হয়তো নিজস্ব অনুভূতি নথিবদ্ধ করার সুযোগ পাইনি, বা হয়তো স্রেফ গাফিলতি করে এড়িয়ে গিয়েছি।
গতকাল রাত্রে অনেক্ষন আলোচনা হলো দুজন বন্ধুর সঙ্গে। বিষয় ছিল: কবি বিভূতিভূষণ এবং তাঁর তৃতীয় নয়ন।
আজ নভেম্বরের পয়লা তারিখ। কথাশিল্পীর চলে যাওয়ার দিন। রইলো আমার নিবেদন।
বাংলা উপন্যাসের ইতিহাসে বিভূতিভূষণ এমন এক নাম, যেখানে প্রকৃতি, দারিদ্র্য, এবং আত্মার গভীর স্পন্দন মিলেমিশে একাকার। ‘পথের পাঁচালী’ প্রকাশের এক শতাব্দী পরে আজও পাঠকের হৃদয়ে যে কম্পন তৈরি করে, তা কেবল তার আখ্যানের নয়—তার অন্তর্লীন দর্শনেরও। মৃত্যু, ক্ষুধা, শিশুমন, এবং লোকজ সংস্কৃতির সমবায় এক বহুধাবিচিত্র মানবগাথা হয়ে ওঠে এখানে।
উপন্যাসটির ভিতর দিয়ে আমরা যেমন দেখি অনাবৃত দারিদ্র্যের মুখ, তেমনি দেখি এক প্রকার নিভৃত ভক্তির নন্দনকানন—যেখানে “গতিই জীবন, গতির দৈন্যই মৃত্যু” (বিভূতিভূষণ)।
এই দার্শনিক সূচনাবাক্যটি তাঁর সমগ্র সাহিত্যচেতনার কেন্দ্রবিন্দু। যেন হেরাক্লাইটাসের উক্তি—“No man ever steps in the same river twice”—এর ভারতীয় প্রতিধ্বনি। বিভূতিভূষণের কাছে জীবন কোনও স্থিত অবস্থা নয়, এক অনন্ত প্রবাহ, যার মূলে গতি, পরিবর্তন, আর অপূর্ব সহিষ্ণুতা।
‘পথের পাঁচালী’-র প্রথম অধ্যায়ে হত্যার কাহিনি, তারপর অপহরণ, তার পর দারিদ্র্যের কষ্ট, অনাহারের দীর্ঘ ছায়া—বিভূতিভূষণ এই সবকিছুকে চিৎকৃত নয়, নীরব সুরে ফুটিয়ে তুলেছেন। যেন টলস্টয়ের ‘Resurrection’ বা হার্ডির ‘Tess of the d’Urbervilles’-এর মতো সামাজিক বাস্তবতা, কিন্তু তার ভিতরে রয়েছে আধ্যাত্মিক ধ্যানের স্তব্ধতা।
ইন্দির ঠাকরুনের মৃত্যু, দুর্গার মৃত্যু, হরিহরের মৃত্যু—সবকিছুতেই মিশে আছে নৃশংসতা ও নিরুপায়তা। “মৃত্যু এখানে কোনও নাটকীয় সমাপ্তি নয়,” লিখেছেন মোঃ আচাযউদ্দিন তাঁর প্রবন্ধ ‘পথের পাঁচালী: মৃত্যু প্রলঙ্গ’-এ, “বরং এক দার্শনিক পরিবর্তন, যেখানে শরীরের বিনাশ মানে অস্তিত্বের নবরূপে উদ্ভাস।” এই ধারণাটি স্পষ্টত উপনিষদীয়: ‘ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে।’ বিভূতিভূষণের মৃত্যুচেতনা কোনও ধর্মীয় আচার নয়; তা এক নীরব প্রাকৃতিক স্বীকারোক্তি।
দুর্গা যখন বৃষ্টিতে ভিজে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়, তখন তার মধ্যে যে অনাহত সৌন্দর্য বিভূতিভূষণ দেখান, তা রিলকের “Duino Elegies”-এর সঙ্গে তুলনীয়। রিলকে যেমন লিখেছিলেন—“Beauty is nothing but the beginning of terror,”—তেমনি বিভূতিভূষণের মৃত্যুচিত্র ভয়াবহ হলেও একপ্রকার সৌন্দর্যের দিগন্তে বিলীন হয়ে যায়।
বিভূতিভূষণের জীবনদর্শনকে তাই বলা যায় এক ‘দুঃখময় আনন্দবাদ’—যেখানে কষ্টের মধ্যেই থাকে জগতের রস। ‘পথের পাঁচালী’ পাঠ করতে করতে আমরা বুঝতে পারি, বিভূতিভূষণ জীবনের ক্ষুদ্রতম অভিজ্ঞতার মধ্যেই ঈশ্বরকে খুঁজেছেন। তিনি জানতেন—“দৈনন্দিন ছোটখাটো সুখ-দুঃখের মধ্যে দিয়ে যে জীবনধারা ক্ষুদ্র গ্রাম্য নদীর মত মন্থর বেগে অথচ পরিপূর্ণ বিশ্বাসের ও আনন্দের সঙ্গে চলেছে—আসল জিনিসটা সেখানে।”
লাবণ্যিকা ঘোষালের একটি অসামান্য গবেষণা পড়েছিলাম। তিনি ‘শিশুমন ও আচরণ: প্রলঙ্গ ‘পথের পাঁচালী’’-তে বিভূতিভূষণের দুই শিশুচরিত্র—অপু ও দুর্গা—কে ফ্রয়েডীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করেছেন। দুর্গার চুরিবিদ্যা, তার প্রকৃতিপ্রীতি, ভাইয়ের প্রতি মমতা—সবকিছুতেই একান্ত মনস্তাত্ত্বিক স্তর আছে। “Pleasure principle”-এর মতোই দুর্গা ও অপু প্রকৃতির মধ্যে আনন্দ খোঁজে; কিন্তু সেই আনন্দ সমাজের চোখে অপরাধ।
অপু যখন ছাঁদা বাঁধে, যখন ছায়ার সঙ্গে কথা বলে, তখন তার মন নিছক শিশুমন নয়, বরং এক সৃষ্টিশীল পর্যবেক্ষক। বিভূতিভূষণের কলমে শিশুমন মানে নিস্পাপতা নয়, এক অনুসন্ধিৎসা—যা Wordsworth-এর “The child is father of the man”–এর বাস্তব রূপ।
অপুর জগৎ এক অন্তহীন শেখার পথ—দারিদ্র্য, মৃত্যু, আনন্দ, লজ্জা, এবং বিস্ময়ের মধ্যে দিয়ে আত্মার পরিণতি ঘটে। Freud যেমন বলেছিলেন—“Dreams are the royal road to the unconscious,”—তেমনি বিভূতিভূষণের শিশু-চরিত্রের স্বপ্নই আমাদের সমাজের অচেতন মুখোশ উন্মোচন করে।
তবে ফ্রয়েডীয় মানসিকতার সঙ্গে সঙ্গে বিভূতিভূষণ যোগ করেছেন লোকমন ও ভারতীয় মনোবৃত্তির ধারাবাহিকতা। দুর্গার চোখে যে আনন্দ, তা প্রকৃতির সঙ্গে একাত্মতার আনন্দ; এখানে মনস্তত্ত্ব আর লোকসংস্কৃতি একসূত্রে গাঁথা।
বিভূতি বাবু তাঁর উপন্যাসে গ্রামীণ সমাজের গান, প্রবাদ, বিশ্বাস ও আচারকে কাহিনির অঙ্গ করে তুলেছেন। ইন্দির ঠাকরুনের কথায়, দুর্গার নাচে, সর্বজয়ার কুসংস্কারে—এই লোকজ ভাবনাই বাস্তবতাকে মানবিক করে তোলে। তাঁর লোকচেতনা নিছক নৃতাত্ত্বিক অধ্যয়ন নয়, বরং এক সাংস্কৃতিক মানবতাবাদ। তাঁর চরিত্রেরা প্রকৃতির সঙ্গে সম্বন্ধ রাখে, যেমন আফ্রিকার লোকগাথায় মানুষ রাখে বৃক্ষের সঙ্গে। গীতার “ক্ষেত্রজ্ঞ” ধারণা এখানে বাস্তব: মানুষ তার ক্ষেত্রের জ্ঞাতা, কিন্তু ক্ষেত্রের অংশও।
তাই ‘পথের পাঁচালী’ কেবল দারিদ্র্যের কাহিনি নয়, এক লোকসমাজের সমগ্র জীবন্ত অভিধান—যেখানে গানের ছন্দ, ধর্মবিশ্বাস, শিশুর খেলাধুলা, সবকিছু মিলে গড়ে ওঠে বাংলার এক সাং��্কৃতিক জীবরস।
সত্যজিৎ রায় একবার বলেছিলেন—“Pather Panchali is not about poverty, it’s about life.” এই উক্তিই বিভূতিভূষণের বাস্তবতার মর্ম। তিনি জীবনের ভয়াবহতা দেখিয়েছেন, কিন্তু সেই ভয়াবহতার মধ্যেও সৌন্দর্য খুঁজেছেন।
তাঁর বাস্তবতা Camus-এর ‘The Plague’-এর মতো এক নৈতিক অভিজ্ঞতা: যেখানে মানুষ এক অজানা অনিবার্যতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকে, তবু বাঁচে। বিভূতিভূষণের চরিত্রেরা অসহায়, কিন্তু ত্যাগী নয়; তাদের মধ্যে আছে এক গভীর স্থৈর্য।
এই স্থৈর্য তাঁর জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেও এসেছে। ছোটোবেলায় দারিদ্র্য, বাবার অনুপস্থিতি, গৌরীদেবীর মৃত্যু—সব মিলে তাঁর ভিতরে গড়ে উঠেছিল এক সংবেদনশীল কঠোরতা। নীরদচন্দ্র চৌধুরী যথার্থই বলেছিলেন—“He was a man of tragic endurance, never of despair.”
‘ভালবাসা Pity নয়…’—এই সংজ্ঞা তাঁর নৈতিকতার কেন্দ্র। বিভূতিভূষণের ভালোবাসা হল করুণার অতীত, মানবতার নীরব সঙ্গীত।
প্রকৃতি তাঁর কাছে নিছক ব্যাকগ্রাউন্ড নয়, এক জীবন্ত সত্তা। ঘাটশিলার জঙ্গলে বসে তিনি লিখেছিলেন, “অরণ্যই ভারতের আসল রূপ।” ‘আরণ্যক’-এর নিস্তব্ধতা বা ‘দেবযান’-এর অলৌকিকতা আসলে এই অরণ্যভাবনার বিস্তার।
তিনি প্রকৃতিকে দেবতা করেননি, বরং তার সঙ্গে আত্মীয়তা স্থাপন করেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি Wordsworth-এর “spirit that rolls through all things”–এর মতোই। প্রকৃতির সঙ্গে এই সংলাপ বিভূতিভূষণের লেখাকে উপনিষদীয় শান্তি দেয়, যা পরবর্তীকালে ‘ইছামতী’ বা ‘অশনি সংকেত’-এ সমাজতাত্ত্বিক পরিসরে রূপ নেয়।
দীর্ঘকাল বিভূতিভূষণকে ‘প্রকৃতিপ্রেমিক’ বলে একরকম simplistic কালেইডোস্কোপে দেখা হয়েছিল। কিন্তু তাঁর লেখায় চাপা হিংসার ধারাও প্রবল। ঔপনিবেশিক বাংলার সামাজিক বৈষম্য, দুর্ভিক্ষ, লজ্জা, চুরি, শোষণ—সবই তাঁর নন্দনতত্ত্বে সন্নিবিষ্ট।
ইন্দির ঠাকরুনের মৃত্যুর দায়ে যে পয়সা না দেওয়ার ঋণ, দুর্গার নাক ফাটানোর ঘটনা, বা ‘অশনি সংকেত’-এর মতি মুচিনীর লাশ—সবকিছুই বাঙালি জীবনের অদেখা হিংসাকে উন্মোচিত করে। তবে তাঁর হিংসা চিৎকার নয়; তা সংযত, সংহত।
Camus যেমন বলেছিলেন—“The evil that is in the world always comes of ignorance,”—তেমনি বিভূতিভূষণের চরিত্রের হিংসাও অজ্ঞতা ও অভাবের ফল। তাঁর দৃষ্টিতে হিংসা সমাজের অন্তর্গত রোগ, মানুষের অন্তর্নিহিত পাপ নয়।
এই ভাবনাই তাঁকে সমকালীন মার্কসবাদী সাহিত্য থেকে পৃথক করে। তিনি সামাজিক পরিবর্তনের ভবিষ্যৎ ভাবেননি; তিনি কেবল মানবতার ব্যথা অনুভব করেছেন।
‘অনুবর্তন’-এর ক্ষুধার্ত শিক্ষক, ‘আদর্শ হিন্দু হোটেল’-এর ক্ষুধার অর্থনৈতিক ব্যঙ্গ, ‘দৃষ্টিপ্রদীপ’-এর মানসিক অবক্ষয়, ‘ইছামতী’-র নীল চাষ—সব মিলিয়ে বিভূতিভূষণের সাহিত্য এক নীরব প্রতিসংঘ।
তিনি কখনও আন্দোলন করেননি, কিন্তু তাঁর প্রতিটি বাক্য ছিল এক নৈতিক ঘোষণা: “একটা জাতি শিক্ষকদের শ্রদ্ধাসনে বসিয়ে তাঁদের প্রায় না খাইয়ে রেখেছে যুগ যুগ ধরে।”
এই নৈতিক বোধ তাঁকে পশ্চিমা ‘মোরাল রিয়ালিজম’-এর সঙ্গে যুক্ত করে—টলস্টয়, দস্তয়েভস্কি, হার্ডির ধারার মতো। তাঁদের মতোই বিভূতিভূষণ বিশ্বাস করতেন যে শিল্পের কাজ সমাজের অন্যায় প্রকাশ করা নয়, তাকে অনুভব করানো।
তিনি লিখেছিলেন, “বাইরের জগতে যা ঘটে, তার চেয়ে লেখকের মনের জগতে আর এক মহত্তর, ব্যঞ্জনাময় বাস্তব আছে।” এই বাক্যই তাঁর শিল্পতত্ত্বের সারকথা। বাইরের দারিদ্র্য, মৃত্যু, ক্ষুধা—সবই তাঁর ভিতরের জগতে পরিণত হয় আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতায়।
Camus-এর মতোই তিনি ছিলেন “a man condemned to hope”—হতাশার মধ্যেও আলো খুঁজেছেন। ঘাটশিলায় তাঁর ‘গৌরীকুঞ্জ’-এর নির্জনে প্রকৃতি, আকাশ, নক্ষত্র—সবই ছিল তাঁর পাঠশালা। ভোরে উঠে ইছামতীতে স্নান, রাতে গাছের ডালে বসে আকাশ দেখা—এই ছিল এক সাধকের জীবনযাপন।
তাঁর প্রিয় ফুল ঘেঁটু বা ছোট এড়াঞ্চির মতোই ছিল তাঁর সাহিত্য—অপ্রচলিত, কিন্তু প্রাণে ভরা।
বিভূতিবাবুর ভাষা মিতভাষী, সংবেদী, স্নিগ্ধ। তাঁর বর্ণনা যেন চিত্রকলার মতো, কিন্তু সেই ছবির ভিতরে থাকে একটি দার্শনিক নীরবতা। Eliot বলেছিলেন—“Poetry is not a turning loose of emotion, but an escape from emotion.” বিভূতিভূষণও আবেগে ডুবে লেখেননি; তিনি আবেগকে শাসন করেছেন।
তাঁর বাক্যগঠন, সংলাপ, লোকভাষার ব্যবহার—সবই এক প্রকার শাস্ত সঙ্গীত। তাই ‘পথের পাঁচালী’ কেবল উপন্যাস নয়, এক সংগীতরূপী অভিজ্ঞতা।
শেষে এটুকুই বলার যে এই উপন্যাস বিভূতিবাবু ও বিশ্বমানবতার সেতুবন্ধন। বিভূতিভূষণ ছিলেন “a saint among storytellers”—যিনি মানবজীবনের মলিন রূপে দেখেছিলেন ঐশ্বর্যের ঝলক। তাঁর সাহিত্য এক গভীর মানবতাবাদী চেতনার বাহন, যেখানে প্রকৃতি, মৃত্যু, প্রেম, ও লোকজ সংস্কৃতি মিলেমিশে গড়ে তোলে এক সম্পূর্ণ ভারতীয় মহাকাব্য।
‘পথের পাঁচালী’ তাই কেবল একটি গ্রামীণ উপন্যাস নয়, বরং মানবজীবনের অন্তরতম সংগীত, যার সুর বয়ে যায় সময় ও ভূগোলের সীমা ছাড়িয়ে—যেন সমগ্র বিশ্বের সাহিত্যের গভীরতম সঙ্গীতে মিশে যায় তার ধ্বনি। নিশ্চিন্দিপুরের মাটিতে যেমন আমরা শুনি ক্ষুধা, মৃত্যু, শিশুর হাসি, আর প্রকৃতির অন্তর্যামী তান—তেমনি ধ্বনিত হয় টলস্টয়ের রাশিয়ান গ্রামে, যেখানে Anna Karenina বা Resurrection-এর মানুষরাও অন্ধকার ও পরিত্রাণের সন্ধানে ঘুরে বেড়ায়।
হার্ডির ওয়েসেক্স প্রদেশে যেমন Tess বা Jude-এর ট্র্যাজেডি নেমে আসে প্রাকৃতিক ও সামাজিক শক্তির মিলিত আঘাতে, তেমনি বিভূতিভূষণের নিশ্চিন্দিপুরেও প্রকৃতি হয়ে ওঠে ভাগ্যের নীরব সাক্ষী। কিন্তু হার্ডির হতাশার বিপরীতে বিভূতিভূষণ খুঁজে পান শান্ত আত্মসমর্পণের এক অনন্ত সুর—যেখানে বেঁচে থাকাই নৈতিকতা, সহিষ্ণুতাই মানবতার মাপকাঠি।
রিলকের কবিতায় যেমন মৃত্যুকে বলা হয় “the other side of life, the inner space of existence,” তেমনি দুর্গার মৃত্যু, ইন্দির ঠাকরুনের বিলুপ্তি, কিংবা অপুর নিঃসঙ্গতায় আমরা দেখি মৃত্যুরই অপরূপ মানবিক রূপ—এক নীরব উত্তরণ, যা দুঃখকে অনস্তিত্ব নয়, রূপান্তর বলে জানায়। রিলকের “Duino Elegies”-এর মতোই ‘পথের পাঁচালী’ আমাদের শেখায়: জীবনের যন্ত্রণাই আমাদের দেবতার দিকে ঠেলে দেয়।
কামুর ‘The Plague’ কিংবা ‘The Stranger’–এর মতোই বিভূতিভূষণের জগৎ এক প্রকার নীরব অস্তিত্ববাদ—কিন্তু তফাত এই যে, কামু যেখানে দেখেন অ Absurd-এর তিক্ত শূন্যতা, বিভূতিভূষণ সেখানে দেখেন করুণায় দীপ্ত অর্থপূর্ণতা। তাঁর অপু কখনও “absurd man” নয়; সে জানে কষ্টের মধ্যেও জগত আছে, নদী আছে, পাখির ডাক আছে, আর সেটাই ঈশ্বরের উপস্থিতি।
ফকনারের Yoknapatawpha County-র মতোই নিশ্চিন্দিপুরও এক মিথোপোয়েটিক ভূগোল—একটি কাল্পনিক গ্রাম, যা বাস্তবতার চেয়ে বেশি সত্য। যেমন ফকনারের গ্রামীণ আমেরিকা মানবচেতনার প্রতীক হয়ে ওঠে, তেমনি বিভূতিভূষণের গ্রাম ভারতীয় অস্তিত্বের প্রতীক। দু’জনই ‘local colour’-এর ভিতর দিয়ে ‘universal condition’-এর সন্ধান দেন।
লাতিন আমেরিকার ম্যাজিক রিয়ালিস্ট ধারায় গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ ‘One Hundred Years of Solitude’-এ ম্যাকন্দোকে গড়ে তোলেন এমন এক স্থানে, যেখানে বাস্তব ও অলৌকিকতা মিশে যায়। বিভূতিভূষণও, তার বহু আগেই, এই কাজটি করেছিলেন—লোকসংস্কৃতি, ধর্মবিশ্বাস ও প্রকৃতির সংলাপে ‘পথের পাঁচালী’ হয়ে ওঠে বাংলার ম্যাকন্দো। তাঁর লেখার অলৌকিকতা চমক নয়, বরং অন্তর্মুখী চেতনা—যেখানে এক মৃত মেয়ের ছায়া হয়ে ফিরে আসে দুর্গা, এক ফেলে দেওয়া নোঙা হয়ে ওঠে জীবনের প্রতীক।
ভিক্টর হুগো যেমন Les Misérables-এ দারিদ্র্যকে মহত্ত্বের রূপ দেন, তেমনি বিভূতিভূষণ ক্ষুধাক্লিষ্ট সর্বজয়ার চোখে খুঁজে পান মাতৃত্বের দার্শনিক উজ্জ্বলতা। তাঁর দারিদ্র্য ভিক্ষার নয়, তপস্যার—“suffering as the ultimate purification of being.”
এমনকি দস্তয়েভস্কির ‘Brothers Karamazov’–এর নৈতিক উল্লাস ও আধ্যাত্মিক দ্বন্দ্বের প্রতিধ্বনি শোনা যায় অপুর যাত্রায়। অপু, আলিওশার মতোই, ব্যথার ভিতর দিয়ে ঈশ্বরকে খুঁজে পেতে চায়। বিভূতিভূষণের ঈশ্বর কোনো মন্দিরের দেবতা নন, তিনি প্রকৃতির গাছ, নদী, মেঘ, আলো ও মৃত্যুর নিঃশব্দতায় বর্তমান।
এই ভাবেই ‘পথের পাঁচালী’ নিজেকে স্থাপন করে বিশ্বসাহিত্যের বৃহত্তর মানবিক পরিসরে—যেখানে মানুষের অভিজ্ঞতা, স্থান-কাল নির্বিশেষে, একই আদিম ব্যথা ও একই গভীর মমতার সুরে বাঁধা।
বিভূতিভূষণের নিজস্ব উক্তিই হয়তো এই সমগ্র কথনের সারসংক্ষেপ— “ভালবাসা ভালবাসা।”
এই বাক্যটি শুধুই ব্যক্তিগত বিশ্বাস নয়, বরং এক সর্বজনীন নৈতিক দর্শন, যা টলস্টয়ের খ্রিষ্টীয় মানবতাবাদ, রিলকের রোমান্টিক ঈশ্বরচেতনা, কামুর অস্তিত্ববাদী সংযম, আর রবীন্দ্রনাথের “যে ভালোবাসে, সে-ই সত্য দেখে”—এই সবকিছুর মিলিত প্রতিধ্বনি।
ভালবাসার মধ্যেই তাঁর দারিদ্র্য, মৃত্যু, প্রকৃতি, এবং ঈশ্বর—সব একাকার। সেই ভালবাসা কখনও করুণা নয়, যেমন তিনি নিজে লিখেছিলেন: “ভালবাসা Pity নয়, করুণা নয়, Charity নয়… ভালবাসা ভালবাসা।” এই অকপট মানবিকতা তাঁকে পৃথক করে ফেলে তাঁর সময়ের যাবতীয় সাহিত্যিক আন্দোলন থেকে; তিনি সমাজতত্ত্বের লেখক নন, মানবতত্ত্বের দ্রষ্টা।
আর এই কারণেই ‘পথের পাঁচালী’ আজও বেজে চলে—মানবতার নীরব সংগীত হয়ে, যা শোনা যায় না কেবল বাংলার গ্রামে, বরং সমগ্র পৃথিবীর নিস্তব্ধ পাঠশালায়, যেখানে প্রতিটি পাঠক, একবার অন্তত, নিজের ভিতরের অপুকে চিনে নেয়।
বিশ্বসাহিত্যের চিরকালীন সম্পদ হয়ে রয়ে যাবে এক বাঙালি ইস্কুলমাস্টারের লেখা এই মহাকাব্য।
অলমতি বিস্তরেণ।