বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কোর অব ইঞ্জিনিয়ার্সে কমিশন লাভ করা একজন অফিসারের সামরিক জীবনের শুরুর দিনগুলো নিয়ে এই বইটিতে গল্প করা হয়েছে। বইটি আত্মজীবনী হলেও গল্পের খাতিরে অনেক বিষয় সহজভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। মিলিটারি একাডেমির প্রশিক্ষণের পর কাপ্তাই লেকের অভূতপূর্ব সৌন্দর্যঘেরা পরিবেশে যে জীবনের শুরু, পোস্তগোলার প্রান্তে বুড়িগঙ্গার উত্তাল বর্ষা, নাটোরের কাদিরাবাদ সেনানিবাসের বৈশাখী ঝড়ে আমের ঘ্রাণ, শীতকালীন মহড়ার পরিশ্রম আর আনন্দময় অভিজ্ঞতা, সিলেটের স্কুল অব ইনফ্যান্ট্রি অ্যান্ড ট্যাক্টিক্স, বাঁধভাঙা বৃষ্টিধারা, প্রকৃতির গুঞ্জন-এই সবকিছুকে আঁকড়ে ধরেই জীবন বয়ে চলে। সেনাবাহিনীর যেকোনো তরুণ অফিসারের সামরিক জীবনের গল্প কম-বেশি একই রকম। লেখকের ‘কমান্ডো’ ট্রেনিং-পরবর্তী সামরিক জীবনের একটি অংশ নিয়ে এই বই রচিত হয়েছে।
রাজীব হোসেন এর লেখার পরিধি বিচিত্র। গ্রামে জন্ম নেয়া এবং সেখানে ক্ষেতের আইলে দৌড়ে বেড়ে ওঠার কারণে, দস্যিপনায় ভরা স্মৃতিমুখর শৈশব। লুকিয়ে মাছ ধরা, আম চুরি করা আর তল্লাট চষে বেড়ানো সেই শিশু, তার কৈশোরে এসে পাড়ি জমায় ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের বিস্তৃত প্রাঙ্গনে। ১৭৫ একরের চারণভূমিতে ভিত গড়ে ওঠা। এক সময় সেনাবাহিনীতে যোগদান এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশ আর্মি স্পেশাল ফোর্সে কাজ করার সুযোগ হয়। সেনা পরবর্তী দ্বিতীয় জীবনে সুন্দরবনের গহীনে রয়েল বেঙ্গল টাইগার কঞ্জারভেসন প্রজেক্টে কাজ করার সুবাদে, গহীন জঙ্গলের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা রয়েছে। একজন আন্তর্জাতিক আল্ট্রা ম্যারাথন রানার হিসেবে পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে ভ্রমণের সুযোগ হয়েছে। এহেন বিচিত্র কর্মজীবন হবার কারণে অভিজ্ঞতার ঝুলি সমৃদ্ধ। এছাড়া মুক্তিযোদ্ধা বাবা খন্দকার আবু হোসেন একজন রাজনীতিবিদ এবং মা শামসুন্নাহার একজন শিক্ষিকা ও নারী অধিকার আন্দোলনের নেত্রী হবার কারণে, প্রান্তিক মানুষের জীবনের সাথে জীবনভর সখ্যতা। জগত সংসারের অনেক ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ পথের অভিযাত্রী রাজীব হোসেন কবিতা, রম্য রচনা, ভ্রমণ কাহিনী, এডভেঞ্চার, প্রকৃতি কিংবা মিলিটারি বিষয়ে লিখলেও- প্রথম বইয়ের বিষয় হিসেবে বেছে নিয়েছেন নিজের লাইফ কোডঃ “কমান্ডো”। লম্বা সময় ধরে সোশ্যাল মিডিয়াতে খণ্ড আকারে প্রকাশ পাওয়া এই বইটির পাঠক চাহিদা থাকায়, বইটির আয়োজন। লক্ষ্য- তরুণ প্রজন্মের কাছে একটি সম্মান ও পরিশ্রমের জীবনের চিত্র তুলে ধরা। যাত্রা সবে শুরু হলো। তিনি চান, সামনের দিনগুলোতে পাঠকের আত্মার কাছে পৌঁছানোর লেখা নিয়ে আসতে, যেন মানুষের বই পড়ার অভ্যাস আরও পোক্ত হয়।
#myreads কয়েকদিন আগে "কমান্ডো" সিরিজের ২য় বইটি পড়লাম। বইটির নাম : দ্যা ইম্ব্যাল্যান্সড বাফেলো"। এই বিচিত্র নামের কারণ একটু পরেই বলছি, তার আগে বইটি সম্পর্কে জেনে নেয়া যাক।
লেখক রাজীব হোসেন এর কমান্ডো ট্রেনিং পরবর্তী জীবন এর গল্প নিয়েই বইয়ে বেশিরভাগ আলোচনা। কিন্তু, লেখকের কমান্ডো ট্রেনিং এ যাওয়ার আগে কাপ্তাইয়ে ৫ রিভারাইন ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যাটালিয়ন এ চাকরির সময়ে নয়নাভিরাম কাপ্তাই এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, বিশেষ করে কাপ্তাই এর বৃষ্টির বর্ণনা পাওয়া যায় বইয়ের শুরুর দিকে। কোনো ব্যাটালিয়নে নতুন অফিসার ক্যাডেট জয়েন করলে প্রথম দুই মাস তার আইসব্রেকিং সেশন হিসেবে ব্যাটালিয়নের প্রতিটি পজিশনে কাজ করতে হয়। পাশাপাশি প্রথমদিকে অফিসারদেরও সৈনিক মেস এ থাকা লাগে। তরুণ সেকেন্ড ল্যাফটেনেন্ট লেখকের আইসব্রেকিং এর সময়টা কিরকম ছিলো? সংক্ষেপে বললে বলতে হয় ঘটনাবহুল।
কাপ্তাই থেকে 5 RE ব্যাটালিয়ন পোস্তাগোলায় শিফট হয়। লেখকও নয়নাভিরাম কাপ্তাই ছেড়ে ঢাকায় আসেন। পোস্তাগোলা সেনানিবাসে কিছুদিন থাকার পরই কমান্ডো কোর্সে সুযোগ পেয়ে তিনি সিলেটে জালালাবাদ সেনানিবাস এ পাড়ি জমান। তার কমান্ডো ট্রেনিং এর বিস্তারিত গল্প শোনা যাবে "কমান্ডো" বইটিতে। কমান্ডো কোর্স করে ফিরে আসার পর পোস্তাগোলায় তার কর্মজীবন নতুনভাবে শুরু করেন। গোটা ব্যাটালিয়নে একমাত্র তিনি বুকে প্যারাকমান্ডো ইন্সিগনিয়া লাগিয়ে দাপটের সাথে তাকে দেয়া সব দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। এরই মধ্যে ডাক পড়ে কম্ব্যাট ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্স এর। লেখক আবার পাড়ি জমান নাটোরে। কম্ব্যাট ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্স শেষে ওইন্টার এক্সারসাইজের সময়। বিভিন্ন মহড়া সম্পন্ন করা, এক গ্রামে সিমুলেটেড এটাক ডিস্প্লে করতে গিয়ে গ্রামবাসীর সাথে ভুলবোঝাবুঝির জন্য আর্মিদেরকে "ডাকাত" সন্দেহ করে গ্রামবাসীর বল্লম হামলা, ১২০ কিলোমিটার নৌকা বাইচ এর অমানবিক গল্প সহ অনেককিছু জানা যাবে এই অংশে। লেখকের ওয়েপন ট্রেনিং এর জন্য ডাক পড়ে আবার সিলেটের জালালাবাদ সেনানিবাসে অবস্থিত SI&T(School of Infantry and Tactics) এ। তার পুরোনো কমান্ডো ইন্সট্রাক্টরদের সাথে একটা রিইউনিয়ন হয়। সেখানে মমতাজের গান, গুইসাপের বারবিকিউ, মেসে এক্সট্রা খাতিরদারি সহ অনেক সুন্দর সময় কাটে লেখকের। এরই মধ্যে লেখক দুইবার প্রমোশন পেয়ে সেকেন্ড ল্যাফটেনেন্ট থেকে ক্যাপ্টেন হন। তার ব্যাটালিয়নের আর্মি কমান্ডো ট্রেনিং এর ইন্সট্রাক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ( এক্ষেত্রে তিনি মেজর জিয়া ও মেজর ইমতিয়াজের কাছে কৃতজ্ঞ😂)। লেখক গার্মেন্টস ধ্বসের পর উদ্ধার অভিযান, ওয়াসার সাথে পানি বন্টন সহ বিভিন্ন সিভিলিয়ান এক্টিভিটিতে অংশগ্রহণ করেন।
বরাবরের মতোই লেখক বিভিন্ন চরিত্রকে অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। কম্ব্যাট ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্স ও ওয়েপন ফায়ারিং কোর্স দুই ক্ষেত্রেই তার রুমমেট হিসেবে ল্যাফটেনেন্ট ফুয়াদকে পান। ল্যাফটেনেন্ট ফুয়াদ কিছুটা নিজের মধ্যে হারিয়ে থাকা ব্যাক্তিত্ব। কিন্তু লেখকের খারাপ সময়ে অত্যন্ত যত্নের সাথে লেখকের পাশে থেকেছেন। এছাড়াও সেলিম নামে আরেকজন অফিসার এর সাথে লেখকের সখ্যতা থাকে। একসাথে ওয়েপম কোর্স করার পর ফুয়াদ ও সেলিম উভয়ই কমান্ডো কোর্সে যোগদান করেন। লেখক তার 5 RE ব্যাটালিয়ন এর অধিনায়ক এর থেকে একজন ভালো দলনেতা হওয়ার অনেক শিক্ষা ও অনুপ্রেরণা নিয়েছেন সময়ে সময়ে। এছাড়াও বিভিন্ন সিভিলিয়ান ও সৈনিকের সাথে লেখকের মজার অভিজ্ঞতাও সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। আমার নিজের সবচেয়ে ভালো লেগেছে এক সৈনিকের " সিভিল বিড়াল" এর গল্পটা😂
এখন নামকরণ এর ব্যাপারে বলি, লেখক USA আর্মির স্পেশাল ফোর্স এর সাথে একটি জয়েন্ট এক্সারসাইজ এ যান চট্টগ্রামের সেনানিবাসে। দুপুরে ফাকা সময় থাকায় তিনি সেনানিবাসে কড়া রোদের মধ্যে দৌড়ান। একজন সিনিয়র অফিসার বিষয়টি দেখে অত্যন্ত রেগে যান। লেখককে এই ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করতে তিনি তার "এক্সারসাইজ ব্যালেন্স বাফেলো" এর কথা বলেন। তারপর সেই অফিসারের বক্তব্য: " আরে, তুমি নিজেই তো একটা ইম্ব্যালেন্সড বাফেলো!"। আমি লেখককে ফেসবুকে ফলো করি। তিনি BRAC University এর একজন alumni. অবসরের পরও তার এই "ইম্ব্যালেন্সড বাফেলো" হওয়ার রীতি অবিচল রয়েছে। পোস্তাগোলায় কয়েকবছর পোস্টিং এর পর লেখকের ডাক পরে ১ প্যারা কমান্ডো ব্যাটালিয়নে যোগদান করার জন্য। আবার ফিরে আসা সিলেটের জালালাবাদ সেনানিবাসে। লেখকের প্যারেন্ট ইউনিট 5 RE ব্যাটালিয়ন থেকে বিদায়ের বেলায় হাজারো সুখস্মৃতি রোমন্থন করে তার কমান্ডো জীবনের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত হোন।
বইটি অনেকটা পার্সোনাল ডায়েরির মতো। একজন সেনাঅফিসারের জীবন সম্পর্কে একটু ভিন্ন দৃষ্টিকোণ দেয় বইটি।
This entire review has been hidden because of spoilers.
বইটি লেখক রাজীব হোসেনের মিলিটারি জীবনে কমিশন লাভের পর শুরুর দিককার স্মৃতিচারণ মূলক বই। একজন সেনাসদস্য বা সেনা অফিসারের জীবন যে কত বৈচিত্রময় তাই তুলে ধরা হয়েছে এই বইটিতে। লেখক খুব সুন্দর ভাবে তার সেনাজীবনের প্রারম্ভিক দিনগুলোর চমকপ্রদ ও স্মৃতিময় ঘটনাগুলো বইটিতে তুলে ধরেছেন। সেনাবাহীনির যে কোন সদস্যকে তার চাকুরিজীবনে অসংখ্য প্রশিক্ষন ও বিভিন্ন কর্মকান্ডের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। একই সাথে পালন করতে হয় অর্পিত দায়িত্ব। সরকারের নির্দেশে সেনা পরিকাঠামোর বাইরেও সাহায্য করতে হয় সিভিল কাজে। এর ফলে যে অভিঙ্গতা সঞ্চয় হয় তা আসলেই অনন্য।
সেনা জীবনের এইসকল অভিঙ্গতা ও মজার মজার কিছু ঘটনা নিয়ে লেখকের অনবদ্য উপস্থাপনায় বইটি বেশ সুখপাঠ্য। বইয়ের নামকরনের পেছনেও বেশ মজার একটি ঘটনা আছে যেটা বইটায় বর্ননা করা আছে। দ্য ইম্ব্যালান্সড বাফেলো বইটি লেখক রাজীব হোসেনের ২য় বই। আর্মি কমান্ডো ট্রেনিং নিয়ে লেখা তার প্রথম বই “কমান্ডো” পাঠকদের কাছে বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। আশা করা যায় এই বইটিও পাঠকমহলে সমাদৃত হবে।