঢুকে যাওয়া সম্ভব হবে। আর অভয় দিয়ে বলতে পারি, সেই যাত্রাটা হবে বিষণ্ণতা ঘেরা প্রশান্তির।
ভেবে রেখেছি, গল্পগুলো মাঝেমাঝেই পড়ব। পড়তে হবে। নিজের আসন্ন বিষণ্ণতাকে জানতেই হয়তো বারবার পড়তে হবে!