গিলগামেশ হলেন সুমেরিয় মহাকাব্যের নায়ক, অনেকটা আমাদের রামচন্দ্র বা অর্জুনের মতন। পৃথিবীর প্রাচীনতম লিখিত উপাদানে পাওয়া গিয়েছে তাঁর কাহিনি। তাঁর দেশের কথা জানতে গেলে আসে ইউফ্রেটিস ও টাইগ্রিসের অববাহিকায় গড়ে ওঠা সুমেরিয়, আক্কাদীয় বা আসিরিয় ইত্যাদি কয়েকটি সাম্রাজ্যের কথা। কারা ছিলেন এদের দেবদেবী ? কী ছিল তাঁদের পারস্পরিক সম্পর্ক ? কে কোন বিষয়ের দেবতা ? কে ইনান্না বা কে ইশতার ? সূর্যদেবতার নাম কী ? চন্দ্র দেবতাই বা কে ? কখন কোন ক্ষমতা দখলের জন্য এঁদের মধ্যে লড়াই ? গিলগামেশের জীবনের যাত্রার মধ্য দিয়ে গল্পের মাধ্যমে সমগ্র মেসোপটেমিয়ার মাইথলজির এ এক টাইম ট্রাভেল। সময়ের সাথে সাথে কোন দেবতার উত্থান হল, কারই বা পতন ? কে ছিলেন মার্ডুক, ‘অসুর-‘ই বা কে ? ‘টাওয়ার অব ব্যাবেল’ কোথায় ? চার হাজার খৃষ্ট পূর্ব থেকে রোমান যুগ পর্যন্ত এক পৌরাণিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের আখ্যানমালা এই গ্রন্থ। ‘হায়রোগ্লিফের দেশে’ বইটিতে ঘুরে এসেছিলেন মিশর থেকে। এবার ঘুরে আসার পালা লেখক রজত পালের সাথে গিলগামেশের দেশ মেসোপোটেমিয়া থেকে। গিলগামেশের দেশের কথা’ বইটি গিলগামেশের দেশ প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার ইতিহাসের ওপর আলোকপাত করার এক নতুন প্রচেষ্টা।প্রথম অংশটি প্রাচীন মেসোপটেমিয়াকে বোঝার চেষ্টা করেছে এক অভিনব পন্থায়, শুধু শুকনো ইতিহাসের চর্বিতচর্বনে ব্যস্ত না থেকে গিলগামেশের উপকথাকে ধ্রুবতারার মতো অনুসরণ করে ইতিহাস পুনর্দর্শনের যাত্রা করেছেন লেখক। এ যেন এক মিথোলজিক্যাল থ্রিলার। পড়তে পড়তে শিহরিত হবেন আপনিও।
'গিলগামেশ' নামটির সঙ্গে আমাদের সবার অল্প-বিস্তর পরিচয় আছে। কেউ-কেউ জানি যে এটি পৃথিবীর প্রাচীনতম মহাকাব্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়। সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ থেকে সুকুমারী ভট্টাচার্য— এমন অনেকের লেখায় আমরা এই কাব্যে অমরত্বের সন্ধান তথা তার দার্শনিক প্রকৃতি বুঝতে চাওয়ার চেষ্টার কথাও পড়েছি। কিন্তু কেমন ছিল সেই দেশ, যেখানে রচিত হয়েছিল এই মহাকাব্য? কেমন ছিল সেখানকার মানুষের জীবনচর্যা, বিশ্বাস, পরিণতি? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার জন্যই লেখা হয়েছে আলোচ্য বইটি। পুত্র অংশু'র সঙ্গে কথোপকথনের মাধ্যমে, মেসোপটেমিয়া নামে উল্লিখিত অঞ্চলের নানা সভ্যতার সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিতে চেয়েছেন প্রাবন্ধিক।
এর বিভিন্ন অধ্যায় দু'টি বড়ো অংশে বিন্যস্ত হয়েছে। সেগুলো হল~ প্রথম পর্ব~ সুমেরিয়ার উপকথা: এর মধ্যে রয়েছে নিম্নলিখিত ক'টি অধ্যায়:— ১. ভূমিকা ২. মহাপ্রলয়ের কথা ৩. ত্রিদেব ৪. ইতিহাসে কী বলে ৫. গিলগামেশের কাহিনি ৬. সৃষ্টিতত্ত্ব এবং উতু, সিন ও নিনলিল ৭. ইনান্নার কথা ৮. ইনান্নার অন্যান্য গল্প ৯. এরেশকিগাল, নার্গাল ও অন্যান্য কিছু দেবদেবীর কথা ১০. নিনুর্ত, গুদাম ও এনকিদুর কথা ১১. এনকিদুর মৃত্যু ১২. অন্যান্য দেবদেবী ১৩. এনমার্কার ও লুগালবান্দার কথা ১৪. অমরত্বের খোঁজে গিলগামেশ ১৫. দৈত্য-দানবদের কথা ১৬. অন্যান্য উপকথা ১৭. গিলগামেশের যাত্রা শেষ দ্বিতীয় পর্ব~ পরবর্তী মেসোপটেমিয়ার কথা: এই অংশটি যেভাবে সাজানো হয়েছে তা প্রবন্ধের বইয়ের ক্ষেত্রে দেখা যায় না। এখানে মার্শেলাস নামক জনৈক রোমান চিকিৎসকের রুদ্ধশ্বাস আত্মকথা বর্ণিত হয়েছে এক-একটি অধ্যায়ে। তার পরের অধ্যায়ে আবার এসেছে ইতিহাসের কঠোর তথ্য। ফলে বিন্যাসটি হয়েছে এ-রকম:— ১) মার্সেলাসের কথা ২) টাওয়ার অফ ব্যাবেল ৩) রোমের পূর্ব সীমান্তে ৪) মার্ডুক ও অসুর ৫) মার্সেলাসের স্বপ্ন ৬) ক্যাসাইট, মিতান্নি এবং ক্যানানাইট ও ফিনিসীয় ৭) প্রিফেক্ট সাইনেজিয়াস ৮) বেল, সাইরাস ও ড্যানিয়েলের গল্প ৯) বেইরুটে মার্সেলাস ১০) পারস্য, গ্রিক ও রোমানদের আধিপত্য ১১) সাইনোজিয়াসের মৃত্যু ১২) শেষ কথা শেষে এসেছে পাঠ-নির্দেশিকা ও প্রবন্ধসূত্র।
এই বইটির ভালো দিক কী-কী? প্রথমত, মধ্যপ্রাচ্যের প্রাচীন ইতিহাস সম্বন্ধে বাংলায় নন-ফিকশন কাজ প্রায় নেই বললেই চলে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে এমন একটি সহজ, সুলিখিত, অলংকরণ ও মানচিত্রে সমৃদ্ধ বইকে দু'হাত তুলে স্বাগত জানাতে হয়। দ্বিতীয়ত, লেখাকে সংক্ষিপ্ত রাখার তাগিদেই প্রাবন্ধিক এই বইয়ে উল্লিখিত বিভিন্ন দেবদেবী ও বিশ্বাসের থিওজেনি বিশ্লেষণ করেননি। তবে তা না করেও তিনি যে পরিমাণ আভাস ও ইঙ্গিত দিয়েছেন তা থেকে এই বিশ্বাস ও ভাবনাগুলোর সঙ্গে এই অঞ্চলের পূর্ব ও পশ্চিমের নানা ধর্মীয় ভাবনার সম্পর্ক অনুমান করা যায়। কীভাবে নানা মিথ ভাঙাগড়ার মধ্য দিয়ে এক দেশ থেকে অন্য দেশে সংবাহিত হয়— তাও বোঝা যায় এর থেকে। তৃতীয়ত, এই বইয়ের শেষে দেওয়া পাঠ-নির্দেশিকাটি একেবারে স্বর্ণখনি। যাঁরা মধ্যপ্রাচ্যের প্রাচীন ইতিহাস নিয়ে গভীরভাবে পড়তে চাইবেন, তাঁরা এই মূল প্রবন্ধগুলো জোগাড় করে পড়ে নিতে পারবেন। এর ফলে লেখকের কোনো ধারণা বা প্রতিপাদ্য নিয়ে সংশয় থাকলে তা দূর করার পথও প্রকট হয়েছে। এই বইটির খারাপ দিক কী-কী? ১) বইটি বিষয়ের অনুপাতে খুবই ছোটো। প্রায় চার হাজার বছরের ইতিহাস ও বিশ্বাসের রূপরেখা ধরে রাখার জন্য এটি অনেক বড়ো হওয়া দরকার ছিল। সেক্ষেত্রে সিন্ধু-সরস্বতী ও মিশরীয় সভ্যতার সঙ্গে এই অঞ্চলের জীবনযাত্রা ও ধর্মের তুলনা করার অবকাশও পাওয়া যেত। ২) বইটির মূল অংশের ছাপা ও বানান চমৎকার হলে কী হবে, তথ্যনিষ্ঠ মুখবন্ধটি ভুলভাল বানান ও টাইপোতে একেবারে আকীর্ণ। যেহেতু ওটি দিয়েই বই শুরু, তাই সেখানে এমন বিচ্যুতি কোনোমতেই কাঙ্ক্ষিত নয়। আশা রাখি যে আগামী সংস্করণে ওই অংশটিকেও শুদ্ধ করে নেওয়া হবে। এই সময়, যখন পরধর্ম-বিদ্বেষের বিষবাষ্পে আমাদের আকাশ-বাতাস একেবারে পূর্ণ, সেখানে এই প্রাচীন সভ্যতার নানা আখ্যান ও ঘটনা পড়তে গেলে সত্যিই অদ্ভুত লাগে। এই বিস্ময়, আর তারই পাশাপাশি নিজেকে আরও একটু সমৃদ্ধ করে তোলার জন্যই বইটি পড়া প্রয়োজন।
বইঃ গিলগামেশের দেশের কথা লেখকঃ রজত পাল মূল্যঃ ১৯৯/- প্রকাশকঃ বইচই পাবলিকেশন্স
এই বইটি মেসোপটেমিয়ার ইতিহাস ও গিলগামেশের দেশে প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার ইতিহাসের ওপর আলোকপাত করার এক নতুন প্রচেষ্টা।
প্রথম অংশটি প্রাচীন মেসোপটেমিয়াকে বোঝার চেষ্টা করেছে এক অভিনব পন্থায়, শুধু শুকনো ইতিহাসের চর্বিতচর্বনে ব্যাস্ত না থেকে গিলগামেশের উপকথাকে ধ্রুবতারার মতো অনুসরণ করে ইতিহাস পুনর্দর্শনের যাত্রা করেছেন লেখক।গোড়াতেই পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন প্রাচীন নানা জনজাতির সঙ্গে যারা এককালে দাপিয়ে বেড়িয়েছিলো মধ্যপ্রাচ্যের এই বিশেষ অংশের ভূভাগে, বহু প্রজন্ম ধরে টিকে থেকে নিজেদের নিঃশ্বাসে এর রুক্ষ প্রান্তরে প্রাণ সঞ্চার করেছিলো, বহু ধ্বংস ও সৃষ্টি করেছিলো, এই বিস্তীর্ণ জায়গাটিকে নিজেদের পরিচয় দিয়েছিলো।
বেশ কয়েকটি স্বল্পপরিচিত নামের সঙ্গে আমাদের আলাপ হয় - সুমেরীয়, আক্কাদীয়, অ্যাসিরীয়(অসুর), ব্যাবিলনীয়, ক্যাসাইট, অ্যাম্রাইট, এলামাইট প্রভৃতি।
কালের প্রবাহে এদের অধিকাংশেরই স্বতন্ত্র অস্তিত্ত্ব লোপ পেয়েছে, আবার কেউ কেউ স্বমহিমায় বিরাজও করছে, যেমন অ্যাসিরীয়রা আজও পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে আছে নিজেদের সাংস্কৃতিক শিকড়ের থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়েও।আজও তাদের প্রধান ভাষা আরামাইক যা প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার আক্কাদীয় ভাষার রুপান্তরিত সংস্করণ।
পূর্ব সেমিটিক ভাষাসমূহের মধ্যে আক্কাদীয় ছিলো অন্যতম অবিমিশ্র ভাষা।আজকের অ্যাসিরীয়রা সেই ভাষাকে সযত্নে লালন করে চলেছে লেবাননে, তুর্কিতে, আমেরিকায় এমনকি আমাদের ভারতবর্ষেও, ওহ হ্যাঁ, এই প্রসঙ্গে বলে রাখা ভালও যে প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার জনগোষ্ঠী এই দেশেই মেসোপটেমিয়ার বাইরে সবচেয়ে দীর্ঘকাল বসবাস করে এসেছে - সিরিয়ান খৃস্টান বা দক্ষিণের ‘মালাঙ্কারা নাসরানি’রা, অধিকাংশই ইস্টার্ণ অর্থোডক্স খৃস্টান।
এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য হোর্মুজ্দ রাস্সাম নিজেও ছিলেন চ্যালডিয়ান ইস্টার্ন ক্যাথলিক খৃস্টান, প্রাচীন মেসোপটেমিয়ান জনগোষ্ঠীরই উত্তরাধিকারী।
এই বইটি পড়তে বসলে প্রথম যে জিনিসটির প্রশংসা না করে পারা যায় না তা হলো লেখকের বহু ভিন্নধর্মী বিষয়কে এক সূত্রে গাঁথার অদ্ভূত ক্ষমতা, তাঁর মুন্সিয়ানার অরো পরিচয় মেলে যখন দেখতে পাই তাঁর চমৎকার বৈঠকী কায়্দায় মহাপ্রলয়ের কথা থেকে শুরু করে ভারতীয় ধর্মের দেবতাদের সঙ্গে সামঞ্জস্য তুলে ধরে সমগ্র আলোচনাটিকে এক টানটান ঠাস বুনোটে আনা।
এ যেন ইতিহাসের লেকচার শোনা নয়, কোনো ট্যুর গাইডের দেখানো পথ ধরে ইতিহাসের রাজপথ থেকে শুঁড়িপথ পায়ে হেঁটে পরিক্রমা এব�� পুরোটাই ঘটছে গিলগামেশের সেই কতোকাল আগে পায়ের ধুলো ফেলা যাত্রাপথ ধরে।
আনত, আসরলুহি থেকে এনজাগ, এনকিমদু হয়ে উরশ বা আন, জাবাবা প্রত্যেকেরই প্রত্যেকেরই প্রসঙ্গ অবতারণা করে দৈবের সঙ্গে দৈনন্দিনের এক অদৃষ্টপূর্ব মেলবন্ধন ঘটাতে সফল হয়েছেন লেখক।
কেউ সেচের দেবতা, কেউ উর্বরতার তো কেউ আবার হিন্দুদের সর্বচরাচরব্যাপী পরব্রহ্মের মতো সর্বশক্তিমান, লেখক এঁদের সকলকেই প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার মানুষের, গোষ্ঠীর্, জনজাতির জীবন, মৃত্যু এবং তার মধ্যবর্তী সময়টুকুতে জীবনের নানা রসদের প্রতিভূ রুপে ফুটিয়ে তুলেছেন্|
পার্বত্য অঞ্চলে সুমেরীয়দের প্রথম আগমন, নানাবিধ জাগতিক কাজে নিত্য শ্রম করা, এরিদু হয়ে উঠলো তাদের প্রথম উল্লেখযোগ্য শহর, সূচনা হলো পানীয় জলের উৎসকে কেন্দ্র করে নাগরিক সভ্যতার গোড়াপত্তন।
নিরাপদ আশ্রয়স্থলে মানুষের শান্তির্, তৃপ্তির নিশ্চিন্ততার শ্বাস যেন দেবতাদের প্রসন্নতার হাসির আকার পেলো, লেখকের ভাষায় "নিপ্পুরে পৌঁছালে বাকি দেবতারা এনকিকে এরিদু শহর স্থাপনের জন্য বাহবা দিচ্ছেন"|
অবশ্য এই থ্রিলারকে হার মানানো নন-ফিকশন বইটির দ্বিতীয় ভাগেও চমকের অভাব নেই। এবার লেখক মার্সেলাস নামক এক রোমান সৈনিকের জবানবন্দীতে শুরু করলেন এক সদ্য-আগত পাশ্চাত্যদেশীয়ের প্রাচ্যদর্শনের বৃত্তান্ত্, এবং তার হাঁটুতে ভর করে প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার আরেক দৃষ্টিভঙ্গী থেকে পরিক্রমা।
ক্রমশঃ পাতায় পাতায় চলে আমরা বাইবেলের টাওয়ার অফ ব্যাবেলের প্রসঙ্গও পাই, নিমরোদের বৃত্তান্ত এবং কিভাবে আব্রাহাম ও নিমরোদের সংঘাত থেকে আজকের তিনটি প্রধান আব্রাহামিক ধর্মের উৎপত্তি হয়।
এখানেও লেখক একটি প্রসঙ্গ উত্থাপন করেও তার অন্তিম সমাধান পাঠকের ওপরেই ছেড়ে দিয়েছেন : ব্যাবেলের টাওয়ার আসলে টাওয়ারই ছিলো নাকি জিগুরাট।তবে কি যে টাওয়ার অফ ব্যাবেলকে ঈশ্বরের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করতে চাওয়ার মূর্ত প্রতীক বলে ধরা হয়েছে তা আসলে পিরামিডাকৃতির প্রাচীন ব্যাবিলনীয় উপাসনালয়?
নিমরোদের প্রাচীন উপাসনাপদ্ধতির পক্ষ্হাবলম্বন ও আব্রাহামের দ্বারা তার বিরুদ্ধাচরণের গ্রাউন্ড জিরো আদতে এক প্রাচীন মেসোপটেমিয়ান স্থাপত্য?
বাইবেলের জেনেসিসে বর্ণিত টাওয়ার অফ ব্যাবেল নির্মানে আব্রাহামিকদের উপাস্য দেবতা অসন্তুষ্ট হন, বন্যার পর থেকে সব মানুষ নানা জায়্গায় ছড়িয়ে না গিয়ে ভাষার ঐক্য থাকার দরুন একত্রে এক স্থানে বসবাস করতে থাকে এ তাঁর মনঃপূত হয়নি।তাদের নানা স্থানে স্থানান্তরিত করার উদ্দেশ্যে তিনি তাদের ভাষার বিভাজন ঘটান ও হতবুদ্ধি করে তথাকথিত টাওয়ার এর নির্মান রুদ্ধ করেন।
এর থেকে দুটি গুরুত্ত্বপূর্ণ ইঙ্গিত মেলে:
এক, জিগুরাটের সর্বোচ্চভাগে প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার দেবতাদের উপাসনালয় থাকতো, আব্রাহাম ও নিরমোদের সংঘাতের সূত্র ধরে বলা যায় এটি নিমরোদের মতো প্রাচীন উপাসনাপদ্ধতির অনুগামীদের ওপর আব্রাহামের মতের বিজয়ের পরিচায়ক একটি উপকথা।
দুই, আব্রাহামের মত দীর্ঘকাল প্রাচীন মেসোপটেমিয়দের শক্ত ঘাঁটিতে স্বীকৃতিলাভে অসমর্থ হয় - যতোদিন না তারা কোনো দুর্বিপাকের কারণে ছড়িয়ে ছিটিয়ে যেতে বাধ্য হয়।
লেখকের সম্পূর্ণ বৃত্তান্তের অন্তিম অংশটি খুব মর্মস্পর্শী, ছোট্ট অংশুর অবাক কৌতুলহল ফুটে ওঠে। সে অপরিণত মস্তিষ্কে আধুনিক যুগে আইসিসের ধ্বংসলীলার কথা শুনে সরল মনে প্রশ্ন করতে থাকে ধ্বংসকারীদের উন্মত্ততার কারণ সম্পর্কে।
নিমরুদ শহর আক্রমণ করে দ্বিতীয় অসুরবনিপালের প্রাসাদ ধুলায় মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে শুনে অংশুর মনের প্রশ্নটি যেন বইয়ের পাতায় প্রতিধ্বনিত হয় : কেন?
এর কোনো সহজ উত্তর হয়নি, হয়না।
রবীন্দ্রনাথই বোধয় অংশুর বাবার মুখে ভাষা জুগিয়েছিলেন :
"রাজছত্র ভেঙে পড়ে রণডঙ্কা শব্দ নাহি তোলে জয়স্তম্ভ মূঢ়সম অর্থ তার ভোলে রক্তমাখা অস্ত্র হাতে যত রক্ত-আঁখি শিশুপাঠ্য কাহিনীতে থাকে মুখ ঢাকি”
প্রাচীণ মেসোপোটেমিয়ান সভ্যতার নায়ক গিলগামেশ। গিলগামেশের সুমেরিয় মহাকাব্যকে ধরা হয় পৃথিবীর ইতিহাসে সবথেকে প্রাচীণ মহাকাব্যের নিদর্শন হিসেবে। সেই গিলগামেশের দেশ কেমন ছিলো? কেমনই বা ছিলো তাদের পৌরাণিক চরিত্র, কিংবা সেই চরিত্রগুলোর গল্প? এই নিয়েই "গিলগামেশের দেশের কথা।" লেখক অত্যন্ত সাবলীল ভাবে সবকিছু তুলে ধরেছেন। বাংলা ভাষায় মেসোপোটেমিয়ার সুমেরিয় পৌরাণিক গাঁথাকে আর কেও এতোটা সুন্দর করে তুলে ধরেছেন এমনটা এখনো পাই নি।
বইয়ের নাম: গিলগামেশের দেশের কথা লেখক: রজত পাল জনরা: মিথোলজিক্যাল থ্রিলার প্রকাশনী: প্রতিচ্ছবি প্রকাশনী প্রচ্ছদ- আদনান আহমেদ রিজন মূল্য-৩২০ টাকা পৃষ্টা: ১৬০
ফ্ল্যাপ: গিলগামেশ হলেন সুমেরিয় মহাকাব্যের নায়ক, অনেকটা আমাদের রামচন্দ্র বা অর্জুনের মতন। পৃথিবীর প্রাচীনতম লিখিত উপাদানে পাওয়া গিয়েছে তাঁর কাহিনি। তাঁর দেশের কথা জানতে গেলে আসে ইউফ্রেটিস ও টাইগ্রিসের অববাহিকায় গড়ে ওঠা সুমেরিয়, আক্কাদীয় বা আসিরিয় ইত্যাদি কয়েকটি সাম্রাজ্যের কথা। কারা ছিলেন এদের দেবদেবী ? কী ছিল তাঁদের পারস্পরিক সম্পর্ক ? কে কোন বিষয়ের দেবতা ? কে ইনান্না বা কে ইশতার ? সূর্যদেবতার নাম কী ? চন্দ্র দেবতাই বা কে ? কখন কোন ক্ষমতা দখলের জন্য এঁদের মধ্যে লড়াই ? গিলগামেশের জীবনের যাত্রার মধ্য দিয়ে গল্পের মাধ্যমে সমগ্র মেসোপটেমিয়ার মাইথলজির এ এক টাইম ট্রাভেল। সময়ের সাথে সাথে কোন দেবতার উত্থান হল, কারই বা পতন ? কে ছিলেন মার্ডুক, 'অসুর-'ই বা কে ? 'টাওয়ার অব ব্যাবেল' কোথায় ? চার হাজার খৃষ্ট পূর্ব থেকে রোমান যুগ পর্যন্ত এক পৌরাণিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের আখ্যানমালা এই গ্রন্থ।
পাঠ প্রতিক্রিয়া: গিলগামেশের দেশের কথা’ বইটি গিলগামেশের দেশ প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার ইতিহাসের ওপর আলোকপাত করা হয়েছে। মূলত মেসোপটেমিয়া এই নামকরণটি গ্রীকরা করে। গ্রীক ভাষায় 'meso' শব্দের অর্থ হল 'মধ্য' এবং 'potomos' কথাটির অর্থ হল 'নদী'। দুই মিলিয়ে নদীর মধ্যভাগ হলো 'মেসোপটেমিয়া'। বইটিতে মোট দুটি পর্ব রয়েছে।
প্রথম পর্ব- সুমেরিয়ার উপকথা : ১. ভূমিকা ২. মহাপ্রলয়ের কথা ৩. ত্রিদেব ৪. ইতিহাসে কী বলে ৫. গিলগামেশের কাহিনি ৬. সৃষ্টিতত্ত্ব এবং উতু, সিন ও নিনলিল ৭. ইনান্নার কথা ৮. ইনান্নার অন্যান্য গল্প ৯. এরেশকিগাল, নার্গাল ও অন্যান্য কিছু দেবদেবীর কথা ১০. নিনুর্ত, গুদাম ও এনকিদুর কথা ১১. এনকিদুর মৃত্যু ১২. অন্যান্য দেবদেবী ১৩. এনমার্কার ও লুগালবান্দার কথা ১৪. অমরত্বের খোঁজে গিলগামেশ ১৫. দৈত্য-দানবদের কথা ১৬. অন্যান্য উপকথা ১৭. গিলগামেশের যাত্রা শেষ
দ্বিতীয় পর্ব - পরবর্তী মেসোপটেমিয়ার কথা: ১) মার্সেলাসের কথা ২) টাওয়ার অফ ব্যাবেল ৩) রোমের পূর্ব সীমান্তে ৪) মার্ডুক ও অসুর ৫) মার্সেলাসের স্বপ্ন ৬) ক্যাসাইট, মিতান্নি এবং ক্যানানাইট ও ফিনিসীয় ৭) প্রিফেক্ট সাইনেজিয়াস ৮) বেল, সাইরাস ও ড্যানিয়েলের গল্প ৯) বেইরুটে মার্সেলাস ১০) পারস্য, গ্রিক ও রোমানদের আধিপত্য ১১) সাইনোজিয়াসের মৃত্যু ১২) শেষ কথা
অনেক ছোট ���কটা বই। ঘন্টাখানেকের বেশি লাগার কথা ছিলো ও না। তবুও আমার চারদিনের ওপর লেগেছে। মিথোলজি আগেও অনেক পড়েছি কিন্তু এই বইয়ের রচনাশৈলি আমার কাছে কিছুটা খটমটে লেগেছে। প্রচুর তথ্য ছোট একটা বইতে যেন জোর করে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। আরেকটু বিশ্লেষণধর্মী ( বইটা আরেকটু বড় হলেও সমস্যা ছিলো না) হলে ভালো হতো। বোঝার সুবিধার্থে বেশ কিছু ছবি দেয়া হয়েছে। দর্শন, মিথোলজি ও থ্রিলারের সমন্বয়ে রচিত এই বইটি মোটামুটি, খুব বেশি তথ্যে যদি কারো আগ্রহ না থাকে তাহলে রিডার্স ব্লকে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বাইন্ডিং এবং প্রচ্ছদ দুটোই বেশ ভালো। মিথোলজির দুনিয়ায় হারিয়ে যেতে ডুব লাগাতে পারেন এই বইটিতে।
বইঃ গিলগামেশের দেশের কথা লেখকঃ রজত পাল মূল্যঃ ১৯৯/- প্রকাশকঃ বইচই পাবলিকেশন্স আলোচকঃ দীপাঞ্জন দাস
বইটির নাম থেকেই বোঝা যায় যে, এটি সুমেরীয় মহাকাব্যের নায়ক গিলগামেশ ও তাঁর দেশের বিষয়েই লিখিত হয়েছে। বইটিকে দুটি পর্বে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম পর্বটি হল “সুমেরিয়ার উপকথা”। এর মধ্যে রয়েছে সতেরোটি অধ্যায়। যথা- ‘ভূমিকা’, ‘মহাপ্রলয়ের কথা’, ‘ত্রিদেব’, ‘ইতিহাস কী বলে’, ‘গিলগামেশের কাহিনি’, ‘সৃষ্টিতত্ত্ব এবং উতু, সিন ও নিনলিল’, ‘ইনান্নার কথা’, ‘ইনান্নার অন্যান্য গল্প’, ‘এরেশকিগাল, নার্গাল ও অন্যান্য কিছু দেবদেবীর কথা’, ‘নিনুর্ত, গুদাম ও এনকিদূর কথা’, ‘এনকিদূর মৃত্যু’, ‘অন্যান্য দেবদেবী’, ‘এনমারকার ও লুগালবান্দার কথা’, ‘অমরত্বের খোঁজে গিলগামেশ’, ‘দৈত্য-দানবদের কথা’, ‘অন্যান্য উপকথা’ ও ‘গিলগামেশের যাত্রা শেষ’। দ্বিতীয় পর্ব “পরবর্তী মেসোপটেমিয়ার কথা”। এর মধ্যে রয়েছে বারোটি পর্ব। যথা- ‘মার্সেলাসের কথা’, ‘টাওয়ার অফ ব্যাবেল’, ‘রোমের পূর্ব সীমান্তে’, ‘মার্ডুক ও অসুর’, ‘মার্সেলাসের স্বপ্ন’, ‘ক্যাসাইট, মিতান্নি এবং ক্যানানাইট ও ফিনিসীয়’, ‘প্রিফেক্ট সাইনেজিয়াস’, ‘বেল, সাইরাস ও ড্যানিয়েলের গল্প’, ‘বেইরুটে মার্সেলাস’, ‘পারস্য, গ্রিক ও রোমানদের আধিপত্য’, ‘সাইনেজিয়াসের মৃত্যু’ ও ‘শেষ কথা’। বইটির মধ্যে যেমন আছে বাইবেলের নোয়ার কথা, রাজা জিউদুসুরের কথা আবার আছে অসুর সাম্রাজ্যের কথা। লেখনীর মাধ্যমে উঠে এসেছে বিভিন্ন শহরের বিভিন্ন দেবতার কথা, নারী স্বাধীনতার কথা। রয়েছে আসাগ, লামাস্টু প্রমুখ দৈত্যের উল্লেখ। বিভিন্ন প্রাচীন উপাসনার কথা বলতে গিয়ে লেখক বালদেবতার মন্দিরের ব্যাখ্যা যেমন দিয়েছেন, তেমনই উঠে এসেছে নিসব, দমকিনা, ননসে, নিনগাল, নিনসিনা, নিনগিসজিদা, বুরিয়স, সুরিয়স, বুগস প্রমুখ প্রধান ও অপ্রধান দেবতার কথা। এসবের মধ্যে এনকিদুর সাথে গিলগামেশের বন্ধুত্বের কাহিনিও আমার বেশ ভাল লেগেছে। সম্পূর্ণ কাহিনিটিই পিতা-পুত্রের আলোচনার মাধ্যমে দৃশ্যায়িত করার যে প্রচেষ্টা লেখক করেছেন, তা অত্যন্ত মনগ্রাহী হয়েছে। উরুক, নিপ্পুর, এরিদু ইত্যাদি নগরের বর্ণনায় প্রাচীন বিশ্বাসের সাথে জনজাতি ও জীবনের সংমিশ্রণ, বইটিকে আরো জীবন্ত করেছে। আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল বইটির ভূমিকা। ভূমিকাটি লিখেছেন সুলেখক ও সমালোচক প্রীতম চট্টোপাধ্যায়। মেসোপটেমিয়ার ইতিহাস ও গিলগামেশের দেশে প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার উপর আলোকপাত করার যে প্রচেষ্টা লেখক করেছেন, তা পাঠকের ভাল লাগবে বলেই আমার মনে হয়েছে।