সিজার বাগচী-র জন্ম ১৯৭৭ সালে। দক্ষিণ কলকাতায়। পূর্বপুরুষের বসবাস ছিল অধুনা বাংলাদেশের ময়মনসিংহে। অল্প বয়সে পিতৃহীন। কলেজে পড়ার সময়ে লেখালিখি শুরু। ফিচার, গল্প, প্রবন্ধ, সমালোচনা, চিত্রনাট্য, কথিকা, উপন্যাস। সহজ তরতরে ভাষায় লেখা সব গল্প-উপন্যাসের বিষয়ই আলাদা। এবং তা উঠে আসে রোজকার জীবনযাত্রা থেকে। বড়দের পাশাপাশি ছোটদের গল্পও লিখছেন নিয়মিত৷ নানা পেশায় যুক্ত থেকেছেন। দীর্ঘদিন সাংবাদিকতার চাকরি করেছেন ‘আনন্দলোক’ পত্রিকায়। বর্তমানে ‘আনন্দমেলা’য় কর্মরত৷ লেখালিখি ছাড়াও বাংলার লোকসংস্কৃতি নিয়ে কাজ করতে ভালবাসেন।
পুজোর আনন্দমেলা বরাবরই আমার কাছে খুব প্রিয় একটা জিনিস। এই পত্রিকা পুজোর গন্ধের সাথে সাথে জানান দিয়ে যায় নতুন জামা কাপড় কেনা শুরু করতে হবে। এবারের আনন্দমেলা আমার মোটামুটি খারাপ লাগে নি। আজ এখানে আমার ভালো আর মন্দ লাগার দিকগুলো তুলে ধরি।
ভালো দিক:
👾আগের বারের এবং এবারের লেখক মোটামুটি একই, তাই লেখার মান যথেষ্ট ভালো বলেই আমার মনে হয়েছে।
👾অনেকদিন পরে সুকান্ত গঙ্গোপাধ্যায়ের হাত ধরে দীপকাকু আর ঝিনুকের প্রত্যাবর্তন। গল্পটি কিছু জায়গায় বড্ড প্রেডিক্টেবেল হয়ে গিয়েছে। তবে এই সিরিজের সেরা লেখা না হলেও লেখার মধ্যে রোমাঞ্চ এবং ঘটনার ঘনঘটায় যেকোনো পাঠক টানটান উত্তেজনা অনুভব করবে।
👾শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের হাসির গল্প যতদিন রয়েছে আনন্দমেলার বিক্রি কমবে না বলেই আমার বিশ্বাস। এলিয়েন টেলিস্কোপ মফস্বল সব মিলিয়ে ভদ্রলোক বেশ একটা মজার গল্প ফেঁদেছেন। আগের লেখার থেকে বেশ পরিণত মনে হলো এটিকে।
👾আমার সব থেকে প্রিয় উপন্যাস উড়ন্ত মানুষ। সুস্মিতা নাগ নতুন লেখক হলেও কিশোর মন তিনি বেশ বোঝেন। আমি কোনদিনই আনন্দমেলায় পরিণত উপাদান খুঁজি না। একটি আদ্যন্ত কিশোর উপন্যাস এই প্রথম দেখলাম। এই যন্ত্র যুগে গল্পেও যে যন্ত্র ঢুকবে তাতে আর বিচিত্র কি। তবে এত মিষ্টি কল্পবিজ্ঞান কাহিনী আমি বহুদিন পড়িনি।
👾গল্প কোনটা ছেড়ে কোনটাকে ধরি। কিশোর রচনায় প্রচেত গুপ্ত এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। ভদ্রলোক এমন কি করে ভাবেন তা বেশ ভাববার বিষয়। নির্ভেজাল মজার গল্প বলতে উল্লাস মল্লিকের হনুমান টুপিকেও আমি একই সারিতে ফেলবো।
👾রাপ্পা রায় যুগ যুগ জিও। এবারেও সুযোগ বন্দ্যোপাধ্যায় তার আঁকায় এবং গল্পে একেবারে বাজিমাত করেছেন। গল্পটি যেমন জমাটি তেমনি মজার। বাংলার কমিক্স জগতের শুনিস্থান খুব দ্রুত ভর্তি হতে চলেছে।
খারাপ দিক:
👾এটা সবার মতোই চর্বিত চর্বন। পত্রিকার অর্ধেক প্রায় বিজ্ঞাপন, এতে আমার যদিও আপত্তি নেই কিন্তু তার সাথে সাথে পত্রিকার দামও তারা চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়িয়ে চলেছেন।
👾পত্রিকা হাতে পাওয়ার দিন যে দুঃখে আমি প্রায় খাওয়া ছেড়ে দিয়েছিলাম তা হলো ফেলুদার কমিক্স নেই। কেন নেই কেউ জানে না। বাদুড় বিভীষিকার বেশ ভালোই চিত্রায়ন হয়েছে কিন্তু তাও যেন সেটা মনের ফাঁকা ভাবটাকে কমাতে পারলো না।
👾গোগোলের কমিক্স আমার মতে তুলে দেওয়া উচিত। বাজে গল্প নির্বাচন নাকি বাজে চিত্রনাট্য নাকি অঙ্কন কোনদিকে যে একে শাপ-শাপান্ত করা যায় আমি জানি না।
স্বীকারোক্তি: আনন্দমেলা কেনাটা অনেকটা নেশার পর্যায়ে এসে গিয়েছে, তাই এর থেকে উত্তরণ অসম্ভব...
আশুবাবুর টেলিস্কোপ - শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় : এটা উপন্যাস না ছোট গল্প? চরিত্র গুলো সবাই ভাসা ভাসা। শেষটাও "শেষ হয়েও শেষ হল না।" ৩* নিঃসঙ্গ প্রহরী - স্মরণজিৎ চক্রবর্তী : কুষাণের সাথে সাথে চড়াই উৎরাই পেরিয়ে একাত্ম হয়ে যাওয়া যায় পড়তে পড়তে। সেই বিশেষ মানুষের সন্ধান পেয়ে মন যেমন ভালো হয়, তেমনই, মানুষের লোভ ক্রমশ বাড়তে দেখে মন খারাপ হয়ে যায়। ৪* ফ্লাইট ৩৭৭ - কৃষ্ণেন্দু মুখোপাধ্যায় : পূর্ণা কে? কালো গাড়িতেই বা কে আসতো? এই উত্তর না খুঁজলে গল্পটা নির্ভেজাল আনন্দ দেয়। দুষ্টের দমন করার জন্য সাহায্য কারো না মাধ্যমে ঠিক এসে যায়। ৩* পাহাড়ে রহস্যের মেঘ - সুকান্ত গঙ্গোপাধ্যায় : দীপ কাকু আর ঝিনুক খুব প্রিয়। এবারেও ভালো লেগেছে। গল্প এগিয়েছে সুন্দর ভাবে, তাতে গতি আছে, রহস্য আছে এবং উত্তেজনাও আছে। এবারের বাকিগুলোর মধ্যে সেরা। ৪* প্রোফেসর রাবিনের গুপ্তসমাধি - রাজেশ বসু : খুবই অগোছালো লেখা লেগেছে। অনেক তথ্য সমৃদ্ধ তবে সেগুলো যেন জোর করে তৈরি করা। ৩* উড়ন্ত মানুষ - সুস্মিতা নাথ : অন্তুর জীবন সম্পর্কে ধোঁয়াশা কাটে না। কতগুলো ছেঁড়া ছেঁড়া ঘটনা সাজানো মনে হয়। ২* রেড ভেলভেট রহস্য - দেবারতি বন্দ্যোপাধ্যায় : কতগুলো ছন্নছাড়া ইতিহাসের টুকরো খবর। গল্প সেভাবে দানা বাধলো কই? মনে হল যেন ইতিহাস পড়ছি। ওনার রুদ্র-প্রিয়ম ও ইতিহাসের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজ করে, কিন্তু সেখানে গল্পের বাঁধন অনেক শক্ত। ২*
কমিকস - বাদুড় বিভীষিকা - সত্যজিৎ রায় - প্রসেনজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়) : বেশ ভালো। ৪* গরাদহীন জানালায় রাক্ষস - সমরেশ বসু - সৌরভ মুখোপাধ্যায়) : খারাপ না। ৩* টার্নিং পয়েন্ট - সু্যোগ বন্দ্যোপাধ্যায় : অন্যান্য বারের তুলনায় বেশ দুর্বল। ২*
গল্প
ডাকাতের দূত - প্রচেত গুপ্ত : বেশ মজার ও অন্যরকম। পড়ার শেষে ভালোলাগায় মন ভরে। ৫* হনুমান টুপি - উল্লাস মল্লিক : মজার, কিন্তু বোকা বোকা। ৩* ক্যাপ্টেন হাসিপাগলি - অঙ্কন মিত্র : দারুণ। হাসিপাগলি সত্যিই ভাল। ৪* হরিমতীর ঝিল - রাজশ্রী বসু অধিকারী : অন্যরকম। মন খারাপ করা। ৪*
অন্যান্য -
সংবেত্তা চক্রবর্তী, যুধাজিৎ দাশগুপ্ত, অচ্যুত দাস, চিত্রিতা চক্রবর্তী, ঋষিতা মুখোপাধ্যায়, জয় সেনগুপ্ত, দেবমাল্য চক্রবর্তী, অংশুমিত্রা দত্ত, মধুরিমা সিংহরায়, চন্দন রুদ্র : এদের লেখা বিভিন্ন বিভাগ যথেষ্ট তথ্যসমৃদ্ধ।.৫*
দীপসুন্দর দিন্দার কুইজ ও সুদেষ্ণা ঘোষের শব্দসন্ধান
এবারের আনন্দমেলা পূজাবার্ষিকী ঠিক জমলো না। উপন্যাসগুলো যেন খুব ছোট এবং সংক্ষিপ্ত মনে হলো। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের উপন্যাসটি পড়ে তো মনে হলো আমার এখনো অবধি পড়া ওনার সবথেকে খারাপ মানের লেখা। ক্রিকেটের ভাষায় Golden Duck! বাকি কিছু উপন্যাস, গল্প ভালো লাগলেও সব মিলিয়ে ঠিক যেন জমলো না। আর বিজ্ঞাপন তো দিন দিন বেড়েই চলেছে। প্রায় ৪০-৪৫% পাতা বিজ্ঞাপনে ভর্তি। শুধু গল্প/উপন্যাস নিয়ে বইটি বানালে ৪৬৫ পাতার বই না হয়ে হয়তো ২৫০ পাতার মধ্যে বইটি হয়ে যেত।