মূল বইয়ের নাম 'Men I have seen', যা প্রকাশিত হয়েছিল ১৯১৯ সালে। ঠিক এক শতক পর কলকাতা বইমেলায় পত্রলেখা থেকে প্রকাশিত হয় তারই বঙ্গানুবাদ 'যাঁদের দেখেছি'। এবারে নন্দন বইমেলায় পত্রলেখার স্টলে বইটে উলটে পালটে দেখতে গিয়ে ভালো লেগে গেল সুরজিৎ সেনের সুদক্ষ কলমের ভাষান্তর। হার্ডকভার বইটির নির্মাণ ও মুদ্রণ প্রশংসার দাবি রাখে। একটিও মুদ্রণপ্রমাদ চোখে পড়েনি। বইয়ের ছোটখাটো আকার বেশ ভালো লাগল। এবার আসা যাক বিষয়ের প্রসঙ্গে।
বইতে বিদ্যাসাগর, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রাজনারায়ণ বসু, আনন্দমোহন বসু, রামকৃষ্ণ পরমহংস, ডাঃ মহেন্দ্রলাল সরকার, দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ - এই সাতজন যুগপুরুষের সঙ্গে লেখকের নিবিড় সান্নিধ্যের কথা লিপিবদ্ধ হয়েছে। উঠে এসেছে টুকরো টুকরো অজস্র ঘটনা ও স্মৃতিকথা, যা থেকে সেই মানুষগুলির প্রচলিত জীবনীর বাইরেও অনেককিছু জানা যায়। বলা ভালো আরো কাছ থেকে চিনতে পারলাম তাঁদের। কখনো বিষ্ময়ের ঘোর লাগল, আবার কখনো বহু বছরের বিশ্বাসে আঘাত লাগল লেখকের তিক্ত অভিজ্ঞতার বয়ানে। শুরুতে কিছুদূর এগিয়ে মনে হয়েছিল লেখক সেইসব মনীষীদের স্তুতিগাথাই শোনাতে ব্যস্ত থাকবেন, রক্তমাংসের আসল মানুষগুলোকে চেনা যাবে না। কিন্তু কয়েক পাতা এগোনোর পর সেই ভুল ভাঙল। কিছু অংশ উল্লেখ করতে ইচ্ছে করছে।
বিধবা বিবাহের অনিবার্য প্রয়োজনীয়তা তখন দেশের প্রায় প্রত্যেক তরুণের মনেই আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ১৮৫৬ সালে সুকিয়া স্ট্রীটের বাড়িতে প্রথম বিধবা বিবাহ অনুষ্ঠানে লেখক স্বয়ং হাজির ছিলেন। সেই রাতের ছবি লেখকের বর্ণনায় স্পষ্ট ফুটে ওঠে চোখের সামনে৷ বাংলা জুড়ে এক প্রাণবন্ত আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বিদ্যাসাগর৷ কর্তব্যনিষ্ঠ হয়ে প্রবল প্রতিবাদের মুখে পড়েও একের পর এক বিধবা বিবাহের আয়োজন করছেন নিজে দাঁড়িয়ে থেকে। বিদ্যাসাগরকেই যেন কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা বলে মনে হচ্ছে বেশিরভাগ অনুষ্ঠানে।
বিদ্যাসাগরের এই মহৎ কাজের পাশাপাশি লেখক তাঁর রসবোধের পরিচয়ও দিলেন। কিন্তু সেখানেই পাঠের গতি বাধাপ্রাপ্ত হল। বিদ্যাসাগর তাঁর এক বন্ধুর নয় বছর বালিকাকে আশীর্বাদ করে বললেন, "মা আয়ুস্মতী হও। রাজার মতো তোমার স্বামী হোক, তারপর বিধবা হয়ে আমার কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্র তৈরি করো - অর্থাৎ আমি যেন আবার বিধবা বিবাহ দেবার একটা সুযোগ পাই।"
বিদ্যাসাগর এমন কৌতুকের ব্যাখ্যাও দিলেন এরপর। বললেন, "বন্ধুদের কন্যারা যদি বিধবা না হয়, তাহলে আমার আদর্শ বাস্তবে পরিপূর্ণ হবে কীভাবে বলো তো? সমস্ত সমাজ যেরকম বিধবা বিবাহের বিরুদ্ধে, তাতে এরকম ঘটনা ছাড়া আমার কর্মসূচি কাজে পরিণত হওয়া তো সম্ভব নয়।"
লেখক নিজেও এই রসাত্মক উক্তি যে উপভোগ করেছিলেন তা তাঁর লেখা থেকেই স্পষ্ট। যদিও এমন একটি ঘটনা দিয়ে একজন মহাপুরুষকে বিচার করা যায় না, তাও পাঠক হিসেবে কিছুটা বিস্বাদ মুখে নিয়েই এগোতে লাগলাম। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের অধ্যায়েও লেখক ব্যক্তিপূজায় ব্যস্ত রইলেন। তবে সচেতনভাবে সেখানে রবীন্দ্রনাথ বা ঠাকুর পরিবারের অন্যান্য দিগগজদের কথা আনেননি একবারও৷ রাজনারায়ণ বসুর সাক্ষাৎ থেকে লেখক শিবনাথ শাস্ত্রী তাঁর প্রতিবাদী সত্তার পরিচয় দিলেন, এবং উল্লিখিত স্বনামধন্য ব্যক্তিদের সঙ্গে বিতর্কে জড়িয়ে পড়ার বহু প্রসঙ্গ সামনে আনলেন। তাঁর যুক্তিনির্ভর প্রশ্নবাণ পাঠের গতি আবার স্বাভাবিক করে তুলল। সেই যুগে তাঁর মতো আধুনিক চিন্তাধারা ও সৎ সাহসিকতার মানুষ বর্তমানেও খুব একটা সুলভ নয়। ধর্ম ও অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে বারবার প্রশ্ন করে জটিল তত্ত্ব জেনে ও বুঝে নেওয়ার আগ্রহে তিনি রামকৃষ্ণ পরমহংসকেও রেহাই দেননি। সবচেয়ে ভালো লাগল এই অধ্যায়টি পড়তে। রামকৃষ্ণের নাম তখনও বাংলা ঘরে ঘরে তেমন ছড়ায়নি। দক্ষিণেশ্বরে এমনই এক অদ্ভুত সাধুর সঙ্গে লেখক দেখা করতে গেলেন, আর সেই একাধিক সাক্ষাতের ছবি তিনি উপহার দিলেন পাঠককে। অভ্যাসবশত মন চাইছিল একবার অন্তত নরেন্দ্রনাথের প্রসঙ্গ আসুক। আশাপূরণ হলো, কিন্তু তিনি দেখা দিলেন মাত্র কয়েক সেকেন্ডের পার্শ্বচরিত্র হিসেবে। লেখক তাঁর কলমকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন বলা যায়, আবার ব্রাহ্মধর্মের একজন সক্রিয় প্রচারক হিসেবে তিনি কিছু চরিত্রের কথা ইচ্ছাকৃতভাবে লেখেননি, এমন ভাবনাও অমূলক নয়৷
ডাঃ মহেন্দ্রলাল সরকারের বিভিন্ন ঘটনাও বেশ আকর্ষক। বিখ্যাত 'সোমপ্রকাশ' পত্রিকার কথাও এই বইয়ে শেষের দিকে অনেকটা জায়গা জুড়ে আছে।
সব মিলিয়ে বিগত শতাব্দীর প্রাতঃস্মরণীয় কীর্তিমান পুরুষদের এই চরিতকথায় ইতিহাসের সঙ্গে সাহিত্যের এক সুন্দর মেলবন্ধন ঘটেছে৷ একে পূর্ণাঙ্গ জীবনীসাহিত্য বলা যাবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ থাকলেও বইটি একবার অন্তত সকলের পড়া উচিৎ। বিশেষ করে ছাত্রাবস্থায় এর পাঠ যে কিশোরমনে অনুপ্রেরণা যোগাতে পারে, সে ব্যাপারে নিশ্চিত।
পত্রলেখা-কে অশেষ ধন্যবাদ জানাই এমন একটি গ্রন্থ পাঠকের দরবারে পেশ করার জন্য।
বই ~ যাঁদের দেখেছি লেখক ~ শিবনাথ শাস্ত্রী ভাষান্তর ~ সুরজিৎ সেন প্রচ্ছদ ~ মৃণাল শীল ফর্ম্যাট ~ হার্ডকভার প্রকাশক ~ পত্রলেখা প্রথম প্রকাশ ~ জানুয়ারি ২০১৯ মুদ্রিত মূল্য ~ ২০০ টাকা