ভ্রমণ পছন্দ করেন? পছন্দ করেন ইতিহাস আর পুরাণের বাঁকে বাঁকে ঘুরে বেড়াতে? তবে এই বইটি আপনার জন্যেই। এই ভ্রমণ সাহিত্যে আপনি পুণ্ড্রনগরীর সাথে জড়িত ঐতিহাসিক স্থানগুলোতে ঘুরে বেড়াবেন লেখকের সাথে। মাঝে মাঝে তন্ময় হয়ে শুনবেন ঐসব স্থানের সাথে জড়িত পুরাণগুলো, তাদের সত্যিকার ইতিহাসগুলো। এরপর নিজেই বুঝে নেবেন সেই ইতিহাসের কতটুকু গ্রহণযোগ্য আর কতটুকু নয়। ভ্রমণের পাশাপাশি এই বইতে আপনি জানতে পারবেন মাহিসাওয়ারের কিংবদন্তি, বেহুলা-লখিন্দরের কাহিনি, মনসা আর ওঝা ধন্বন্তরির দ্বৈরথ, কমলা সুন্দরীর গল্প, গরুড় আখ্যানসহ আরো অনেকগুলো চমৎকার মিথ কিংবা কিংবদন্তি সম্পর্কে৷ পৃথিবীর প্রত্যেকটি স্থানই একেকটি স্মৃতির আধার, ইতিহাস আর পুরাণের বাহক। চমৎকার সব ঐতিহাসিক স্থান ঘুরে ঘুরে তাদের গল্পগুলো শোনার আমন্ত্রণ রইলো।
ভ্রমণ আর ইতিহাসের যুগলবন্দী- ফ্ল্যাপের এমন ভাষ্য, চমৎকার প্রচ্ছদ আর আগ্রহজাগানিয়া বিষয়বস্তু দেখে বইটা অনলাইনে কিনি। কিন্তু দুঃখের বিষয়, হতাশ হয়েছি। ভ্রমণ-ইতিহাস-কিংবদন্তী এবং গল্প, এই প্রতিটা বিষয়কে কলমের আঁচড়ে পাঠকের কাছে উপস্থাপনের জন্য যে পরিমাণ মুন্সীয়ানা এবং সাবলীল লেখনশৈলীর দরকার, তার ঘাটতি আছে বলেই আমার ব্যক্তিগত মতামত। আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কী লিখব কী লিখব না, সেটা বিষয়ের সাথে যায় কিনা, সাবলীলতা মানেই হালকা ধাঁচের লেখা না, আর হালকা ধাঁচের লেখা মানেই আরোপিত হাস্যরস না, এটুকু বোঝার ক্ষমতা থাকা খুব জরুরি। কিংবদন্তীকে সহজভাবে উপস্থাপন করতে গিয়ে লেখক বারকয়েকই সর্বনামের ব্যবহারে গণ্ডগোল করেছেন, কিছু কিছু মুদ্রণ প্রমাদও নজরে এসেছে৷ এমনিতে বইটির বাঁধাই, কাগজ, প্রচ্ছদ লাজওয়াব। পড়তে কষ্ট হয় না৷ বিষয়বস্তুও ভালো কিন্তু উপস্থাপনেই একটু গণ্ডগোল। মহাস্থানগড় ভ্রমণ অভিজ্ঞতার পাশাপাশি বেহুলা, মনসা, ধন্বন্তরি ওঝা, পুণ্ড্ররাজ প্রভৃতি নানান গল্প এবং কল্পকথা এসেছে। স্থানীয় বিখ্যাত জিনিস যেমন বগুড়ার দই এর প্রসঙ্গ এসেছে। এসেছে চণ্ডীমঙ্গল, মনসামঙ্গল, মহাভারত, কৈবর্ত বিদ্রোহের কথা। ইতিহাসে নবিশ পাঠকদের এই বই আরো ভালো লাগবে। যারা কিছুটা জানেন, তাদের অনেকটুকুই আসলে আগেই জানা থাকবে৷ তবে জানা জিনিসও পড়তে খারাপ লাগে না যদি লেখার গভীরতা থাকে৷ এখানে সেই বিষয়েরই প্রবল অভাব অনুভূত হয়েছে আমার কাছে। তবুও কারো বিষয়বস্তু সম্পর্কে আগ্রহ থাকলে পড়ে দেখতে পারেন৷
কর মানে হাত আর তোয়া মানে জল। পৌরাণিক মতে, মহাদেবের হাত ধোয়া জল থেকে জন্ম হয় বলে নদীর নাম হয় করতোয়া। এই করতোয়ার তীরেই গড়ে উঠা এক রাজ্যে মিলে যায় বৌদ্ধধর্মের অনেক অনেক পুরাতন স্মৃতিচিহ্ন,কালের খেয়ালে যা চলে গিয়েছিল একসময় লোকচক্ষুর আড়ালে। এতক্ষণে নিশ্চয় বুঝে গেছেন কীসের কথা বলছি। হ্যাঁ, বগুড়ার মহাস্থানগড়, ইতিহাসবিদদের কাছেও যা এখনো অনেক অজানা তথ্যের ভাণ্ডার।সাধারণের কাছে যদিও তা মাটির ঢিপি ছাড়া বিশেষ কিছুই নয়। পড়লাম আশিক সারোয়ারের লিখা "পুণ্ড্রবর্ধনের স্মৃতিকথা"। নাম শুনে মনে হতে পারে বইটা প্রাচীন আমলের কোনো গল্পকে উপজীব্য করে লিখা। তবে এই মনে হবার মাঝে বেশ খনিকটা সত্য আছে। লেখকের মতে করোনা মহামারীর সময়ে লেখক স্মৃতির পাতা হাতড়ে তার বগুড়া ভ্রমণের অভিজ্ঞতা দুই মলাটে বন্দীর চেষ্টা করেছেন। তবে এই বইকে গোবেচারা ভ্রমণকাহিনী না করে লেখক জুড়ে দিয়েছেন মহাস্থানগড় ও তার আশে পাশের এলাকায় আবিষ্কৃত হওয়া ঢিবি ও জায়গাগুলোকে নিয়ে লোকমুখে চলতে থাকা বিভিন্ন লোককথা, ইন্টারনেট থেকে নেয়া বেশ কিছু তথ্য। সেই সাথে পুরো বইটাকে ছোট ছোট অধ্যায়ে ভাগ করে দিয়েছেন যাতে প্রাচীন মহাস্থানগড়ের খাঁ খাঁ নিস্তব্ধতায় পাঠক হারিয়ে না যায়। "ভ্রমণ তোমাকে বাকরুদ্ধ করে দেবে, এরপর গল্প বলাতে বাধ্য করবে" - ইবনে বতুতা এই কথার পিঠে আমার মনে হয় নিজে ঘুরলেই যে বাকরুদ্ধ হবে তা নয়। অন্যের ভ্রমণের গল্প শুনেও বাকরুদ্ধ হওয়া যায়। লেখক যদি বইজুড়ে তার যাওয়া-আসা, দেখার গল বলতেন তাহলে বোধহয় এতটা উপভোগ্য হতো না। যদিও এসব লোককথার অনেক কিছুই অনেকের জানা। তারপরও বগুড়ার পথে ঘুরুতে ঘুরতে এসব গল্প নেহাত মন্দ হয়নি। এতে করে বইটা পুরোপুরি ফিকশন গোত্রও এড়াতে পারলো আবার নন-ফিকশন হওয়া থেকেও বেঁচে গেল। তবে লেখকের লেখনীতে অপরিপক্কতার ছাপ গল্প বলার ধরণে বুঝা গেছে। মুখে বলার সময় অনেক রকম বলা যায়,সেসব শুনতে শ্রুতিকটুও লাগে না। কিন্তু লেখার সময় তেমন লিখলে লিখা পড়া শান্তি পাওয়া যায় না। লেখক তার ভ্রমণকে পাঠকের কাছে উপভোগ্য করার যথাসাধ্য চেষ্টা করলেও আমার মনে হয়েছে তিনি অনেক অতিরিক্ত শব্দ যোগ করেছেন। এতে মাঝে মাঝে পড়তে ভালো লাগেনি। সবশেষে বইয়ের প্রোডাকশন দারুণ ভাল হয়েছে। বইটা হাতে নিয়েই একটা শান্তি লাগে। যারা ঘুরতে ভালোবাসেন কিন্তু আমার মতো পকেট মাঝে মাঝেই হাত ছেড়ে দেয় তারা পড়ে দেখতে পারেন। যারা ঘুরাঘুরি করেন না তাদেরও খারাপ লাগবে না।
বাংলার পথে পথে ছড়িয়ে আছে নানা ইতিহাস নানা সংস্কৃতি। এই ইতিহাস সংস্কৃতির কয়টাই বা আমরা জানি। পুন্ড্রবর্ধনের স্মৃতিকথা এমনই এক বই যা আপনাকে ঘুরাবে ইতিহাস এবং পুরানের বাকে বাকে। বগুরা শহরের অলিগলিতে যে ইতিহাস ছড়িয়ে আছে তা লেখক তুলে ধরেছেন নিজের ভ্রমণ অভিজ্ঞতার সংমিশ্রণে। মাহিসাওয়ারের কিংবদন্তি থেকে কমলা সুন্দরী, বেহুলা-লখিন্দর কেউই বাদ পড়ে নাই এখান থেকে। ইতিহাসের বাকে বাকে ঘুরার সাথে কিছু ঐতিহ্যবাহী খাবার কিংবা যাযাবরের মত এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় চলে যাওয়া সবই ছিলো স্বপ্নের মতো। ভ্রমন ভালো লাগে এমন যে কারো কাছে এই বইটি হবে একটি রত্ন।
ভ্রমন পচ্ছন্দ করেন? পচ্ছন্দ করেন ইতিহাস আর পুরাণের বাঁকে বাঁকে ঘুরে বেড়াতে? তবে এই বইটি আপনার জন্যই। ফ্ল্যাপের এই লেখাটা দিয়েই বইটা সম্পর্কে ধারনা পাওয়া যায়, বলছি আশিক সারওয়ার রচিত ভ্রমন বিষয়ক বই "পুন্ড্রবর্ধনের স্মৃতিকথা"। ভ্রমন ঘরনার বই তেমন পড়া হয় নি, তখন বন্ধু সাজেস্ট করলো এই বইটি পড়ে দেখ। কিন্তু মনে হচ্ছিল ট্রাভেলিং বই মানে কি কটমটে তথ্য আর বর্ননা না? পড়ে কি আসলেই ঘুরে আসার ফিল বা ঘুরতে যাওয়ার মতো আগ্রহ হবে? এইসব দ্বিধাদ্বন্দ্ব নিয়ে শুরু করেছিলাম বইটি। শুরু করেই দেখি অর্ধেক পড়া শেষ কখন যেনো! আমার আপনার মতো একজন ভ্রমন পিয়াসী মানুষের পুন্ড্রনগরে ঘুরে বেড়ানো, তার ভাষায় সেখানের ইতিহাসের বিভিন্ন গল্পের ধারাবর্ননা, মনে হবে যেন ক্যাম্প-ফায়ারের ধারে বসে গল্প শুনছি। ঐতিহাসিক জায়গাগুলোর সাথে কিংবদন্তির গল্প, পুরানের কাহিনী, লোককাহিনী এমন ভাবে রিলেট করেছেন লেখক যে এতে বইয়ে উল্লেখিত জায়গা গুলো নিজে যেয়ে দেখার প্রচন্ড ইচ্ছা হয়েছে আমার। বইটা পড়া শেষ হতেই ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম, মনে হচ্ছে গল্প ফুরায়নি এখনো। ভাই বললেন, রসো বাছা শীঘ্রই আসছে। বগুড়া জেলার পথে প্রান্তরে ঘুরে আসুন বইটির সাথে, কথা দিচ্ছি হতাশ হবে না।