কবে যেন একটা পথ শুরু হয়েছিল কোথাও। যে পথটা আজ এই মুহূর্তে এসে মিশে যাচ্ছে আমাদের পরিচিত পথে...
এই পথে বাতিল মানুষেরা যায়। এইখানে সর্বদাই জেগে থাকেন প্রত্যাখ্যানের আশ্চর্য দেবতা। অনেক করে চাওয়ার পরেও, যারা পায় না কিচ্ছুটি - তাদের তিনি পথ দেখান। এগিয়ে চলার পথ। অন্ধকারের দরজা পেরিয়ে, এক অনন্ত সাদা আলোর দিকে...
সামান্য এই বইয়ের ধুলোমলিন কিছু পাতার ওপরে লেগে রইল সেই আলোরই কয়েকটি কণা। শব্দের পরে শব্দ এবং শব্দের মধ্যবর্তী শূন্যতার ভিতরে মিশে রইল অচিন একটা সুর। পাঠকের কাছে অনুরোধ সম্ভব হলে ইয়ারফোন ব্যবহার করবেন।
এই দুনিয়ায় চিরচারিত সব বাইনারির বাইরে সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ কিছু মানুষ থাকে, যারা কোনো প্যাটার্নেই খাপ না খাওয়ার অপারগতা এবং অপদার্থতার লজ্জায় চির ব্যর্থ, ন্যুব্জ স্কন্ধ, ক্লান্ত হৃদয়টা কে টেনে হিঁচড়ে কোনোক্রমে নিয়ে যেতে চায় ফিনিশিং লাইনের ওপারে… এহেন মুখচোরা দুঃখী মানুষের হয়ে কালেভদ্রে কলম ধরেন অর্ঘ্য দীপের মতো কেউ। যাপনহীন একাকী নিঃসঙ্গ জীবনের ক্রমাগত বেঁচে থাকার নিবিড় প্রার্থনায় তিনি লেখেন : "আমাদের নাম নেই এবং প্রণাম নেই কোনও আমরা যে যার মতো হিংসুটে দৈত্য হই লিখে রাখি আনমনে এপিটাফ কখনো কখনো জানলার পাশ থেকে বসন্ত ফিরে যায় ওই… "
কি জানি, কি ছিল সেই মায়াবী হাওয়ায়, যার থেকে একটা রঙচটা মিনিবাসের জানলার ধারের সিটে শুরু হয় একজন একাকী লেখকের জার্নির। "এই শহরের অজস্র মানুষের ভিড়ে আরেকজন মানুষ" মাত্র হিসেবে নিজের পরিচয় দেওয়া লেখক নিজের প্রথম বইতেই প্রার্থনা করে বসেন পৃথিবীর তাবৎ অবুঝ মনকে প্রত্যাখ্যান মেনে নিতে শেখানোর। সেই দাবীর অন্তরালে পুঞ্জীভূত শোক জ্বলে উঠে সেদিন আলোকিত করেছিল আমার মতো অসংখ্য পাঠকের চেতনা। আজ তারই অন্তঃস্থলে এসে দাঁড়িয়েছেন প্রত্যাখানের আশ্চর্য দেবতা, যাঁর কাছে নিভৃতে নিজের সকল দীনতা আহুতি দিয়ে আমরা চেয়ে নিই কোনও এক বিস্মৃত প্রিয়জনেরর ভালো থাকার আশীর্বাদ… অর্ঘ্য দীপের প্রতিটি লেখা আসলে নিজেই এক একটি মিরর অফ আরিশেড, ঘুমহীন রাতে যার প্রতিটি অক্ষর অবয়ব নেয় এক মূর্ত মায়ায়, আর আশ্বাস দিয়ে বলে : " Misfits will take over the world someday. " বেশ কিছু কবিতা, গদ্য এবং অণুগল্প সংকলিত অর্ঘ্য দীপের এই বই আমাদের মতো অযোগ্য ও বেমানানদের উদ্বর্তনের রূপকথা…
নাম : প্রত্যাখ্যানের আশ্চর্য দেবতা লেখক : অর্ঘ্য দীপ প্রকাশনা : বাহার মুদ্রিত মূল্য : ৩২০ টাকা সম্প্রতি প্রত্যাখ্যানের আশ্চর্য দেবতা বইটি পড়া শেষ করলাম। সংক্ষেপে পাঠপ্রতিক্রিয়া লিখছি। প্রত্যাখ্যানের আশ্চর্য দেবতা বইটি অনেকগুলি মুক্তগদ্য এবং কবিতার সংকলন। বইটির খোঁজ পেয়েছিলাম খুব অদ্ভুতভাবে। অফিস থেকে ফেরার সময় ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে একটি ছবি দেখতে পাই যে ছবিতে কিছু মন কেমন করা কয়েকটি কথা লেখা ছিল। বোঝা যাচ্ছিলো যে কোনও বই থেকে ছবিটি তোলা হয়েছে। তারপর ছবির নিচে কমেন্টস পড়ে বইটির নাম এবং প্রকাশনা সংস্থার নাম জানতে পারলাম। বইটি সংগ্রহ করার জন্য বাহার প্রকাশনী সংস্থার প্রকাশক অরিন্দম ঘোষের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। যথাসময়ে বইটি পেলাম এবং খুব মন দিয়ে ধীরে ধীরে লেখাগুলি পড়লাম। লেখাগুলিতে মনখারাপ মিশে আছে। কোথায় যেন রয়ে গেছে কিছু পুরানো স্মৃতি। একটা অদ্ভুত নস্টালজিয়া বারবার ফিরে আসে লেখাগুলির মধ্যে। পড়ন্ত শেষ বিকেলের আলোয় কবিতাগুলি পড়তে পড়তে চোখের কোণে জল আসে। কোথাও যেন খুব অসহায় মনে হয় নিজেকে। একটা অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে ডুবিয়ে দেয় লেখাগুলি। আসলে আমাদের জীবনটাই খুব অদ্ভুত। যা চাই তা বেশিরভাগ সময় পাই না। আর যেটা পাই সেটা হয়তো ভুল করে চেয়ে ফেলি। এই চাওয়া-পাওয়ার সমীকরণ করেই জীবনের অনেকটা সময় কাটিয়ে ফেলি। কিন্তু সব চাওয়া-পাওয়ার যুক্তির সমীকরণ কি মেলে কখনোও?? কোথাও কি মনখারাপ পরে থাকে বিশেষ কারোর জন্য?? সে ফিরে আসবে না, অথবা কোনোদিন তার নম্বর থেকে ফোন আসবে না জেনেও হয়তো অপেক্ষা করি সেই বিশেষ মানুষটার একটা ফোনের জন্য। যা কিছু সুন্দর তাতে কিছু না কিছু আঘাত থাকে। যে পায় সে পায়, বাকিরা সেই আঘাত বুঝতেও পারে না। প্রত্যাখ্যানের আশ্চর্য দেবতা বইটিতে মনের এই বিশেষ অনুভূতিগুলিকে তুলে ধরা হয়েছে। বইটির কবিতাগুলি বারবার পড়লে একটা অদ্ভুত অনুভূতির সৃষ্টি হয় যে অনুভূতি একটা মন কেমন করা নস্টালজিয়া তৈরি করে।