প্রাচীন মিসর। অষ্টাদশ রাজবংশের পরাক্রমশালী সম্রাট তৃতীয় আমেনহোতেপের মৃত্যুর পর ‘আখেনাতেন’ নাম নিয়ে সিংহাসনে বসলেন তাঁর পুত্র চতুর্থ আমেনহোতেপ। সিংহাসনে বসেই ছুড়ে ফেললেন পূর্বপুরুষের ধর্মকে, দর্পচূর্ণ করলেন ক্ষমতালোভী পুরোহিতদের, ঊষর মরুতে গড়ে তুললেন নতুন রাজধানী। উদ্ধত, আত্মকেন্দ্রিক, বেপরোয়া আখেনাতেনের একমাত্র দুর্বলতা রাজমহিষী নেফারতিতি, যাঁর সৌন্দর্য ও ব্যক্তিত্বের খ্যাতি মিসরজুড়ে। নেফারতিতির স্বপ্ন, একদিন শাসন করবেন গোটা মিসর, ইতিহাসে অক্ষয় করে রাখবেন নিজের নাম। কিন্তু ষড়যন্ত্র, ঘৃণা আর প্রতিহিংসার বাতাবরণ চারদিকে। সব বাধা অতিক্রম করে নেফারতিতি কি পারবেন স্বপ্ন পূরণ করতে? লাজনম্র এক কিশোরীর প্রাচীন মিসরের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হয়ে ওঠার কাহিনি নেফারতিতি। মহামারী, মন্বন্তর ও মৃত্যুঞ্জয়ী ভালোবাসার এক ইতিহাসনিষ্ঠ আখ্যান।
সাড়ে তিন হাজার বছর আগে পুরো মিশর কে শাসন করা নারী
History is His Story. But some women wrote Her stories as well. নেফারতিতি তেমনই একজন ক্ষমতাবান নারী ছিলেন।
ফারাও আখেনাতেন সূর্যদেবতাকে একেশ্বর বলেছিলেন আর শুরু করেন আতেনের পূজা। সেই মন্দিরে ফারাও র পাশাপাশি বানানো হয় আরেকটা মূর্তি সেটা ছিল নেফারতিতির। কারণ ফারাও তার স্ত্রীকে ভালোবাসতেন ও মর্যাদা দিতেন এমনকি তার রাজ্যশাসন এর সফলতায় মুগ্ধ হয়ে তাকে উত্তরাধিকারী ও ঘোষণা করেন।আখেনাতেন এর স্ত্রী হয়ে রাজমহিষী হয়ে হয়তো বেশ আরামদায়ক জীবন কেটে যেতে পারত তার। কিন্তু ইতিহাস কখনো ক্ষমতাবান নারীদের সুন্দর সমাপ্তি ঘটতে দেয় নি। নেফারতিতির পরিণতি কি হয়েছিল তাহলে?
ফারাও এর রাজরানী হয়ে আসার পরে নিজের বিচক্ষণতা দিয়ে সকল ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করেন তিনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পেরে উঠেন নি সেনাপ্রধান হোরেমহেব আর অন্য সকল মন্দিরের পুরোহিতদের চক্রান্তের সাথে। তার শেষ কি হয়েছিল?
নেফারতিতি নাম টা অনেক পরিচিত ছিল তাই বইমেলায় বাতিঘরের স্টলে সাজানো দেখে নিয়ে নিলাম। বছরের শেষে এসে পড়া শুরু করে ভাবলাম আরো আগে কেন পড়া হলো না! হিস্টোরিক ফিকশন বরাবরই আমার পছন্দের জনরা। আর সেটা যদি মিশরীয় হয় তাহলে কথাই নেই। মিশর নামটাই আমার কাছে মিস্টিরিয়াস লাগে।
এই বইতে নেফারতিতিকে নিয়ে অহেতুক রুপ সৌন্দর্যের বন্দনা করা হয়নি। ক্লিওপেট্রা কে নিয়ে যতবার বলা হয় শুরুতেই আসে রূপের কথা। A woman who ruled Egypt has more to offer than a pretty face right? নেফারতিতির মধ্যে একজন শাসকের সকল গুণ ছিল বললে ভুল হবে না। ঠিক তার বিপরীতে লেখক রেখেছেন তার স্বামী ফারাও আখেনাতেন কে। পাগলাটে চিন্তা, আর আশেপাশের সবাইকে খেপিয়ে তুলে রাজ্যের বারোটা বাজানোর যে অবস্থা করেছিলেন তার থেকে বাচিয়েছেন নেফারতিতি। যখন ফারাও অবিবেচক এর মত সিদ্ধান্ত নেন তখন রাজ্যের হাল ধরতে প্রয়োজন হয় নেফারতিতির মত বিচক্ষণ, গুণবতী রাজমহিষীর।
অথচ তার চারপাশে কুটিল বুদ্ধি মানুষের অভাব নেই। পূর্বপুরুষদের বহুঈশ্বরবাদ কে ঝেটিয়ে বিদায় করে নতুন ধর্ম রচনা শুরু হয় ফারাও এর সাথে পুরোহিতদের কোন্দল, উচ্চাভিলাষী সেনাপ্রধান হোরেমহেব আর ফারাও এর আরেক রানী কিয়া র প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের মাঝে কিভাবে নিজেকে আর মিশরকে বাচাবেন নেফারতিতি? এই বই হচ্ছে সেই গল্প। একজন উজিরের মেয়ে নেফারতিতি থেকে সমগ্র মিশরের শাসনকর্তা নেফারনেফরুয়াতেন হওয়ার গল্প।
as I am and always have been a fan of powerful women in history, নেফারতিতি আমার প্রিয় চরিত্রগুলোর মধ্যে একজন হয়ে গেল।
এই ক্ষমতা অবশ্য বেশিদিন টিকেনি, কারণ মানুষ একজন অযোগ্য পুরুষ শাসক কে মানতে পারে কিন্তু একজন নারী যোগ্য হলেও তাকে মানতে পারে না।
হয়তো তাই মৃত নেফারতিতি ও জীবিত নেফারতিতির মতই একটা থ্রেট! যে জন্যে আজও তার সমাধি বা মমি খুঁজে পাওয়া যায় নি।
আর্কিওলজিস্ট এর ধারণা সে হয়তো তার সৎপুত্র তুতেনখামেন এর সমাধির ভেতর কোন গোপন চেম্বারে আছেন। অথবা ভ্যালি অব কিংস যেখানে সকল রাজ পরিবারের মানুষের মমি সেখানে লুকানো আছেন। কিন্তু কথা হচ্ছে নেফারতিতি কে গোপন কেন করা প্রয়োজন হয়ে গেল? কেন তার মৃত্যু একটা রহস্য? কেউ বলে সে পুরোহিত এর রোষের শিকার হয়ে খুন হয়েছে তাই তার লাশ পাওয়া যায় নি। কেউ বলে আসলে সে মারা যায় নি বরং অন্য নামে শাসন চালিয়ে গেছেন। অবাক করার বিষয় কেন নেফারতিতি জীবিত ও মৃত অবস্থায় ও এতটা রহস্যময় ছিল? কেন তাকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার এত চেষ্টা?
Perhaps, strong and powerful women are always a threat to the society even after they are dead!
পুরোহিত আর শাসক যতদিন হাত মিলিয়ে চলেছে ততদিন ইতিহাস লেখার মত ঘটনা ঘটেনি। শুধু শোষিত হয়েছে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ। রাজা যখন ধর্মব্যবসায়ীদের সায়েস্তা করতে নিজেই নতুন ধর্ম প্রবর্তন করেন, তখন সৃষ্টি হয় ইতিহাস। নেফারতিতির ইতিহাস এক ফারাও এর পত্নীপ্রেমের ইতিহাস। ফারাও আখেনতাত তাঁর স্ত্রীকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দিয়েছিলেন। তাকে মিসরের রাজপ্রতিভূ (পরবর্তী ফারাও) ঘোষণা করেছেন তার দূরদর্শিতা আর রাজ্য শাসনের ক্ষমতায় মুগ্ধ হয়ে। কিন্তু ইতিহাস তাকে কালের গর্ভে বিলীন করেছে কেবল সে নারী বলে। ধর্মব্যাবসায়ীয়া একজন অযোগ্য পুরুষের শোষণ মানতে পারে তবু একজন যোগ্য নারীর শাসন তারা সহ্য করেনা।। কাল বিলীন হয়, ইতিহাস মরুভূমির বালির তলায় চাপা পড়ে থাকে। হয়ত আবার কালের আবর্তনেই বালিঝড়ের মধ্যে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে চায়।