সাভোতে রেলপথ তৈরির দায়িত্বে এসে মহাবিপদে পড়লেন কর্নেল জে, এ, প্যাটারসন।…নিখোঁজ হতে লাগল একজন-দু’জন করে কুলি। ঘটতে লাগল নিত্য-নতুন রোমহর্ষক ঘটনা। এ কাহিনি পড়তে নিলে ছাড়া যায় না।
পৃথিবীর ইতিহাসে যত মানুষখেকো শিকার হয়েছে তার মাঝে সম্ভবত সবচেয়ে বিখ্যাত সাভোর মানুষখেকো। আজ থেকে ১২৪ বছর আগে, তৎকালীন ব্রিটিশ ইস্ট আফ্রিকায় (আজকের কেনিয়া) রেললাইন বসানোর সময় সাভো নামক জায়গায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলো দুটি সিংহ। প্রধান টার্গেট ছিলো রেলের কাজে নিয়োজিত ভারতীয় কুলিরা। পাহারা যতই শক্ত হোক, তাঁবুর আশপাশে যতই আগুন জ্বলুক, কাঁটাগাছ বিছানো হোক, বন্দুক ছোঁড়া হোক - এই জোড়া সিংহকে নিবৃত্ত করা যায়নি৷ সরকারি হিসাব মতে মোট ১৩৫ জন হতভাগা মানুষ এই জোড়া সিংহের শিকার হয়েছিলো!
ব্রিটেনের রয়্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের লে. কর্ণেল জন হেনরি প্যাটারসনের হাতে অবশেষে মারা পড়ে সিংহ দুটি। কিন্তু এই সৌভাগ্য দিনে দিনে আসেনি। দুই মানুষখেকো শিকারে কী পরিমাণ দূর্ভোগ, হতাশা, কষ্ট স্বীকার করেছেন প্যাটারসন, কতবার ভয়ে অর্ধমৃত হয়েছেন, ভাগ্যের জোরে প্রাণে বেঁচেছেন, সাহসে ভর করে অসম্ভবকেও সম্ভব করেছেন - তা উঠে এসেছে তাঁর লেখা 'The Man-Eaters of Tsavo' বইটিতে।
পঠিত 'সাভোর মানুষখেকো' এই বইটিরই ভাবানুবাদ (বাংলা)। রূপান্তর করেছেন সেলিম আনোয়ার। প্রকাশক সেবা প্রকাশনী।
বইটি খুবই রেয়ার। প্রকাশসাল ১৯৯২, এখন আর রিপ্রিন্ট হয়না। লাকিলি এক কপি পেয়ে গেছি!
বইয়ে সাভোর নরখাদক ছাড়াও বিভিন্ন ঘটনাসূত্রে প্যাটারসন ও তাঁর সহকর্মীদের সিংহ শিকারের বর্ণনা আছে। লেখক বিশেষ করে বলেছেন তাঁর ভারতীয় ভৃত্য মাহিনার কথা, যার সাহস ও দক্ষতা তাঁকে বারবার মুগ্ধ করেছে। এছাড়া লেখক আরেক ভৃত্য পাঠান যুবক রোশান খানের কথা বলেছেন। এই সুঠাম অথচ ভীতু ছেলেটিকে নিয়ে বেশ রোমাঞ্চকর একটা অভিজ্ঞতা হয়েছিলো প্যাটারসনের। যে ঘটনায় রোশানের ভীরুতার জন্য প্রাণে বেঁচেছিলেন তিনি।
বইয়ের শেষদিকে রোমহষর্ক একটা ঘটনার বর্ণনা আছে। ঘটনাটি রেললাইনের আশেপাশে ঘাঁটি গাড়া আরেক মানুষখেকোকে নিয়ে। পুলিশ সুপার রায়াল সিংহ শিকারে এসে কিভাবে নিজেই মানুষখেকোর শিকারে পরিণত হন তা পড়তে পড়তে গায়ে কাঁটা দিবে যে কারোরই।
লে. কর্ণেল জে. এ. প্যাটারসন 'বাঘ বনাম সিংহ' - এই বিখ্যাত তর্কের শেষ টেনেছেন সিংহকে এগিয়ে রেখে। তাঁর মতে বাঘ যতই সাহসী আর হিংস্র হোক, তেজের দিক থেকে সিংহ বাঘের চেয়েও এককদম আগে।
প্যাটারসন বেশ ভালো শিকারী হলেও তাঁর শিকার জীবন ছিলো সংক্ষিপ্ত।
চোখের সামনে ভোঁতা নামের এক ভৃত্যকে সিংহীর হাতে আহত ও পরবর্তীতে মারা যেতে দেখে শোকে তিনি শিকার ছেড়ে দেন। ভোঁতাকে আহত করা সেই সিংহীই ছিলো তাঁর শেষ শিকার। রেলের কাজ শেষ করে ১৮৯৯ এ ইংল্যান্ড রওনা হন তিনি। সেই সাথে শেষ হয় রোমাঞ্চকর এই কাহিনী।
বইটি একইসাথে রোমাঞ্চকর ও দূর্লভ। দুয়ে মিলে এর গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে। ব্যক্তিগত রেটিং তাই ৪.৫/৫।