#পাঠ_প্রতিক্রিয়া
#দেবারতি_মুখোপাধ্যায়ের_ডাকাতরাজা
প্রথমেই বলি অনেকদিন পরে আবার একটানা কোনো উপন্যাস পড়লাম। ছয়মাসের মেয়েকে সামলেও দেড় দিনের মধ্যে যে ২৪৮ পৃষ্ঠার 'ডাকাতরাজা' শেষ করতে পারবো সত্যিই ভাবিনি। কিন্তু ওই যে লেখিকার নাম যখন দেবারতি মুখোপাধ্যায় আর উপন্যাসের পটভূমি আমার জন্মভূমি তথা বাসভূমি তখন তো বাকি আর কিছু বলার থাকে না।
'ডাকাতরাজা' সম্পর্কে বিস্তারিত বলার আগে এটুকুই বলবো এই উপন্যাসের প্রত্যেকটি চরিত্রকে আমি সামনাসামনি প্রত্যক্ষ করেছি। কারণ ডাকাতরাজার পটভূমি শুধু আমার হাতের তালুর মতো চেনাই নয়, আমি বড়ো হয়েছি এখানেই। তখন তো এসব স্থাপত্যে না ছিল পাহারা, না ছিল কোনো রকম রক্ষণাবেক্ষণ! ট্যুরিষ্টও হাতেগোনা! ইচ্ছেমতো ঘুরে বেড়াতাম।
আমার হাঁটতে শেখা, সাইকেল থেকে স্কুটি শেখা সবই ওই দুই দুর্গতোরণের মাঝের রাস্তাতে। বিকেল হলেই খেলার জায়গা ছিল রাজদরবারের আশেপাশের কোনো মন্দির প্রাঙ্গন। তাই উপন্যাসে বর্ণিত সুউচ্চ প্রাচীর ঘেরা মল্লরাজবাড়ি, মৃন্ময়ী মায়ের মন্দির, প্রাচীন বটবৃক্ষ, পশ্চিমের পুষ্করিণী, তার পাড়ে বর্তমানে ভাঙ্গাচোরা রাণীদের মহল, বড়ো পাথরদরজা, ছোটো পাথর দরজা, দুই দরজার মাঝের খাত, জলদুর্গ, পরিখা, দলমাদল কামান থেকে মল্লেশ্বর শিবের মন্দির, বিড়াই নদী থেকে শ্মশান ঘাট, মিউজিয়াম অর্থাৎ যোগেশচন্দ্র পুরাকীর্তি ভবন, বিষ্ণুপুরের প্রতিটা ওলিগলি, পাড়া এতোই কাছ থেকে দেখেছি ডাকাতরাজার সবটাই চোখে সিনেমার মতো ভাসছে।
ডাকাতরাজা যদিও লেখিকার কল্পনামিশ্রিত ইতিহাসআশ্রিত উপন্যাস তবুও এমন অনেক বিষ্ণুপুরের জানা অজানা তথ্য মিলেমিশে রয়েছে যা মনকে নতুন করে নাড়া দিতে বাধ্য। দশাবতার তাস বারবার দেখলেও প্রকৃত খেলাটা এতোদিন ঠিক মতো জানা হয়ে উঠেনি। আজ অনেকটা ধারণা তৈরি হলো। বিষ্ণুপুরের মাটিতে শ্রীনিবাস আচার্যের পদার্পণ, পুঁথি অপহরণের কাহিনী মাস্টার্সের সিলেবাসেও পড়েছিলাম, কিন্তু মল্লভূমের সাথে ওনার এভাবে একাত্ম হয়ে ওঠার কাহিনী জানা ছিল না। কৃষ্ণপ্রেমের সাথে সাথে ওনার দর্শন, রণনীতি, দূরদর্শিতা, বিচক্ষণতা বারবার যেন মৌর্য যুগের চাণক্যকেই মনে করিয়ে দেয়। ওনার সম্পর্কে পড়ে শুধু মুগ্ধই হইনি, জানার আগ্রহ আরো বেড়ে গেছে।
মহারাজ বীরহাম্বিরকে নিয়ে আর নতুন করে কি বলবো! বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষা নেওয়ার পর থেকে ওনার জীবনালেখ্য সম্রাট অশোকের মতোই যে পরিবর্তিত হয়েছিল তা লোকমুখে অনেকবার শুনেছি। কিন্তু এভাবে গল্পের স্রোতে তার জীবনকে উপলব্ধি করার সৌভাগ্য প্রথমবার হলো।
'ডাকাতরাজা' শেষ উনপঞ্চাশতম মল্লরাজ বীরসিংহের জীবনের উপরেই পুরোপুরি আধারিত। বাকি চরিত্ররাও এই ডাকাতরাজাকে কেন্দ্র করেই উপস্থিত হয়েছে। কালাপাহাড়কে আলাদা ভাবে জানতে পারাটা যদিও কিছুটা বাড়তি পাওনা তবুও মনে হয়েছে পরিসরটা আরো একটু বিস্তৃত হলে হয়তো আরো বেশি ভালো লাগতো। কারণ মল্লরাজাদের স্থাপত্যকীর্তি, শতাব্দী প্রাচীন বিভিন্ন রেওয়াজ, ঐতিহ্যবাহী পরম্পরা বা আরো যা কিছু লোকশ্রুতি আছে তা যে রীতিমতো শিহরণ জাগানো বলার অপেক্ষা রাখেনা। সেদিক থেকে ভাবলে মনে হবে যেন খুব কমটুকুই পড়লাম। ডাকাতরাজা শুরু হচ্ছে প্রথম মল্লরাজ আদি রঘুনাথের আমল থেকে সাড়ে আটশো বছর পরে। অবশ্য খুব স্বাভাবিক ভাবেই তেরোশো বছরের বেশি রাজত্ব করা এক রাজবংশের কতটুকু কাহিনীই বা একটি উপন্যাসে লিপিবদ্ধ করা যায়!
তবে স্বীকার করতে দ্বিধা নেই ডাকাতরাজা যত পড়েছি রোমাঞ্চিত হয়েছি আর টানটান উত্তেজনা নিয়ে কোনো এক সম্মোহনী ক্ষমতার বলে শুধু পাতার পরে পাতা এগিয়ে গেছি।
মহারানী শিরোমণি, মনোহরা, মেনকা, রুদ্রাক্ষ প্রায় প্রত্যেকের চরিত্র মনের মধ্যে স্থায়ী আসন করে নিয়েছে। খলচরিত্রগুলিও কম নয়। মাধব মল্ল থেকে জগতকুমার, ছড়াকার কেশব বা প্রধানমন্ত্রী জিমূতবাহন, প্রত্যেকের লোভ, লালসা, প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকরার পরিণাম যে অল্পপরিসরের মধ্যে গাঁথা হয়েছে তা সত্যিই প্রশংসনীয়! প্রায় চারশো বছর আগের এক অধ্যায়ের সাথে এতোটাই জড়িয়ে গেছিলাম যে রাজকুমার শীতলের মৃত্যুটা মেনে নিতে বড্ড কষ্ট হচ্ছিল! যদিও ইতিহাসকে অস্বীকার করার উপায় নেই। হয়তো বেশিরভাগ চরিত্র লেখিকার কল্পনাতে সৃষ্টি, তবুও সেই কল্পনার সাথে ইতিহাসের এইভাবে মিলেমিশে যাওয়াই 'ডাকাতরাজা'র সবচেয়ে বড়ো স্বার্থকতা।
উপন্যাসের কয়েকটা মন ছুঁয়ে যাওয়া অংশ বিশেষ ভাবে না উল্লেখ করলেই নয়। কারণ একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়েও প্রতিটি ঘটনার যথেষ্ট প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে। তার মধ্যে প্রধানতম বীরহাম্বিরের কন্যা শ্যামাকুমারীর জন্মমুহূর্ত। যেখানে রাজপরিবারে পুত্রের জন্মই শুধু শুভ মানা হয় সেখানে মহারাজা রাজপন্ডিতমশাই সহ সবার অমতে গিয়ে কন্যার জন্মতিথিতে মল্লেশ্বর মন্দিরের ভিত্তিপ্রস্তরস্থাপন ও ত্রিশদিন ব্যাপি অনুষ্ঠানের আয়োজন করছেন। শূদ্র পুত্র পবনের সাথে রাজকুমার রঘুনাথের সখ্যতা, চতুষ্পাঠীর দ্বাররক্ষক হয়েও পবনের শিক্ষা অধ্যায়ণের আকাঙখা, দূর থেকে পাঠদান শুনেও তার শাস্ত্রজ্ঞান একলব্যকেই যেন মনে করিয়ে দেয়। চারশো বছর আগে দাঁড়িয়ে রাজকুমার শীতলের তার স্ত্রী মনোহরার প্রতি মুক্তমনা মনোভাব, হেরে পর্বতে দশাবতার খেলায় রাজপরিবারের বধূকে নিয়ে যাওয়ার সাহস বা রাজা বীরহাম্বিরের তার কন্যাকে নিয়ে উজবেকিদের মতো বড়ো করার মনোবাঞ্ছা নিঃসন্দেহে আজকের যুগেও অন্য মাত্রা দেয়। উপন্যাস জুড়ে যেই মেনকা কেশব ছড়াকারকে নিয়ে প্রেমের মোহতে আবেগে ভেসেছে শেষ অবধি মল্লভূমের হিতে তাকে নিজহস্তে হত্যার সিদ্ধান্ত যেন একজন সাধারণ রমনীকেও বীরাঙ্গনা করে তুলেছে। আশ্রয়দাত্রী মল্লভূমের প্রতি তার ভালোবাসা, দায়বদ্ধতা, আত্মত্যাগ অবশ্যই ভাবতে বাধ্য করে।
বলার অপেক্ষা রাখে না লেখিকা প্রতিটি বইই অনেক রিসার্চের পরে লিখেন। ডাকাতরাজাও সেরকমই। শুধু তথ্য সমৃদ্ধই নয়, একদিকে য���মন এই উপন্যাসেও রয়েছে নারাচের মতোই নানান সংস্কৃত শ্লোকের ভাবার্থ, তেমনই অনেক চলতি ছড়া, যার কিছু রাঢ় অঞ্চলের মানুষের একসময় মুখে মুখে শোনা যেত। শ্রীকৃষ্ণের ভক্তিগীতি থেকে ভাদুগান কিছুই বাদ যায়নি দুই মলাটে। তবুও মনের মধ্যে কোথাও একটা অতৃপ্তি বোধ হচ্ছিল।
তেরোশো বছরেরও বেশি সময়কাল ধরে রাজত্ব করা মল্লরাজবংশের পরম্পরা আজও মল্লভূমের মাটিতে একইরকম ভাবে যে বিরাজমান তা মা মৃন্ময়ী পু��োর সময়েই বোঝা যায়। দূর্গাষ্টমীর সন্ধিক্ষণে ঐতিহ্যবাহী কামানদাগার কথা তো কারোরই অজানা নয়। পটে আঁকা তিন ঠাকুরণীর পুজো, নবমীতে খচ্চরবাহিনীর বিশেষ পুজো, রাবনকাটা নৃত্য, নীলকন্ঠ পাখিকে উড়িয়ে দেওয়ার রেওয়াজ আজও চলছে। তাছাড়াও মদনমোহনের মাহাত্ম্য, বালুচরী শাড়ি, শাস্ত্রীয় সঙ্গীত, দলমাদল কামান নিয়ে যেসব জনশ্রুতি রয়েছে, রাসমঞ্চ, জোড়বাংলো সহ অন্যান্য মন্দির ও বিষ্ণুপুরের বিভিন্ন বাঁধের ইতিহাস বৃত্তান্ত অনেক কিছুই উপন্যাসে অধরা! একটি সল্প পরিসরেই লেখিকাকে বাঁধতে হয়েছে কলম।
আসলে বিষ্ণুপুরবাসী বলেই হয়তো উপন্যাসের শেষেও বারবার মনে হচ্ছে আরো বেশি যদি হতো! আরো কিছু যদি পড়তে পারতাম! বিশেষ করে বালক রঘুনাথকে আমরা এই উপন্যাসে পাচ্ছি, ওনার রাজা হওয়ার আগেই উপন্যাস শেষ হয়ে হচ্ছে। যেখানে রাজা রঘুনাথের জীবন অনেক বেশি বর্ণময় ও আকর্ষণীয়, সেই নিয়েও কিছু পেলে আরো ভালো লাগতো।
ডাকাতরাজার ক্লাইম্যাক্স নিয়ে অবশ্য কিছু বলবো না। কারণ লেখিকা যেই চমকপ্রদ মোড়ে নিয়ে গিয়ে উপন্যাসটি শেষ করেছেন, সেটিই ওনার বিশিষ্টতা। প্রতিবার এভাবেই উনি নিজের রেকর্ড নিজেই ছাপিয়ে যান। ওনার হস্তাক্ষর বইয়ে না থাকলেও ওনার স্বাক্ষর ঠিক উনি লেখাতে রেখে যান।
যেই ধর্মউদারতা নিয়ে লেখিকা 'অঘোরে ঘুমিয়ে শিব' শেষ করেছিলেন, আজ আরেকবার ডাকাতরাজাতেও তাই দেখতে পেলাম। মল্লরাজাদের ধর্মনিরপেক্ষতা, সহনশীলতা, সর্বোপরি বিষ্ণুপুরের অধিবাসীদের সেই সুপ্রাচীনকাল থেকে হিন্দু মুসলিম ঐক্যের মাঝে কোথাও যেন লেখিকার ভাবনাও মিলেমিশে এক হয়ে গেছে।
শুধু দুয়েক জায়গাতে আরেকটু মিল থাকলে ভালো হতো মনে হয়েছে। মেনকার পাঠানো কবুতুর দূতের শেষ বার্তাতে শ্রীধরের উদ্দেশ্যে কি লেখা ছিল! রঘুনাথ রাজা হলে রাজপন্ডিতমশাই শ্রীব্যাস আচার্যের জন্য কোনো দন্ড দেওয়া হয়েছিল কিনা! ১৮২ পাতাতে বড় পাথর দরজার আড়ালি দেওয়াল হবে, ছোটো আর বড়োতে সম্ভবত উল্টোপাল্টা হয়েছে। আর সামান্য কিছু ছাপার ভুল রয়েছে।
পত্রভারতীর কভার পেজ কোয়ালিটি তো এমনিতেই অসাধারণ। আর ডাকাতরাজার প্রচ্ছদে ডাকাতরাজাই যেখানে বিরাজমান সেখানে আর তো কিছু বলারই নেই।
পরিশেষে বলবো বিষ্ণুপুর নিয়ে লেখক রমাপদ চৌধুরীর 'লালবাঈ' পড়েছিলাম, আজ প্রিয় লেখিকা দেবারতি মুখোপাধ্যায়ের 'ডাকাতরাজা' পড়লাম। দুটিই নিজের জায়গাতে অনবদ্য। আমাদের মন্দিরনগরীকে নিয়ে এরকম উপন্যাস আরো আসুক, বাংলার বিস্মৃতপ্রায় মল্লরাজাদের গৌরবান্বিত শাসনের কাহিনী আরো বেশি মানুষ জানুক, বাংলা তথা ভারতের গর্ব আমাদের বিষ্ণুপুরকে পৃথিবীর সকল মানুষ চিনুক, একজন সাধারণ মল্লভূমের বাসিন্দা হিসেবে এটাই সব সময় চাইবো।
অনেক অনেক ধন্যবাদ প্রিয় লেখিকা দেবারতি মুখোপাধ্যায়কে আমাদের প্রাণের শহর বিষ্ণুপুরকে এই 'ডাকাতরাজা' উপহার দেওয়ার জন্য। 🙏
©প্রতীতি চৌধুরী।