[সম্পাদকীয় নোট : উনিশ শতকের বাঙালি মুসলমান সমাজে প্রচলিত ধর্মীয় বাহাছের চিত্তাকর্ষক বিশ্লেষণ আছে প্রবন্ধটিতে। তাতে ইতিহাসের পাশে সমাজ ও রাজনীতি চমৎকার জায়গা নিয়েছে। অতীত ও বর্তমান একে অন্যকে আলোকিত করেছে। প্রাবন্ধিক ইতিহাস পড়ার প্রচলিত-প্রতিষ্ঠিত অনেকগুলো সংস্কার কোনো প্রকার বিরাগ না দেখিয়েই বাতিল করেছেন, আবার নতুন ধারণাগুলো সূক্ষ্মভাবে আমল করেছেন। সংস্কারমুক্ত নিরাসক্তি এ লেখার প্রাণ। বাড়তি পাওনা তার ভাষাভঙ্গি—বাহাছকে পারফরমেন্স হিসাবে উত্থাপন করতে করতে লেখাটি নিজেই হয়ে উঠেছে আকর্ষণীয় পারফরমেন্স।]
সুকন্যা সর্বাধিকারী : শঙ্খ-সংসারের স্থান-কাল-পাত্র এবং উত্তর-ঔপনিবেশিক ভাবনার এক পুনর্মূল্যায়ন
[সম্পাদকীয় নোট: উত্তর-ঔপনিবেশিক চিন্তাধারার একাংশে সদর-অন্দরের যে-নিরঙ্কুশ বৈপরীত্য প্রতিষ্ঠিত আছে, তাকে সমস্যায়িত করতেই প্রাবন্ধিক কথা সাজিয়েছেন। তবে এ কাজে বেছে নেয়া ‘সংসার’, ‘শঙ্খ’, ‘মনসা’, ‘লক্ষ্মী’ ইত্যাদি ধারণা শুধু ওই সমস্যায়ন-প্রকল্পের আজ্ঞাবহ না থেকে, নিজেরাই হয়ে উঠেছে অসামান্য ধারণার আকর। বাঙালি হিন্দু-সংস্কৃতির একাংশের কাঠামোগত সূক্ষ্ম পরিচয় এ লেখার অন্যতম আকর্ষণ। শেষে ধারণাগুলো জীবনানন্দের রূপসী বাংলার অভূতপূর্ব পাঠ হাজির করলে আমরা প্রবন্ধটির অর্গানিক বুনটের ব্যাপারে আরেকবার নিশ্চিত হই।]
শিশির ভট্টাচার্য্য : অনুবাদের তিন পদ্ধতি: সেমিওসিস, মিমেসিস ও সেমিওমিমেসিস
[সম্পাদকীয় নোট: অনুবাদ সম্পর্কে চালু হাজার কথাকে এ লেখায় প্রাবন্ধিক সূত্রবদ্ধ করেছেন। অনুবাদের পুরনো ইতিহাসের আংশিক রূপরেখা প্রণয়ন লেখাটির গুরুত্ব বাড়িয়েছে। বহু অনুবাদক ও অনুবাদ-তাত্ত্বিকের মত শিশির ভট্টাচার্য্য উপস্থাপন করেছেন প্রাঞ্জল ভাষায়। অনুবাদক হিসাবে নিজের অভিজ্ঞতা এবং গদ্যের কৌতুকরস প্রবন্ধটির বাড়তি পাওয়া।]
পারভেজ আলম : ‘ম্যাড ম্যাক্স: ফিউরি রোড’: পুঁজিবাদী বাস্তবতাবাদ ও ভৌতিক আইন নিয়ে খেলা
[সম্পাদকীয় নোট: ‘ম্যাড ম্যাক্স’ সিরিজের ফিউরি রোড সিনেমার আলোচনা আছে প্রবন্ধটিতে। সেদিক থেকে একটা ভালো চলচ্চিত্র-সমালোচনা হিসাবে লেখাটিকে দেখা চলে। কিন্তু কাহিনি ও চরিত্রের রূপকী-প্রতীকী তাৎপর্যের ভিত্তিতে লেখক গেছেন সর্বগ্রাসী পুঁজিবাদী ব্যবস্থার পর্যালোচনায়। দেরিদা ও আগামবেনের সংশ্লিষ্ট ধারণা ব্যবহার করে সিনেমার পাটাতনে তিনি রাজনীতি, আইন ও ধর্মতত্ত্বের স্বরূপ উন্মোচন করেছেন। পারভেজ আলমের সাম্প্রতিক বহু লেখার মতো এ লেখায়ও আছে শেষ জমানার ধারণা, এবং প্রত্যক্ষ রাজনীতির প্রণালি-পদ্ধতির লিপ্ত অনুসন্ধান।]
আহমেদ শামীম : শব্দ যখন ইতিহাসের চাবি
[সম্পাদকীয় নোট: এ লেখায় বাংলা অঞ্চলের ভাষাচর্চার সাথে সম্পর্কিত তুলনামূলক কম আলোচিত একটা দিকে সংক্ষেপে আলোকপাত করা হয়েছে। কয়েকটি শব্দের উৎস তালাশ করে আহমেদ শামীম জনগোষ্ঠীর ইতিহাসের একটা ভিন্ন সম্ভাবনার ইশারা দিয়েছেন। বাংলাদেশের অতি ক্ষুদ্র এবং অনালোচিত জনগোষ্ঠী হিসাবে কডাভাষী মানুষদের আলাপ কারো কারো কাজে লাগতে পারে।]
অনুপম সেন অমি : বস্তি এবং নারী-শরীর: সম্ভাব্য ভায়োলেন্সের জমিন
[সম্পাদকীয় নোট : সমাজে বিদ্যমান প্রভাবশালী ধারণা ভায়োলেন্সকে সহনীয় করে তুলতে পারে। রাষ্ট্র, সমাজ ও গণমাধ্যমে উৎপাদিত ভাষা বাড়িয়ে দিতে পারে কোনো জনগোষ্ঠীর ঝুঁকিগ্রস্ততা। বস্তি ও নারী-শরীরকে ধারণা হিসাবে নির্মাণ করে প্রাবন্ধিক এ ধরনের দুটি স্পেসকে সামনে এনেছেন। সাহায্য নিয়েছেন ফ্রয়েড ও হেনরি লেফেবের দুটি ধারণার। বাংলাদেশের বাস্তবতায় সংবাদপত্র ও সিনেমার উদাহরণ ব্যবহার করে অনুপম সেন অমি নিষ্ঠাবান থেকেছেন প্রাত্যহিক বাস্তবতার প্রতি। তাঁর ভাষা ও বিশ্লেষণে নৈতিক-প্রায়োগিক দায় পরিষ্কারভাবে পাঠ করা যায়।]
মোহাম্মদ আজম : বাঙালি মুসলমানের ‘স্বদেশ প্রত্যাবর্তন’: এক হীনম্মন্য মিথের ইতিহাস-ভূগোল
[সম্পাদকীয় নোট : বাঙালি মুসলমানের ইতিহাস প্রণয়নের জ্ঞানতাত্ত্বিক ও পদ্ধতিগত একটি গভীর মুসিবতের দিকে এ প্রবন্ধ বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। মুসলমান সমাজ বাংলা, বাংলাদেশ ও বাঙালিত্বকে যথেষ্ট আমলে আনে নাই, আর বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এ অবস্থার বদল ঘটেছে এবং তারা ‘স্বদেশে’ ফিরেছে—অত্যন্ত প্রতাপশালী এ মিথকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে এ প্রবন্ধে। দেখানো হয়েছে, আদতে ভিন্ন স্থান-কাল-সংস্কৃতির নিরিখে সংজ্ঞায়নের কারণেই এরকম মনে হয়। বদরুদ্দীন উমরের একটি ছোট প্রবন্ধকে ভিত্তি হিসাবে নিলেও লেখাটিতে আসলে একটি প্রভাবশালী দৃষ্টিভঙ্গিকেই মোকাবেলা করা হয়েছে।]
বাংলাদেশের সাহিত্য অঙ্গনে প্রবন্ধের পরিমাণ বেশ কমে গেছে। কেউ এর জন্যে দায় চাপান ফেইসবুকের উপর। কারো মতে উইকিপিডিয়ার কারণে প্রবন্ধের এই আকাল।
বিগত দু'দশকে সমসাময়িক তরুন লেখকদের মাঝে চিন্তার বেশ কিছু নতুন দিক উন্মোচিত হয়েছে। তাদের লেখায় অবধারিতভাবে চলে এসেছে বিভিন্ন জ্ঞানতাত্ত্বিক এবং সিস্টেম্যাটিক ইঙ্গিত, ইশারা, ন্যারেটিভ এবং নয়া ডিসকোর্স।
সোশ্যাল মিডিয়ায় তাদের লেখালেখি সৃষ্টি করছে অনেক কিছু নতুন এবং ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ। আর্ট-কালচার, সোশ্যাল সায়েন্স, বিভিন্ন ভাব এবং থিওরির সমন্বয়ের প্রচেষ্টা করা হয়েছে এই প্রথম সংখ্যায়। নিচে তরুন চিন্তকদের চিন্তামূলক লেখা এবং সেসবের রিভিউ দেয়া হল।
বাহাছ মানে নিছক তর্ক নয়। কোর্ট বিল্ডিঙের বিভিন্ন তর্ক-বিতর্কের ভিত্তি আইনী ডোমেইনের মধ্যে হয়। নিছক ডিবেট বা আর্গুমেন্ট হিসেবে নয়। বাঙালি মুসলমান সমাজে উনিশ শতকে যে বাহাছ প্রচলিত ছিল তার কথা ফুটিয়ে তুলা হয়েছে এই লেখায়। বাহাছের নিজস্ব গ্রাউন্ড ছিল। একইসাথে মুসলমান মৌলবীদের মধ্যকার এইসব বাহাছে সেক্যুলার বিষয়াদীও ছিল যা বিস্ময়কর। সেই সাথে ছিল মজলিশে তর্কে পটানো কিন্তু এই পারস্যু করাটা শেষ কথা ছিল না। বাঙালি মুসলমানের গণতান্ত্রিক অভিলিপ্সা শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে পৌছায় সেটি এই প্রবন্ধ পড়লে পাঠক বুঝতে পারবেন। তবে তৈমুর রেজার লেখনী আমার খানিকটা খটমটে লেগেছে। সেইসাথে স্লো রিড।
২) শঙ্খ-সংসারের স্থান-কাল-পাত্র এবং উত্তর-ঔপনিবেশিক ভাবনার পুনর্মূল্যায়ন।
লেখক : সুকন্যা সর্বাধিকারী
সংসার নামক গোলকধাঁধা এবং ট্রিকি এনটিটি নিয়ে লেখক নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে লিখেছেন। যেই দৃষ্টিতে শঙ্খ, সাপ, মনসা, মহাদেব, লক্ষ্মী, এই কনসেপ্টসমূহ বেশ প্রাসঙ্গিকভাবে চলে এসেছে। অন্দর-বাহির, রাত-দিন, জীবন-মৃত্যু, আশা-দূরাশার প্যারাডক্সে বিভিন্ন বৈপরীত্য কিভাবে আবার একসাথে বিলীন হয়ে যেতে পারে তা সুকন্যার লেখনীতে সুন্দরভাবে প্রকাশ পেয়েছে। লেখক একজন বৈদিক ধর্মের নারীর দৃষ্টিকোণকেও এই লেখায় প্রাধান্য দিয়েছেন।
৩) অনুবাদের তিন পদ্ধতি : সেমিওসিস, মিমেসিস ও সেমিওমিমেসিস
লেখক : শিশির ভট্টাচার্য্য
খুব সম্ভবত এই সংখ্যায় আমার সবচেয়ে ফেভারিট লেখা এটি। লেখক অনুবাদের মূল বিষয়াদী সংক্ষেপে, প্রাঞ্জল ভাষায় এবং দারুন উইটের সাথে উপস্থাপন করেছেন। অনুবাদের ইতিহাস, বিভিন্ন তুলনা এবং টেকনিক উদাহরণসহ ঝরঝরে লেখনীতে পাঠককে উপহার দিয়েছেন এই ভেটেরান অনুবাদক। যারা অনুবাদে আগ্রহী তাদের জন্যে হাইলি রেকমেন্ড করতে চাই।
৪) 'ম্যাড ম্যাক্স : ফিউরি রোড' : পুঁজিবাদী বাস্তবতাবাদ ও ভৌতিক আইন নিয়ে খেলা।
লেখক : পারভেজ আলম
মুভির সাথে লেখক মিলিয়েছেন সর্বগ্রাসী পুঁজিবাদের যে ভৌতিক বাস্তবতা সেটার সাথে। মূলত মুভির আলোচনা এখানে থাকলেও লেখক বিভিন্ন দার্শনিকের মধ্যকার তুলনা, পোস্ট-এপোকলিপ্টিক পৃথিবীর ভয়াবহতা, এমনকি সেখানেও পুঁজিবাদের শক্তিশালী উপস্থিতি বিভিন্ন দিক বিবেচনা করে লিখেছেন। মার্ক্সবাদের সাথে সাথে চলে এসেছে শেষ জমানার কথাও। আমাদের বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতির সাথে অনেকে হয়তো বেশ কিছুটা সমিল পেতে পারেন ঐ মুভির বিভিন্ন উপাদান এবং লেখকের ব্যাখ্যা থেকে। তবে পারভজ আলমের লেখার সাথে যারা পরিচিত নন এবং যারা বিভিন্ন প্রতীকি ব্যাপার-স্যাপার বুঝেন না তারা এই লেখায় একটা গোলকধাঁধায় পড়ে যেতে পারেন। ইসলাম এবং কমিউনিজমের এক কম্বিনেশন হয়তো লেখক দেখতে চান। অতীতের রেড মাওলানার মত।
৫) শব্দ যখন ইতিহাসের চাবি
লেখক : আহমেদ শামীম
সংক্ষিপ্ত এই লেখায় আহমেদ শামীম নৃতাত্ত্বিকভাবে ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বার এক ভাষা এবং সংস্কৃত ও অন্যান্য ভাষার সাথে সেই ভাষার আদি সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেছেন। যদিও কোন ভাষার অরিজিন কি এবং প্রকৃত অরিজিন তিনি খুঁজেছেন, তার নিজস্ব ফাইন্ডিং আরো কিছু থাকলে ভালো হত। লেখাটি আরো বিশদ করা দরকার ছিল বলে আমি মনে করি।
৬) বস্তি এবং নারী-শরীর : সম্ভাব্য ভায়োলেন্সের জমিন
লেখক : অনুপম সেন অমি
দুইটি বিষয়কে অনুপম সেন অমি বিশ্লেষণ করেছেন। সামাজিক প্রভাবশালী ন্যারেটিভের কারণে যে বিষয়গুলো মারাত্মক সহিংসতার শিকার হয়। ন্যারেটিভ মেকার মধ্যবিত্ত শ্রেণী, রাষ্ট্রযন্ত্র, সমাজ, সিনেমায় যে ভায়োলেন্সকে স্বাভাবিকভাবে দেখা হওয়ার আশংকা সবসময় থেকেই যায় এবং একইসাথে উস্কানী দেয়া হতে থাকে এসব বিষয়ের উপর ভায়োলেন্সের। এখানে লেখক দু'জন ফিলসফারের দৃষ্টিভঙ্গীর প্রাসঙ্গিকতা এনেছেন। নৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে লেখকের এই প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানাই।
বস্তি এবং নারী-শরীর এদেশে নিরাপদ নয়।
৭) বাঙালি মুসলমানের 'স্বদেশ প্রত্যাবর্তন' : এক হীনম্মন্য মিথের ইতিহাস-ভুগোল।
লেখক : মোহাম্মদ আজম
কোন একটি ত্রুটিপূর্ণ ধারণা কালাতিক্রম করে ফেললে বদরুদ্দিন উমরের মত ব্যক্তিও লিখে ফেলেন পক্ষপাতদূষ্ট সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধ। বাঙালি মুসলমানের বিষয়ে কতগুলো একদম স্টেরিওটিপিক্যাল ধারণা এবং মিথের ফাঁক-ফোঁকড়ের তত্ত্বতালাশ করেছেন মোহাম্মদ আজম। চমৎকার এই লেখায় বাঙালি মুসলমানকে নিয়ে নেগেটিভ কিছু মিথ-বাস্টারের কাজ করেছেন লেখক। এই চমৎকার লেখাটিতে বিভিন্ন বিষয়ে আলোকপাত করেছেন তিনি। একটি জনগোষ্ঠির হীনম্মন্যতাসম্পন্ন বুদ্ধিজীবীদের চিন্তা-চেতনার কারণে সেই জনগোষ্ঠিকে নিয়ে যে বহুবছর ধরে ইতিহাসের ক্রুসিয়াল বিভিন্ন বিষয়ে ভুল বুঝা হয় সেটি দেখিয়েছেন মোহাম্মদ আজম।
তত্ত্বতালাশের প্রথম সংখ্যায় সূত্র-নির্দেশ বা রেফারেন্স সমুহের পাদটীকা প্রতিটি লেখার শেষেই পাবেন।
সব লেখকদের পরিচয় "এ সংখ্যার লেখক" শিরোনামে শেষের দিকে আছে।
খোদ সম্পাদকের মতে প্রথম চারটি সংখ্যা হবে পরিকল্পনাহীন। আমার কাছে চারটি সংখ্যা-ই আছে। সময়ের সাথে সবগুলোর রিভিউ দেয়া হবে। তত্ত্বতালাশ বেশ পাঠকপ্রিয়তা পাচ্ছে বলে মনে হয়।
ডিটেক্টিভের মতই সাহিত্য, কালচার, ইতিহাস, আর্ট, বিজ্ঞান, বাণিজ্য এবং আরো বিভিন্ন জ্ঞানের শাখার বিষয়ে জারি থাকুক তত্ত্বতালাশ।