তন্ত্র-মন্ত্র, গুপ্তসংঘ, বিস্মৃত দেব-দেবী অথবা পুরাণের কাহিনীর সাথে অবিকৃত ইতিহাসের মিশেল ঘটিয়ে অতিপ্রাকৃত গল্প রচনা বাংলা ভাষায় বিরল। মুহম্মদ আলমগীর তৈমূর যেমন একদিকে বাঙালী পাঠককে এই ধারার প্রতি আকৃষ্ট করেছেন, ঠিক তেমনিভাবে অনুপ্রাণিত করেছেন অসংখ্য নবীন লেখককেও। ভিন্ন ভিন্ন স্বাদের এই গল্পগুলো লেখা হয়েছে বাংলাদেশের নানান ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে, ভিন্ন ভিন্ন কাল-পাত্রের প্রেক্ষিতে।
কখনও প্রাচীন সুমেরীয় সভ্যতার দেবী লিলিথ হাজির হয়েছে বংশালের চাকুরীজীবী ব্যাচেলরের জরাজীর্ণ ঘরে; বৈশালী রাজ্যের সর্ব শক্তিধর তান্ত্রিক চিত্রকূট আয়োজন করেছেন অদ্ভুত তন্ত্র সাধনা; প্রাচীন মিশরের ভয়ঙ্কর দেবতা এপোফিসের কাল্টের সাথে জড়িয়ে পড়েছে এযুগের ইব্রাহীম কাদরী। আসামের গহীন জঙ্গলে খুঁজে পাওয়া কালো পাথরের সাথে দেবতা আহুরার কী সম্পর্ক? বখতিয়ার খিলজিকে বধ করার উদ্দেশ্যে রাজা লক্ষ্মণ সেন যে পিশাচ ডেকে এনেছিলেন, তাকে নতুন করে কে জাগিয়ে তুলছে? যে তিরিশটি রুপোর পয়সার বিনিময়ে জুডাস ইসকারিয়াত যিশু খৃষ্টকে রোমানদের হাতে ধরিয়ে দিয়েছিল, সেই অভিশপ্ত জুডাস কয়েন কি করে এসে পৌছাল বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ এক গবেষকের হাতে?
এইসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে পাঠক জড়িয়ে যায় নিভৃত কুহকে।
আমার রেটিং বায়াসড। হরর জনরা খুব একটা পছন্দ না, কিন্তু আলমগীর তৈমূর স্যারের লেখনী এত দারুন আর গল্পের বুনন এত চমৎকার যে গল্প টেস্টবাড না মেনে চললেও পড়া থামাতে পারিনি। যদিও অনেক সময় নিয়েছি। ছোট ছোট গল্পের পুরো বইটা শেষ করতে ধীরে সুস্থে অনেক সময় নিয়েছি।
যে কোনো হরর লাভার এর জন্য দারুন সুপাঠ্য এবং মাস্ট রিড।
অতিপ্রাকৃত আবহ তৈরিতে মুহম্মদ আলমগীর তৈমূর একদিকে যেমন সিদ্ধহস্ত, অন্যদিকে পরিমিত রসবোধ তাঁর লেখার আরো একটি বিশেষ দিক। এই সংকলনের তেরোটি গল্প/উপন্যাসিকার প্রায় সবগুলোই ভালো লেগেছে ঠিক এ কারণেই। কয়েকটি মোটামুটি মানের গল্প যে ছিল না সেটি বলা ভুল হবে, তবে সেই সংখ্যাটা যৎসামান্য। বেশিরভাগ গল্পই পুরোদস্তুর উপভোগ্য। সেগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চাই বংশালের বনলতা, অসীম আচার্য্যের অন্তর্ধান, হৃদয়পুর কতদূর, কান্তজিউয়ের পিশাচ, প্রাচীন মুদ্রা - এই গল্পগুলোর নাম।
এপার বাংলায় মুহম্মদ আলমগীর তৈমূর হয়তো এখনও ততটা খ্যাতিমান নন। সম্প্রতি সানডে সাসপেন্স-এর সৌজন্যে তাঁর লেখা অনন্য কাহিনিদের সঙ্গে বৃহত্তর পাঠকগোষ্ঠীর একটু-একটু করে পরিচয় গড়ে উঠছে। তবে ওপারে তো বটেই, এপারের রসবেত্তাদের মধ্যেও তাঁর লেখা এক সশ্রদ্ধ আকর্ষণের বিষয়। কেন? কী এমন জিনিস লেখেন তৈমূরসাহেব, যা এই সময়ে তন্ত্র, পিশাচ ও অপদেবতার আখ্যান অক্লেশে লিখে চলা নব্য লেখককেও থমকে দেয়? কেন এই সময়ের বহু লেখক তৈমূরকে অঘোষিত দ্রোণাচার্য মেনে একলব্যের সাধনা করেন নিভৃতে? তার কারণ একটাই। ভয়োৎপাদক বর্ণনা, লোকায়ত বিশ্বাস ও জীবনের সরস বিবরণ, বিপুল প্রজ্ঞা এবং ইতিহাস-চেতনার এমন মিশ্রণ প্রায় অভাবনীয়। আর তৈমূর তাঁর লেখায় এই মিশ্রণ পরিবেশন করে আমাদের চমকে দেন বারবার। তাঁর তেমন আটটি কাহিনি সংকলিত হয়েছে এই বইয়ে। তারা হল~ ১. অসীম আচার্যের অন্তর্ধান ২. বজ্রযোগীর প্রত্যাবর্তন ৩. বংশালের বনলতা ৪. হৃদয়পুর কতদূর ৫. ইব্রাহিম কাদরি'র মৃত্যু ৬. কালো পাথর ৭. অমলকান্তি'র চাকরি ৮. ভুদুয়া জমজম এই গল্পগুলো আমরা আগেও পড়েছি— কখনও 'বংশালের বনলতা' সংকলনে, কখনও কোনো পত্রিকায় বা বার্ষিকীতে। কিন্তু এই বিশেষ সংস্করণের দু'টি বিশেষত্ব আছে। সেগুলো হল~ (ক) রয়্যাল সাইজের এই বইটির মুদ্রণ ও পরিবেশনকে সার্থক করে তুলেছে ওঙ্কারনাথ ভট্টাচার্যের অসামান্য অলংকরণ। (খ) ছাপার ভুল বা বানানের অরাজকতা এখানে আদৌ চোখে পড়েনি। যদি উপমহাদেশের, বিশেষত বাংলার ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা লৌকিক ও অলৌকিক আতঙ্কের আখ্যান পড়তে চান, যাতে মিশে থাকে পাপ আর অভিশাপ, লোভ আর বিষাদ, তাহলে এই বইটি কোনোমতেই উপেক্ষা করা উচিত হবে না। সুযোগ পেলেই পড়ে ফেলুন!
সবগুলো গল্পই অসম্ভব ভালো লেগেছে। মুহম্মদ আলমগীর তৈমূর এখন আন্ডাররেটেড লেখক বাংলাদেশের। হাল আমলের রহস্য ঘরানার লেখকদের তুলনায় উনি অনেক বেশি ভালো লেখেন। প্রতিভার সঠিক মূল্যায়ন হোক এই প্রত্যাশা করি।
শীতের শেষের সাথে সাথে জমজমাট এই প্রায় সাড়ে চারশত পৃষ্ঠার হরর বইটাও শেষ হলো অবশেষে! মুহম্মদ আলমগীর তৈমূর স্যারের লেখার কথা অজস্রবার শুনেছি আমি পরিচিত পছন্দের মানুষদের কাছে। শেষমেশ পরিচয় হলো আমার ভদ্রলোকের অ-তে অসাধারণ লেভেলের লেখনীর সাথে।
লেখক এতোটাই জানাশোনা মানুষ, ইতিহাস যে তাঁর বা হাতের খেল সেটা প্রত্যেকটা গল্পেই পাওয়া গেছে প্রমাণ। আমি গল্পে ভয়ে স্থানুর মতো হবো, নাকি লেখা পড়ে... খেই হারিয়ে ফেলছিলাম।
তন্ত্র-মন্ত্র, কাল্ট, গুপ্তসংঘ, দেব-দেবী, পুরাণ, ধর্ম সব কিছুর সাথে অবিকৃত ইতিহাসের মিশেল ঘটিয়ে অতিপ্রাকৃত রচনা আসলেই বাংলায় দেখা যায়না। এখানে ফেরাউন আমলের মিশরীয় দেবতা অ্যাপোফিস, অ্যানুবিস, ভারতীয় অসংখ্য দেবদেবী, প্রাচীন মেসোপোটেমিয়ান অপদেবতা, সুমেরীয় সভ্যতার দেবী লিলিথ, দেবতা আহুরা, মনসা দেবী, জুডাস কয়েন থেকে শুরু করে বাংলাদেশের নানা সময়ের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ভিন্ন ভিন্ন পরিচিত চরিত্রের মিশেলে রচিত হয়েছে এক একটি বড়গল্প/উপন্যাসিকা। বংশালের বনলতা, হাকিনী, অমল কান্তির চাকরি এইসব নামগুলো অনেকদিন মনে থাকবে আপনার কথা দিচ্ছি। মোঘল আমল, সেই সুপ্রাচীন বাংলা থেকে শুরু করে ইংরেজ আমল, সত্তর দশক, একাত্তর, আশি নব্বইয়ের সময়...কি নেই! এমনকি ইতিহাসের ব্যপ্তি ছাড়িয়ে গেছে দেশ ছাড়িয়ে বিশ্বপরিমন্ডলেও!!
লেখকের সবচেয়ে বড় গুণ তার লেখার ধরণ। সাধারণত রহস্য, ভৌতিক, থ্রিলার এইসব বইতে কেউ অতটা সাহিত্যিক ধাঁচের লেখনি, ভারি শব্দ, উন্নত ভাষা আশা করেন না। কিন্তু তৈমূর স্যার এক্ষেত্রে একদমই মুদ্রার উলটো পীঠ। লেখনীর জাদু এতটাই অসাধারণ, ভাষাশৈলী পড়ে মনেই হয়না একটা ভৌতিক ধাঁচের বই পড়ছি। দারুণ রসকসের সহিত প্রবাদের ব্যাবহার, ইংরেজি বাংলা সংস্কৃত থেকে শুরু করে আরও সব উক্তির ব্যবহার, শব্দভান্ডারের সঠিক ব্যবহারের সহিত গল্পের মান ধরে রাখা, খুব কম দেখেছি আমি এই জনরায়। খুব কম। নতুন লেখকদের একটু খেয়াল করা উচিত আমার মনেহয় এইধরনের উদাহরণগুলো। তাতে লেখার মানটার দিকেও খেয়াল থাকে।
তবে, আমি চাঁদের গায়ের সামান্য একখানি কলঙ্ক পেয়েছি আমার মতে। সেটা হলো প্রায় প্রতিটা লেখাই একটা ব্যাসিক প্যাটার্নে লেখা। কোনো না কোনো এক চরিত্র থাকেই যার কাজ ইতিহাস তুলে ধরা। সে ইতিহাসের প্রত্যেকটি সুচারু বাঁকও তুলে আনবে সামনে বিনাদ্বিধায়। যেটা টানা এতগুলো গল্প/উপন্যাসিকার ক্ষেত্রে বেশ টায়ারিং, মাঝে মাঝে ইতিহাসের প্রবল স্রোতে কোথায় গিয়ে যে ঠেকি, বুঝে উঠিনা আসল গল্প কি ছিল। সেক্ষেত্রে প্রতি একটি কিংবা দুটি গল্প পর পর একটু গ্যাপ দেয়া ভালো আমার মতে। সেকারণে আমারও কিছুটা সময় নিয়ে শেষ করা। আর দুই একটা গল্প আমারও হয়তো মনপূতঃ হয়নি, তবে সেটা সংখ্যা অনুসারে অত্যন্ত কম। ভালো লাগার পরিমান এতো বেশি, যে ঠাঁয় পায়নি সেসব।
যাহোক, এই বইটি বের হয়েছিলো আদী প্রকাশনী হতে। এতে মোট ১৩টি লেখা আছে সংকলন আকারে। বইটি প্রকাশনী আর ছাপাচ্ছেনা। তবে নতুন আকারে দুই ভাগে ভাগ করে 'নিগূঢ়-১ ও ২' নামে বইগুলো প্রকাশ করছে বিবলিওফাইল প্রকাশনী। কলকাতায় অবশ্য একই নামে বুকওফার্ম প্রকাশ করছে বইটি।
ভৌতিক, রহস্য আর ইতিহাসের মিশেলে লেখা যদি আপনার পছন্দ হয় এই বইটি আমি অবশ্যই আপনাকে রেকোমেন্ড করবো। পাশাপাশি আরও বেশি পরিচিতি পাওয়া উচিত এই ���্রতিভাবান লেখক ও শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুহম্মদ আলমগীর তৈমূর স্যারের।
কুহক কথন-১৩ টি অতিপ্রাকৃত গল্পের বৃহৎ সংকলন । যদিও বেশিরভাগ গল্পই আগে বিচ্ছিন্নভাবে আমার পড়া , তাও রিভিশন হয়ে গেল। বর্তমানে অতিপ্রাকৃত জঁরে দেশের সেরা লেখক মুহম্মদ আলমগীর তৈমূর- এতে কোন সন্দেহ নাই, অন্তত আমার কাছে । প্লট হোক যেমন-তেমন, ঘটনাপ্রবাহ বর্ণনায় তার যে মুন্সিয়ানা, বুঁদ হয়ে শুধু পাতার পর পাতা উল্টে যেতে হয়।
'হাকিনী'র মুহাম্মদ আলমগীর তৈমূরের যে কোনো লেখা ভীষণ আগ্রহ নিয়ে পড়ি। গতানুগতিক হরর গল্প ড. তৈমূর লেখেন না। তাঁর গল্প ও ঔপন্যাসিকা মানেই মিথলজি, ইতিহাস ও ধর্মতত্ত্বের এক অসাধারণ মিশেল। এই বইতে দীর্ঘদিন ধরে লেখা তাঁর গল্পগুলো সংকলিত হয়েছে। প্রতিটি গল্প আলাদাভাবে রহস্য পত্রিকায় পড়েছি। তবু আঁশ মেটে না। তাই আরও একবার মুহাম্মদ আলমগীর তৈমূরের লেখা অসাধারণ কাহিনিগুলো পড়ে ফেললাম।
নির্দ্বিধায় পাঁচ তারকা পাওয়ার মতো। স্রেফ 'নজ্জুমি কিতাব' গল্পখানা এই সংকলনে স্থান পাওয়ার যোগ্য নয়। বাকিগুলো অসংখ্যবার পড়ার মতো গল্প।
‘অলৌকিক’ বা ‘অতিপ্রাকৃত’ জঁনরার প্রতি আমার আলাদাই ভালোলাগা আছে । আসলে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এইসব ঘটনা ঘটে না বলেই বোধহয় এই টান । এইবছরেই ‘অতিপ্রাকৃত’ জঁনরার বেশ কয়েকটি বই পড়েছি । সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের যে কটি ‘অতিপ্রাকৃত’ বই পড়েছি তার ভিত্তিতে নিঃসন্দেহে বলতে পারি ওপার বাংলায় শুধু ‘থ্রিলার’ নয়, বরং তার সাথে সাথে ‘অতিপ্রাকৃত’ বিষয়বস্তু নিয়েও বেশ ভালো কাজ হচ্ছে ।
📄 বর্তমান বাংলা সাহিত্যের ‘হরর ফ্যান্টাসি’ জঁনরার অন্যতম স্টলওয়ার্ট ফিগার বলা হয় ‘মুহম্মদ আলমগীর তৈমূর’কে । এই লেখকের লেখনীর ধরণ ‘প্রি-মডার্ন’ ধাঁচের, প্রতিটি গল্পেই তার ‘ভাষার সাবলীলতা’ এবং ‘বিশ্ব ইতিহাসের’ ওপর অগাধ জ্ঞানের ছাপ স্পষ্ট । বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লেখা আটটি বড়োগল্পের সংকলন এই বইটি । তন্ত্র-মন্ত্র, গুপ্তসংঘ, বিস্মৃত দেবদেবী অথবা পুরাণের কাহিনির সাথে অবিকৃত ইতিহাসের মিশেল ঘটিয়ে লেখা হয়েছে এই সংকলনের গল্পগুলি ।
📑 গল্প-আলোচনা :
🔸অসীম আচার্যের অন্তর্ধান : বখতিয়ার খলজিকে বধ করার উদ্দেশ্যে রাজা লক্ষ্মণসেন যে পিশাচ ডেকে এনেছিলেন, তাকে নতুন করে জাগিয়ে তুলেছে কে ?
▫️ইতিহাস প্রেক্ষাপটের সাথে খুব সুন্দর হাস্যরসের মিশেলে গল্পটি পড়তে ভালোই লাগে ।
🔸বজ্রযোগীর প্রত্যাবর্তন : বৈশালী রাজ্যের সর্বশক্তিধর তান্ত্রিক চিত্রকূট আয়োজন করেছেন অদ্ভুত তন্ত্রসাধনার । বজ্রযোগীর প্রত্যাবর্তন হবে কি ?
▫️এই গল্পের প্লট দুর্দান্ত, খুব ভালো ভাবে জমিয়ে শুরু করে হঠাৎই শেষ হয়ে যায় গল্প । পড়ে মনে হয়েছিল এই প্লটের ওপর একটি উপন্যাস হলে দারুণ হবে । পরে জানতে পারলাম ঠিক এই নামেই লেখক উপন্যাস লিখেছেন, পড়ার অপেক্ষায় আছি ।
🔸 বংশালের বনলতা : প্রাচীন সুমেরীয় সভ্যতার দেবী লিলিথ হাজির হয়েছে বংশালের এক চাকুরিজীবী ব্যাচেলরের জরাজীর্ণ ঘরে । তারপর ?
▫️নির্দ্বিধায় এই গল্পটি সংকলনের সেরা গল্প । যেমন প্লট, সেইরকম দুর্দান্ত এক্সিকিউশন । পড়ে বেশ রোমাঞ্চিত হতে হয় ।
🔸হৃদয়পুর কতদূর : ভারত-বাংলাদেশ বর্ডারে অবস্থিত ‘হৃদয়পুর’। সেখানে অবস্থিত ‘ঠাকরুণ বেওয়া’ মন্দির এবং ‘হাতিশালের খান্ডালা’র ইতিহাস কি ? তুঘান তুঘরিল খানের সাথেই বা হৃদয়পুরের সম্পর্ক কি ?
▫️এই সংকলনের আরেকটি দুর্দান্ত গল্প । বর্তমানের সাথে ইতিহাসের দুর্দান্ত মিশেলে গল্পটি হয়ে উঠেছে অনবদ্য ।
🔸ইব্রাহিম কাদরীর মৃত্যু : জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ইব্রাহিম কাদরীর সাথে গল্পের কথকের তেমন একটা ভালো সম্পর্ক না । কিন্তু ইব্রাহিম কাদরীই এক অদ্ভুত আবদার নিয়ে আসে তার কাছে । বিশেষ কারণবশত প্রাচীন মিশরের ভয়ংকর দেবতা অ্যাপোফিসের কাল্টের সাথে জড়িয়ে পড়েছে ইব্রাহিম কাদরী । তারপর ?
▫️ এই গল্পে রয়েছে মিশরীয় পুরাণের এক ভয়াবহ অপদেবতা, পিরামিড রহস্য, ক্রুসেড, নাইট টেম্পলার, ফ্রি মেসন সহ বেশ কিছু কাল্টের বর্ণনা । বহুল তথ্যের ভারে জর্জরিত এই গল্পটি পড়তে তেমন ভালো লাগেনি ।
🔸কালো পাথর : গল্পের কথক হঠাৎই একটি রহস্যময় ‘কালো পাথরের’ সন্ধান পান তারই বন্ধুর লেখা ডায়েরীতে । সেই কালো পাথরের সন্ধানে কথক পৌঁছে যান মেঘালয়ের গহীন জঙ্গলে । ঐ রহস্যময় কালো পাথরটির সাথে দেবতা আহুরার সম্পর্ক কি ?
▫️এই গল্পটি সংকলনের সবচেয়ে ভয়াবহ গল্প । অন্যান্য গল্পগুলির তুলনায় এ গল্পে ভৌতিক আবহের বর্ণনা বেশ ভালো পরিমাণে ছিল ।
🔸অমলকান্তির চাকরি : ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির চাকরিতে সুবিধা করতে না পারায় অমলকান্তির সংসারে চলছে টানাটানি অবস্থা । এমন সময় একটি পার্কে তার সাথে দেখা হয় এক অদ্ভুত ব্যাক্তির, যিনি অমলকান্তিকে প্রস্তাব দেন এক অদ্ভুত চাকরির । ঠিক কি ধরণের চাকরি ?
▫️এই সংকলনের সবচেয়ে বড়ো গল্প এটি । গল্পের প্লট এবং বিল্ড-আপ দুর্দান্ত, সাধারণ কাহিনী থেকে অতিপ্রাকৃতের দিকে যেভাবে গিয়েছে গল্পটি তা বেশ উপভোগ্য । কিন্তু গল্পের মাঝের অংশে তন্ত্রের বর্ণণা একটু কম হলে গল্পটি আরও জমজমাট হত বলে আমার মনে হয়েছে ।
🔸ভুদুয়া জমজম : গল্পের মূল প্রেক্ষাপট সত্তরের দশক । এই গল্পের কথক একজন সিগারেট কোম্পানির ডেলিভারিম্যান । এক প্রত্যন্ত এলাকায় সিগারেটের কার্টন বেচতে গিয়ে এক অভূতপূর্ব ঘটনা জানতে পারেন তিনি । কি সেই ঘটনা ?
▫️গল্পটি বেশ ভালোই । সাধারণ কাহিনীর সাথে দেবী মনসার মিথের মিশেলে গল্পটি বেশ আকর্ষণীয় হয়েছে । শেষ অংশটি বেশ ভয়াবহ লেগেছে ।
📄 এই বইটি ‘অতিপ্রাকৃত গল্প সংকলন’ হলেও গল্পগুলির প্রেক্ষাপট আবর্তিত হয়েছে ইতিহাস, আর্টিফ্যাক্ট, দেবতা-অপদেবতা, ধর্ম, কাল্ট এবং প্রচলিত কিংবদন্তি... এই বিষয়গুলিকে কেন্দ্র করে । ভয় এবং রোমাঞ্চের সাথে লেখক প্রতিটি গল্পেই সুনিপুণ ভাবে প্রয়োগ করেছেন ‘হিউমার’, যা গল্পগুলিকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে । এই সংকলনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল ‘গল্পের বিল্ড-আপ’। ভীষণ সাবলীল ভাবে লেখক ইতিহাসের সাথে বর্তমানের মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন প্রতিটি গল্পে, বেশ কিছু ক্ষেত্রে পড়তে পড়তে দৃশ্যপট যেন চোখের সামনে ভেসে উঠেছে ।
🔻তবে এই সংকলনের কয়েকটি গল্প দুর্দান্তভাবে শুরু হয়েও শেষ হয়েছে ভীষণ হতাশাজনক ভাবে ।
📄 ‘বুকিকার্ট পাবলিকেশন’ এর প্রোডাকশন দুর্দান্ত । প্রতিটি গল্পের সাথেই দুর্দান্ত কিছু ইলাস্ট্রেশন বইটিকে সমৃদ্ধ করেছে । ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ‘অতিপ্রাকৃত’ গল্প পড়তে চাইলে অবশ্যই সংগ্রহ করুন এই বইটি, ভালো লাগবে ।
“There is no exquisite beauty… without some strangeness in the proportion.” ― Edgar Allan Poe
কুহক-কথন - "কুহক-কথন" মূলত লেখক মুহম্মদ আলমগীর তৈমূরের লেখা একটি অতিপ্রাকৃত গল্প সংকলন। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে ১৩ টা গল্প নিয়ে করা এ সংকলনটি আদী প্রকাশন থেকে প্রথম প্রকাশিত হয়। - অমল কান্তির চাকরি - অমল কান্তি, এক ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে কাজ করা ছা পোষা এক ব্যাক্তি। চাকরিতে সুবিধা করতে না পারায় তার সংসারে চলছে টানাটানি অবস্থা। এমন সময় এক পার্কে তার সাথে দেখা হয় এক অদ্ভুত ব্যাক্তির। সেই লোক অমল কান্তিকে দেয় ধাধার বিনিময়ে এক অদ্ভুত চাকরির প্রস্তাব। সে চাকরির বিস্তারিত জানতে হলে পড়তে হবে গল্পটি।
"অমল কান্তির চাকরি" কুহক কথন বইয়ের প্রথম গল্প। আগাগোড়া দুর্দান্ত এক কাহিনী লেগেছে গল্পটিকে। সাধারণ কাহিনী থেকে অতিপ্রাকৃতের দিকে যেভাবে গিয়েছে গল্পটি তা বেশ দারুন। অমল কান্তি এবং মৃণাল বাবু দুটি চরিত্রকেই নিজ নিজ জায়গায় ভালো লেগেছে।নানা ধরনের তন্ত্রের বর্ণনাও ইন্টারেস্টিং। - বংশালের বনলতা - "বংশালের বনলতা" গল্পের শুরুতে দেখা যায় এ গল্পের প্রোটাগনিস্ট "আইসিসি ট্রেডিং এজেন্সি" এর জুনিয়র একাউন্টেন্ট হিসেবে কর্মরত আছে। লোকটি যে বাড়িতে আছে সেটি বংশাল এলাকার দেড়শো বছরের পুরোনো এক আর্মেনীয় ধাঁচের বাড়ি। হঠাৎ সে বাড়িই হয়ে উঠে তার ভাগ্য পরিবর্তনের চাবিকাঠি।
"বংশালের বনলতা" গল্পটি বইয়ের আরেকটি দারুন হিস্টোরিক্যাল হরর। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সময় থেকে প্রাচীনকালের এক অপদেবীর ঘটনা বেশ ভালো লেগেছে আমার। গল্পটির বর্ণনা এবং সাসপেন্সটিও দারুন। - অসীম আচার্য্যের অন্তর্ধান - "অসীম আচার্য্যের অন্তর্ধান" এ গল্পটির মূল কথক একজন স্কুল শিক্ষক। তার এই সহকর্মী নলিনী বাবুর মা মারা যাওয়ায় সে আর তার স্কুলের হেড মাস্টার নলিনী বাবুর পৈত্রিক ভিটায় যাবার সিদ্ধান্ত নেয়। সেখানেই তারা দেখতে পায় অদ্ভুত পোড়ো বাড়ি। সেই বাড়ির ইতিহাস নিয়েই এই গল্পের বাকি অংশ।
হিস্টোরিক্যাল হরর ধাঁচের এ গল্পের ঐতিহাসিক পার্ট সুলতানী আমল, কোম্পানি আমল থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত বিস্তৃত। প্রথম দিকে কাহিনী কিছুটা ধোঁয়াশা লাগলেও শেষের দিকে মোটামুটি ক্লিয়ার হয়েছে সব ঘটনা। মোটের উপর ওকে টাইপ একটি গল্প। - কালো পাথর - "কালো পাথর" গল্পের টাইটেলটির মতোই মূল ঘটনা এক কালো পাথরকে ঘিরে। এই গল্পের কথক হঠাৎই "গরিবুল্লাহ" নামক এক খেপাটে কবির এক ডায়েরির সন্ধান পান। সেই ডায়েরিতে বর্ণিত কালো পাথরের সুলুক-সন্ধান নিয়েই এই গল্পটির কাহিনী এগিয়েছে।
এই গল্পের সেটিং বর্তমান কাল, ইউসুফ ক্বরবানির শাসনামল থেকে মহাভারতের সময় পর্যন্ত বিস্তৃত। অন্যান্য গল্পগুলোর তুলনায় এ গল্পের ভৌতিক আবহের পরিমান বেশ ভালো পরিমান ছিল, বিশেষ করে ভৌতিক গল্পের হিসেবে শেষ পার্ট একেবারেই দুর্দান্ত। - বজ্রযোগীর প্রত্যাবর্তন - "বজ্রযোগীর প্রত্যাবর্তন" গল্পের শুরু গল্পের কথকের সাথে বৃন্দাবন দাস নামক এক লোকের সাথে দেখা হবার মাধ্যমে। তার মাধ্যমে গল্পকথক এক অদ্ভুত ঘটনা এবং মানুষের কথা জানতে পারেন। বজ্রযোগী নামক সেই অদ্ভুত মানুষ এবং তার প্রত্যাবর্তন নিয়েই এই গল্পের বাকি ঘটনা। - "বজ্রযোগীর প্রত্যাবর্তন" এই গল্পটিও হিস্টোরিক্যাল হরর ধাঁচের। নকশাল আন্দোলন, শাহ সুলতান মাহিসওয়ার থেকে পুন্ড্রনগরের কংশ সেন- দুর্দান্ত লেগেছে এই গল্পের ঘটনাবলী। তবে এর ভিতরে একটি স্ক্রলের ভেতরে যে কাহিনী পাওয়া যায় তা বিশেষ ভালো লেগেছে। সে সাথে তন্ত্র সাধনার নানা আচার-উপাচারের বর্ণনাও বেশ ভালো লেগেছে। - ইব্রাহিম কাদরীর মৃত্যু - "ইব্রাহিম কাদরীর মৃত্যু" এই গল্পের শুরুতে জানা যায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ইব্রাহিম কাদরীর সাথে গল্পের কথকের তেমন একটা ভালো সম্পর্ক নেই কিছু কারনে। কিন্তু ইব্রাহিম কাদরীই এক অদ্ভুত আবদার নিয়ে আসে তার কাছে। সেই আবদারের বিস্তারিত নিয়েই এই গল্পটি রচিত।
"ইব্রাহিম কাদরীর মৃত্যু" গল্পে মিশরীয় পুরানের এক ভয়াবহ অপদেবতা, পিরামিড রহস্য, ক্রুসেড, নাইট টেম্পলার, ফ্রি মেসন সহ বেশ কিছু কাল্টের বর্ণনা আছে এই গল্পে যা পড়তে বেশ ভালো লেগেছে। এই গল্পের রহস্যের সমাধানটাও গল্পের বাকি গল্পগুলোর চেয়ে আলাদা কিছুটা,তবে মনে হলো যেন হুট করেই হয়ে গেল। মোটের উপরে ভালোই লেগেছে গল্পটা। - হাকিনী - "হাকিনী" গল্পের কথক তার বাবার কর্মফলের কারনে তার ব্যবসার বিভিন্ন জিনিস বেচতে গিয়ে অমিয় জুলেয়ার্স এর মালিককে দুটো বালা দেখান। সেই দুটো বালার আসল রহস্য নিয়েই মূলত এই গল্পটি রচিত।
"হাকিনী" গল্পের প্রেক্ষাপট বৃটিশ আমল থেকে বখতিয়ার খলজির আমল পর্যন্ত বিস্তৃত। গল্পের বর্ণনা এবং হাকিনী বিষয়ক তন্ত্র-মন্ত্র ভালো লেগেছে। তবে এই গল্পের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক লেগেছে এর এন্ডিং, একেবারেই শকিং এবং আনএক্সপেক্টেড লেগেছে এবং এন্ডিংটি। - হৃদয়পুর কতদুর - "হৃদয়পুর কতদুর" এই গল্পের মূল প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ-ভারতের মাঝামাঝি হৃদয়পুর নামক এক জায়গা। গল্পের কথক তার স্কুলে চাকরি করা এক অসুস্থ মানুষকে নিয়ে সে জায়গায় গিয়ে কিছু অতিপ্রাকৃত ঘটনা দেখতে পান যা নিয়ে এ গল্পের কাহিনী। - "হৃদয়পুর কতদুর" গল্পের বিস্তার বর্তমান সময়, তুঘরিল খানের শাসনামল থেকে মেসোপটেমিয়ার এক সময় পর্যন্ত। গল্পটি সবমিলিয়ে মোটামুটি লেগেছে। হৃদয়পুর গ্রামের পুর্বের ইতিহাসের পার্টটি ভালো লেগেছে,গল্পের শেষটাও বেশ ভয়াবহই। - নজ্জুমি কিতাব - "নজ্জুমি কিতাব" গল্পটি এই নামেরই একটি কিতাবকে ঘিরে। হঠাৎই গল্পের কথকের কাছে এসে পড়ে কিতাবটি। তাই সে দীনবন্ধু নামে এক লোককে সাথে নিয়ে বের হয় এই কিতাবের রহস্য উদ্ধারে। - কুহক কথনের বাকি গল্পগুলোর তুলনায় নজ্জুমি কিতাব গল্পটি হতাশাজনকই মনে হয়েছে, যেন "শেষ হইয়াও হইলো না শেষ" টাইপের। মনে হয় গল্পের রহস্যটি আরো বিস্তৃত হলে গল্পটি আরো ভালো লাগতো। - হাতকাটা তান্ত্রিক - "হাতকাটা তান্ত্রিক" গল্পের শুরুর প্রেক্ষাপট আমাদের দেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়। সেখানে এক যোদ্ধা যুদ্ধে অংশ নেবার জন্য ভারতে ট্রেনিং নিতে গিয়ে দেখা হয় এক হাতকাটা তান্ত্রিকের সাথে। তার মুখে শোনা ঘটনাটাই এই গল্পের মুল উপজীব্য।
"হাতকাটা তান্ত্রিক" গল্পটির বর্ণনাভঙ্গি বাকি গল্পগুলোর তুলনায় কিছুটা দুর্বল লাগলো। তবে এই গল্পে পাওয়া "খান্ডালা" নামক এক জায়গার ইতিহাসটি বেশ ভালোই লাগলো। - কান্তজিউয়ের পিশাচ - "কান্তজিউয়ের পিশাচ" নামক এই গল্পের শুরু হয় মূল গল্প কথকের ছোট কাকার অনেক বছর পরে বাড়ি ফেরার মাধ্যমে। কিন্তু সে আসার পর থেকেই বেশ অসুস্থ ছিল। একদিন হঠাৎ সেই ছোট কাকা অন্তর্ধান হলে তাকে খুঁজতে বের হয় গ���্প কথক এবং এ নিয়েই গল্পের বাকি অংশ। - "কান্তজিউয়ের পিশাচ" গল্পটি আমার আগা গোড়া ভালো লেগেছে। গল্পের ভিতরে সুন্দরবনের বর্ণনা, কাহিনীর সাথে ভ্যাম্পায়ার মিথের মিশ্রণ এবং সর্বোপরি বর্ণনাভঙ্গি সবকিছুই টপক্লাস লাগলো। - ভুদুয়া জমজম - "ভুদুয়া জমজম" গল্পটির মূল প্রেক্ষাপট সত্তরের দশক। সে সময়ে এক সিগারেট কোম্পানির ডেলিভ্যারিম্যান এই গল্পের কথক। এক প্রত্যন্ত এলাকায় সিগারেটের কার্টন বেচতে গিয়ে এক অভূতপূর্ব ঘটনা জানতে পারেন এবং সেই ঘটনা নিয়েই এই গল্প।
"ভুদুয়া জমজম" গল্পটি মোটের উপরে ভালোই। বিশেষ করে সাধারণ কাহিনীর সাথে মনসার মিথের ব্লেন্ডিং ভালো লেগেছে। শেষটাও বেশ ভয়াবহ লেগেছে। - এবার আসি আমার পড়া সংকলনটির সেরা গল্প "প্রাচীন মুদ্রা" কে নিয়ে। অনেক আগে এক সংকলনে গল্পটা পড়া থাকলেও আবারো মুগ্ধ হয়ে পড়লাম। গল্পের নাম শুনেই বোঝাই যাচ্ছে এটি একটি বিশেষ প্রাচীন মুদ্রাকে নিয়ে। হিস্টোরিক্যাল হরর জনরার একেবারে দুর্দান্ত উদাহরণ এটি। গল্পের প্রেক্ষাপট এবং বর্ণনাভঙ্গি দুটোই দারুণ ভালো লেগেছে আমার। - "কুহক কথন" নামের এই অতিপ্রাকৃত গল্প সংকলনে গল্পের সাথে বেশ কিছু মানানসই ইলাস্ট্রেশন বেশ ভালো লেগেছে আমার। বইটির প্রচ্ছদও মিনিমালের ভিতরে আকর্ষণীয়। বইয়ের বাঁধাই, মেক আপ, পৃষ্ঠার মান সবগুলো দামের তুলনায় মানানসই। ছোটখাট কিছু বানান ভুল থাকলেও তা গল্প পড়ায় কোন বিঘ্ন ঘটায় নি। - সবমিলিয়ে, "কুহক কথন" অতিপ্রাকৃত ঘরানার একটি দুর্দান্ত গল্প সংকলন যার মুল কৃতিত্ব অবশ্যই লেখক মুহম্মদ আলমগীর তৈমূরের। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এই গল্পগুলোকে এক মলাটে নিয়ে আসার জন্য আদী প্রকাশনকে ধন্যবাদ। আমি ব্যাক্তিগতভাবে লেখকের সামনের গল্পগুলো পড়ার জন্য অধীর আগ্রহে থাকলাম। সব ধরনের হরর- থ্রিলার পাঠকদের জন্য হাইলি রিকমেন্ড করা থাকলো বইটি। - এক নজরে "কুহক কথন" - লেখক: মুহম্মদ আলমগীর তৈমূর জনরা: ঐতিহাসিক হরর/থ্রিলার গল্প সংকলন প্রচ্ছদ: সজল চৌধুরী অলঙ্করণ: মিশন মন্ডল প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি ২০২০ (আদী প্রকাশন) পৃষ্ঠা সংখ্যা: ৪৩২ মুদ্রিত মুল্য: ৪৯৫ টাকা।
মুহম্মদ আলমগীর তৈমূর স্যারের লেখা প্রায় প্রত্যেকটা কাহিনিতেই ইতিহাস, মিথ, অতিপ্রাকৃত এবং লৌকিক বিশ্বাসের এক দুর্দান্ত সমন্বয় দেখা যায়। ‘কুহক-কথন’ বইটিও এর ব্যতিক্রম নয়। লেখক যেভাবে বাস্তব ইতিহাসের সঙ্গে পুরাণের জগত, পিশাচতত্ত্ব, তন্ত্রসাধনা বা নানান ধর্ম-সংক্রান্ত কিংবদন্তিকে মিশিয়ে প্রত্যেকটা গল্প তৈরি করেছেন, তা নিঃসন্দেহে বর্তমান বাংলা হরর বা সাসপেন্স সাহিত্যে এক অনন্য সংযোজন।
সংকলনের প্রতিটি গল্প যেন একটি ছোট্ট টাইম-ট্রাভেল। কখনও আমরা পৌঁছে যাই বৈশালী রাজ্যে, কখনও বা ঘুরে আসি মেসোপটেমিয়- সুমেরীয় সভ্যতার গলি ঘুপচি থেকে। ইতিহাসপাঠ আর অলৌকিক অভিজ্ঞতা একসঙ্গে অনুভব করাতে লেখক যে দক্ষতা দেখিয়েছেন, তা মুগ্ধ করার মতো।
স্যারের লেখা গল্পগুলোর বড় সম্পদ তার 'বিল্ড-আপ'। গল্প শুরু হয় সাধারণ, চেনা বাস্তবতা দিয়ে, তারপর ধীরে ধীরে, নিঃশব্দে, কাহিনির ছায়ায় এক দুর্ভাবনার কুহক ছড়িয়ে পড়ে। ইতিহাসের গভীরে গিয়ে তিনি তুলে আনেন বিস্মৃত দেবতা, কাল্ট, আর পরিত্যক্ত রীতিনীতিকে। এমনভাবে গল্পে এগুলোর বর্ণনা আসে যে মনে হয় সব সত্যি কাহিনী।
এই বইয়ের প্রত্যেকটা গল্পই আমার ভালো লেগেছে। তবে “বংশালের বনলতা” আর “হৃদয়পুর কতদূর” গল্পদুটির কথা আলাদা ভাবে বলতে হয়। দুটো গল্পেরই আদি প্রেক্ষাপট প্রাচীন মেসোপটেমিয়া সভ্যতা। প্রথমটি তার অনবদ্য প্লট এবং মিশ্র আবহে মুগ্ধ করবে পাঠককে, দ্বিতীয়টি বর্তমান আর অতীতের সংলগ্নতায় এক অদ্ভুত আবেশ সৃষ্টি করেছে। এছাড়াও ‘ভুদুয়া জমজম’ এবং ‘অমলকান্তির চাকরি’ গল্প দুটিতেও রয়েছে দারুণ ভাবনাচিন্তা ও হিউমারের মিশেল, যা গল্পে অন্য এক মাত্রা যোগ করেছে। “অমলকান্তির চাকরি” এই গল্পটা আগে পড়া ছিলো, “কালো জাদু” শিরোনামে এটি পড়েছিলাম। এখানে কালো জাদুর অনেক ইতিহাস বর্ণনা করেছেন লেখক।
তবে কিছু গল্প যেমন ‘ইব্রাহিম কাদরির মৃত্যু’ তথ্যের ভারে কিছুটা ক্লান্তিকর ঠেকেছে, যদিও গবেষণার পরিমাণ প্রশংসনীয়। “বজ্রযোগীর প্রত্যাবর্তন” গল্পটাও বেশ লেগেছে। এটি এই সংকলনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গল্প। এই শিরোনামে বৃহৎ আকারের একটি উপন্যাস ও আছে, হয়তো এর পরবর্তি কাহিনী নিয়ে লেখা।
বইয়ের অলংকরণ এবং ছাপার মান অত্যন্ত উন্নত, ওঙ্কারনাথ ভট্টাচার্য দাদার ইলাস্ট্রেশন প্রত্যেকটি গল্পকে আরো আকর্ষনীয় করে তুলেছে। প্রতিটি গল্পের হেডপিছে চিত্রশৈলীর যে ব্যবহার হয়েছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়।
বাংলা সাহিত্যে অতিপ্রাকৃত-ইতিহাসের সমন্বিত ধারাকে যদি এককথায় উপভোগ করতে চান, তাহলে ‘কুহক-কথন’ হতে পারে পাঠকদের জন্য বেস্ট চয়েজ। পাঠ শেষে আপনি কিছু প্রশ্নের উত্তর পাবেন না কিন্তু ঠিক সেই অপূর্ণতা থেকেই জন্ম নেবে কৌতূহল, আর কৌতূহল থেকেই তৈরি হবে নতুন জিজ্ঞাসা। সেটাই তো এক ভালো গল্পের চিহ্ন নাকি?
কুহক কথন নিয়ে কেন জানি রিভিউ লেখা হয়ে ওঠে নি। গল্পগুলোর বেশিরভাগই অন্য কোন সংকলনে আগে পড়া বলেই হয়তো। তন্ত্র এবং হরর ও থ্রিলারের মিশেলে তৈমূর সাহেবের লেখাগুলোয় বিভিন্ন বিষয়ে উনার গভীর জ্ঞানের ছাপ তো আছেই তার উপর প্রত্যেকটি লেখাতেই পুরোনো দিনের কিছু অজানা ইতিহাসও জানতে পারা যায়। আর অলৌকিক গল্প রচনায় আমার জানামতে বাংলাদেশে উনিই সেরা তবু লেখক খুব একটা আলোচিত বা পরিচিত হয়ে ওঠেন নি এটা খুবই অদ্ভুত লাগে। তন্ত্রের ভয়াল দিকটা তার লেখায় বেশি ফুঁটে ওঠে এই বিষয়টা বাদ দিলে তার লেখায় আমি কোন অপছন্দের জায়গা খুঁজে পাই না। উনার সবগুলো বই এখনো আমার পড়ার সুযোগ হয় নি, আশায় আছি পড়া হবে শীগগরিই।
সুলেখক মুহম্মদ আলমগীর তৈমুরের ভৌতিক গল্প সংকলন। একটানে পড়ে শেষ করার মত। বিশেষ করে এত সুক্ষ্মভাবে গল্প বর্ণনা করেছেন, পুরো ঘটনার দৃশ্যপট যেন চোখের সামনে ভেসে উঠে। অদ্ভুত সুন্দর লেখনী আর অজানা ইতিহাসের মেলবন্ধনে বইটি হয়ে উঠেছে সুখপাঠ্য।