বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকের প্রেক্ষাপটে এই উপন্যাসের সূচনা । বর্তমানের মতো ‘নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি’ নয়, নিখাদ বাঙালিয়ানা বুকে নিয়ে যৌথ দালানেই ছিল পারিবারিক বিন্যাস। তৎকালীন বাঙালি যৌথ পরিবারগুলির মধ্যে প্রচলিত রীতিনীতি, বাল্যবিবাহের ভালোমন্দ, তৎকালীন সময়ের সামাজিক-রাজনৈতিক চেতনা নিয়েই এই উপন্যাসের প্রেক্ষাপট।
পারিবারিক প্রথা মেনে দুই পরিবারের সম্মতিতে খুব কম বয়সে বিয়ে হয় কুমুদ-বিম্ববতীর। স্বভাবে একে অপরের সম্পূর্ণ বিপরীত তের বছরের কিশোর কুমুদ ও আট বছরের বালিকা বিম্ববতীর বিবাহের পর তাদের মধ্যে নানারকম বিরোধ আর খুনসুটি। ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠার সাথে সাথে পরস্পরের প্রতি আকর্ষণ জন্মানো ও হৃদয়ে মোহময় অনুভূতির আনাগোনা । পরিবারের অন্য অপরিণত দম্পতিদের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন । ব্রিটিশদের হাত থেকে দেশ উদ্ধারের স্বপ্ন দেখা কলেজ ছাত্র সূর্য্যশঙ্কর বিপ্লবী হওয়ার লক্ষে শরীর ও মন প্রস্তুত করে । পিসির পরিকল্পনা অনুযায়ী তার কিশোরী স্ত্রী সুহাসিনী কি পারবে তাকে সংসারে ফিরিয়ে আনতে? শুদ্ধ বাঙালিয়ানার স্বাদে পরিপূর্ণ মিষ্টি প্রেমের উপন্যাস ‘অম্বুবাচি’।
বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকের প্রেক্ষাপটে এই উপন্যাসের সূচনা। তৎকালীন বাঙালি যৌথ পরিবারগুলির মধ্যে প্রচলিত রীতিনীতি, বাল্যবিবাহের ভালোমন্দ, তৎকালীন সময়ের সামাজিক-রাজনৈতিক চেতনা নিয়েই এই উপন্যাসের প্রেক্ষাপট।
সেসময় বাল্যবিবাহকে বেশ স্বাভাবিকভাবেই নেওয়া হতো। তবে স্বচ্ছল বা বনেদি ঘরনার কিছু কিছু পরিবারে একটু ব্যতিক্রমী প্রথার দেখা মিলতো। ৬-৭ বছরের মেয়েদেরকে স্কুল কিংবা কলেজপড়ুয়া ছেলেদের সাথে বিয়ে দেওয়া হতো ঠিকই, কিন্তু তারা স্বামীর সাথে কিংবা শ্বশুরবাড়িতে থাকতে পারতো না। কেবল বিশেষ বিশেষ অনুষ্ঠানে শ্বশুরবাড়ি যেত৷ ঋতুমতী হওয়ার পরেই তারা স্বামীর সাথে থাকার অনুমতি পেত। অনেকক্ষেত্রে দেখা যেত যতদিন না ছেলের পড়াশোনা শেষ হচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত তাদের একসাথে থাকতে দিতো না পড়াশোনায় সমস্যা হতে পারে এই ভেবে৷
.
.
এবার মূল কাহিনীতে আসি। পারিবারিক প্রথা মেনে দুই পরিবারের সম্মতিতে খুব কম বয়সে বিয়ে হয় কুমুদ-বিম্ববতীর। কুমুদের বয়স তের, আর বিম্ববতীর আট। দুইজনেই বেশ ছোট। বিয়ে কী তা কেউই বোঝে না। কুমুদ মনে করে কোত্থেকে কোন নচ্ছার মেয়ে এলো রে বাবা, ওর আদরে ভাগ বসাচ্ছে। এদিকে বিম্ব মনে করে এই ছেলেটা কথায় কথায় এভাবে রেগে যাচ্ছে কেন, মাথায় কি ব্যামো আছে!?
তাই বিয়ের পর তাদের মধ্যে মিলের চেয়ে বেশি দেখা যায় নানারকম বিরোধ আর খুনসুটির। গল্প সামনে এগোতে থাকে, গল্পের তালে তালে কুমুদ আর বিম্বও বড় হতে থাকে। তাদের মধ্যকার আড়ষ্টতা ভাঙ্গে, একে-অন্যের প্রতি আকর্ষণ জন্মায়৷ এভাবেই কাহিনী এগোতে থাকে।
.
.
পুরো বইটা অনেকটা ডেইলি সোপের মত। আমরা কুমুদ-বিম্ব জুটিকে ছাড়াও দেখি বাসার অন্যান্য সব জুটির গল্প, সম্পর্কের টানাপোড়েন।
এইটা ভালো লেগেছে বাসার সব চরিত্রই অনেক সাপোর্টিভ। হ্যাঁ এক-দুইটা বদমেজাজি ক্যারেক্টার তো প্রতিটা পরিবারেই থাকে। সেগুলো বাদ দিলে বাকি সবাই বেশ চমৎকার। বইয়ের কিছু কিছু জায়গা পড়ে ফিক করে হেসেছি, কিছু জায়গায় যারপরনাই অবাক হয়েছি।
আমার সবচেয়ে পছন্দের চরিত্র ছিল কুমুদের সেজবৌঠান কামিনী আর কুমুদের বন্ধু নিশীথ। কামিনী আধুনিকা, শিক্ষিতা, বুদ্ধিমতী একইসাথে কুমুদ-বিম্বকে সবসময় আগলে রাখে। আর নিশীথ ছিল কুমুদের সবসময়ের সঙ্গী। যেকোনো ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সে নিশীথের পরামর্শ নিয়ে নেয়, নিশীথ তার আগে বিয়ে করেছে কীনা! অন্তিম পর্বেও নিশীথ বেশ বড় একটা কন্ট্রিবিউশান রাখে।
.
.
কে জানি বলেছেন শুদ্ধ বাঙালিয়ানার স্বাদে পরিপূর্ণ মিষ্টি প্রেমের উপন্যাস ‘অম্বুবাচি’। আসলেই তাই। তবে কুমুদ-বিম্বের প্রেম ছাপিয়ে এই উপন্যাসের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয়টি হলো পারিবারিক বন্ধন।
বিম্ব কুমুদের বোন প্রভাকে বলেছে সে বাতাবিলেবু খেতে ভালোবাসে, সেজন্য কুমুদ আর তার বন্ধু নিশীথের বাতাবিলেবু পেড়ে আনা, বিম্বর অনুরোধে কুমুদের দোলনা বানানো– এসব ঘটনা এত্ত কিউট।
.
.
বইটা আপনারা নির্দ্বিধায় পড়তে পারেন। লেখিকা এত সুন্দর করে ঝরঝরে ভাষায় বইটা লিখেছেন, সুখপাঠ্যই বটে।
টাইম মেশিনে করে আজ পৌঁছে গেছি বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে। একদিনেই শেষ করে ফেললাম অম্বুবাচি। ঝরঝরে সাদামাটা যৌথ পরিবারের গল্প। ঘটনার ঘনঘটা নেই। কিন্তু হালকা চালে পড়ার জন্য উপযোগী বই। আর আমার এরম সাবেকি যৌথ পরিবারের গল্প পড়তে বরাবরই দারুন লাগে। বাকি দুটোও শেষ হবে দুএকদিনের মধ্যেই।।
আর প্রচ্ছদ এর কথা না বললে অন্যায় হবে। কারণ প্রচ্ছদ টাই আমাকে এই বইয়ের প্রতি আকৃষ্ট করেছিল।
একদম সহজসরল, মনে রেশ রেখে যাওয়া, positive vibes দেওয়া বই খুঁজছেন? তাহলে এই উপন্যাসটির কথা জানতেই হবে।
বৃটিশ রাজত্বকালের ভারতবর্ষ। একদিকে বাংলায় বহাল তবিয়তে বিরাজ করছে বাল্যবিবাহ ও কুলীন প্রথা, বিধবা বিবাহ আইন চালু হলেও সেই ’ অনাচার ’ মেনে নিতে পারেনি তথাকথিত বংশমর্যাদাসম্পন্ন সমাজ। আরেকদিকে ক্রমশ চুপিসারে ছড়িয়ে পড়ছে ব্রিটিশ শাসকের বর্বর অসভ্য লাঞ্ছনার বিরুদ্ধে বিদ্রোহীদের বিদ্রোহের আগুন।
সেই অস্থির সময়ের প্রেক্ষাপটে রচিত এই উপন্যাস ’অম্বুবাচি ’। কাহিনীর মুখ্য চরিত্র বালিকা বধূ বিম্ববতী ও বালক বর কুমুদ। প্রথা অনুযায়ী খুব ছোটবেলায় বিয়ে হয়ে গেলেও কিশোরী বয়সে না পৌঁছনো পর্যন্ত বাবার বাড়িতেই থাকে ছোট্ট বিম্ববতী। মাঝে মাঝে শ্বশুরবাড়ি গিয়ে বড়দের খুব আদর ভালোবাসায় কাটিয়ে আবার মায়ের কোলে ফিরে আসে সে। সেই যাওয়া আসার মাঝেই সে আশ্চর্য হয় কুমুদের গাছে চড়ার পারদর্শিতায়, আহ্লাদে আটখানা হয় তার পুতুল তৈরি করার দক্ষতায়, মুগ্ধ হয় বাঁশির সুরে। কুমুদ ও সে বড় হলে যখন একসাথে থাকবে তখন কুমুদ বড়বাবুটি হয়ে গাছে চড়ে অনেক বাতাবিলেবু পেড়ে আনবে বিম্বর জন্য। এদিকে কুমুদ ক্রমশ মুগ্ধ হতে থাকে এই বালিকার গভীর চোখের দিকে তাকিয়ে। কিভাবে তাকে খুশি করা যায়, তার ছোট বউটির পছন্দ অপছন্দের তালিকা জেনে নিতে মোটেই দেরি করতে চায়না কুমুদ। একই সঙ্গে গল্পে আসে জ্যোতি শান্তি, সুহাসিনী সূর্য, সুভাষ প্রভা, বিনোদ কামিনীর মিষ্টি প্রেমের বৃত্তান্ত।
বাল্যবিবাহের ভাল ও মন্দ দুই দিক উঠে এসেছে গল্পে। অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে অনেক মেয়ে যেমন আদরের ছোট্ট বউটি হয়ে পরিবারের চোখের মণি হয়ে থাকে, তেমনি আবার অনেক মেয়ে কুলাঙ্গার স্বামীর লোভী অত্যাচার ও শারীরিক নিগ্রহ সহ্য করতে না পেরে গুমরে মরতে থাকে।কুমুদ এক দাদার কাছে শুনেছে, স্ত্রী হচ্ছে ফুলের মত। তাকে ইচ্ছে করলে নরম হাতে স্পর্শ করে যত্নে রাখা যায়, তখন সে সুগন্ধ ছড়ায়। আবার এফোঁড়ওফোঁড় করে টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলা যায়, তাতে কোনো সুখ নেই আছে হৃদয়বিদারক মৃত্যু, যে মৃত্যু ছিনিয়ে নিয়ে গেছে তাদের চারপাশের অনেক দিদি, বোন, কন্যাকে।
অনেকগুলি চরিত্রের উপস্থিতিতে যৌথ পরিবারের গল্প পড়তে আমার বরাবর ভাল লাগে। এই কাহিনীতে সবকিছু যে ভালো ঘটছে সেটা বলা যাবে না, কিন্তু তবুও সবকিছু এত সহজসরল ভাবে এগিয়ে গেছে যে বেশি ভাবনাচিন্তা না করেই একদম নিশ্চিন্ত মনে উপভোগ করে পড়ার মতো একটি উপন্যাস। বিভা প্রকাশনীর যতগুলি বই আজ অবধি পড়েছি তার সবগুলি ছিল রহস্য, ভৌতিক বা অতিপ্রাকৃতিক কাহিনী। এই উপন্যাসটি বেশ অন্যরকম। খুব ভালো লাগল।
মধুমিতা সেনগুপ্তের লেখা আগে পড়িনি কখনও। এবারের কলকাতা বইমেলায় আমার বন্ধু ঋতুপর্ণ বইটির দিকে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করায়। বইয়ের মিষ্টি প্রচ্ছদ অলঙ্করণ দেখে বুঝিনি গল্পটাও এতটা মিষ্টি হতে পারে। ২০৮ পাতার ছোট্ট একখানা বইয়ে পরতে পরতে রয়েছে শুদ্ধ বাঙালিয়ানার ছোঁয়া। গল্পের প্রধান দুটি চরিত্র - কুমুদ আর বিম্ববতী..যথাক্রমে ১২ আর ৯ বছর বয়সের দুই বালক - বালিকা। বাল্যবিবাহ করে ' পুঁচকে ' বউ কে হিংসে করা কুমুদের মনেও ঝড় ওঠে, মন আনচান করে ওঠে বিম্বর বড় বড় চোখের টানে, তারা আবদ্ধ হয় পূর্বরাগের বাহুপাশে। বাচ্চা দুটো ছেলে মেয়ের মানসিক বিবর্তন গল্পে 'স্রোতের মাঝে জেলেদের নৌকোর উজ্জ্বল আলো’র মতো । সর্বোপরি রয়েছে লেখিকা মধুমিতা সেনগুপ্তের ঝরঝরে বাংলা ভাষা। যারা বইটি পড়তে উৎসুক তারা আজকের দিনে দাঁড়িয়ে বিচার করবেন না দয়া করে, গল্পের প্রেক্ষাপট ইংরেজ শাসিত বাংলার স্বচ্ছল বাঙালি পরিবার গুলোকে নিয়ে। গল্পে আমার পছন্দের চরিত্র কামিনী( কুমুর সেজবৌঠান)। প্রতিটা অধ্যায়ে তার উপস্থিতি চোখে পড়েছে ছোট্ট ভাই বোনদের আগলে রাখা আর মন ভরা আবেগের মধ্যে । মোটমাট কুমুদ-বিম্ববতী, কামিনী- বিনোদ,সুভাষ- প্রভা , সুহাসিনী - সূর্যশংকর, বড়মা, শঙ্খমালা, কমলাবালা, আদর্শে ভরা জ্যোতিপ্রকাশ আরও অনেককে সাথে নিয়ে বইটি পড়ার এই কয়েকদিনের সফর কেবল মিষ্টত্তে ভরা।। আমার তরফ থেকে ৪.৫/৫❤️
হালকা চালের মন ভালো করা উপন্যাস। পুরনো দিনের বাঙ্গালি বনেদী বাড়ির বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠান, সাথে অল্প বয়সে বিয়ে হওয়া দুজনের মিষ্টি প্রেম সব মিলিয়ে বেশ উপভোগ্য!
🍂📖বইয়ের নাম - অম্বুবাচী ১📖🍂 ✍️লেখিকা - মধুমিতা সেনগুপ্ত 🖨️প্রকাশক - বিভা পাবলিকেশন 📑পৃষ্ঠা সংখ্যা -২০৮
🍂🍁বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকের প্রেক্ষাপটে এই উপন্যাসের সূচনা । তৎকালীন বাঙালি যৌথ পরিবারগুলির মধ্যে প্রচলিত রীতিনীতি , বাল্য বিবাহের ভালোমন্দ নিয়েই এই উপন্যাস । তের বছরের কিশোর কুমুদ ও আট বছরের বালিকা বিশ্ববতীর বিবাহের পর তাদের মধ্যে নানারকম বিরোধ আর খুনসুটি । ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠার সাথে সাথে পরস্পরের প্রতি আকর্ষণ জন্মানো ও হৃদয়ে মোহময় অনুভূতির আনাগোনা । পরিবারের অন্য অপরিণত দম্পতিদের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন । ব্রিটিশদের হাত থেকে দেশ উদ্ধারের স্বপ্ন দেখা কলেজ ছাত্র সূর্য্যশঙ্কর বিপ্লবী হওয়ার লক্ষে শরীর ও মন প্রস্তুত করে !পিসির পরিকল্পনা অনুযায়ী তার কিশোরী স্ত্রী সুহাসিনী কি পারবে তাকে সংসারে ফিরিয়ে আনতে ? শুদ্ধ বাঙালিয়ানার স্বাদে পরিপূর্ণ মিষ্টি প্রেমের উপন্যাস ‘অম্বুবাচি’ ! পুরনো দিনের বাঙ্গালি বনেদী বাড়ির বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠান , সাথে অল্প বয়সে বিয়ে হওয়া দুজনের মিষ্টি প্রেম সব মিলিয়ে বেশ উপভোগ্য ! আর প্রচ্ছদ এর কথা না বললে অন্যায় হবে , কারণ প্রচ্ছদ টাই আমাকে এই বইয়ের প্রতি আকৃষ্ট করেছিল ! এই উপন্যাসের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় টিই হলো পারিবারিক বন্ধন । কোনো সম্পর্কের জটিলতা নেই , কোনো আক্রোশ, হিংসা- প্রতিহিংসা নেই । দায়িত্ব , কর্তব্য, ভালোবাসা , আবেগ এগুলোই এই উপন্যাস কে অনেক বেশি সমৃদ্ধ করেছে !! বর্তমানের মতো নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি ’ নয় , নিখাদ বাঙালিয়ানা বুকে নিয়ে যৌথ দালানেই ছিল পারিবারিক বিন্যাস । তৎকালীন বাঙালি যৌথ পরিবারগুলির নিজস্ব ও সামাজিক নিয়মকানুন ও সেগুলির ভালো - মন্দ নানা দিক নিয়েই এই উপন্যাস রচিত । । পারিবারিক প্রথা মেনে দুই পরিবারের সম্মতিতে খুব কম বয়সে বিয়ে হয় কুমুদ ও বিম্ববতীর । স্বভাবে একে - অপরের সম্পূর্ণ বিপরীত কুমুদ আর বিশ্ব , নিজেদের মধ্যে ঝগড়া - খুনসুটি করতে করতে পূর্বরাগের বাহুপাশে আবদ্ধ হয় । পরে এক বিশেষ পারিবারিক কারণে তারা বাধ্য হয় একে অপরকে না দেখে দু'বছর অতিবাহিত করতে!!🍁🍂
কিছুদিন আগে পড়ে শেষ করলাম মধুমিতা সেনগুপ্তএর লেখা অম্বুবাচী, আদ্যোপান্ত এক মিষ্টি প্রেমের উপন্যাস। এই প্রথম তার কোন লেখা পড়লাম, এবং পড়ে বেশ দারুণ লাগলো। ১৯১৭ সালে এই উপন্যাস এর সূচনা এবং এই উপন্যাস এর সময়কাল ১-১.৫ বছর। এই উপন্যাস পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল আমি নিজেই পৌঁছে গেছি বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে। উপন্যাস এর কেন্দ্রে আছে ১৩ বছরের কুমুদ ও ৮ বছরের বিম্ববতী। বাল্যবিবাহের পর কুমুদের মনে হিংসে থাকে বিম্ববতী কে নিয়ে, কারণ তার সবকিছুতে সে এখন ভাগ বসাবে। দুজনেরই বাচ্চা মন, কুমুদের কথায় বিম্ববতী দুঃখ পেলে এক অপরাধ বোধ জন্মায় কুমুদের এবং ওদের অজান্তেই ওদের মধ্যে নিষ্পাপ মিষ্টি সম্পর্ক গড়ে ওঠে ওদের মধ্যে, যা লেখিকা খুব সুন্দর ভাবে বর্ণনা করেছেন নানা ঘটনার মাধ্যমে। যেমন বিম্ববতী এর আবদার এ কুমুদের দোলনা বানানো, কুমুদের বাতাবি পাড়া এইসব নানা ঘটনার মাধ্যমে ওদের সম্পর্ক টা চিনির থেকেও মিষ্টি হয়ে ওঠে। এই দুজন ছাড়াও সেই সময়কার পারিবারিক বর্ণনা, যৌথ পরিবারের রীতিনীতি, পারিপার্শ্বিক নানান চরিত্র এই উপন্যাস টিকে বেঁধে রেখেছে। কিছু চরিত্র উল্লেখ না করলেই নয় - বড়মা আশালতা দেবী, বিম্ববতী এর দাদা জ্যোতিপ্রকাশ, কুমুদের সেজবৌদি কামিনী। বড়মা তাদের সংসারে প্রধান স্তম্ভ। তাকে সবাই ভালো বাসেন যেমন, তেমনি ভয় ও পান। আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে লেখিকা তার মনকে আধুনিকতার ছোঁয়ায় ভরিয়ে তুলেছেন। যেমন তিনি নববিবাহিত কুমুদ কে বউ এর শরীর খারাপ এর দিনে পাশে থাকার শিক্ষা দিয়েছেন, আবার বিম্ববতী কে কুমুদের জন্মদিনে পায়েস রান্না শিখিয়েছেন। নিজের বৌমা কে শিখিয়েছেন খালি পেটে উপাসনায় সিদ্ধিলাভ হয় না। সত্যি বাঙালিয়ানায় যে আধুনিকতার ছোঁয়া দিয়েছেন লেখিকা তা আমার মনকে জয় করে নিয়েছে। জ্যোতিপ্রকাশ এর মতো দাদার জুরি মেলা ভার। বিম্ববতী কপাল করে তার মতো দাদা পেয়েছে। যেমন সে তার বোনকে ভালোবাসে তেমনি তার বোনের ��ালোর জন্য কঠোর হতে পিছুপা হন না। খুব সুন্দর এই চরিত্র টি সৃষ্টি করেছেন লেখিকা। কামিনী, কুমুদের সেজবউঠান আমার অন্যতম প্রিয় চরিত্র। কুমুদের থেকে বড়জোর ২-৩ বছরের বড় হবে, কিন্তু কী সুন্দর করে সে সব কিছুতে ঠাকুরপো, ননদ দের আগলে রেখেছে। তার আবেগ খুব সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখিকা। আমার মনে হয় কামিনী এর মতো চরিত্র না থাকলে এই উপন্যাস ই হত না। শুধু কুমুদ বিম্ববতী ই নয় , প্রভা- সুভাষ, কামিনী- বিনোদ, সুহাসিনী সূর্যশঙ্কর এদের ও অল্পবিস্তর প্রেমকাহিনী লেখিকা ফুটিয়ে তুলেছেন এই উপন্যাসে।
আর একজন কেও ভালো লেগেছে সে হলো কুমুদের প্রাণের বন্ধু নিশীথ। এছাড়াও আরও অনেক চরিত্র আছে যা বইটি পড়লে বোঝা যাবে।
প্রেমকাহিনী ছাড়াও লেখিকা ব্রিটিশ শাসিত ভারতের সময়ের কিছু বর্ণনা করেছেন। উপন্যাসের শেষের দিকে এক রুদ্ধস্বাস ঘটনার বিবরণ আছে যা সত্যি অপ্রত্যাশিত ছিল। পড়ার সময় বেশ টানটান উত্তেজনা অনুভব করেছি।
লেখিকার সুন্দর ঝরঝরে বাংলা ভাষার বর্ণনায় এই গল্পটি হয়ে উঠেছে খুবই সুখপাঠ্যকর। বাঙালিয়ানা এর ছোঁয়া প্রতি পাতায়। আমার মনেহয় লেখিকা অতি সযত্নে সময় নিয়ে উপন্যাসটির বুনন করেছেন। আমি পড়ার সময় একটি করে অধ্যায় পড়ে বই বন্ধ করে গল্পটির রেশ উপভোগ করছিলাম। বলতে গেলে বেশ ইচ্ছে করেই এই ২০৮ পাতার গল্পটি বেশ কিছুদিন সময় নিয়ে পড়েছি এবং মিষ্টতা অনুভব করেছি।