গত প্রজন্মের এক ছিন্নমূল পরিবার এপার বঙ্গে এসে মফস্বলে থিতু। এখানে ভাড়া বাড়ি আছে, পাড়া আছে, গঙ্গার ঘাট আছে, আছে হৃদয়ে কাঁটাতারের দাগ নিয়ে জীবনের উদযাপন। আর? বাবার ইয়াশিকা ক্যামেরা। যে ধরে রাখে মুহূর্তকে। সেই মুহূর্ত আর স্মৃতি এবার বইয়ে।
চলচ্চিত্র বিষয়ে অধ্যাপনা, তথ্যচিত্র নির্মাণ, ফিল্ম, টেলিভিশন ধারাবাহিক ও ওয়েব সিরিজের চিত্রনাট্য রচনা এবং তার ফাঁকে ফাঁকে নিজের ব্লগে নানা স্বাদের লেখালেখি-এইসব নিয়েই কল্লোল লাহিড়ী। প্রকাশিত উপন্যাস গোরা নকশাল (২০১৭)। ইন্দুবালা ভাতের হোটেল(২০২০)। নাইনটিন নাইনটি আ লাভ স্টোরি (২০২২)। ঘুমিয়ে পড়ার আগে (২০২৪)। স্মৃতিগদ্য গ্রন্থ বাবার ইয়াশিকা ক্যামেরা (২০২১)। লেখক গোরা নকশাল এবং ইন্দুবালা ভাতের হোটেল উপন্যাস দুটির জন্য দুহাজার একুশ সালে ভূমধ্যসাগর পত্রিকার 'শ্রীমতী সাধনা সেন সম্মান'-এ সম্মানিত।
ভীষণ রকম মন ক্যামন করা একটা বই। এই কটাদিন খুবই উদাস উদাস সময় কাটলো কল্লোলবাবুর গল্প শুনে শুনে।
কল্লোল লাহিড়ী খুবই মায়াময় করে গল্প বলেন সেটা উনার ইন্দুবালা ভাতের হোটেল বইটা পড়ে টের পেয়েছিলাম। এবার তিনি শুনিয়েছেন নিজের গল্প, পরিবারের গল্প, দেশভাগের গল্প, পূর্বপুরুষদের দেশত্যাগের গল্প, দেশকে মিস করার গল্প, ঠাম্মা, বড়মা, মা, মণি, হাঁদা, জেঠু, বাবা, কাকু, আরো কততততত। কিছু মানুষ মুখ ফুটে বলেন না কিন্তু মনের গহীনে দেশের জন্য, কাছের মানুষদের জন্য কি ভীষণ রকম মমতা পোষণ করে গেছেন সারাটা জীবনভর।
কত কতবার যে চোখ ভীজে উঠেছে এসব মায়া-মমতায় মাখা গল্প শুনতে গিয়ে।
কল্লোলবাবুর বাবার বন্ধু তাকে উপহার দিয়েছিলেন ইয়াশিকা ক্যামেরা। সেটা দিয়ে এন্তার ছবি তুলা হয়েছিল। অনেক অনেক ছবি হারিয়ে গিয়েও অ -নে-ক ছবির নেগেটিভ থেকে গিয়েছিল উনাদের বাসায়। বাসা বদলাতে গিয়ে সেই নেগেটিভগুলো হাতে আসে। ডিজিটাল যুগে সে সব নেগেটিভ ওয়াশ করে ছবি করাও বেস ঝক্কির কাজ।
সেই ঝক্কি সামলে উঠে কল্লোলবাবু পাঠকের জন্য গল্পের ডালি খোলে দিলেন। সে সব হারিয়ে যাওয়া ছবি ও ছবির গল্প, ছবির মামুষগুলোর গল্প, ছবির বাইরের গল্প নিয়ে এই বই।
কল্লোল লাহিড়ীর লেখায় কেমন যেন একটা মন কেমন করা সুর থাকে, ইন্দুবালা ভাতের হোটেল পড়েও এটা টের পেয়েছি। কেমন যেন... ঠিক বুঝানো যায় না! বুকের মধ্যে একটা আরাম আরাম হু হু করা ভাব!
ছবি— একটা মুহূর্তকে বন্দি করে রাখার এক জাদুকরী মাধ্যম। সময় চলে যায়, মানুষ বদলে যায়, কিন্তু ছবিতে ধরে রাখা সেই এক ফ্রেমের গল্প থেকে যায় অমলিন। ছবি ধরে রাখে সেই হারিয়ে যাওয়া মুহূর্তটুকু, ঠিক যেমনটা ছিল। একটিমাত্র ক্লিকেই ধরে রাখা যায় হাসি, ভালোবাসা, কিংবা বিষাদের ছোঁয়া। ছবির পাতায় জীবন্ত হয়ে ওঠে হারিয়ে যাওয়া সময়, ফিরে আসে প্রিয় মুখগুলো। স্মৃতির টানাপোড়েনে যখন মন ভার হয়, তখন একটিমাত্র ছবি এনে দিতে পারে সান্ত্বনা আর অদ্ভুত এক প্রশান্তি। কোনো পুরোনো অ্যালবাম খুললেই হয়তো চোখে ভেসে ওঠে আম্মুর কোলে বসে থাকা ছোট্ট ‘আমি’, অথবা প্রিয় বন্ধুর সঙ্গে হাসিমাখা স্কুলের দিনগুলো। একটিমাত্র ছবিই যেন বলে দেয় হাজারো না বলা কথা, ফিরিয়ে আনে হারিয়ে যাওয়া মানুষ আর মুহূর্তকে। ছবির পাতায় তাই শুধু মুখ নয়, থেকে যায় ভালোবাসা, আবেগ আর সময়ের ছোঁয়া। ছোটবেলায় আমার একার যত ছবি তোলা হয়েছিল, সেটা বাসার বাকি ৩ জনের ছবি একত্র করলেও এর চেয়ে বেশি হবে। মাঝে মাঝেই ছবির অ্যালবামগুলো ঘেঁটে দেখি। ছবির অনেক মানুষের সাথে এখন আর সেভাবে যোগাযোগ নেই, অনেকে বেঁচেও নেই৷ তবুও একরাশ নস্টালজিয়া কাজ করে৷ ঠিক যেমন এই বইটা পড়তে যেয়ে অনুভূত হয়েছে। . . বইয়ের নাম দেখেই বোঝা যাচ্ছে বইটা কী নিয়ে। লেখক তাঁর বাবার ইয়াশিকা ক্যামেরা আর সেই ক্যামেরায় তোলা ছবিগুলো নিয়ে করে গেছেন একের পর এক স্মৃতিরোমন্থন।
আর বইয়ের প্রচ্ছদে যেই সাদাকালো ছবিটা দেখতে পারছেন, সেটাও সেই ইয়াশিকা ক্যামেরায় তোলা। বইটা পড়ার সময় মনে পড়লো ইয়াশিকা ক্যামেরা বোধহয় আমাদেরও আছে। আলমারি খুলে সব জিনিস লণ্ডভণ্ড করে একদম কর্নারে ক্যামেরাটা খুঁজে পেলাম। হাতে নিয়ে মনে পড়লো এমন আরো একটা ক্যামেরা ছিল। যেটা নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর খেলনা বানিয়ে সব যন্ত্রপাতি খুলে ফেলেছিলাম। এইটা কোনো কারণে ইনট্যাক্ট রয়ে গেছে। . . এখন তো ছবি তুললেই সেটা অটো ক্যামেরায় সেভ হয়ে যাচ্ছে। আপনি চাইলেই সাথে সাথে ছবির কোয়ালিটিও দেখতে পারছেন। কিন্তু বছর বিশেক আগেও এই সুবিধা ছিল না। তখন স্মৃতি সংরক্ষণের প্রধান মাধ্যম ছিল ফিল্ম নেগেটিভ। তো লেখকের বাবা এই ক্যামেরাটা উপহার পেয়েছিলেন তাঁর এক বন্ধুর কাছ থেকে। সেটা দিয়ে অনেক ছবি যেমন তোলা হয়েছিল, অনেক ছবি আবার বাসা বদলের সময় হারিয়েও গিয়েছিল। তো সেরকমই আরেকবার বাসা বদলাতে যেয়ে লেখক খুঁজে পেলেন প্যান্ডোরার বাক্সে ভরা ছবির নেগেটিভ। সেই নেগেটিভ ওয়াশ করে খুলে বসেন নিজের গল্পের ঝাঁপি। ছবিগুলো পাশে রেখে লিখে ফেলেন ছবির পেছনের গল্পগুলো৷ . . লেখকের লেখায় উঠে এসেছে তাঁদের বাসা বদলানোর গল্প, দেশভাগ, বাবার হাঁটার গল্প, দুই ভাইয়ের খুঁনসুটি, ঠাম্মা, হাঁদা, বড়মাসহ নানান মানুষের গল্প, বইয়ের আলমারির গল্প আরো কত কী। কিছু কিছু লেখা আপনাকে হাসাবে, কিছু লেখা আপনার মন খারাপ করিয়ে দিবে। বইটা পড়তে যেয়েই অনেকদিন পর মনে পড়লো হজমি লবণের কথা। সবাই একটা কাগজে মুড়ে স্কুলে নিয়ে আসতো। একটু টক-ঝাল-মিষ্টি স্বাদ। আগে অগ্রণী স্কুলের সামনে পাওয়া যেত, আসরা প্রায়ই আমার জন্য নিয়ে আসতো। কল্লোল লাহিড়ীর লেখা বরাবরই বেশ সাবলীল। ছোট ছোট বাক্যে তরতরিয়ে গল্প বলে যান। সেই গল্প বলে যাওয়ার কায়দা তেও কেমন যেন একটু মন খারাপ করার ব্যাপার থাকে। যারা 'ইন্দুবালা ভাতের হোটেল পড়েছেন', তারা হয়তো লেখার ধরনটা বুঝতে পারছেন। পড়তে ভালো লাগবে, মাঝে মাঝে নিজেকে কানেক্টও করতে পারবেন। 'বাবার ইয়াশিকা ক্যামেরা' বারবার পড়ার মতো বই না হলেও একবার পড়ে দেখতে খারাপ লাগবে না৷
সাধারণত রিভিউ লিখতে হলে প্রচ্ছদ দিয়েই শুরু করি বা পরে লিখলেও কিছুটা জায়গা ছেড়েই রাখি ইলাস্ট্রেশনের জন্য। অনেকেই এড়িয়ে যান। কিন্তু যার যেটা সরস্বতী, সেটা পেরিয়ে ঘাস খাওয়ার ক্ষমতা অনেক ঘোড়ার থাকতে পারে। আমার মত গাধার অন্তত নেই। তবে এই বইয়ের প্রচ্ছদ যেখানে একখানা সাদা কালো ছবি মাত্র। টাইটেলে কালপুরুষের সাধারণ একটা কনট্রাস্ট। ভেতরে কিছু ডুডলস ছাড়া বাদ বাকি যেহেতু ক্যামেরায় তোলা ছবি। তাই বই সাজানো নিয়ে আর তেমন কিছু লিখছি না। শুধু মনে হল প্রচ্ছদ নিয়ে হয়তো আরও ভাবা যেত। লেখকের নাম আগে থেকে জানা না থাকলে বইটা কোনদিন তুলেও দেখতাম কিনা সন্দেহ। দ্যাটস ইট। এবার ভেতরে যাওয়া যাক। বাবার ইয়াশিকা ক্যামেরার হারিয়ে যাওয়া ফিল্ম ডেভেলপ করে, লেখক খাতার পাশে ছবি রেখে লিখে গিয়েছেন তাদের কথা। ছবি ছবিতেই দেশ ভাগ এসেছে, একটা বাংলা থেকে আরেকটা বাংলায় এসে টিকে থাকার লড়াই এসেছে। আরও এদিক ওদিকের কত মানুষ। বইয়ের আলমারি। একটা আস্ত সময়। এক বিয়ের অ্যালবাম ছাড়া, বাদবাকি অ্যালবামে যেমন এলোমেলো গল্পের ছবি থাকে, এও তেমনি। এক গল্প থেকে আরেক গল্পে যাওয়ার তুলোটে মেঘ। নন ফিকশন বই। বিশাল যে অজানা কিছু জানতে পারবেন, রোমাঞ্চিত হবেন এমনটা নয়। প্রথম বেশ কয়েক পাতায় এরকমই একটা ভাব ছিল মনের মধ্যে। তারপর যত লেখা এগিয়েছে নিজেই চমকে গেছি। বইও বিনোদনের মাধ্যম। মেনে নিলাম। তাই বলে আমার অ্যাড্রেনালিনের অসারতার জন্য মানুষ নতুন করে দুঃখ পাবে! তাদের জলের গল্পে ভ্যারাইটি আনবে? এ কেমন নিষ্ঠুরতা! আমি নিজে একজন প্রিভিলেজড পাঠক। বাড়ির কারোর কাছে কোনদিন দেশ হারাবার গল্প শুনিনি। বরং যাদের হারিয়েছে, তাদের গল্পের কিছু কিছু অতিরিক্ত শুনে হেসেছি। সবাই জমিদার, সবার একর একর সোনালী ধান, নৌকা চালানোর মতো পুকুর। গড়িয়ে গড়িয়ে হেসেছি। মুখ কালো করে অনেকেই চলে গেছে। কিন্তু তাদের গল্পের একদম মগডালের অর্বুদটুকুকে নিজের করে পাওয়ার মত মন আমার কোথায়? আজকের নন্দন, কলেজস্ট্রিট, এমনকি বইমেলাও যদি অন্যদেশে চলে যায়? কেউ যদি দাগিয়ে দেয়? এসে বলে কাল থেকে কফিহাউস যতে পাসপোর্ট লাগবে? তখন কোথায় যাব? বাঁচব আদৌ? তখন কি আর অন্যদেশে বসে গল্প বলব না? সেই মেলায় মস্ত মস্ত বইয়ের পাহাড় ছিল, চলতে গেলেও মানুষ বইয়ের সাথে ধাক্কা খেত... লেখকও তেমনি বলে গেছেন তার সাবলীল ভাষায়। কখনও মায়া জন্মেছে তাঁর কলমে। ক্ষতও কম নেই কিছু। তবু সফল স্মৃতিকথার বইতে যেমন একটা উজান থাকে। বারবার ফিরে আসার ইচ্ছে থাকে। সেটা কোথাও গিয়ে এই বইতে নেই। তুলনা করার কোনও মানেই হয় না। তবু জাস্ট রেফারেন্স হিসেবে ধরলে, 'অক্ষয় মালবেরী'-ও তো একরকম টুকরো ছবিরই কোলাজ। তবু কেন ফিরে যাই? আর কেনই বা একটা জাপানি ক্যামেরার কাছে ঠিক সেইভাবে ফিরব না? সে আপনারা পড়লেও বুঝবেন। ইন্দুবালার ঝোঁকেই পড়তে লেগেছিলাম। হতাশ হইনি। তবে বার বার পড়ে দেখতে ইচ্ছেও করেনি আর।
...মায়ের একটা গ্রাম ছিল, আলবেড়িয়া। মা সেখানে মাঝেমাঝেই লুকিয়ে পড়তো। দিদার একটা মিষ্টি পিঠের কৌটো ছিল। দিদা সেই কৌটোতে মনের আনন্দে সাজিয়ে রাখত পিঠে খাওয়ার গল্প। মণির ছিল এক টুকরো দেশ। মণি সেই দেশে মাঝে মাঝেই হারিয়ে যেত। বাবার ছিল একটা ইয়াশিকা ক্যামেরা। বাবা সেই ক্যামেরায় সবার ছবি তুলে রাখত। হাঁদার ছিল একটা চায়ের দোকান।...
কল্লোল লাহিড়ীর গল্প বোনার হাত, শব্দভাণ্ডার এবং যুতসই অনাস্বাদিত শ্রুতিমধুর শব্দ বসানোর দক্ষতা ইন্দুবালা ভাতের হোটেল পড়ার সময়ই টের পেয়েছিলাম। তিনি ছোট এবং মাঝারী বাক্য ব্যবহার করে চিত্রকল্প ফুটিয়ে তোলেন। সেই চিত্রকল্প এত মধুর, এত সজীব হয় যে পাঠকগণ নিজেকে খুব সহজেই সম্পর্কিত করে ফেলতে পারেন৷
'বাবার ইয়াশিকা ক্যামেরা' বইটিকে আত্মকথা নাকি স্মৃতিকথা কোন ভাগে রাখা যায়, এ নিয়ে আমি একটু দোটানাতেই আছি। তবে লেখকের বাবার ইয়াশিকা ক্যামেরায় তোলা একেকটা ছবির ক্যাপশন আকারেই লেখক আমাদের ঘুরিয়ে এনেছেন তাঁর শৈশব থেকে, তাঁর বেড়ে ওঠার দিনগুলো থেকে।
দেশভাগের বিষণ্ণতা এত বেশি ছিল বইটাতে, যে পুরোটা বইকে এককথায় বলা যায় বিষণ্ণতা মাখা সুখ। লেখকের ছোটবেলার একেকটা ছবি পাঠককে নিয়ে যায় স্বপ্নরাজ্যের কোন ছেলেবেলাতে, যে ছেলেবেলাতে সব না পাওয়া সত্ত্বেও থাকে কেবল অনাবিল সুখ। যে ছোটবেলাতে দিদা রূপকথা আর পিঠেপুলি নিয়ে হাজির থাকেন, ঠাম্মা তার নরম শরীরে রোদ পোহান, বাবা তার কর্মব্যস্ততার আড়ালে ক্যামেরার লেন্সে চোখ রাখেন, মা তার সর্ষে ইলিশ এর ঘ্রাণে পাড়া মাতিয়ে রাখেন, মণি তার গল্প আর স্নেহের পরশে যাত্রা দেখাতে নিয়ে যান, হাঁদা একজন স্নেহময় জ্যাঠা হওয়া সত্ত্বেও খেলার সঙ্গী হয়ে ওঠেন আর দাদা আর ভাইয়ে চলে বেদম খুনসুটি।
প্রতিটা মানুষের সুখস্মৃতিগুলোই ধরে রাখে ক্যামেরা। আমরা আজো শৈশবের ছবি দেখে ফিরে যাই অতীতে, হয়তো তখন ছবির হাসিটুকুর আড়ালের আরো না বলা কান্নার কথা বা মজার কথা মনে পড়ে যায়। অল্পক্ষণ বর্তমানকে ভুলে আমরা মেতে ওঠি নস্টালজিয়ায়।
বড্ড মায়ামায়া সুন্দর এই বইখানা। ইন্দুবালা পড়ে লেখকের উপর যে আস্থা জন্মেছিল, তা আরেকটু বেড়ে গেল বেশ অভিনব কায়দায় লেখা এই আত্মকথাটি পড়ে। একটা সুন্দর অতীতভ্রমণ এর জন্য পাঠকেরা এই শীত শীত বিকেলটাকে বেছে নিতেই পারেন।
নীল ঘূর্ণি আর ক্ষীরের পুতুলকে এক সারিতে রাখার জন্য ৪.৫/৫।
Picked up this book quite by accident, out of sheer nostalgia over my own memories of my father's camera, and I am so happy-sad that I did.
Just the most terribly gut wrenching book for your mid-thirties. An age when your parents begin to visibly age and you feel fears you never thought you could feel. An age when more friends live outside the country than within it. An age when the city you grew up in loses the familiar landmarks and takes on an unfamiliar shape. An age when you sit down on melancholy mornings and wonder, just what makes a home? Buildings, people or memories?
Nope. You definitely shouldn't read this gem of a book in your mid-thirties, during a pandemic that never seems to end, unless you are prepared to weep profusely every few pages.
ছবির ভিতর ছবির তৈরি দেশ রোদ খেলে যায় সাদাকালো হাওয়া সময় যখন পাশেই এসে বসে সাধ্য কী সেই, গল্প ছেড়ে যাওয়া?
মানুষ ছাড়া, সেই গল্পে কী আর থাকে? কী জানে তার স্যাঁতসেঁতে চার দেওয়াল? ভীষণ তীব্র জ্বর কদিন। ছোটবেলায় গল্পে পড়া বুড়ির হাড় মটমটে ব্যারাম যেন ঢুকে পড়েছে কীভাবে শরীরে। ভাইরাসের হানায়, কড়া ডোজের ওষুধ গিলে নিলেই, দুপুরগুলো ঝাপসা হয়ে আসে কেমন। হাসপাতাল, বাড়ি, ওষুধ এমনভাবে জড়িয়ে গেছে জীবনে, সদ্য পা দেওয়া নতুন জীবনও মনে হয় কোন সে দূরের অতীত। এখনও অ্যালবামে সাজিয়ে ওঠা হয়নি ছবি।
অথচ একদমই না চেনা আরেকটা সংসারের ছবি কীভাবে যেন সঙ্গে জুটে গেল এই সময়ে। সেইসব ছবির নেপথ্যে জাপানি একটা ক্যামেরা। নাম তার, ইয়াশিকা। ওপার বাংলা থেকে শিকড় ছেঁড়া কোনও এক লাহিড়ী পরিবারের গরীব এক প্রাইমারি স্কুলের মাস্টার কত কত ছবি তুলেছিলেন জাপানি সেই যন্ত্রের শাটারে ক্লিক করেই। আর ক্লিক করলেই নাকি নিজের ভাষায় কথা বলে উঠত ক্যামেরা। ক্লিক ক্লিক! মাস্টারের ছেলেদের কথায় সেই ভাষা হয়ে উঠত ‘ঠিক ঠিক’। আর তার বহু বহু বছর পর সেই ইয়াশিকা ক্যামেরার খুঁজে পাওয়া একতাড়া রিলের সৌজন্যে নতুন করে হারিয়ে যাওয়া ছবির সেই মানুষদের গল্প বলতে বসে গেল নাকি সেই মাস্টারের ছেলেদেরই একজন। যেন বালি-উত্তরপাড়ার নতুন তৈরি হওয়া সিনে-ক্লাবের সাদাটে পর্দায় শুরু হল এলোমেলো কিছু ফ্ল্যাশব্যাক...
অথচ গল্প মানেই কি বানিয়ে বানিয়ে লিখতে বসা রূপকথা? তা তো নয় একদমই। বরং সাধারণ তাঁত বা ছাপা শাড়ি অথবা সাদা থান বা ধুতি-পাঞ্জাবীর কিছু ছাপোষা চরিত্র ঘুরে-বেড়ায় এই সমগ্র আখ্যান জুড়ে। সেসব সত্যি রোদ পড়ে আসা বিকেল, প্রাচীন গঙ্গার হাওয়া মাখা পুরনো কোনও লাইব্রেরী, জি.টি. রোডের ধার ঘেঁষে বেঁচে থাকা মফস্বলী পাড়া, আর গল্পেরই এক অর্বাচীন চরিত্র হাঁদার সাদাকালো টিভির মতো ঝিরঝিরে কতগুলো মানুষ... গলার কাছটা আচমকাই খুব ব্যথা হয়ে ওঠে যাদের জন্য। মনে পড়ে নিজেরও কখনই না-থাকা দেশের কথা। ঠাকুরদার নোয়াখালি। ঠাকুমার কুমিল্লা। দেশ ছেড়ে আসার পর নবদ্বীপের কাছে ভান্ডারটিকুরিতে নতুন দেশ আবার। পাটকাঠির বেড়া দেওয়া ঘর। ...সেই দেশেরও পাট চুকেছে আজ কতদিন! একটুও ছবি তুলতে না-জানা আমার বাবাও আজ সিনিয়র সিটিজেন হতে হতে এখন পাড়ার সর্বাধিক বয়োজ্যেষ্ঠ একজন। পড়ার ধৈর্য্য না থাকলেও, ইছামতীর ওপাড়ের দেশটার কথা শুনে হাত বোলায় ইয়াশিকা ক্যামেরায় তোলা ছবিগুলোর গায়ে। রাঙা, মণি, হাঁদা, বড়মা— যোগ দেয় সেইসব গল্পে আমাদের। অনেকরাতে মোবাইলে বেজে ওঠে সবথেকে ছোট ভাই। “কী ভাল গো বইটা বড়দা! আবার পড়তে হবে আমাকে...”
আবার? আবার ফেরত যাওয���া এইসব গলার কাছটা ব্যথা করে দেওয়া স্মৃতিদের কাছে? কোন সুখে যেচে ব্যথা পেতে চায় মানুষ? কোন সুখে ফেরত যেতে চায় নিজেদের যাবতীয় ভাঙচুর অতীতের কাছে? সেসব অতীত যেন আরও নতুনে প্রাণ পায় মেখলা ভট্টাচার্যের অলংকরণে। হাতে এঁকে বা কাগজ কেটে তৈরি করা একেকটা মোটিফ সাজিয়ে তোলে সেই কবেকার জাপানি ইয়াশিকার ছবিগুলোকে গ্রামবাংলার সবুজে। সেইসব সবুজে আমরাও খুঁজতে চাই দেশ। চাই যে আর কারুর ঠিকানা না হারাক, আমাদের এই সুজলা-সুফলা দেশ থেকে। বই শেষ হলে, জানুয়ারির সন্ধেয় তাই হয়তো হঠাৎ বৃষ্টি নামে খুব। ঝড় ওঠে দমকা। ‘বাবার ইয়াশিকা ক্যামেরা’ বইয়ের সমস্ত লেখা, অক্ষর, শব্দ চলতে থাকে সঙ্গে সঙ্গে। দিয়ে যায় শুধু কিছু মনখারাপ... বেমক্কা কিছু মানুষকে অযথাই জীবন থেকে অদৃশ্য কোনও ইরেজার দিয়ে ঘষে ঘষে মুছে ফেলার... বুড়ি ঠাকুমার থুতনি ধরে নাড়িয়ে দিতে না পারার... রাঙা, মণি, বড়মা, হাঁদাদের কিছুতেই আর একেকটা নিউক্লিয়ার পরিবারের বৃত্তে নিয়ে আসতে না পারার...
সেখানেই অত্যন্ত সহজ এই বইটা আমাদের সকলের হয়ে ওঠে। এভাবেই। শীতের সকালে ছড়ানো পেঁয়াজকলির উপরে খেলে বেড়ানো রোদ্দুরের মতো উড়ান দেয় টাইম ট্র্যাভেল। আবার কারুর হাত পড়ে শাটারে... চোখের কোণটা কি চিকচিক করে ওঠে কারুর? ওই যে শব্দ হল ‘ক্লিক’ করে, কথা বলে উঠল ইয়াশিকা? আচ্ছা, কে বলতে পারবে, সব কান্না কী করে এভাবে ঠিক ঠিক পড়ে ফেলতে পারে ও? কী করে আচমকা ঠেলে নিয়ে আসে স্রোতে পুরনো মানুষ? কী করে আচমকা একটা ভুলে যাওয়া ইতিহাস চোখের সামনে তুলে ধরে এইভাবে? কী করে এত এত ছবি তোলার পরেও, নিজে সমস্ত ছবির কাছে শুধু স্মৃতি হয়েই থেকে যায়, বাবার ইয়াশিকা ক্যামেরা?
৪.৫ গত প্রজন্মের এক ছিন্নমূল পরিবার এপার বঙ্গে এসে মফস্বলে থিতু। এখানে ভাড়া বাড়ি আছে, পাড়া আছে, গঙ্গার ঘাট আছে, আছে হৃদয়ে কাঁটাতারের দাগ নিয়ে জীবনের উদযাপন। আর? বাবার ইয়াশিকা ক্যামেরা। যে ধরে রাখে মুহূর্তকে।
কল্লোল লাহিড়ীর ইন্দুবালা পড়ে দেখেছিলাম ছোটখাটো বিষয়গুলো উনি কেমন করে যেনো মাথায় ঢুকিয়ে দেন। ওনার বলার ডং অনেকটা সামনাসামনি গল্প শোনার মতোন। ইন্দুবালা ভাতের হোটেলে তিনি রান্নার গল্প বলেছেন,যেসব রোজকার খাবার, বা আগে দাদী নানী বা বড়-আম্মুদের কাছে বিভিন্ন খাবারের নাম আর বর্ণনা শুনতাম,সেসব খাবারের গল্প ছিলো।এবার লেখক নিজের কথা বলেছেন। দেশভাগের কথা,ছেড়ে যাওয়ার কথা,দেশ নামের শব্দের আকুতির কথা,ছবির কথা,পরিবারের মানুষের কথা বলেছেন।
ছবির গল্প কতো ভাবে বলা যায়!একেকজনের চোখে একেক রকম।কিন্তু যাকে জড়িয়ে এই গল্প সে-ই এই লুকোনো গল্প বলতে পারে।ছবি কথা বলে! এই আভাস এর প্রতি পাতাতেই। চেনার প্রতি আমাদের টান অনেক।তাই বোধহয় নতুনের চেয়ে আমাদের পুরনো প্রীতি অনেক বেশি। বিশেষ করে ফেলা আসা মানুষগুলো,ভালো দিনগুলো।"শুনেছি কোনো একটা বাড়িতে থাকতে থাকতে সেই বাড়িটার মতো হয়ে যায় মানুষগুলো।নাকি বাড়িটা হয়ে যায় মানুষ?" -এমন অনেক লাইন আছে,যেগুলো আমার নিজের কথা ভাবতে বাধ্য করেছে, আমাকে আমার দুই ঘরের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। এক ঘর নিজেদের ছিলোনা,ভাড়া বাড়িকে ঘর বানিয়ে নিতে নেই, এ ভুলে গেছিলাম। আবার আরেকটা হারিয়েছে 'আরেকটু ভালো' এর জন্য। এসব কথা মনে হলে মনে শূন্যতা তৈরি হয়। আবার অ্যান্টেনা ঘুরিয়ে শুক্রবার, শনিবার দুপুরের পর থেকে বাসাভর্তি লোকের সাথে দেখা সাদাকালো সিনেমার স্মৃতিও হাসিয়ে যায়।কিংবা একসাথে হাঁড়ি না চড়ালেও সবাই কি সুন্দর হাসিখুশি বিরাট পরিবারের মতোন ছিলাম,সেসব মনে করিয়ে হাসি ঝুলিয়ে যায় মুখের কোনায়।
সুখপাঠ্য অবশ্যই, তবে মাঝেমধ্যে সুর হারিয়ে ফেলেছে।এক গল্প থেকে অন্য গল্পে চলে যাওয়ার কারণে মাঝেমধ্যে একটু একটু খাপছাড়া হয়ে যাচ্ছিলো কিন্তু একপাতা-আধপাতা পরেই আবার আগের রেশে ফেরা হয়ে যায়।
লেখক :কল্লোল লাহিড়ী প্রকাশক:সুপ্রকাশ দাম:২৯০ টাকা ..তারপর একদিন কাঠের বাক্স থেকে বের হয়ে আসে বাবার ইয়াশিকা ক্যামেরা।স্মৃতিকোষ ধরে আলতো টান দেওয়া নস্টালজিয়া।ঐ যে ছবিতে যাকে দেখা যাচ্ছে তিনি কি 'বড়োমা' নাকি ইন্দির ঠাকরুণ?নাকি আমারই ঠাকুমা?..শীতের আলসে রোদ পোহাতে থাকে বইগুলি।অশক্ত শরীরে উপরে উঠে আসেন বাবা।তাকিয়ে থাকেন বইগুলির দিকে।..ঐ তো সেই সরস্বতী পূজোর ছবিটা।সামনে বার মাধ্যমিক।আমি আবার ছোটো হয়ে গেছি স্মৃতিরেখা ধরে।..ঐ তো সেই অ্যান্টেনা।একটু খানি ঘুরিয়ে দিলেই ধরা যাবে বাংলাদেশ টি.ভি আর কিংবা 'হাঁদার ' একটুখানি স্বদেশ।..একটি উদ্বাস্তু পরিবারের যাপনের সাক্ষী থাকে ইয়াশিকা ক্যামেরায় তোলা ছবিগুলি।যাদের সঙ্গে জীবন শুরু হয়েছিল তারা ক্রমশ: যাত্রা করেন অজানা দেশে।ছবিগুলি ঝাপসা হয়ে আসে ক্রমে।কালের নিয়মে অথবা চোখের পাতায় মুক্তদানার স্পর্শে।কিছু মুহূর্ত শুধু ধরা থাকে ইয়াশিকায় আর কল্লোল লাহিড়ীর সাবলীল গদ্যে।