উঁচু পাঁচিল আর লোহার গেট দিয়ে ঘেরা দোতালা দালানটা সাক্ষ্য দিচ্ছে অনেক বঞ্চনা আর পাপের। 'আকন্দ বাড়ি' নাম ধারণ থেকে 'শ্রীলেখা ভবন' পরিচয় মুছে ফেলতে পারেনি। শ্রীমতী শ্রীলেখা চক্রবর্তীর ছেলেরা এই বাড়ি পানির দরে করিম আকন্দের কাছে বিক্রি করে ওপারে চলে গিয়েছিলেন। শুধু ছোট ছেলে অনিমেষ চক্রবর্তী দেশমাতৃকাকে ছেড়ে গেলেন না, বাড়ির পেছনের অংশে এখনো তার বসবাস।
আকন্দ বাড়ির প্রধান করিম আকন্দকে নিয়ে শহরে অনেক গুজব, পুরোনো কুখ্যাতি। প্রৌঢ়বয়সী মানুষটাকে দেখলে লোকজন সালাম দেয় ঠিকই, কিন্তু তা যতটা না শ্রদ্ধায়, তারচাইতে বেশী ভয়ে। তার দুই ভাই এবং পুত্র-কন্যা নিয়ে গঠিত বিশাল যৌথ পরিবারটি শহরের রাজনীতি থেকে ব্যবসা - অনেক কিছুই নিয়ন্ত্রণ করে।
বৃদ্ধবয়সে করিম আকন্দের স্নেহ সব এসে জড়ো হয়েছে তার পালক-পুত্র কামরুলের জন্য। বেলবটম প্যান্ট, বুকখোলা শার্ট, ঝাঁকড়া চুল আর ঢুলুঢুলু চোখের তরুন কামরুল পারিবারিক ব্যবসা সামলায় দক্ষতার সাথে। দুলাভাই ইউসুফ কামরুলের অধীনে দোকানে বসতে তেমন পছন্দ করে না, তবে প্রায় ঘর-জামাই হওয়ায় নিরুপায় সে। ইউসুফের পিতা জালাল উদ্দিন গ্রামে বদমেজাজি বলে পরিচিত, দ্বিতীয় বিয়ে করার পর প্রথম পক্ষের পুত্র ইউসুফকে প্রায় ত্যাগ করেছে।
অনিমেষ চক্রবর্তীর একমাত্র কন্যা অনন্যা চক্রবর্তী। করিম আকন্দের এতো কিছু জেনেও কেন যে মেয়েটা কামরুলকে ভালোবাসে! আর ছোটবেলা থেকে তাকে চোখের সামনে বেড়ে উঠতে দেখা অর্ণব ভেবেছিল, অনন্যা তো আছেই সবসময়! তার উদাসীনতার কারণে কবে যে অনন্যা কামরুলের হয়ে গেল, টের পায়নি।
গল্পের শুরু সেদিন, যেদিন দিনেদুপুরে দোকানে এসে কামরুলকে এক মোটরসাইকেল আরোহী গুলি করে গেল। জীবন্মৃত হয়ে টিকে থাকা ছেলেটিকে ঘিরে থমকে গেল কতগুলো জীবন। কামরুলের অনুপস্থিতি অনেকের জন্যই লাভজনক, মাথা চাড়া দিল সেই সব সুযোগসন্ধানী সাপেরা।
তবে এই গল্পটা খুনের নয়, প্রেমেরও না। এ এক শহরের গল্প, যে শহর লালন করছে কা��রুল - অনন্যা - ইউসুফ - অর্ণবের কথা। অথবা গল্পটা সেই ছায়াসময়ের, যে সময় অস্থির কিন্তু অদ্ভুত বিষন্ন।
একটা গল্পকে প্রাণবন্ত করে তুলতে হলে, লেখকের নিজের জীবনলব্ধ অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয়। 'ছায়াসময়' উপন্যাসের লেখক গল্প সাজিয়েছেন তার জন্মস্থান ময়মনসিংহ শহরকে কেন্দ্র করে, বইটি উৎসর্গও করেছেন প্রিয় শহরকে। লেখকের বর্ণনায় শহরটি হয়ে উঠেছিল মায়াময়। 'আকন্দ বাড়ি'র দোতালার জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকা অন্তঃপুরবাসিনীরা, আর উঠোনে সকলে মাঝখানে আসীন কর্তা করিম আকন্দের বর্ণনা ভীষণরকম জীবন্ত। অর্ণব আর তপন - দুই ভাইয়ের ফেলে যাওয়া শহরের জন্য টান পাঠকের মনেও মায়ার সঞ্চার করার মতো।
পটভূমিতে এসেছে আশির দশকের অস্থির সময়, যখন রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পাশাপাশি বদলে যাচ্ছে মানুষগুলোও, দ্রুত বাড়ছে পরস্পর অবিশ্বাস, ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা। সেই পরিচিত সুর কেটে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে চরিত্রগুলোতেও। শুরু থেকেই কামরুল কোমায়, কিন্তু সবকিছু তাকে ঘিরেই আবর্তিত। অনন্যার ভালোবাসা, করিম - জেবুন্নেসার পুত্রস্নেহ, অর্ণবের বিতৃষ্ণা আর ইউসুফের টপকে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা কামরুলকে বাঁচিয়ে রেখেছে পুরো গল্পে। করিম আকন্দের চরিত্রটি পাঠক ঘৃণা করতে গিয়েও ভালোবাসতে বাধ্য হবেন। ইউসুফকে নিয়েও দোলাচলে থাকতে হয়।
মূল চরিত্রগুলোর পাশাপাশি আততায়ীর খোঁজে ঘুরতে থাকা ওসি আমিনউদ্দিন, বখে যাওয়া ছেলে রহমান, ডাকাত কোহিনূর, রাতেরবেলা ঘোর লাগা বাঁশি বাজানো রাজনীতিবিদ কাশেম আলী, শেকড়ের টানে ফেরা তপন, ইউসুফের স্ত্রী আমিনা - একেকটি চরিত্রকে খুব বাস্তব মনে হয়। কোনো মানুষকেই একেবারে বাঁধাধরা ছকে ফেলে দেওয়া যায় না, বরং ভালোমন্দ মিলিয়ে প্রচন্ড অনিশ্চিত প্রতিটি মানুষ - এটা লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন সুচারুভাবে।
বইয়ের প্রচ্ছদটি মানানসই। মুদ্রনজনিত ভুল অবশ্য খুব বেশি ছিল। তবুও, অনেক দিন পর একটি বই পড়ে অন্তরে হাহাকার ছেয়ে গেল। ছায়াসময়ের বিষন্নতায় সার্থকতার সাথে ডুবিয়ে দিলেন লে��ক।
বইঃ ছায়াসময়
লেখকঃ শরীফুল হাসান
প্রকাশনাঃ বাতিঘর প্রকাশনী
প্রকাশকালঃ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯
প্রচ্ছদঃ জিয়াউদ্দিন বাবু
পৃষ্ঠাসংখ্যাঃঃ ২৮৫
মূল্যঃ ৩০০ টাকা