ইন্দ্রনীল সান্যালের জন্ম হাওড়ার বালিতে, ১৯৬৬ সালে। নীলরতন সরকার মেডিকেল কলেজ থেকে এম বি বি এস। প্যাথলজিতে এম ডি, পিজি হাসপাতাল থেকে।সরকারি চাকরির সূত্রে কাজ করেছেন সুন্দরবনের প্রত্যন্ত প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে মহাকরণের ডিসপেনসারিতে, লালবাজার সেন্ট্রাল লকআপ থেকে গঙ্গাসাগর মেলার হেল্থ ক্যাম্পে।বর্তমানে পূর্ব মেদিনীপুর জেলা হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত।প্রথম প্রকাশিত গল্প ২০০৪ সালে ‘উনিশকুড়ি’ পত্রিকায়।শখ: বই পড়া, ফেসবুকে ফার্মভিল এবং হ্যাপি অ্যাকোয়ারিয়াম খেলা, সুদোকু সমাধান।
এই সময়ের অন্যতম প্রিয় লেখক ইন্দ্রনীল সান্যালের লেখা ‘ক্রান্তিকাল’ উপন্যাসটি শেষ করলাম । আহা ! ভীষণ সুন্দর একটা উপন্যাস । অনেকরই ধারণা ইন্দ্রনীল সান্যাল মানেই ‘মেডিক্যাল থ্রিলার’... কিন্তু এর আগেও ওনার লেখা সামাজিক উপন্যাস ‘রক্তবীজ’ পড়ে রীতিমতো চমকে উঠেছিলাম । এবার তো পুরোপুরি ধাক্কা খেয়েছি এই উপন্যাস পড়ে ।
📄 এই উপন্যাসে সমান্তরালভাবে চলতে থাকে দুটি আলাদা সময়ের গল্প । বেঙ্গল মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র সাইমন স্বদেশ বিশ্বাস, সে থাকে তার দিদার সাথে । তার দিদা ‛অ্যালঝাইমার্স’ রোগে আক্রান্ত, আস্তে আস্তে সবকিছু ভুলে যাচ্ছেন তিনি । স্বদেশ ভালোবাসে তার চেয়ে সিনিয়র ডাক্তার লহমাকে ।
▫️একদিন হঠাৎ নিজের দাদুর লাইব্রেরিতে সে খুঁজে পায় একজন আমেরিকান ‛মেজর’এর ডায়েরি । আরও আশ্চর্যের বিষয়... ঐ ডায়েরির বিভিন্ন পাতায় স্বদেশ দেখতে পায় তার নিজের বাবার সই এবং টীকা । সেই ডায়েরি থেকেই স্বদেশ জানতে পারে ভিয়েতনাম যুদ্ধের কথা এবং ঐ আমেরিকান সৈন্যের সাথে একজন ভিয়েতনামের মেয়ে ‘বিয়ান’ এর প্রেমের গল্প । যুদ্ধে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে জরুরি তৎপরতায় আমেরিকায় ফিরে যেতে হয় ঐ মেজরকে, তখন বিয়ান গর্ভবতী । তারপর...
▫️আর কি বিয়ানকে খুঁজে পেয়েছিল ঐ আমেরিকান ? কি পরিণতি হয়েছিল ওদের প্রেমের ? একজন আমেরিকান সৈন্যের ডায়েরি ওদের বাড়িতেই বা এল কিভাবে ?
📄 কাহিনীতে যতই বিভিন্ন রকম মেডিক্যাল সংক্রান্ত বিষয়বস্তু থাকুক... যতই কাহিনীর মূল প্রেক্ষাপটে ‘ভিয়েতনাম ওয়ার’ থাকুক... আমার মতে এটি একটি আদ্যোপান্ত ‘প্রেমের উপন্যাস’। যুদ্ধ, দাঙ্গা, সাম্পদায়িকতা, মহামারী - এই সবকিছুর উর্দ্ধে যে একমাত্র ‘ভালোবাসা’, সেই বার্তাই লেখক ছড়িয়ে দিয়েছেন এই উপন্যাসে ।
▫️ইন্দ্রনীল সান্যালের লেখা অন্যান্য থ্রিলার উপন্যাসগুলির চেয়ে এই উপন্যাসটি অনেক পরিণত লেগেছে । এই উপন্যাসে যুদ্ধের বর্ণণা পড়তে গিয়ে যেমন শিউরে উঠতে হয়, আবার স্বদেশ এবং লহমার প্রেমের অংশগুলি পড়তে পড়তে মনটা তৃপ্ত হয়ে ওঠে । স্বদেশ এবং লহমার প্রেম এই উপন্যাসের একটি অন্যতম অংশ, লেখক খুব যত্ন নিয়ে এই সম্পর্কের ছবি এঁকেছেন... যেখানে ভালোবাসা আছে, কিন্তু একটুও বাড়াবাড়ি নেই । দুটি কাহিনী সমান দক্ষতায় এগিয়ে নিয়ে গেছেন লেখক, থ্রিলার না হলেও কাহিনী বেশ দ্রুতগতির ।
📄 এই উপন্যাসে ‛ভিয়েতনাম ওয়ার’ আছে, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার উল্লেখ আছে, মহামারী আক্রান্ত সমাজের বর্ণণা আছে... আর আছে আদি ও অকৃত্রিম ‛ভালোবাসার গল্প’ । উপন্যাসের একটি অংশ উল্লেখ করে এই আলোচনা শেষ করছি...
▫️"প্রতিটি মানুষের জীবনেই এমন ক্রান্তিকাল আসে, যখন তাকে পরীক্ষা দিতে হয় ।ভালবাসার পরীক্ষা । যতই সবাই বলুক যে, প্রেম বলে কিছু নেই, প্রেম কিন্তু আছে । রোমিও-জুলিয়েট বলো বা রাধাকৃষ্ণ, সব গল্পই এক । জাতি, ধর্ম, বর্ণ বা দেশ নির্বিশেষে দু’জন মানুষ পরস্পরের কাছে আসতে চাইছে আর কেউ না কেউ তাতে বাধা দিচ্ছে । কখনও পরিবারতন্ত্র, কখনও পুরুষতন্ত্র, কখনও ধর্মগুরু । বেসিকালি এগুলো ক্ষমতা বা রাষ্ট্রের আলাদা আলাদা নাম । রাষ্ট্র কেন এটা করে ? কেননা, এই প্রেম বা ভালবাসা রাষ্ট্র চাইছে না । সে লেবার চাইছে, ভক্ত চাইছে, সেনা চাইছে, রোবট চাইছে, কুলি চাইছে । রাষ্ট্রের চোখে চোখ রেখে এর বিরোধিতা করার মতো কলজের জোর সকলের থাকে না । বুকে ভালোবাসার বারুদ থাকলেই এটা পারা যায় ।”
ইন্দ্রনীল সান্যাল এর নাম শুনেছি বহুদিন।তাঁর লেখা পাঠক মহলে সমাদৃত তাও জানি।কিন্তু পড়া হয়নি কখনো। কর্মব্যস্ততায় অ্যামাজন কিন্ডল গত ৮ বছরের সঙ্গী। কোথা থেকে শুরু করা যায় ভাবতে গিয়ে শারদীয়া ১৪২৮ এ প্রকাশিত 'ক্রান্তিকাল' নিয়ে বসে গেলাম। অসাধারন লাগলো বললে কম বলা হয়!! বাংলায় ভিয়েতনাম যুদ্ধের পটভূমিকায় ভালো উপন্যাস খুব বেশী নেই।এই লেখা পড়তে পড়তে হেমিংওয়ের কথা মনে পড়ে।মুরাকামির লেখায় যে 'মেলাংকলি'র ভাব থাকে তা মনে পড়ে। আমার কাছে এই লেখা আন্তর্জাতিক মনে হয়েছে।শুধু এই কারনে নয় যে এই গল্প আমাদের নিয়ে যায় ভিয়েতনাম,অ্যামেরিকা,কোলকাতা,দোহা বা কাতারে। কারন এই যে গল্প বলার পদ্ধতি আন্তর্জতিক মানের। এই গল্পের ইংরাজি অনুবাদ হওয়া উচিত যাতে লেখাটিকে বিশ্বদরবারে পৌছানো যায়। দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারি এর থেকে কম ভালো উপন্যাস বুকার ও ইন্টারন্যাশনাল বুকার পুরস্কার নিয়ে গেছে। এর পর কি করবো? ওঁর বাকি লেখাগুলোও পড়বো,এটাই করার আছে। বিয়ান,মেজর টম,সাইমন স্বদেশ বিশ্বাস এই নামগুলো হয়তো মনে থেকে যাবে বহুদিন।গল্প শেষ হয় নিয়ম মেনে।কিন্তু মন থেকে মুছে যায় না।ভালো লাগা রয়ে যায়। বুকগ্যাস্ম একেই বলে। লেখাটিকে ৫/৫ দেওয়া ছাড়া উপায় নেই। ইন্দ্রনীলবাবু,আপনি লিখতে থাকুন। আমরা পড়তে থাকি।
ইন্দ্রনীল সান্যাল এর নাম শুনেছি বহুদিন। তাঁর লেখা পাঠক মহলে সমাদৃত তাও জানি। কিন্তু পড়া হয়নি কখনো। এই বইটি আগের বছর বইমেলায় প্রকাশ হওয়ার কিছুদিন পরেই আউট ওফ স্টক হয়ে যায়। একে তো গুডরিডস এ ভালো রিভিউ তার উপর আউট ওফ স্টক, সেই অমোঘ আকর্ষণেই বইটি অতি স্বল্প ছারে সংগ্রহ করেছিলাম, আর পড়া শেষ করলাম কিছুদিন আগে। লেখক পাঠক মহলে খ্যাত মেডিক্যাল থ্রিলার লেখক হিসেবে, কিন্তু লেখকের এই দুটি আলাদা ঘরানার উপন্যাস হলেও অসাধারণ। বইটি পড়তে পড়তেই এতটাই ভালো লেগেছে যে আমি লেখকের নতুন প্রকাশিত তিনটি মেডিক্যাল থ্রিলার বইটিও সংগ্রহ করে রেখেছি।
পটভূমি - ঘূর্ণি - চিকিৎসক দম্পতি উজান এবং জাগরী কলেজ জীবনের প্রথম দিন থেকে প্রেম। একসঙ্গে ওরা পড়াশুনো এবং বামপন্থী রাজনীতিও করেছে। পরবর্তীকালে উজান কলকাতার এক নম্বর শিশু বিশেষজ্ঞ এবং পুরো দস্তুর কর্পোরেট চিকিৎসক। জাগরী নিজেকে যুক্ত রেখেছে নবোদয় হাসপাতালের সঙ্গে, যেটির পরিচালন ক্ষমতা অতি বাম মনোভাবাপন্ন চিকিৎসকদের হাতে। ওদের একমাত্র সন্তান রোহনের হাঁপানি আছে। মধ্যবয়সে এসে উজান আর জাগরীর দাম্পত্য এসে দাঁড়িয়েছে খাদের কিনারে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় মূলে আছে আদর্শগত সংঘাত, কিন্তু দু’জনেই জানে, তাদের সম্পর্ক মরে যাচ্ছে। ভালবাসা আবার খুঁজে নেওয়ার জন্যে দু’জনে পুরী বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা করে। সেই সময়েই পুরীতে আছড়ে পড়ছে সাইক্লোন ফণী। আদর্শের, সম্পর্কের আর প্রকৃতির ঘূর্ণিঝড় থেকে উজান আর জাগরী কি বেরোতে পারবে? ক্রান্তিকাল - বা���-মা হারা স্বদেশ সাইমন বিশ্বাসের কাছের মানুষ বলতে দিদা কমলা আর প্রেমিকা লহমা। সঙ্গে রয়েছে জটিল অসুখ আর বিষণ্ণতা। দাদু মাইকেল কানাই বিশ্বাস ভারতবর্ষের কমিউনিস্ট পার্টির ইতিহাসে এক উল্লেখযোগ্য নাম। হঠাৎ দাদুর ঘরে একটি ডায়েরি খুঁজে পায় স্বদেশ। ডায়েরির মালিক ভিয়েতনামে যুদ্ধ করতে যাওয়া মার্কিন সেনা, মেজর টম, যিনি একজন শল্যচিকিৎসক। কী আছে সেই ডায়েরিতে? গত শতকের সত্তরের দশকের ভিয়েতনাম যুদ্ধের নাপাম বোমা, টানেল ওয়ার, এজেন্ট অরেঞ্জ আর নতুন শতকের দুইয়ের দশকের কলকাতা শহরের জাতি বিদ্বেষ, ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা, হিংসা কী ভাবে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে ডায়েরির সূত্র ধরে? যুদ্ধ এবং প্রেমের টানাপড়েনে কার জয় হচ্ছে?
পাঠপ্রতিক্রিয়া - লেখক আসলে দুটি প্রেম কাহিনী লিখেছেন, দুটি আলাদা আলাদা প্রেক্ষাপটে। প্রথম প্রেক্ষাপট সাইক্লোন ফনী, সেখানে উজান আর জাগরী এর প্রেম, নিজেদের আলাদা ভাবে খুঁজে পাওয়া, আর আরেকটা প্রেক্ষাপট কোভিড। অসম্ভব বলিষ্ঠ লেখনী, উপন্যাস দুটোই তরতর করে পড়ে ফেলা যায়, কিছু কিছু জায়গা এতটাই ভালো লেগেছে যে দুবার করেও পড়তে হয়েছে। অসাধারন লাগলো বললে কম বলা হয়!! বাংলায় ভিয়েতনাম যুদ্ধের পটভূমিকায় ভালো উপন্যাস খুব বেশী নেই। এই লেখা সত্যিই আন্তর্জাতিক মানের প্রেম কাহিনী। উজান, জাগরী,মেজর টম,সাইমন স্বদেশ বিশ্বাস এই নামগুলো হয়তো মনে থেকে যাবে বহুদিন। ইন্দ্রনীলবাবু, আপনার কলম চলতে থাকুক। আমরা পড়তে থাকি।