প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্পদ পণ্ডিত বিষ্ণুশর্মা রচিত পঞ্চতন্ত্রের খ্যাতি জগতজোড়া। গ্রীক, জার্মান, ইতালীয়, ফরাসী, ইংরাজী, স্পেনীয়, সিরীয় প্রভৃতি সহ পৃথিবীর প্রধান পঞ্চাশটিরও বেশি ভাষায় পঞ্চতন্ত্রের অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এমনকি পূর্ব আফ্রিকায় সোয়াহিলি ভাষাতেও পঞ্চতন্ত্রের গল্পের সন্ধান পাওয়া যায়। জনসমাজে এই গ্রন্থের প্রভাবও অতি ব্যাপক। পাশ্চাত্য পণ্ডিতদের মতে, বাইবেলের পরেই পঞ্চতন্ত্রের স্থান।
পঞ্চতন্ত্রের এই ব্যাপক জনপ্রিয়তা থেকেই তার উপযোগিতার প্রমাণ মেলে। বস্তুতঃ পঞ্চতন্ত্রের গল্পগুলির মূল সত্য জগৎ ও জীবন থেকে আহৃত বলেই, বাস্তবতার প্রয়োজনেই দেশে দেশে সসমাদরে গৃহীত হয়ে চলেছে। পঞ্চতন্ত্র কালজয়ী, জগত্জয়ী এক অসাধারণ গ্রন্থ।
পৃথিবীময় রাজসমারোহে সমাদৃত পঞ্চতন্ত্র কবে রচিত হয়েছিল, রচয়িতা বিষ্ণুশর্মার পরিচয়ই বা কী, এসব প্রশ্নের সঠিক উত্তর মেলে না। অনুমান করা হয়, খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীর কোনও এক সময়ে মূল পঞ্চতন্ত্র লিখিত হয়েছিল। সেই মূল রচনা অনেককাল আগেই হারিয়ে গেছে।
লুপ্ত পঞ্চতন্ত্রের ভিত্তিতে রচিত পরবর্তীকালের বিভিন্ন গ্রন্থের অনুবাদ সেই সুদূর অতীতেই পার্শ্ববর্তী নানা দেশে প্রচারিত হয়ে পড়ে। উদাহরণ হিসাবে নাম করা চলে, পহ্লবী অনুবাদ, সিরীয় ও আরবী অনুবাদ। এই অনুবাদ পরম্পরা কালক্রমে ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীর দেশে দেশে।
যাই হোক, বর্তমানে যে পঞ্চতন্ত্রের সঙ্গে আমরা পরিচিত, তা নবম থেকে একাদশ শতাব্দীর মধ্যে কোনও জৈন লেখকের হাতে রূপ পায় বলে আধুনিক পণ্ডিতসমাজ মনে করেন।
জৈনসাধু পূর্ণভদ্র সুরিকৃত পঞ্চাখ্যানক গ্রন্থই অনূদিত হয়ে ভারতীয় প্রাচীন ও আধুনিক বিভিন্ন ভাষার সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। মূল পঞ্চতন্ত্রের লেখক যিনিই হোন না কেন, তার রচনার প্রসাদগুণ ও সরসতা এমনই যে যুগ যুগ ধরে তা আবালবৃদ্ধবণিতা সমানভাবে উপভোগ করে চলেছে। কালজয়ী মহাগ্রন্থ রামায়ণ কিংবা মহাভারত যেভাবে ভারতীয় সাহিত্যকে নানাভাবে সমৃদ্ধ ও রসসিক্ত করে চলেছে, তেমনি বলা চলে, ভারতীয় শিশু-কিশোর ও বয়স্ক সাহিত্যেরও উর্বরতা দানে পঞ্চতন্ত্রের অবদানও সামান্য নয়।
পঞ্চতন্ত্রের শুরুতেই পাওয়া যায়, বিষ্ণুশর্মা নামে জনৈক ভূয়োদর্শী পণ্ডিত লেখক তার সারাজীবনের পাণ্ডিত্য ও প্রজ্ঞা নিয়ে রাজপুত্রদের অল্পসময়ে নানা শাস্ত্রে পারদর্শী করে তুলবার প্রয়োজনে পঞ্চতন্ত্রের গল্পগুলি রচনা করেছেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গল্পের পাত্রপাত্রী রাখা হয়েছে পশু ও পাখিদের। কিন্তু তাদের চাল-চলন, চরিত্র ব্যবহারে বিচিত্র মানুষের চিরকালের স্বভাবধর্মই প্রকাশ পেয়েছে। বস্তুতঃ পশু পাখির আড়ালে লেখক মানুষ, তার সমাজ তথা জগতের একটি পূর্ণাঙ্গ পরিচয় অসাধারণ রচনাকুশলতায় সহজ ভঙ্গিতে ফুটিয়ে তুলেছেন।
গল্পের বুননে সকৌতুক উঁঙ্গি, অথচ তার সার সত্য চিরকালীন— জগৎ জীবনের এক অসাধারণ দর্পণ যেন।
আসলে এই অশীতিপর বৃদ্ধ পণ্ডিত বিষ্ণুশর্মা কোনও অসাধারণ লেখকের কল্পনা প্রসূত নাম অথবা সত্যিকার চরিত্র তা নিশ্চয় করে বলার উপায় নেই। তিনি যেই হোন না কেন, সংসারের কণ্টকময় পথে নিরাপদে চলার উপযোগী বিচিত্র অভিজ্ঞতার দুর্লভ জ্ঞান-সঞ্চয় তিনি প্রতিটি মানুষের জন্য রেখে গেছেন, যা আমাদের চিরকালের পাথেয় স্বরূপ হয়ে আছে। তাই সমগ্র মানবজাতিই তাঁর কাছে ঋণী।
তবে একথাও সত্যি যে, পঞ্চতন্ত্রের গল্পগুলি কোনও একজন লেখকের রচিত নয়। অনেক গল্পের বীজ পাওয়া যায় প্রাচীন জাতক-কাহিনীর মধ্যে। পণ্ডিতদের অনুমান, কিছু গল্প প্রচলিত প্রাচীন লোককথা থেকেও সংগৃহীত হয়েছে।
গল্পের কাঠামো যেখান থেকেই আহরণ করা হোক না কেন, কোনও অসাধারণ প্রতিভাধর লেখকের হাতেই যে সেগুলো সঞ্জীবিত হয়েছে ও চিরায়ত রূপ লাভ করেছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
বর্তমান গ্রন্থে মূল পঞ্চতন্ত্রের গল্পগুলি স্বাদ গন্ধ বজায় রেখে অবিকৃতভাবে পরিবেশনের চেষ্টা হয়েছে। শিশু-কিশোরদের পক্ষে দুষ্পাচ্য ও গুরুপাক বিবেচনায় গুটিকতক ভিন্ন রসের গল্প বর্জন করা সমীচীন মনে করেছি। এতে গ্রন্থের অন্তর্নিহিত।
সুরের কোনওভাবে অঙ্গহানী ঘটেছে মনে করার কারণ নেই। বরং এই ব্যবচ্ছেদ পাঠকদের পক্ষে হিতকর ও পুষ্টিদায়ক বলেই আমরা মনে করেছি।
ইতিপূর্বে বাংলা ভাষায় পঞ্চতন্ত্রের অসংখ্য সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। তার অনেকগুলিই বর্তমানে বাজারে প্রচলিত রয়েছে। উল্লেখ করার বিষয় হল, এসব বইয়ের কোনওটিতেই মূল গ্রন্থের মহামূল্যবান সুভাষিত তথা হিতবচন সংযোজিত হয়নি। ফলে পঞ্চতন্ত্রের গল্প নামে পরিবেশিত হলেও প্রতিটি বইই রয়েছে অসম্পূর্ণ এবং মূল পঞ্চতন্ত্রের ঘটেছে অঙ্গহানি। অনুতাপের বিষয়, বাংলা ভাষার সুকুমারমতি পাঠককুলকে এতাবৎকাল এই অসম্পূর্ণ পঞ্চতন্ত্র নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে।
বর্তমান নির্মল সংস্করণে আমরা পঞ্চতন্ত্রের এই অসম্পূর্ণতা পরিপূরণের যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি। সেই বিবেচনায় বাজার চলতি পঞ্চতন্ত্রের সমৃদয় সংস্করণের মধ্যে এটিকেই একমাত্র পূর্ণাঙ্গ ও সম্পূর্ণ পঞ্চতন্ত্র বলা যেতে পারে। আমরা হিতবচন সমূহ গুচ্ছাকারে প্রতিটি তন্ত্রের ভাঁজে ভাঁজে স্থান করে দিয়েছি যাতে গল্পের রসাস্বাদনের পাশাপাশি তার অন্তর্নিহিত সত্যের সঙ্গেও পাঠকদের সম্যক পরিচয় ঘটে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, জ্ঞানতাপস বিষ্ণুশর্মা তাঁর গল্পের মাধ্যমে রাজপুত্রদের যে শিক্ষা দিতে চেয়েছিলেন, তা নিহিত রয়েছে এইসব সুভাষিতর মধ্যেই।
চিরায়ত সাহিত্য পরিবেশনায় আমাদের এই প্রয়াস পাঠকদের মনোমতো হলে শ্রম সার্থক জ্ঞান করব।