"আমি কোনো রিস্ক নিই না,"—তারাপদ রায়ের সেই অমর মাতাল যখন বোতল আর ফটোফ্রেমের মাঝে নিজের ‘সেফ অপারেশন’ চালিয়ে যাচ্ছেন, তখনই আমি Drink: A Cultural History of Alcohol বইটা হাতে পাই। সালটা ২০১২। বইটা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে মনের মধ্যে সেই মাতালের সংলাপগুলো বারবার ধাক্কা দিচ্ছিল। কারণ যা গ্যাটলি লিখেছেন, আর যা তারাপদ রায় লিখেছেন, তার মধ্যে ফারাক শুধু মাত্র স্কেলে—সাহিত্যের স্কেল আর ইতিহাসের স্কেল। মদ সর্বত্রই আছে, এবং সর্বত্রই কিছু না কিছু ঢালে—শুধু শরাব নয়, গল্প, বিদ্রোহ, বিশ্বাস আর ভ্রান্তিও।
গ্যাটলি এখানে মদের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের এক বিস্তৃত, বর্ণময় ও মনোগ্রাহী ইতিহাস তুলে ধরেছেন। ঠিক যেন ইতিহাসের ডেকানিটার মুখ খুলে গেছে, আর আমরা চুমুক দিয়ে চুমুক দিয়ে সভ্যতার যাবতীয় ঝাঁজ ও ঝিমুনি খেয়ে নিচ্ছি।
গ্যাটলির বইয়ের আসল শক্তি এখানেই—তিনি মদকে কেবল পানীয় হিসেবে দেখেননি, দেখেছেন এক সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ হিসেবে। প্রাচীন মেসোপটেমিয়ায় বিয়ার আর ব্রেডের যুগলজুটি, গ্রিক দার্শনিকদের ওয়াইন-চালিত আলোচনার মঞ্চ, রোমানদের বেসামাল অর্গি কালচার, ইসলামি সমাজে আরাক ও তার ধর্মসঙ্কট, মধ্যযুগীয় ইউরোপের বিয়ার মঠ, ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের ব্র্যান্ডি-শাসন, আমেরিকার প্রোহিবিশন যুগের গ্যাংস্টার-বিয়ার-বুটলেগিং, এমনকি হিপি-সংস্কৃতির বারবন মিশে সবই এই বইয়ের পাতায় পাতায়।
মদ এখানে শুধু একটা বস্তুর নাম নয়, এটা একটা সময়চেতনা, একটা চিন্তার ধরন, একটা প্রতিরোধ আর আত্মসমর্পণের খেলা।
গ্যাটলি আমাদের দেখান, কিভাবে মদ ছিল একদিকে পবিত্র (খ্রিস্টের রক্তরূপী ওয়াইন), আবার আরেকদিকে পাপ (ইসলামে হারাম)। কীভাবে 'ডিস্টিলেশন'-এর বিজ্ঞান বদলে দেয় সাম্রাজ্যের গতিপথ—একটা ভালো ব্র্যান্ডি মানেই আরও বেশি উপনিবেশ।
এমনকি সমাজবিজ্ঞানীর চোখেও যেটা সমাজভিত্তিক উত্তরণ বা অধঃপতন, সেটাও এই বইতে এসেছে রসালো ভঙ্গিতে। বিশেষ করে নারীর মদ্যপান ঘিরে দ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক মদ্যনীতি, অথবা শ্রমিক শ্রেণির 'সস্তা মদে আত্মবিস্মৃতি'র সংস্কৃতি—সব কিছুই এসেছে অত্যন্ত তথ্যসমৃদ্ধ অথচ প্রাণবন্তভাবে।
এই জায়গাটায় এসে তারাপদ রায়ের “আমি কোনো রিস্ক নিই না” পড়লে মনে হয়, এই মাতাল পুরাণ আসলে একটা বৃহত্তর মানব ইতিহাসের ক্যারিকেচার। গ্যাটলি দেখাচ্ছেন মদের সঙ্গে রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অর্থনীতি, এমনকি যুদ্ধও কীভাবে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আর তারাপদ রায় সেই একই ইতিহাসকে নামিয়ে আনছেন একটা মধ্যবিত্ত বাঙালি সংসারে—যেখানে নেতাজির ছবি, সিঙ্ক, আলু আর গিন্নির আলপিনপরা জিজ্ঞাসা একটা ছোটখাটো লাতিন আমেরিকান বিপ্লবের মতোই নাটকীয়।
দুই ক্ষেত্রেই মদ মানুষের স্বরূপ উন্মোচনের চাবিকাঠি। গ্যাটলি একে দেখাচ্ছেন রেনেসাঁর আলোয়, রায় দেখাচ্ছেন রান্নাঘরের টিউবলাইটে।
গ্যাটলির লেখার মধ্যে যেটা খুব আনন্দের, সেটা হলো ভারী বিষয়কে হালকা ককটেলের মতো উপস্থাপন। ভাষা সহজ, কিন্তু তথ্যে টইটম্বুর। আপনি যদি কখনো ভেবেও থাকেন, "মদের ইতিহাস দিয়ে আমি কী করবো?", তাহলেও এই বইয়ের প্রথম দুই অধ্যায় পড়ার পর আপনার মন পাল্টে যাবে।
তিনি কার্ল মার্ক্সকে যেমন টেনে আনেন, তেমনই বলেন, “No empire ever thrived without a favorite drink.” এমনতর ছোট ছোট one-liner দিয়ে তিনি প্রতিটি অধ্যায়কে রসঘন করে তোলেন।
গ্যাটলির Drink এবং তারাপদ রায়ের মাতাল—দু’জনই একে অপরের ব্যাকরণ বুঝে ফেলেছেন, যদিও শতাব্দী আর ভাষার দূরত্ব বিস্তর। একজন দেখাচ্ছেন সভ্যতা কীভাবে গ্লাসে উঠে এসেছে, আর একজন দেখাচ্ছেন, কীভাবে গ্লাস থেকে সভ্যতা মাঝেমাঝে নামিয়ে ফেলতে হয়, গিন্নির রান্না শেষ হওয়ার আগেই।
এই বইটি মদ্যপানে উৎসাহ জোগায় না, বরং বোঝায়, কেন এই তরল বস্তুটি এত যুগ ধরে মানুষের রক্তে, ঘামে, ইতিহাসে মিশে আছে।
এটা একটা সাংস্কৃতিক ইতিহাস, এক চুমুকে শেষ করা যায় না। আবার পকেটে নিয়ে বারবার পড়তে হয় না। শুধু একটাই জিনিস দরকার: একটা খোলা মন আর একটু ঠান্ডা মাথা।
অলমতি বিস্তরেণ।