পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী আসছেন ভারত সফরে। আসছেন কলকাতায়।
আন্তর্জাতিক ও কূটনৈতিক স্তরে অসম্ভব স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ সফরের আগেই ঘটে চলেছে কিছু আপাত সংযোগহীন ঘটনা।
দৈনিক সত্যবার্তার সাংবাদিক মোনালিসাকে গভীর রাতে ফোন করে কী অ্যাসাইনমেন্ট দিলেন সম্পাদক? করাচীর "চানেসার গোঠ" রেলস্টেশনে পাওয়া যায় কার অজ্ঞাত পরিচয় লাশ? র'-এর উচ্চাকাঙ্ক্ষাহীন মধ্যবয়সী অ্যানালিস্টকে শীতঘুম ভাঙিয়ে কোন কাজে নিয়োগ করা হল? কে-ই বা করল? বারুইপুরে চটি কিনতে গিয়ে পুলিশের হাতে কেন গ্রেপ্তার হলেন জনৈক বাংলার শিক্ষক? দিল্লির গণেশনগর মহল্লায় একা একটা ফ্ল্যাটে কাটানো ওই বিপত্নীক ভদ্রলোকই বা কে? তাঁর কী সম্পর্ক, এই সমস্ত ঘটনার সঙ্গে?
হিংস্র বাস্তুতন্ত্রের মধ্যে শ্বাপদের নিয়ত ছোটাছুটিতে গুলিয়ে যায়, কে শিকার আর কে-ই বা শিকারী!
শতরঞ্জ বড় জটিল! ভার্জিনিয়ার শান্ত শহরতলি থেকে কলকাতার ব্যস্ত রাজপথ, লাহোরের মোচি গেট থেকে বারুইপুরের বাজার, দিল্লির ক্ষমতার অলিন্দ থেকে চানেসার গোঠ-এর আন্ডারওয়ার্ল্ড, দুবাইয়ের বিলাসবহুল হোটেল থেকে ধাড়সা--- ষড়যন্ত্র ও পাল্টা ষড়যন্ত্রের সূক্ষ্ম জাল ছড়িয়ে আছে আমাদের চারপাশে!
যে কোনও সমষ্টিবদ্ধ জীবনে সংঘাত ও হিংসার অনিবার্যতা অনস্বীকার্য। ব্যক্তি বনাম ব্যক্তি , ব্যক্তি বনাম গোষ্ঠী , গোষ্ঠী বনাম গোষ্ঠী , সম্প্রদায় বনাম সম্প্রদায় , জাতি বনাম জাতি -- এমনতর নানা বিসংবাদকে কেন্দ্র করে হিংসার বহিঃপ্রকাশ , কখনও মৃদু , কখনও মর্মান্তিক।
কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রীয় জীবনে এমন হাজারো দ্বন্দ্ব সংঘাত নিরসন করার , শাসন, দমন করার ও প্রশমিত করার চূড়ান্ত ও নিরঙ্কুশ ক্ষমতা রাষ্ট্রের হাতে কেন্দ্রীভূত। এই অপরিমিত ও অপ্রতিহত ক্ষমতার সুবাদেই রাষ্ট্র প্রতিপক্ষহীনভাবে সমাজে সর্বব্যাপী আধিপত্য করে। সঙ্গতভাবে তাই রাষ্ট্রের এই সর্বাত্মক ক্ষমতার মধ্যেই নিহিত থাকে হিংসার সবচেয়ে সম্ভাবনাময় উৎস ; সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলা হয় potential source !
আধুনিক রাষ্ট্রীয় সমাজকে গোত্রবিচারে দুটিভাগে ভাগ করা যায় - গণতান্ত্রিক ও অগণতান্ত্রিক। প্রত্যেকটি শাসনব্যবস্থার শাসক ও শাসিতের দ্বৈততার মধ্যে নিহিত থাকে বিষমতা বা ফাঁক , যা থেকে শাসক শাসিতের সম্পর্কে ঘনিয়ে ওঠে ছোট বড় নানা দ্বন্দ্ব।
এটাই রাজনৈতিক গমনশীলতার প্রধান উপজীব্য -- এবং এই উপন্যাসেরও।
ইতিহাসের এ এক কঠিন আপার্তবৈপরীত আঙ্গিক যে একুশ শতকের সূচনায় যখন বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির ক্ষেত্রে নব পর্যায়ের বিপ্লব ঘটমান তখন তারই পাশাপাশি প্রবল হয়ে উঠেছে সন্ত্রাসবাদ ও সন্ত্রাসী ধর্মীয় মৌলবাদ। বিজ্ঞান ঋদ্ধ শিক্ষার ব্যাপক প্রসার এবং শ্রমের উৎপাদিকা শক্তির নাটকীয় বৃদ্ধি জনজীবনে ধর্মীয় মৌলবাদের প্রভাব লক্ষণীয়ভাবে হ্রাস করবে, এটাই ছিল স্বাভাবিক প্রত্যাশা। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি এবং ঘটছে না।
ধর্মীয় মৌলবাদের নাটকীয় অভ্যুত্থানের কারণ নিয়ে মনস্তাত্বিক , ঐতিহাসিক , দার্শনিক , সমাজবিজ্ঞানী অনেকেই চিন্তাভাবনা করেছেন। কিন্তু সর্বসম্মত কোনো ব্যাখ্যা এ তাবৎ মেলেনি। এবং সাম্প্রতিককালে এটাও স্পষ্ট যে সন্ত্রাসবাদ ও ধর্মীয় মৌলবাদ স্রেফ দরিদ্র , বঞ্চিত , অশিক্ষিত জনগণকেই উদ্বেলিত করে না -- উচ্চশিক্ষিত ও উচ্চবিত্ত স্তরের প্রভূত মানুষজন এর প্রভাবের দ্বারা আক্রান্ত। মৌলবাদী সন্ত্রাসের যাঁরা মূল প্রবক্তা ও সংগঠক , তাঁদের অনেকেই উঠে আসেন আপন আপন সমাজের বিত্তবান ও বিদগ্ধ উচ্চবর্গ থেকে।
উপন্যাসটি একটি আদ্যন্ত রাজনৈতিক থ্রিলার। উপন্যাটির পটভূমি এক্কেবারে ambivalent -- উভয়বঙ্গের বাস্তুহারা ছিন্নমূল মানুষের জীবনের খণ্ডচিত্র, দেশভাগের যন্ত্রণাপ্রসূত মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতার নেতিবাচকতার সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ।
স্বাভাবিকভাবেই এসেছে নাইন ইলেভেন। ২০০১ সালে আমেরিকার টুইন টাওয়ার হামলা, সন্ত্রাসবাদের ব্যঞ্জনা ও রাজনৈতিক মর্ম সম্ভবত চিরকালের জন্য বদলে দেয়। টুইন টাওয়ার হামলা, তার যাবতীয় ষড়যন্ত্রতত্ত্বসহ, গোটা বিশ্বে এক নতুন যুদ্ধের সূচনা করে – সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধ। প্রেসিডেন্ট বুশ ‘ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশন’ তত্ত্বের অনুসরণে মুসলিম বিশ্বের বিরুদ্ধে আমেরিকা ও পশ্চিমের ঘোষণা করেন নয়া ক্রুসেডের। পূর্বতন কম্যুনিস্ট ব্লকের পরিবর্তে এবার মুসলিম বিশ্ব হয়ে ওঠে পশ্চিমের প্রধান শত্রু।
এই সম্পূর্ণ দুঃস্বপ্নের বিপুলতা মন্থন করে তার নির্যাসটুকু শুষে উপন্যাসের অবয়বে নিয়ে এসেছেন অরিন্দম। অনুচ্চারণীয, অমীমাংসেয় , অস্থির, সর্বগ্রাসী সেই দুঃস্বপ্ন।
অরিন্দমের উপন্যাসের ৩৯৯ পাতার দীর্ঘ পরিসরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে আমাদের পরিচিত বেশ কিছু চরিত্র। তাদের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে এই অনন্ত দুঃস্বপ্নের মায়াজাল। সমাজের উচ্চতম প্রাঙ্গনের বেশ কিছু মানুষ, ক্ষমতার অলিন্দে স্বচ্ছন্দে বিচরণকারী বেশ কয়েকজন কেউকেটা ও প্রচুর আগ্রহী ও অনাগ্রহী জনসাধারণ এই উপন্যাসের চরিত্র। এইসব চরিত্রদের আমরা যেমন দেখেছি পথচলতিদের ভিড়ে , ট্রেনে-বসে, অন্ধকার গলির মোড়ে আবার কারও কথা পড়েছি খবরের কাগজে।
রাজনৈতিক থ্রিলার হিসাবে উপন্যাসটি সম্পূর্ণ ওপেন এন্ডেড। কোনো প্রোটাগোনিস্ট নেই সেই অর্থে। দু'টি মূল প্রশ্ন উঠে এসেছে লেখকের বিভিন্ন চরিত্রদের মাধ্যমে -
১) আদিম নীতি থেকে রাষ্ট্র হয়ে কোনোদিনই কি হয়ে উঠবে কল্যাণময়? ২) রাষ্ট্রক্ষমতা যাঁদের হাতে ও তাঁদের sanctum sanitarium আলো করে রাখেন যাঁরা, তাঁরা কি কোনোদিনও হয়ে উঠতে পারেন ন্যায়বান, জিঘাংসাহীন ও সকলের অধিকারের সুরক্ষক? দস্যু রত্নাকারের আদিম খোলস ছেড়ে রাষ্ট্র কোনোদিনও হয়ে উঠবে কি মনীষী বাল্মীকি? ৩) উল্লম্ব গতিশীল পশ্চিমা সভ্যতার আকর্ষণ আর একই সাথে আগ্রাসী পশ্চিমের প্রতি আক্রোশ স্ববিরোধিতা নয় কি ? ৪) ইসলামী মৌলবাদ কি মার্কিন বিদ্বেষের সমার্থক ? ৫) সন্ত্রাসবাদের উৎস এবং স্বরূপ কি আরও জটিল, আরও গভীর, আরও তমসাবৃত নয় ?
এই কয়েকটি প্রশ্নকে কেন্দ্র করেই সাবপ্লট রয়েছে অনেকগুলি। ষড়যন্ত্রের বিতংস ও ষড়রিপুর সংঘাত রয়েছে। কিন্তু এই গল্পের কোনো closure নেই। কোনো ফীল গুড ফ্যাক্টর নেই। বেশ কালো।
আর রয়েছে স্পাইক্রাফট বা গুপ্তচরবৃত্তির এক সমান্তরাল দুনিয়া।
উপন্যাসের সূচিমুখে তাই লেখক স্বীকার করে নিয়েছেন :
এ গল্পে রাষ্ট্রের ক্ষমতাশালী প্রভুরা আছেন। তাঁদের আদিগন্ত বিস্তৃত ক্ষমতালিপ্সু জিহ্বার স্পর্শ আছে। জটিল কুটিল মন্ত্রণাদাতারা আছেন। তাঁদের নিজের স্বার্থগন্ধী লড়াই আছে। বোড়ে ও ঘোড়ার রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম আছে। সাদা-কালো গুলিয়ে দেওয়া, পক্ষ বিপক্ষের হিসেবে গরমিল করে দেওয়া এই গল্পের শেষে পৃথিবী ঠিক তেমনটিই থেকে যায় , যেমনটি তা গল্পের শুরুতে ছিল।
অরিন্দমের উপন্যাসের মধ্যে জুড়ে দেওয়া হয়েছে বেশ কিছু ফ্ল্যাশব্যাকের ইনসেট, যার মাধ্যমে পাঠককে ঘটমান বর্তমান থেকে ঘটমান অতীতে নিয়ে যাওয়া হয়। অরিন্দমের লেখার মুন্সিয়ানা আক্ষরিক অর্থেই অদ্বিতীয়। বাংলার সঙ্গে তিনি সাবলীলভাবে মিশিয়েছেন বহু হিন্দি, ইংরেজি ও উর্দু বাক্যখণ্ড। উপন্যাসটির দু'চারটে জায়গায় শব্দচয়নে আরেকটু সচেতনতার প্রয়োজন থাকলেও অরিন্দমের ভাষা অত্যন্ত সাবলীল। লেখার গতি কখনও গোয়েন্দাকাহিনির মতো তরতরে, কখনও বা গভীর , দার্শনিক আর ঘনবদ্ধ।
পারস্যের বণিকরা ভারতবর্ষে চৌষট্টি খোপের এক মজার খেলা খেলতে দেখেছিল মানুষকে। এদেরই হাত ধরে আমাদের চতুরঙ্গ একসময় পাড়ি দেয় পারস্যে। সেখানে এর নতুন নাম হয় ‘শতরঞ্জ’। দাবার উদ্ভাবন আমাদের দেশেই। প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ থেকে জানা যায় যে ভারতে দাবার উদ্ভাবন ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষভাগে। সুবন্ধুর 'বাসবদত্তা' উল্লেখ করেছে দাবা খেলার। আরবদের থেকে শিক্ষা নেয় ইউরোপীয়রা। ভারত দখলের পরবর্তীকালে ইংরেজরা ভারতবর্ষীয় পদ্ধতিতে দাবা খেলার পরিবর্তন করে, দ্রুত নিস্পত্তির তাগিদে।
উপরের অংশটুকু স্রেফ উপন্যাসের নামকরণের সার্থকতা বোঝানোর জন্য বললুম। ��ধুনিক দাবার বিভিন্ন চাল বা movesএর অনুকরণে প্রত্যেকটি অধ্যায়ের নামকরণ করেছেন অরিন্দম। দাবার রসিক হয়তো সহজেই বুঝবেন সার্থকতা এবং মগনলাল মেঘরাজের ভঙ্গিমায় 'নাজুক , নাজুক' বলবেন , কিন্তু ম্যাংগো পাবলিককে গুগল দেখে বুঝতে হবে নবীর কসম।
লেখনী সাংঘাতিক বুদ্ধিদীপ্ত। মাঝে মধ্যে অরিন্দমের এক্সপ্রেশনের ঝলকানি চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। আমার মতো সাধারণ পাঠককে যথেষ্ট পরিশ্রম করতে হয়েছে ওঁর অনেক intended innuendo-র সাথে তাল মেলাতে।
আক্ষরিক অর্থেই প্লটে ন্যূনতম ফিল-গুড ফ্যাক্টর নেই। লেখকের ভাষায় : 'সর্ব মুশকিল আসান ও সর্ব সূত্র ব্যাখ্যাকারী কোনো প্রখর ডিটেকটিভ বা যুগাবতার নেই এ গল্পে। কোনো পক্ষ বিপক্ষ , জয়-পরাজয় , উচিত-অনুচিত নেই। শেষমেশ ধর্মের জয় ও অধর্মের বিনাশও দেখায় না এ গল্প। '
সভ্যতা নামের যে মুখোশ-আঁটা গোলকধাঁধার ভিতরে আমাদের বাস , এই গল্প তাকেই ডিকোড করার চেষ্টা করেছে মাত্র।
পড়ে দেখতে পারেন। একটাও স্পয়লার না দিয়ে লিখলাম। একবার পড়তে শুরু করলে লেখকের ত্রুটিহীন, অনবদ্য মুন্সিয়ানা আপনাকে দিয়ে গোটাটা পড়িয়ে নেবেই নেবে। আমার মতো নিরস ননফিকশনের পাঁড় পাঠককে ঘাড় ধরে পড়িয়ে নিলেন লেখক।
অরিন্দমকে তার আগামী সব প্রকল্পের জন্য শুভেচ্ছা জানাই।
কিছু কিছু বই থাকে, পড়ার পরে মনে হয়, আহা, মানুষকে এই বই সম্পর্কে জানাই। যত বেশী মানুষ এই বইটা পড়বে, তত ভাল। কিন্তু লিখতে বসলেই ব্যস, ভাঁড়ে মা ভবানী! সমস্ত তালগোল পাকিয়ে যায়, কোথা থেকে কীভাবে শুরু করবো, আর কোথায় গিয়ে শেষ করবো, ভেবে পাইনা।
'শতরঞ্জ' পড়তে গিয়েও এরকমই অবস্থা আমার। একেকটা পর্ব পড়ি, গুচ্ছের মানুষ এসে হাজির হয় - কেউ আসে দিল্লী থেকে, কেউ আসে আমেরিকা থেকে, কেউ আসে বারুইপুর থেকে, কেউ আসে, হ্যাঁ, পাকিস্তান থেকেও। পাকিস্তান মানে করাচীর কুখ্যাত চানেসার গোঠ, আবপারা ইত্যাদি অঞ্চল থেকে। গুল্ল করে এই অঞ্চলগুলো সম্পর্কে পড়লাম - ওরেবাবা, পড়েই তো ভয় লাগছে।
এই যে এত সংখ্যক মানুষ, এরা আসছেন সমাজের একদম উচ্চস্তর - দেশের প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা, মন্ত্রী, আমলা- থেকে শুরু করে সাংবাদিক, পড়ুয়া, পুলিশ, বাংলার শিক্ষক, মুচি, মানে পুরো সামাজিক স্পেকট্রাম।
কিন্তু এরা করছেন কী? অনেককিছু ঘটে যাচ্ছে, কিন্তু একটার সঙ্গে অন্যটার কোনো লিঙ্ক আমি তো পাচ্ছি না। তারিখ দেওয়া আছে প্রতি পর্বের শুরুতে, কিন্তু সেখানে ট্যুইস্ট হচ্ছে, প্যাটার্নটা নন-লিনিয়ার। ফলে টাইম ফলো করলেও কিস্যু বোঝা যাচ্ছে না। যা থাকে কপালে, ভেবে এগিয়ে চললাম।
অবশেষে...বেশ খানিকটা এগোনোর পরে, মনে হল, কিছু যেন দিশা পাচ্ছি। আপাত-সম্পর্কহীন এই যে সব ঘটনাবলী, এদের মধ্যে খুব সূক্ষ্ম কিছু প্যাটার্ন আছে। বেশ কিছু ঘটনা ঘটে যাচ্ছে, বা ঘটানো হচ্ছে, কোনো বৃহত্তর ঘটনাকে রূপ দিতে।
রাজনীতি এই বইয়ের মূল উপজীব্য। রাজনীতির বেসিক মন্ত্র হচ্ছে - এখানে কেউ কারো বন্ধু নয়, কেউ কারো শত্রু নয়, কেউ ভালও নয়, কেউ মন্দও নয়, সবাই ঘুরছে নিজের নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য। সেইজন্যেই, এই কাহিনিতেও, কেউ পুরো সাদা নয়, কেউ পুরো কালোও নয়। কাহিনির শেষেও, ঠিক-ভুলের বিচারটা কেমন যেন ঘেঁটেই থাকে। তার ওপর, রাজনৈতিক মঞ্চ যদি হয় ভারত এবং পাকিস্তান, তাহলে তো আরোই সরেস হয় ব্যাপারটা।
অরিন্দমবাবু বেশ লিখেছেন বইটি। ডিটেলের প্রতি তাঁর চোখ আছে, এবং সেই ডিটেলিং-এর যোগ্য কলমও আছে। একটা হার্ডকোর থ্রিলারের মধ্যেও তিনি হিউমার এনেছেন, তবে সেটা কখনোই আরোপিত মনে হয়নি। কাহিনির শুরুতে তিনি গাঁতিয়ে ঢিল দিয়েছেন, প্রচুর সুতো ছেড়েছেন, প্রচুর ঘটনা আমদানি করেছেন, কিন্তু অত্যন্ত সুনিপুণভাবে, সবকটা সুতোকে জড়ো করে, আটকেছেন। কাহিনির শেষটা অনবদ্য, এই জটিল ঘটনাপ্রবাহের এরকম ওপেন-এন্ডেড সমাপ্তিই বাঞ্ছনীয়।
পাঠক হিসেবে বলি, খুব মনোযোগের দাবী রাখে এই বই। ঘটনার ঘনঘটা সামলাতে মাঝে মাঝেই পাতা উলটে দেখতে হয়েছে, ফিরে ফিরে পড়তে হয়েছে। তবে পড়া শেষ করে, খুব তৃপ্তি পেয়েছি।
এবারে আসা যাক কিছু অত-ভাল-নয় ব্যাপারে।
১। বিভা-র প্রোডাকশন বেশ ভাল, পেপারব্যাকটা অত্যন্ত ছিমছাম হয়েছে, স্মার্ট লুক যাকে বলে। মুদ্রণ প্রমাদ একদমই সামান্য।
তবে, একুশ নম্বর পর্বে, পটান্তরের সময়, হঠাৎ করেই অরুণ সচদেভের অংশ থেকে শামসুদ্দিন-জব্বারের কাহিনি আরম্ভ হচ্ছে (পাতা ২৫৯)। কোনো গ্যাপ বা বিরতি নেই। এই একই পর্বে, পট পরিবর্তন হয়ে পরীক্ষিৎ ঢুকে পড়ছেন ২৬২ পাতায়। প্রথমে ভেবেছিলাম এটা শুধু এই পর্বেরই ব্যাপার, কিন্তু এই ব্যাপার এর পর থেকে মাঝেমাঝেই ঘটেছে। পাতাসংখ্যা কম রাখার জন্যেই কি এরকম?
গোটা বইটা এতই ভালভাবে বিন্যস্ত যে এই ত্রুটিটা খুবই চোখে লাগলো।
২। অরুণ, রাকেশ, শেখরণ, প্রদীপবাবু, পরীক্ষিৎ - এঁদের ক্ষেত্রে, মাঝেমাঝেই 'তাঁর' থেকে 'তার', 'ভাবলেন' থেকে 'ভাবলো' হয়ে গেছে। বস্তুত, শুরুতে এই মিক্সাপ অনেকটাই কম ছিল, কিন্তু পরের দিকে এটা প্রচন্ড বেড়ে গেছে। আশা করি লেখক এবং প্রকাশক, উভয়ে মিলে পরের সংস্করণে এটা শুধরে নেবেন।
বাংলায় পলিটিক্যাল থ্রিলার আমি এর আগে পড়িনি। 'শতরঞ্জ' আমার পড়া এই বছরের অন্যতম সেরা বই হয়ে রইলো, এবং বাংলায় পড়া সেরা পলিটিক্যাল থ্রিলার।
আমার মতো গোবেচারা গৃহবধূ, যারা ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ায়, তাদের লাইফস্টাইলটা জানেন তো; থোড়-বড়ি-খাড়া, খাড়া-বড়ি-থোড়। এ হেন আমার জীবনে সশরীরে এক ইয়া গোবদা চেহারা নিয়ে থ্রিলার হাজির হলে, কত পরিমাণে পুলকিত হতে পারি ভাবুন! এ থ্রিলার আবার যে সে থ্রিলার নয়, ষড়যন্ত্রের এক বিশালাকার জাল বুনে চলা পলিটিক্যাল থ্রিলার। ফলে, যাঁরা রাজনীতি ভালবাসেন, সেই সঙ্গে রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার সাক্ষী হতে চান, এই বই নিঃসন্দেহে তাঁদের জন্য। বইয়ের জাল এই উপমহাদেশ জুড়ে ছড়ানো। আন্তর্জাতিক এক ঘটনাকে কেন্দ্র করেই ঘটে চলল কিছু ঘটনা। তাদের মধ্যে কোনও সংযোগ কেউ খুঁজে পাচ্ছে না। কিন্তু সত্যিই কি সেগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা! বাংলা রহস্য রোমাঞ্চ গল্পে যেমন দেখি, তাবড়-তাবড় অফিসাররা হাবুডুবু খাচ্ছেন, এদিকে বাঘা গোয়েন্দা এসে সব 'চুটকি মে মুশকিল আসান' করে দিল, সে ভ্যাদভেদে গল্প এখানে পাবেন না। পাবেন, শার্প ব্রেনের অধিকারী কিছু সরকারি অফিসার। পাবেন, মিনিটে মিনিটে বুক ধরাস করে ওঠার মতো সিচুয়েশন। পাবেন, আর্বান-স্মার্ট ঝরঝরে পরিষ্কার স্বাদু বাংলা গদ্য। পাবেন, রক্তমাংসের কিছু চেনা চরিত্র, কল্পনার আড়ালে। পাবেন... আহ! নিজে পড়ুন, সব আমি কেন বলব!
কিন্তু, বইটি সম্পর্কে আমার কিছু অভিযোগ ���য়েছে। সাধারণ পাঠক বলেই আমার এ অনুযোগ। প্রাজ্ঞ ব্যক্তির কাছে সে সব নস্যি। 1, বইয়ের অধ্যায়ের নামগুলো সবই দাবার চাল দিয়ে। আমি দাবা বুঝি না, তাই অধ্যায়ের কনটেন্টের সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রেই নামটি কানেক্ট করতে পারিনি। 2, লেখক এত বেশিবার 'ছা-পোষা' শব্দটি ব্যবহার করেছেন যে, শেষে এসে আমি বেশ বিরক্ত হয়েছি। 3, বইয়ের দাম। সেটি প্রকাশক দেখেন, নাকি লেখক, আমি জানি না। এত বেশি দাম দিয়ে কোনও কলেজ স্টুডেন্ট কি বইটা কিনতে পারবেন? 4, বইয়ের সমাপ্তি। এমন ওপেন এন্ডিং আমি নিজে নিতে পারি না। 5, বুদ্ধিমান মানুষেরা একই রকম ভাবেন--- এ কথা সত্য। কিন্তু, দু-তিন পাতার অন্তরে দুটি মানুষের চিন্তা ভাবনার ভাষা একই হয়ে যাওয়াটা দৃষ্টিকটু লেগেছে। 6, প্রচুর চরিত্রের সমাবেশ। গল্পের খাতিরে এত এত চরিত্রকে আনতে হয়েছে, তার উপর আবার যাদের প্রয়োজন নেই, সেই সব চরিত্রদেরও ব্যকগ্রাউন্ড টেনে আনায় কয়েকটি জায়গায় পড়ার আসল উত্তেজনা স্তিমিত হয়ে গিয়েছিল।
এতদূর পড়েও লেখক যদি মনে মনে গালিগালাজ করে আমার বাপ-পিতেম উদ্ধার না করে দেন, তাহলে শেষ অবধি তাঁকে শুভেচ্ছা জানিয়ে যাই। তাঁর প্ল্যাটিনামের কলম তীক্ষ্ণতর হোক।
পুনশ্চ- এটা না লিখলে অন্যায় হত। ক্যাফে টেবলের বইয়ের প্রচ্ছদ সবসময়েই দুর্দান্ত হয়। 'শতরঞ্জ'ও তার অন্যতম উদাহরণ। প্রচ্ছদ শিল্পী স্বর্ণাভ বেরাকে অসংখ্য সাধুবাদ জানাই। বইটা হাতে পেয়েই, আমার কন্যেটি এই প্রচ্ছদ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে একটি ছবি এঁকে, নিজের ঘরের দেওয়ালে সাঁটিয়ে রেখেছে। আপনাকে নমস্কার জানাই স্বর্ণাভ বাবু।
গত চারদিন বুঁদ হয়ে ডুবেছিলাম অরিন্দম চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস শতরঞ্জে। এখনো ঘোর লেগে আছে, যা কাটিয়ে উঠতে সময় লাগবে । কিছু কাহিনী এমন হয়, যা পড়ার সময় অন্য কোনদিকে আর মন যায় না, অসম্ভব মনোযোগ লাগে... যা ভীষণভাবে ভাবায়, এবং শেষ হওয়ার পরও তার রেশ রয়ে যায়। শতরঞ্জ এমনই একটি উপন্যাস । ৪০০ পাতার এই উপন্যাস একটি পলিটিক্যাল থ্রিলার... এক বিশাল ষড়যন্ত্রের কাহিনী। প্রেক্ষাপট আমাদের এই উপমহাদেশ, ভারত পাকিস্থান । এই কাহিনীর বিস্তার এই দুই দেশের বিভিন্ন শহরের বিভিন্ন স্তরের মানুষদের ঘিরে। তাদের লোভ লালসা, ক্ষমতা দখলের মানসিকতা, কূটনীতি, ষড়যন্ত্রের জাল এবং গুপ্তচরবৃত্তি... এইসব নিয়েই গড়ে উঠেছে এই কাহিনী। শতরঞ্জের সাদা কালো ঘুটির মতোই এই গল্পের চরিত্র গুলি। কখন কোন চাল বাজিমাত করবে , কে নির্মম ভাবে বলি চড়বে, কোন দান কাকে এগিয়ে রাখবে, কার পাল্লা কখন ভারী হবে... পড়তে পড়তে মাঝে মাঝেই গুলিয়ে যায় । ফিরে ফিরে পড়তে হয় ঘটনাবলী বার বার। প্রতিটি অধ্যায়ের শুরুতে তারিখ উল্লেখ করা থাকলেও , নন লিনিয়ার প্যাটার্নের জন্যে তাতে বিশেষ সুবিধে হয়না। প্রসঙ্গত উল্লেখ যোগ্য, প্রতিটা অধ্যায়ের নামকরণ করেছেন লেখক, শতরঞ্জের বিভিন্ন চালের নাম দিয়ে..., এটি অবশ্যই একটি বিশেষ মাত্রা যোগ করেছে লেখায়।
লেখক অরিন্দম চট্টোপাধ্যায়ের লেখনী অসম্ভব স্মার্ট, মেদহীন, ঝকঝকে... এতো বড় থ্রিলার কাহিনীতে তিনি টানটান ভাবটা আগাগোড়া ধরে রাখতে পেরেছেন। লেখায় আছে ডিটেইলের প্রতি যত্ন, সে চরিত্র গুলির বিন্যাসেই হোক বা কোনো একটি জায়গা বা ঘটনার বর্ণনাতে। গল্পের অনেকগুলি ট্রাক, চরিত্রও প্রচুর... কিন্তু প্রতিটি ট্রাক তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সামলেছেন, কোথাও কোনো ঘটনা প্রেডিক্টেবল বলে মনে হয়নি, বা কখনও গল্পের পেস স্লো বা বোরিং হয়ে যায়নি... গল্পের পরতে পরতে চমকটা লেখক তাঁর সুনিপুণ লেখনী দক্ষতায় বজায় রাখতে পেরেছেন।আদ্যোপান্ত এই সিরিয়াস গল্পে লেখকের ছোট ছোট হিউমারও বিশেষ ভাবে নজর কাড়ে।
শুধু শেষের দিকে বেশ কিছু অধ্যায় বদল হয়েছে কোনোরকম গ্যাপ না দিয়ে... এই জায়গাগুলো বুঝতে একটু অসুবিধে হয়।
শতরঞ্জ বইটি সংগ্রহ করে, পড়ে দেখতেই পারেন। পড়তে পড়তে এর সাথে একাত্ম হয়ে যাবেনই। বইটি শেষ না করে, অন্য কিছুতে মন বসাতে পারবেন না। অরিন্দম চট্টোপাধ্যায়কে আগামী সব লেখার জন্য রইল আগাম শুভেচ্ছা।
বইটা বেশ বড়, দামটা বড্ডই বেশি, কিছু কিছু চরিত্রের ব্যাকস্টোরি বড্ড বেশি ডিটেইলে দেওয়া হয়েছে, পরে দেখা গেছে সেই চরিত্রগুলো একেবারেই মাইনর। বড্ড বেশি চরিত্রের সমাহার হয়ে গেছে, প্রথমদিকে বেশ গুলিয়ে যায়। সবকটা পরিচ্ছদের নাম ইংরেজিতে কেন?
এরকম টুকটাক কিছু বক্তব্য বাদ দিলে অসম্ভব টানটান। কাহিনীর মাঝামাঝিতে পৌঁছে গেলে নামিয়ে রাখা যায়না। হাইলি রেকমেন্ডেড। আরও আসুক এরকম।