সুবর্ণ বসুর জন্ম ৯ আগস্ট, ১৯৮৪, উত্তর কলকাতার শ্যামবাজারে। গভর্নমেন্ট স্পনসর্ড মাল্টিপারপাস স্কুল ফর বয়েজ টাকী হাউস থেকে মাধ্যমিক এবং হেয়ার স্কুল থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেছেন। বিদ্যাসাগর কলেজ থেকে প্রাণীবিদ্যায় স্নাতক, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর। কেরিয়ার ম্যাগাজ়িনে সাংবাদিকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু, বর্তমানে ‘আনন্দমেলা’ পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগের সঙ্গে যুক্ত। প্রথম গল্প ‘টেলিফোনিক’, প্রকাশিত হয়েছিল ‘উনিশ কুড়ি’ পত্রিকায়। ‘উনিশ কুড়ি’ পত্রিকায় প্রকাশিত গোয়েন্দা অনমিত্রর রহস্যকাহিনি সিরিজ় পাঠকমহলে বিশেষ জনপ্রিয়। লিখেছেন বহু ছোটদের গল্পও। তাঁর ধর্ম, পুরাণ এবং দেবদেবী বিষয়ক বহু নিবন্ধও বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় নিয়মিত প্রকাশিত এবং সমাদৃত।
ভালো পদে চাকুরীরত, প্রতিষ্ঠিত পরিবারের ছেলে অনুভব এক সন্ধ্যায় দেখা করতে যায় বান্ধবী অস্মিতার সাথে। ওদের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়, বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে অনুভব। কিছুক্ষণ পরেই খুন হয় অস্মিতা। পরের দিন একই ভাবে ছুরির আঘাতে খুন হন অস্মিতার বস সুকোমল। সন্দেহের বশে অনুভবকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
এবার মাঠে নামেন আমাদের গোয়েন্দা অনমিত্র। অনমিত্র একজন চিত্রশিল্পী। মাঝে মাঝে সখের গোয়েন্দাগিরি করে থাকে। অনুভবকে বাঁচাতে তার স্মরণাপন্ন হয় অনুভবের বোন ঈশিতা। আরেকদিকে গল্পের ক্লাইম্যাক্সের কিছু অংশ সমান্তরাল ভাবে এগোয়। সেখানে একটি পার্কে বেঞ্চে বসে একটি গল্প বলেন একজন নাম না জানা লোক আর সেই গল্প নির্বিকার মুখের শুনে যায় এক যুবক। তাঁরা আসলে কে? এই গল্পে তাঁদের কী ভূমিকা?
গল্প পড়তে পড়তে সব ধাঁধার সমাধান হতে থাকে। ---
গত বছরে এই লেখকের লেখা 'ছায়াপ্রহর' উপন্যাসেও ক্লাইম্যাক্সের একটা অংশ প্রথমে দেওয়া ছিল যা কাহিনীকে আরো রোমাঞ্চকর করে তুলেছিল। এবারেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। এটা একদিকে একটা রহস্য উপন্যাস ঠিকই, কিন্তু মোটেই গুরুগম্ভীর নয়, খুব একটা ভয়ের বা নৃশংসও নয়। লেখনী খুব পরিচ্ছন্ন। এখানে থ্রিল আর সাসপেন্স থাকলেও কোনরকম কনফিউশনে পড়তে হয়নি। কাহিনীটি খুন দিয়ে শুরু হলেও লেখক এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন যে কাহিনী জুড়ে একটা মন ভাল করে দেওয়া আমেজ বিরাজ করে।
হাসি কান্নার মিশেল, রহস্য, রোমাঞ্চ আর একটা সাসপেন্স- সব মিলিয়ে যাকে বলে একদম 'জমে ক্ষীর'। লেখক কোথায় আছেন বা আমার লেখা আদৌ দেখবেন কিনা জানিনা (না দেখারই কথা), তবে আশা করব আপনি প্রতি বছর আমাদের এরকম মন ভালো করা কাহিনী উপহার দেবেন আর পারলে এই অনমিত্রকে আবার ফিরিয়ে আনবেন বইয়ের পাতায়। পাঁচ তারা রেটিং দিলাম।
ছায়াপ্রহরের পরে দ্বিতীয় উপন্যাস পড়লাম সুবর্ণ বসুর লেখা। যা আশা করেছিলাম সেরকমই পেলাম। আমি জানি না অনমিত্র সিংহ গোয়েন্দা সিরিজ হিসাবে লেখক লেখেন কি না, কিন্তু না হলেই খুশি হব। বাঙালি লেখকদের মধ্যে একটু নাম হলেই সবার একটা নিজের গোয়েন্দা সিরিজ লেখার প্রবণতা আছে, আর সে ক্ষেত্রে বেশিরভাগ লেখার মানই খুব সাধারণ হয়।
যাই হোক উপন্যাসের কথায় আসি। নামের মত উপন্যাস ও নাগোরদোলার মত গোল গোল ঘুরেছে, একবার উপর আর নিচ। গল্পে ঈশিতা চরিত্রটা আর তার সংলাপ চরিত্রটা কে একটা অন্য মাত্রা দিয়েছে। লেখক আবার নিজের হাস্যরসের পরিচয় দিয়েছেন। ছায়াপ্রহরের রিভিউ -এ বলেছিলাম যে লেখক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের লেখা থেকে অনুপ্রানিত, আর এবার তো লেখক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের পাতালঘর উপন্যাসের রেফারেন্স ও দিয়েছেন। গল্পের ক্লাইমেক্স যে ভাবে তিনটে ভাগে দেখানো হয়েছে সেটা বেশ আকর্ষনীয়।
📄 গল্প সংক্ষেপ : এই উপন্যাসের শুরুটা হয় একটু অন্যরকম ভাবে । শুরুতেই লেখক আমাদের নিয়ে যান ক্লাইম্যাক্স দৃশ্যে, ‘পাটুলি’র একটি ঝিলের ধারে বসে একজন ‛রহস্যময়’ ব্যক্তি অবিরত কথা বলে চলেছেন তার পাশে বসা ‘অজ্ঞাত পরিচয়’ এক আগন্তুকের সাথে... যে অত্যন্ত ধৈর্য্য সহকারে নীরবে শুনে যেতে থাকে ঐ ব্যক্তির সমস্ত কথা । ঐ রহস্যময় যার মুখ থেকেই আমরা শুনতে থাকি এই কাহিনীর বর্ণনা...
▫️কাহিনীর শুরুতে আমরা জানতে পারি একটি অবস্থাপন্ন পরিবারের ছেলে অনুভব, যে নিজেও উচ্চপদে কর্মরত । সে ভালোবাসে মধ্যবিত্ত পরিবারের এক সাধারণ মেয়ে অস্মিতাকে । অস্মিতা বর্তমানে একটি এনজিওতে কর্মরত এবং খুব শীঘ্রই সে অনুভবের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে চলেছে । একদিন সন্ধ্যায় অনুভবের সাথে অস্মিতার ব্যক্তিগত সমস্যা নিয়ে তীব্র বচসা হয়, সেই সময় অনুভব মাথা গরম করে অস্মিতার ওপর হাত তোলে এবং তারপর অস্মিতার বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় । বাড়ি ফিরে এসে অনুভব জানতে পারে অস্মিতা খুন হয়েছে এবং সমস্ত তথ্য প্রমান তার বিরুদ্ধে । ফলস্বরূপ তাকে হাজতে যেতে হয় ।
এইসময় অনুভবের কাকার মেয়ে ঈশিতার সূত্রে কাহিনীতে প্রবেশ করেন ‘অনমিত্র সিংহ’। অনমিত্র একজন শিল্পী, বিভিন্ন একজিবিশনে তার আঁকা ছবি প্রদর্শিত হয়... এছাড়াও পুজোর মন্ডপসজ্জা এবং ঠাকুরের মূর্তিভাবনার থিম্ পরিকল্পনার কাজও সে করে থাকে । অবসর সময়ে অপরাধ বা রহস্য নিয়ে মাথা ঘামাতে ভালোবাসে সে, নেহাতই নিজের শখের কারণে । এই কেসের তদন্ত করতে গিয়ে অনমিত্র জানতে পারে... যেদিন অস্মিতা খুন হয় ঠিক তার পরের দিনই হুবহু একই পদ্ধতিতে খুন হন আরও একজন প্রৌঢ় ব্যক্তি, এবং অস্মিতার সাথে এই ব্যক্তির একটি যোগসূত্র আছে ।
▫️অনমিত্রর মূল লক্ষ্য কি শুধুই অনুভবকে নির্দোষ প্রমান করা ? নাকি প্রকৃত হত্যাকারীকে খুঁজে বার করা ? কি সেই মোটিভ যার জন্য পরপর খুন হতে হল এই দুজনকে ?
📄 পাঠ প্রতিক্রিয়া : এই উপন্যাসটি একটি জমজমাট ’মার্ডার মিস্ট্রি’, যার পরতে পরতে মিশে আছে প্রেম এবং মনস্তত্ত্ব । একটু আলগাভাবে শুরু হলেও বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহের সাথে সাথে কাহিনী বেশ টানটান হয়ে ওঠে ।
▫️এই উপন্যাসের মূল চরিত্র 'অনমিত্র সিংহ', যে আর পাঁচটা ডিটেকটিভদের তুলনায় বেশ অন্যরকম । তার তদন্ত করার পদ্ধতিতে একটা স্বতন্ত্রতা আছে । প্রচলিত রীতিনীতি অনুসরণ করার চেয়ে অনমিত্র বেশি আস্থা রাখে নিজের ইনস্টিংক্টের উপর । অনেক ক্ষেত্রেই সে সিদ্ধান্ত নেয় ‘প্রসেস অফ এলিমিনেশন’এর মাধ্যমে । এছাড়াও গল্পের একটি নির্দিষ্ট অংশে পৌঁছে তার ‘অদম্য’ মানসিকতার প্রকাশ পাওয়া যায়... আর ঠিক এই কারণেই চিরাচরিত ‘ডিটেকটিভ সুলভ’ না হয়েও অনমিত্র চরিত্রটি পাঠকের মনে দাগ কাটতে সক্ষম হয় ।
ঈশিতার সাথে অনমিত্রর কেমিস্ট্রিটা এই উপন্যাসের একটা উপভোগ্য দিক, পাঠকদেরও তাদের মধ্যেকার রসায়ন বেশ ভালো লাগবে ।
▫️এই উপন্যাসে লেখক সুবর্ণ বসুর গল্প বলার ধরণ আমার ভীষণ ভালো লেগেছে । শুরুতেই লেখক এই কাহিনী টুকরো টুকরো করে ছড়িয়ে দিয়েছেন সম্পূর্ণ আখ্যান জুড়ে... এরপর ঠিক ‘জিগ্ স পাজ্ল’ সমাধান করার ভঙ্গিতে প্রতিটি টুকরো কুড়িয়ে নিয়ে ভীষণ সুনিপুণ ভাবে সাজিয়েছেন গোটা উপন্যাসের গল্প । পড়তে পড়তে যতবারই ভাবতে শুরু করবেন যে কাহিনীর সমাধানে পৌঁছে গেছেন, ঠিক ততবারই বুঝবেন ‘এই যাঃ! কিছু তো একটা মিসিং রয়ে গেল মনে হচ্ছে ।’
▫️অনেকদিন পর দুর্দান্ত একটি ‘মার্ডার মিস্ট্রি’ উপন্যাসের স্বাদ পেলাম ।