গভীর রাত্রির নিস্তব্ধতা ভেঙে ভেসে আসে কারাের নূপুরধ্বনি। কনকনে হিমেল স্রোত হঠাৎই আমাদের অস্তিত্ব অবধি যেন কাঁপিয়ে দিয়ে নিমেষে হারিয়ে যায় জমাট অন্ধকারের দেশে।। লুকোনাে অতীতের কবর চিরে ফিরে আসতে যেন কেউ আজ বেপরােয়া। জানা-অজানার দুনিয়ার অদৃশ্য পর্দা পার করে ভেসে আসে তার নীরব হাতছানি।। কখনাে এক মরাগাছের ডালের সঙ্গে কোনােরকমে লাট খেয়ে ঝুলতে থাকে কারাের অতৃপ্ত ইচ্ছেটুকুর সাক্ষী হয়ে।। আবার কখনাে বা প্রাচীন কোনাে গ্রন্থের আড়ালে লুকিয়ে থাকা অন্তিম দীর্ঘশ্বাসটুকুর ছোঁয়ায়। বাস্তব-পরাবাস্তবের সীমারেখায় মিলেমিশে এক হয়ে যায় আলাে-আঁধারের গণ্ডি! সেই আলাে-আঁধারিয়া জগতের কিছু না বলা গল্পের সংকলন ‘মরা গাছের দোলনাটা এবং…’।
লেখকের সাথে পরিচয় মিরচি বাংলা মারফত। এই বইয়েরই 'উপরতি' নামক গল্পটির নাট্যরূপ শুনে বইটির প্রতি প্রাথমিক আগ্রহ জাগে। অগত্যা, সংগ্রহ করা এবং আজকের এই কয়েক ঘন্টার সাহচর্য। ভয়ের গল্পের প্রতি আমি বরাবরই দুর্বল, তার ওপরে লেখক যদি নিজেই জর ফিকশনের পাঠক/ভক্ত হয়ে থাকেন, তাহলে সংকলনের প্রতি আশা বাড়ে বই কমে না। সেই নিরিখে 'দি ক্যাফে টেবল' বইটির পরিবেশনায় খামতি রাখেনি। ভালো লাগে স্বর্ণাভ বেরার করা নীলাভ প্রচ্ছদখানিও। অলংকরণ বর্জিত ক্ষীণতনু পেপারব্যাকটিতে পাবেন লেখকের ভূমিকা বাদে পাঁচটি নানান সাইজের অলৌকিক গল্প।
বইয়ের প্রথম কাহিনী, 'মাতাল রঙ্গেতে', সম্বভত বইয়ের সবচেয়ে অভিনব গল্প। গল্পটি পড়ে আবিষ্কার করবেন সুকুমার রায়ের আপাত অর্থে নিরীহ ননসেন্স পৃথিবীর এক নিকষ ভয়াল প্রতিরূপ। ভালো লাগে, গল্পটির আবছায়া ধোঁয়াটে পরিণতি, যা উৎসাহী পাঠকের কাছে পৌঁছে দেয় একগুচ্ছ ভাবনার খোরাক। সংকলনের নাম-গল্প তথা দ্বিতীয় কাহিনী, 'মরা গাছের দোলনাটা', বইয়ের দুর্বলতম হওয়ার দাবি রাখে। চেনা ঘরানার একঘেঁয়ে শিশুতোষ হরর। গড়পরতা পরিণতি এবং বর্ণনার অতিমারী গল্পটিকে অচিরেই ডোবায়। হতাশ মন বলে ওঠে, বইতে এটিকে স্থান না দিলেই ভালো হতো।
অবশ্য এরপরেই পাঠকের হাতে বইয়ের সেরা দুটো গল্প তুলে দিয়েছেন লেখক। পূর্ব উল্লেখিত 'উপরতি' গল্পটিতে হেটেছেন দুটো ভিন্ন সময় সরণী দিয়ে। মিশিয়েছেন অভিশাপ ও ভক্তিরসের ভয়াল সংমিশ্রন। অভিশপ্ত এক রাজবাড়ী ঘিরে দুর্ভাগ্যের গহীন করালগ্রাস, ছায়া ঘনিয়ে আসে এক আসন্ন আনন্দৎসবের ওপর! আফসোস হয়, গল্প এবং রাজপ্রাসাদ দুটোকেই আরেকটু বিস্তৃত গথিক ছায়ায় রচলেন না কেনো লেখক। পারলে গপ্পোটিকে অডিওতে শুনে দেখুন। বিশেষত মীরাবাইয়ের ভজন সমৃদ্ধ অংশটুকু! হলফ করে বলছি, পাঠ অভিজ্ঞতা এক নিমেষে অনেকাংশ বৃদ্ধি পাবে।
ঠিক এর পরেই পাবেন বইয়ের শ্রেষ্ঠ কাহিনী, 'সম্ভভামি যুগে যুগে'। গল্পটিতে আমরা পাই লেখকের সবচেয়ে পরিণত স্বত্তা। তার পরিমিত লেখনী ছুঁয়ে যায় প্রকৃত মানবিক ও পরলৌকিক হররের সীমারেখা। লোভ, পাপ ও ঘৃণার মনস্তাত্বিক দ্বৈরথের সাথে অবলীলায় মিশিয়ে দেন মহাভারতের মূল্যবোধ। কোথাও গিয়ে যেন, 'তারকাটা পাঠক' নামক অমন অদ্ভুত চরিত্রটি, নীল গেইমান-কৃত কোনো এক্সেন্ট্রিক চরিত্রের কথা মনে করিয়ে দিলেও দেয়। সত্যিই ভালো লাগে সবটা। মনে ধাক্কা দেয় শেষপাতে মুকসুদ্ধি-ন্যায় অমন চমকপ্রদ পরিণতি!
বইয়ের অন্তিম কাহিনী, 'অন্ধকারের উৎস হতে...' আদতে এক পরোপকারী যুবকের গল্প। বৃষ্টি ভেজা এক দুর্যোগের বিকেলে, সে প্রাণ বাঁচায় এক ভয়ার্ত তরুণীর, এবং জড়িয়ে পরে এক বিভীষিকাময় বাস্তবে! লেখক গল্পের সূচনা ভালোই করেছিলেন, তবে শেষটায় গিয়ে অমন ঠাকুমার ঝুলি মার্কা পরিণতি অবলম্বন করলেন দেখে হতাশ হলাম। অতিকথনে নিমজ্জিত গল্পটি শেষ খাতে মন ভরাতে পারলো না একেবারেই।
যাই হোক, ভবিষ্যতে লেখকের কাছ থেকে আরো ভালো কিছু ভয়ের গল্প উপহার পাবো এই আশা রইল। হয়তো পরবর্তী গল্পগুলোতে, লেখক আরো পরিণত হস্তে তুলে ধরবেন মানব মনের ধূসর দিকগুলো। তার মূল চরিত্ররা হবে আরো বাঁকা পথের পথিক, বিচরণ করবে সাদা-কালো দুনিয়ার বাইরে এক পরিচিত ধূসর বলয়ে। লেখক হিসেবে সক্রিয়ভাবে বিরত থাকবেন অতিসরলীকরণ হতে। পাঠক হিসেবে এটুকু আশা করলে, ক্ষতি কি?
এই ক্ষীণতনু বইয়ে 'ভূমিকা' বাদে আছে পাঁচটি অলৌকিক কাহিনি। তারা হল~ ১. মাতাল রঙ্গেতে; ২. মরা গাছের দোলনাটা; ৩. উপরতি; ৪. সম্ভবামি যুগে যুগে; ৫. অন্ধকারের উৎস হতে... বইয়ের সেরা লেখা নিঃসন্দেহে প্রথমটি। এতে লেখনীর মুনশিয়ানায় সুকুমারের চিরসবুজ ননসেন্স রাইম হঠাৎই দেখা দেয় গভীর আতঙ্কের কারণ হয়ে। ইনফ্যাক্ট এই গল্পটি পড়ার পর 'আবোল তাবোল' একেবারেই অন্য চেহারায় দেখা দিতে বাধ্য। বাকি লেখাগুলো সুখপাঠ্য। তবে অতিকথনের গুরুদোষ এই লেখাগুলোর বক্তব্যকে অলংকারের তলায় একেবারে চাপা দিয়ে দিয়েছে। শুধু "সম্ভবামি যুগে যুগে" সুপারন্যাচারাল হররের আলঙ্কারিক বিবরণ ও বাহুল্য বর্জন করে মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েনকে গুরুত্ব দিয়েছে বলেই আমার কাছে সেটি আলাদা সম্ভ্রম আদায় করে নিল। অলৌকিক কাহিনির অনুরাগীরা এই বইটিকে পছন্দ করবেন বলেই আমার অনুমান।
ভয়ের গল্প বরাবরই পাঠকের চিরকালীন আকর্ষণ। আর যদি লেখক নিজেই "জর ফিকশন" ঘরানার ভক্ত হন, তবে আশা খানিকটা বেশিই জাগে। মিথিল ভট্টাচার্য্যর লেখা মরা গাছের দোলনাটা এবং... সংকলন সেই প্রত্যাশা পূরণে পুরোপুরি সফল না হলেও, কিছু কিছু জায়গায় বেশ খানিকটা সাহসী ও দৃষ্টান্তমূলক হয়ে ওঠে। অলংকরণহীন ক্ষীণতনু পেপারব্যাক সংস্করণটি দ্য ক্যাফে টেবল প্রকাশনীর পরিচ্ছন্ন পরিবেশনায় উপস্থাপিত হয়েছে, যার নীলাভ প্রচ্ছদ করেছেন স্বর্ণাভ বেরা—একটি চমৎকার নান্দনিক ছোঁয়া।
বইয়ের প্রথম গল্প, ‘মাতাল রঙ্গেতে’, সন্দেহ নেই এই সংকলনের সবচেয়ে অভিনব রচনা। সুকুমার রায়ের ননসেন্স রাইম ব্যবহার করে এক অজানা ভয় ও বিমূর্ত আতঙ্কের প্রতিরূপ নির্মাণে লেখকের মুন্সিয়ানা স্পষ্ট। গল্পের ধোঁয়াটে, কুয়াশাচ্ছন্ন পরিণতি পাঠকের চিন্তার খোরাক জোগায়, এবং যথার্থভাবেই অলৌকিক গল্পের ঘরানায় নিজস্ব স্বাক্ষর রাখে। এটি নিঃসন্দেহে বইটির সর্বাপেক্ষা স্মরণীয় কাহিনি।
দ্বিতীয় গল্প, ‘মরা গাছের দোলনাটা’, যদিও বইটির নামকাহিনি, তা আশানুরূপ হয়নি। চেনা ছাঁদের একটি শিশুতোষ ভৌতিক কাহিনি—অতিচেনা বাঁকে ঘোরে, অতিরিক্ত বর্ণনা ও অপ্রয়োজনীয় নাটুকে আবহে গল্পের প্রাণ দুর্বল হয়ে পড়ে। একটি তীব্র গল্পের সংকলনে এটি যেন কিছুটা ফ্ল্যাট ফুটনোটের মতোই।
তবে এরপরেই আসে জোড়া ধাক্কা। ‘উপরতি’ গল্পটি, যার নাট্যরূপ আগেই শোনা ছিল, লেখক পাঠককে নিয়ে যান এক যুগল টাইমলাইনে, যেখানে অভিশাপ, অপার বিষাদ এবং ভক্তির গাম্ভীর্য মিলে গড়ে তোলে এক গা ছমছমে অভিজ্ঞতা। রাজবাড়ির ছায়ায় ঢেকে থাকা করাল ইতিহাস, এক আধুনিক বিয়ের ছুতোয় আবার সামনে আসে। গল্পের গন্ধে মীরাবাইয়ের ভজনের রেশ; শব্দ ও সুরের অপার্থিব গাঁথনি নিঃসন্দেহে সাহিত্যিক অর্জন।
এরপরেই আসে সংকলনের শ্রেষ্ঠ কাহিনী, ‘সম্ভবামি যুগে যুগে’। লেখক এখানে হয়ে ওঠেন সম্পূর্ণ পরিণত ও সংবেদনশীল। মানবিক ও মনস্তাত্ত্বিক হররের এক অপূর্ব মিশ্রণে লোভ, অহং, অনুশোচনা আর মহাভারতের দর্শন রূপ পায়। চরিত্র ‘তারকাটা পাঠক’-এর মধ্যে এক আশ্চর্য বহুমাত্রিকতা গড়ে ওঠে, যা এক এক্সেন্ট্রিক, অথচ ভীষণ বিশ্বাসযোগ্য অস্তিত্বের দিকে ইঙ্গিত দেয়। গল্পের সমাপ্তিতে এসে যে মোক্ষম বাঁক, তা পাঠকের মনে গভীর রেখা কেটে যায়।
শেষ গল্প, ‘অন্ধকারের উৎস হতে...’, একটি আশাবাদী প্রতিশ্রুতি নিয়ে শুরু হলেও, লেখক শেষমেশ গিয়ে যেন ফসকে যান। গল্পের সূচনা যতটা পাকা ও পরিব্যাপ্ত, পরিণতি ততটাই ঠাকুমার ঝুলিমার্কা। একরকম বেখাপ্পা নরম বালিশে মুখ গুঁজে গল্পটি ঝিমিয়ে পড়ে।
তবুও, এ সংকলনের পড়া শেষ করে একরকম রয়ে যায় কিছু আশা। ভবিষ্যতে লেখক যদি আরো সাহস নিয়ে মানুষের গূঢ় মনস্তত্ত্ব, নৈ���িক দোদুল্যমানতা আর ধূসর সীমানায় বিচরণকারী চরিত্রদের বেশি তুলে ধরেন—যারা সোজা পথে হাঁটে না, কিন্তু ভেতরে সৎ—তবে বাংলা অলৌকিক গল্পের জগতে তাঁর নাম স্থায়ী হয়ে উঠতে পারে। সহজীকরণের ফাঁদে না পড়ে, তিনি যদি ওই "ধোঁয়াটে" ও "অনিশ্চিত"-এর কুহক ধরে রাখেন, তবে অনেক দূর যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই বই এক ঝলক আলো, যেখানে কিছুটা ছায়া থেকেও জন্ম নেয় সাহসী ভাবনার বীজ।
🪄মিথিল দার ❝উপরতি❞ বহুদিন আগে শুনেছিলাম মিরচিতে। শুনতে তো অসাধারণ লেগেছিল। তখন থেকে ইচ্ছা ছিল ওঁর লেখা পড়ার।কিন্তু এতদিন কেটে গেল এই বই পড়তে। ✴️ না দেরি করে শুরু করা যাক,এর ছোট্ট আলোচনা। ♦️ এটি এটি একটি কাহিনী সংকলন।
🔹১.মাতাল রঙ্গেতে:-তুষার বাবু অর্ডারটা ক্যান্সেল করতে বলেন সুমনকে।সুমন জোরাজোরি করলেও তাকে ধমক দিয়েই সে ঠিকানায় যেতে বারণ করা হয়।কি এমন রয়েছে যার জন্য তাকে ধমক খেতে হল?এর পিছনে লুকিয়ে কোন অতীত?
২.মরা গাছের দোলনাটা:-ঋজু,শুভ দুইজন একেবারে পরম মিত্র।ওরা টিউশন পরে তিয়াসদির কাছে।যাতায়াতের পথে একটি বাড়ি তাতে বিশাল গেটে তালা ঝুলছে। সেখানে একটি ছেলে দোলনায় দোল খেত।একদিন ছেলেটি ওদের সামনে তীব্র আক্রোশে গেটে সজোরে আঘাত হানতে থাকে। কি এমন হল? ছেলেটি কি বিকারগ্রস্ত? এই গল্পটি পড়তে গিয়ে চোখ থেকে জলের ধারা বেরিয়ে এসেছিল।
৩.উপরতি:-পৌষালী আমেরিকা থেকে ছুটে এসেছে তার ভিটেবাড়িতে, বাবা মাকে এক রকম জোর করেই।তাদের বারণ গ্রাহ্য না করে এখানেই বিয়ে করার চিন্তাভাবনা নিয়েছে সে।কিন্তু,এই বাড়িতে পা রাখার পর থেকে কেমন একটা অন্য অনুভূতি গ্রাস করেছে তাকে। লুকিয়ে আছে ঐতিহাসিক কাহিনী।সেই কাহিনী কী?এই কাহিনী পড়ার জন্যই তো বইটা নেওয়া। শুনে যেরকম অভিভূত হয়েছিলাম পরেও আবার বিস্মিত হলাম,সত্যিই অনবদ্য লেখা।
৪.সম্ভবামী যুগে যুগে:-বহুদিন পর অচিন্ত্যবাবুর সাথে দেখা করতে এলো বিহান।ইনি চিরকালই বিহানকে টানেন। সাইকোলজিস্টের পাশাপাশি তার ঝুলিতে রয়েছে অসংখ্য গল্পের ভান্ডার। সেই ভান্ডার থেকেই এক কাহিনী শোনাতে থাকেন তিনি। এক ভয়াল কাহিনী! বাকিটা জানতে পড়তে হবে গল্পটি। বেশ লেগেছে এটি 😌।
৫.অন্ধকারের উৎস হতে:-বহুদিন পর বৃষ্টি দেখতে পেয়ে যেন ময়ূখ স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে উঠেছে।মেইন রোডের আলোটার দিকে এগোতেই সে শুনতে পেল এক নারী কন্ঠ যেন সাহায্য চাইছে।তারপর গলিটা থেকে বেরিয়ে সে ময়ূখের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। আলুথালু তার বেশ,যেন বেশ সন্ত্রস্ত। কিসের এত ভয়?এই গল্পটি অনেক কিছু শিক্ষা দিয়ে যায়। সব থেকে ভালো লেগেছে এই গল্পটি। কিছু কিছু অংশ আমাদের বাস্তব জীবনে ঘটে চলা জীবনচক্রকে তুলে ধরে।।
📌 আমার এই বইতে ভালো লাগা বেশ কিছু অংশ গ্লিম্পস হিসাবে তুলে ধরলাম নিচের ছবিগুলিতে।বইটার মধ্যে দু-একটি মুদ্রণ প্রমাদ ছাড়া আর কোন অসুবিধা পাইনি। প্রচ্ছদটি সুন্দর ভাবে এঁকেছেন শিল্পী স্বর্ণাভ বেরা,যা বেশ মানানসই।