একটু থামুন! সিরিয়াস লেখা পড়তে পড়তে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছেন? তাহলে একটা ব্রেক নেন। নন-ফিকশনকেও দারুণভাবে উপভোগ করতে পারবেন।
ভারতীয় শিকারী কেনেথ এন্ডারসনের লেখা বনে বিপদ বইয়ে পাঁচটা গল্প আছে।
তালাভাদির বাঘ— কেনেথ এন্ডারসনের বন্ধু হাঘি হেইলস্টোন। হাঘির গুলিতে এক বাঘ ভয়ংকর ভাবে আহত হয়। এদিকে হাঘি গুরুতর অসুস্থ হলে কেনেথ এন্ডারসনকে অনুরোধ জানায় সে যেন বাঘটির শিকার করেন। একটি আহত বাঘ কীভাবে মানুষখেকো হয়ে ওঠে এবং কেনেথ এন্ডারসন কীভাবে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে তাকে শিকার করেন, সেই কাহিনি।
গেরহেট্টির শয়তান— এটি ‘পাগল’ খেতাব পাওয়া একটা হাতির কাহিনি। হাতিটা কিভাবে পাগল হয়েছে সে ব্যাপারে এন্ডারসন জানেন না। কয়েকজন মানুষকে হত্যা করা এই পাগলা হাতিকে দমনের অভিযান এখানে বর্ণিত হয়েছে ।
জালাহালির খুনি— গল্পটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগেকার সময়ের। একটা স্বাভাবিক আকারের সাধারণ একটি চিতাবাঘের কাহিনি। যে নিজের জীবন বাঁচাতে লড়েছে সাহসীভাবে, বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে। আর এটা করতে গিয়ে মানুষ আহত ও নিহত হয়। শেষ পর্যন্ত চিতাবাঘটার মৃত্যু হয় ঠিকই , তবে সেটাও বীরোচিতভাবেই।
মামান্দুরের নরখাদক— এটা একটা মানুষখেকো বাঘিনীর গল্প। বাঘিনীটা প্রথমে কিছু রাখাল হত্যা করে। পরবর্তীতে এন্ডারসন তার কলাকৌশল দ্বারা নরখাদকটাকে শিকার করেন।
রহস্যময় বন— অলৌকিক কিছু ঘটনার বিবরণ নিয়ে এই অংশের লেখাগুলি। প্রতিটাতেই এন্ডারসন ছিলেন প্রত্যক্ষদর্শী। কালো যাদুর কাহিনী , হাতি বৃদ্ধ হলে নদীতে আত্মাহুতি দেয়ার মিথটা সত্য না মিথ্যা এটা পরীক্ষা করাসহ আরও একটা কাহিনী দিয়ে বইটা শেষ হয়েছে।
অনুবাদ ছিল খুবই সাবলীল , পড়তে সমস্যা হয়নি একেবারেই। পড়ার সময় নিজেকে এন্ডারসনের সঙ্গীই মনে হয়েছে। বিশেষ করে “জঙ্গল, বন্যপ্রাণী ও শিকার জীবনের বর্ণনাগুলো ছিল খুবই জীবন্ত”
বানানে দুয়েকটা ভুল নজরে আসছে। ঐতিহ্য প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত বইটার মূল্য ১৫০৳।
কেনেথ এন্ডারসনের বন্ধু হাঘি হেইলস্টোন। ময়ার নদীর তীরে পছন্দমত একটুকরো জমি কিনে রেঞ্চ গড়ে তুলেছিলেন। মাঝখানে মাথায় বুদ্ধি চাপলো "দিয়াশলাই ঘাস" এর চাষ করবেন। সেই ঘাসের আড়ে হরিণ, শুয়োরের উৎপাত, তারপর তাদের লোভে বাঘ চিতাবাঘের আনাগোনা - আর শেষমেশ হাঘির গুলিতে এক বাঘের আহত হয়ে মানুষখেকোতে পরিণত হওয়া - যে বাঘটি পরিচয় লাভ করেছিলো 'তালাভাদির মানুষখেকো' নামে। গুলিতে মুখ বীভৎসভাবে নষ্ট হওয়া এই মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগকে দমন করেন কেনেথ। তবে এত সহজে নয়, দারুণ টক্কর দিয়েছিলো বাঘটা। একবার তো মরতেই বসেছিলেন। গভীর রাতে জলাশয়ের মাঝে নেমে চারপাশে চক্কর দেয়া বাঘ আর হাতির কবল থেকে এন্ডারসন যে কিভাবে ফিরেছিলেন - ভাবতেই গায়ে কাঁটা দেয়।
মানুষখেকোটির হাতে নিহত নিরীহ মানুষগুলোর রক্তের দাগ হাঘির হাতেও লেগেছিলো। তাই ঘটনাটির পর বেশিদিন বাঁচেননি তিনি।
তালাভাদির বাঘের মতই মামান্দুরের নরঘাতক বাঘিনীর কাহিনীও শিহরণ জাগানো। বিখ্যাত চামলা ভ্যালির ডোরাকাটার উত্তরসূরী হিসেবে আবির্ভাব হয় এই বাঘিনীর। এছাড়া মানুষের শয়তানি আর জ্বালাতনও যে প্রাণীদের নরঘাতক হতে বাধ্য করে তার উদাহরণ 'জালাহালির খুনী'। 'গেরহেট্টির শয়তান' এক পাগলা হাতি নিয়ে। শুরুতে পরপর তিনটা ঘটনা আছে হাতির আক্রমণের, সেগুলা ভাল্লেগেছে।
বইটার শেষ হয়েছে অলৌকিক কিছু ঘটনার বিবরণ দিয়ে। প্রতিটাতেই কেনেথ এন্ডারসন ছিলেন প্রত্যক্ষদর্শী। সুতরাং ভুয়া হওয়ার সম্ভাবনা নেই। বিশেষ করে কালো যাদুর কাহিনীটাতে আক্রান্ত মেয়েটির গালে মুখে টর্চ জ্বেলে, আঙুল ঢুকিয়ে আসলেই পাথর বের হয় কিনা তা কনফার্ম করতে গলদঘর্ম হয়েছেন কেনেথ। হাতি বৃদ্ধ হলে নদীতে আত্মাহুতি দেয়ার মিথটা যে সত্য তাও নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে জেনেছেন তিনি। বাকি কাহিনীটা এক পরিত্যক্ত গ্রামের মন্দিরের। মন্দিরের পবিত্র লন্ঠন চুরি করে কিভাবে এক বিদেশি খ্রিস্টান দম্পতি অভিশাপের সম্মুখীন হয়েছেন তা নিয়ে লেখা।
ওভারঅল চমৎকার একটি বই। রেটিং ৪/৫। শেষ লেখাটি - 'রহস্যময় বন' যে কারো অবিশ্বাসের ভিত নাড়িয়ে দিতে সক্ষম।