Jump to ratings and reviews
Rate this book

দীর্ঘশ্বাসেরা হাওরের জলে ভাসে

Rate this book
বাংলাদেশের প্রচলিত সামাজিক স্তরবিন্যাসের অনেকটা বাইরে হাওরাঞ্চলের সামাজিক স্তরবিন্যাস। সমাজ কাঠামােটাও অনেকটা ভিন্ন। ভিন্ন মানুষদের সুখ-দুঃখ , আনন্দ-বেদনা, আশা-ভরসা আর স্বপ্নের প্রেক্ষাপট। একবিংশ শতাব্দীতে এসেও যারা কখনও ট্রেন, উঁচু দালান দেখেনি, যাদের দেহ কোন এমবিবিএস পাশ ডাক্তারের স্পর্শ পায়নি। কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস আর নিয়ন্ত্রণহীন আদিম প্রবত্তি তাদের টেনে ধরে মধ্যযুগের কুষ্টিতে। হেলাফেলায় ছিটিয়ে দেয়া বীজ ফুঁড়ে ধানের জন্য আর নৌকায় মাছেদের লাফিয়ে ওঠা দেখে একসময় দেশের নানা জায়গা থেকে বসত গড়া মানুষের আজও হাওরের আদি অধিবাসীদের চোখে শুধুই আবাদি। মাহ ধরা পেশায় ঝুঁকে পড়া মুসলমানদের মাইমল নামের নতুন পরিচয় কিংবা নৌকার যাযাবর জীবন ত্যাগ করে আসা মানুষদের গাইন উপাধি দিয়ে সমাজ কর্তৃক অগ্রাহ্য করার প্রবণতা প্রতিনিয়ত তৈরি করছে নতুন নতুন সামাজিক মেরুকরণ। জমিদারি প্রথার অবসান হলে—সে ব্যবস্থার ছায়া হয়ে যেন এখনও হাওরের ওয়াটার লর্ডরা বেঁচে আছে। হাওরের বালকেরা স্বপ্ন দেখে ওয়াটার লর্ড হয়ে বিল থেকে বিলে দাপিয়ে বেড়াবার—যে স্বপ্নের বেশিরভাগই পরিসমাপ্তি ঘটে মাটি পাথরের সাথে বস্তাবন্দি হয়ে হাওরে ডুবে মরায় কিংবা বর্শা-বল্লমের আঘাতে।। পত্রিকায় রামসার সাইট হয়ে যাওয়া টাঙ্গুয়ার হাওরের খবরে আমরা উদ্বলিত হই বটে কিন্তু টাঙ্গুয়ার হাওর পাড়ের মানুষদের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন থেকে অধিকারহীনতা পরবর্তী খবর আমরা রাখি না, রাখতে চাই না। লেখক হাওরাঞ্চলে দীর্ঘদিন সশরীরে অবস্থান করেছেন। দিনের পর দিন ঘুরে বেড়িয়েছেন হাওরের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে। প্রত্যন্ত এবং দুর্গম অঞ্চলের মানুষদের সাথে মিশেছেন একাকার হয়ে। নতুন-পুরাতন বই ঘেটেছেন বিস্তর। প্রায় চারবছর ধরে বুকে লালন করা খণ্ড-খণ্ড অভিজ্ঞতা আর সত্য ঘটনার ছায়া অবলম্বনে লিখেছেন তাঁর প্রথম উপন্যাস দীর্ঘশ্বাসেরা হাওরের জলে ভাসে।

159 pages, Hardcover

First published February 1, 2012

Loading...
Loading...

About the author

Masudul Haq

5 books7 followers
মাসউদুল হকের জন্ম ১৯৭৪ সালে। সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় পদচারণা করলেও তাঁর আগ্রহের জায়গা মুলত কথাসাহিত্য। তবে কথাসাহিত্যের নির্দিষ্ট কোন গণ্ডিতে নিজেকে আটকে রাখতে চান না। ফলে তাঁর প্রতিটি গল্প বা উপন্যাসের বিষয়বস্তু হয় ভিন্ন। কথাসাহিত্যের প্রতিটি শাখায় কাজ করার স্বপ্ন নিয়ে তিনি লেখালিখি করেন। প্রতিনিয়ত নিজেকে নতুন নতুন সাহিত্যিক চ্যালেঞ্জের সামনে দাঁড় করানাে এবং সেই চ্যালেঞ্জ থেকে উত্তরণের চেষ্টাই মাসউদুল হকের সাহিত্য রচনার মূল প্রেরণা। পড়াশােনা করেছেন কুমিল্লা ক্যাডেট কলেজ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং সিভিল সার্ভিস কলেজে। একাডেমিক পড়াশােনার বিষয় সমাজকর্ম এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক। তবে আগ্রহের বিষয় দর্শন, ইতিহাস এবং রাজনীতি। প্রথম উপন্যাস ‘দীর্ঘশ্বাসেরা হাওরের জলে ভাসে’র জন্য ২০১২ সালে পেয়েছেন এইচএসবিসি-কালি ও কলম তরুণ কথাসাহিত্যিক পুরস্কার। তাঁর গল্প অবলম্বণে নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি ‘ঘ্রাণ’ দেশের বাইরে একাধিক চলচ্চিত্র উৎসবের পাশাপাশি ২০১৬ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ স্বল্প দৈর্ঘ্য ছবির মর্যাদা পেয়েছে। মাসউদুল হক পেশায় সরকারি চাকুরে।

Ratings & Reviews

What do you think?
Rate this book

Friends & Following

Create a free account to discover what your friends think of this book!

Community Reviews

5 stars
13 (44%)
4 stars
11 (37%)
3 stars
5 (17%)
2 stars
0 (0%)
1 star
0 (0%)
Displaying 1 - 10 of 10 reviews
Profile Image for Harun Ahmed.
1,806 reviews534 followers
January 10, 2023
বইয়ের শুরুটা বিস্ময়কর-
"প্রকৃতির সাথে লড়াই চলে না, সমঝোতা চলে । তাও যদি প্রকৃতির সম্মতি থাকে । বানরের গলায় যেমন স্বেচ্ছায় এবং নিজ দায়িত্বে ঝুলে থাকে বানরশাবক তেমনি করে হাওর অঞ্চলে প্রকৃতির গলায় ঝুলে থাকে হাওরের মানুষ । প্রকৃতির সাথে লড়াই করে ধনীর তকমা গায়ে নিয়ে টিকে থাকা মানুষ হাওরে দেখা যায় কদাচিৎ । প্রকৃতি ধনবানের প্রতি দুর্বল আর গরিবের প্রতি নির্দয়—এ সত্য মেনে নিয়েই হাওরের মানুষেরা বানরশাবকের জীবন বেছে নেয় ।"

গল্পের শুরুতেই আমরা হাওর অঞ্চল সম্পর্কে নানান অজানা ও অবাক করা তথ্য পাই( যে তথ্যগুলো হাওর সম্পর্কে আমাদের ভাসাভাসা জ্ঞান চিরতরে বদলে দেবে।) লেখক যে প্রচুর পরিশ্রম করেছেন তা বোঝা যায়। শুরু হয় আফাজ মাস্টারকে দিয়ে। এরপর একের পর এক চরিত্র আসতে থাকে। আসতেই থাকে!অথচ বইটা মাত্র ১৬৪ পাতার। লেখক যে গল্প সাজিয়েছেন তার জন্য বইয়ের আয়তন হওয়া উচিত ছিলো অন্তত ৫০০ পাতা। আফাজ মাস্টার, আতিক, আয়নাল, খসরু কারো সাথেই একাত্ম হওয়ার তেমন সুযোগ পাওয়া যায় না। ছোট পরিসরে দীর্ঘ গল্প বলায় পুরো উপন্যাসে বর্ণনার আধিক্য পীড়াদায়ক। মহৎ উপন্যাস হওয়ার সব চিহ্নই বইতে আছে কিন্তু পরিসরের সীমাবদ্ধতা আর অত্যাধিক চরিত্রের সমাবেশের জন্য সে সম্ভাবনার অপমৃত্যু ঘটেছে।

(২৫ জুন,২০২২)
Profile Image for Farzana Raisa.
534 reviews267 followers
May 18, 2022
এতো সুন্দর একটা বই? এতো নির্মম বাস্তবতা? পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল একটা জীবন যেন পার করে ফেলছি।

এইতো ক'বছর আগে বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে টাঙ্গুয়ার হাওড়ে ঘুরতে গিয়েছিলাম। এর বিশালত্ব দেখে, এত দূরের দূরের জনপদ দেখে কম অবাক হইনি। এতো কষ্ট করে করে এত দূর দূরান্তে কেন থাকে মানুষ? উত্তর পাওয়া গেলো। উত্তর পাওয়া গেলো আরও অনেক কিছুরই। আরও আগে যদি পড়তাম বইটা? হয়ত নতুন চোখে, নতুন দৃষ্টিতে দেখা হতো সবকিছু। ভাবতে পারতাম অন্য ভাবেও। অসম্ভব সুন্দর একটা বই। হাইলি রেকমেন্ডেড।
Profile Image for Amit Das.
182 reviews125 followers
February 9, 2021
বাংলাদেশের প্রচলিত সামাজিক স্তরবিন্যাসের অনেকটা বাইরে হাওরাঞ্চলের সামাজিক স্তরবিন্যাস। ভিন্ন সমাজ কাঠামো নিয়ে গঠিত সেই অঞ্চলের মানুষের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, আশা-ভরসা আর স্বপ্নের প্রেক্ষাপটও তাই ভিন্ন।

হাওরাঞ্চলে দীর্ঘদিন সশরীরে অবস্থান করে, সেখানকার মানুষদের সাথে একাকার হয়ে মিশে, নতুন-পুরাতন বই ঘেঁটে, অভিজ্ঞতা আর সত্য ঘটনার ছায়া অবলম্বনে সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার মধ্যনগর এলাকা ও সন্নিহিত গ্রামগুলো নিয়ে মাসউদুল হক লিখেছেন তাঁর প্রথম উপন্যাস 'দীর্ঘশ্বাসেরা হাওরের জলে ভাসে'।

সুনামগঞ্জ জেলার বাসিন্দা হওয়ায় উপন্যাসটির বিষয়বস্তুর প্রতি শুরু থেকেই দুর্বলতা ছিল। তবে এর বাইরেও লেখকের চমৎকার ন্যারেটিভ স্টাইলের সমন্বয়ে দারুণ একটি উপন্যাস হয়ে উঠেছে আমার কাছে।
বেশ তথ্যবহুল বই, তথ্যের ভার আরেকটু কম মনে হলে আরো ভালো লাগত। এজন্যই একটি তারা কম দিলাম।
Profile Image for মোমিন Ahmed .
116 reviews52 followers
September 29, 2021
বই এর নামটা কি সুন্দর!
'দ্বীর্ঘশ্বাসেরা হাওরের জলে ভাসে'।
মানুষ যখন দুঃখ কষ্টের সাথে লড়াই করতে করতে এক সময় আর পারে না, যখন সে এই দুঃখ কষ্টের সঙ্গ মেনে নিতে বাধ্য হয় যখন তার আর কিছু করার থাকে না, বুকের ভেতর থেকে দ্বীর্ঘশ্বাসেরা বেড়িয়ে আসে। এই বই এ হাওরের মানুষের জীবনের ছবি এঁকেছেন লেখক। তাদের জীবনে বেচে থাকার গল্প তুলে ধরেছেন। এইসব মানুষ জীবনযাপন করে না তারা জীবনে বেচে থাকে। প্রকৃতির সাথে লড়াই করে বেচে থাকে আর ভাবে প্রকৃতিদেবী এতো কিছু কেড়ে নিয়েও তাদের বেচে থাকতে দিয়েছে। এখানে দুঃখ কষ্টের পরিণতি দ্বীর্ঘশ্বাসে থেমে থাকেনি। এখানে শুধু হাহাকার।

তারাশংকর এর গণদেবতা পঞ্চগ্রাম উপন্যাস এর একটা ছায়া আমার চোখে পড়েছে এই বই পড়ার সময়। গণদেবতা উপন্যাসের সবগুলো চরিত্র একই গল্পের অংশ কিন্তু এখানে বর্তমান সময়ে মানুষের মধ্যে সেই বন্ধন আর নেই এই কথা 'দ্বীর্ঘশ্বাসেরা হাওরের জলে ভাসে' পড়ে জানা যায়। এখানে সব গুলো চরিত্র আলাদা আলাদা ভাবে এক একটা গল্প তৈরি করে। আর সব গুলো গল্প মিলেমিশে হাওরের গল্প হয়ে যায়।

মাসউদুল হকের কাছে অনেক আশা থাকবে।
Profile Image for Mahmudur Rahman.
Author 14 books368 followers
November 22, 2020
উপন্যাস ছোট পরিসরে হওয়া দোষের না, বরং ব্যক্তিগত ভাবে সেটাই অনেক ক্ষেত্রে পছন্দ করি। লেখক হাওরের মানুষের যে সুখ দুঃখ দেখাতে চেয়েছেন অর্থাৎ যে গল্পটা বলতে চেয়েছেন তা বলেছেন, কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু যে পরিমাণ চরিত্র এবং ঘটনা তিনি এনেছেন তাতে উপন্যাস আরও বড় পরিসর দাবী করে। আতিক, আয়নাল থেকে শুরু করে খসরু কিংবা আখের, কোন চরিত্রই পুরোপুরি ফুটে ওঠেনি। অন্যদিকে অনেকে যদিও বলেন মাসউদুল হক 'পুবের পূর্বপুরুষেরা' উপন্যাসে তথ্যের কচকচানি করেছেন, আমি দেখি হাওর নিয়ে এই উপন্যাসে সেটা বেশি জা অনেক ক্ষেত্রে গল্পকে ঢেকে দেয়। হাওরের ইতিহাস, উপকথা সব মিলিয়ে গল্পটা আসলে জটিল হয়ে ওঠে আর সেই জটিলতা নিরসনে উপন্যাসের পরিসর বড় হওয়া প্রয়োজন ছিল।

বায়ান্ন প্রকাশনীর নতুন সংস্করণ পড়লাম। লেখকের নিজের ভুল কিনা জানি না তবে বইয়ে 'ভুলা', 'বুঝা', 'শুনা' প্রভৃতি শব্দের ব্যবহার আছে যা ভুল বলেই জানি। পাশাপাশি বইয়ের প্রোডাকশন ভালো হলেও বেশ কিছু জায়গায় টাইপো আছে। 'টাইপো' মানা যায় তবে মাসউদুল হকের লেখায় 'শুনা', 'বুঝা' মানায় না; অন্তত যে বইটা 'এইচএসবিসি কালি ও কলম পুরস্কার' প্রাপ্ত।
Profile Image for Sadia Sultana.
7 reviews3 followers
February 16, 2018
পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ মাসউদুল হকের উপন্যাস ‘দীর্ঘশ্বাসেরা হাওরের জলে ভাসে’
-সাদিয়া সুলতানা

হাওরের মানুষের জীবন কেমন? সেই জীবনের রসদ কি কেবল বিপুল জলরাশির অবারিত সৌন্দর্য্য? নাকি বর্ষার পানির তোড়ে অভাবের হাহাকারে বিপর্যস্ত জনপদের পত্রিকার শিরোনাম হওয়াই এর একমাত্র ভবিতব্য? পত্রিকার পাতায় হাওরের ছবি দেখে চার দেয়ালের মধ্যে যাপিত জীবন নিয়ে হিশেব কষে দিনাতিপাত করা মানুষের জন্য এক অনন্য সাধারণ বই গদ্যকার মাসউদুল হকের প্রথম উপন্যাস ‘দীর্ঘশ্বাসেরা হাওরের জলে ভাসে।’ যে জীবন আমি নিজে দেখিনি সে জীবনে যেন লেখক আমাকে হাত ধরে নিয়ে যান। কড়ায়গন্ডায় জীবনের হিসেব বুঝে নিতে যখন ব্যস্ত সবাই তখন কোনো কোনো মানুষ কান পেতে অন্যের জীবনের গল্প শোনেন, প্রান্তিক মানুষের দীর্ঘশ্বাসের গভীরতা পরিমাপ করেন। অন্তহীন পানির সাথে অভাবের অবাধ বিচরন আর নিরন্তর বোঝাপড়ার আখ্যান এই ‘দীর্ঘশ্বাসেরা হাওরের জলে ভাসে।’ এই উপন্যাসের পাতায় পাতায় হাওরের জলের মতো প্রবাহিত হয়েছে হাওরের মানুষের দীর্ঘশ্বাসের গল্প।

বাংলাদেশের হাওরের পানির উৎস হলো ভারতীয় এলাকা থেকে উৎপন্ন নদী ও সীমান্তবর্তী পাহাড় থেকে নেমে আসা নানা পাহাড়ি ছড়ার পানি যা পাহাড় ধুয়ে মাটিতে এসে এই এলাকার জমিকে উর্বর করেছে আবার নদীগুলির নাব্যতাও হ্রাস করেছে। নদীর এই জলবৈচিত্র্য আর বঞ্চনার গল্পই লেখক বলেছেন এই উপন্যাসে। হাওরের মানুষের জীবনকে শাসন করে পানি। সেই পানিকে ঘিরে ক্রিয়াশীল থাকে দাদন ব্যবসায়ী, সারের ডিলার, সেচ কারবারি, জলমহালের ইজারাদাতার মতো সুযোগসন্ধানী নানা পেশার মানুষ। এসব চক্রের প্রভাব আর ‘অজগর সাপের মতো শিকারকে জাপটে ধরা’ অভাবের সাথে বসবাসকারী টাঙ্গুয়ার হাওরের মানুষের জীবনের গল্পগুলো ছোট ছোট বাক্যবিন্যাসে অপূর্বভাবে চিত্রায়িত করেছেন লেখক। লেখক যখন বলেন, ‘হাওরের মানুষ তাই ঘুম না আসা মানুষের মতো এপাশ ওপাশ করে জন্মাবধি জীবনযাপন করে’ তখন যেন চোখের সামনে হাওরের মানুষের পুরো জীবনচক্র দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। ১৮৮ পৃষ্ঠার বইটি থেকে এরকম অসংখ্য বাক্য উদ্ধৃত করা যাবে যা পাঠকের মনে একেবারে গেঁথে যাবে।

এই উপন্যাসের চরিত্র-বিন্যাসের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এখানে কোন বিশেষ পুরুষ বা নারী চরিত্র কেউ কাউকে ছাপিয়ে প্রধান হয়ে উঠতে পারেনি বা হয়ে ওঠেনি। এছাড়া এই উপন্যাসে সংলাপ তুলনামূলক কম। তবে আঞ্চলিক ভাষার সংলাপগুলো বেশ সুখপাঠ্য। উপন্যাসের প্রথম চরিত্র ঢাকার জগন্নাথ কলেজ থেকে বারো বছর আগে ¯œাতক পাশ করে হাওর অঞ্চলের দুর্গমতর জনপদ সুনামগঞ্জের ধরমপাশা উপজেলা ছাড়িয়ে মধ্যনগর থানা পেরিয়ে চামরদানি ইউনিয়নের চামরদানি হাইস্কুলের শিক্ষক আফাজ মাস্টার। অভাবের সাথে সম্পর্কচ্ছেদের অভিলাষে একসময়ের শহরবাসী আফাজ মাস্টারের পাড়াগাঁয়ে প্রত্যাবর্তনের পেছনের কারণ তার সহজ হিশেবের জীবন যাপন আর তার দাদার প্রতিষ্ঠিত স্কুলের হাল ধরার প্রত্যাশা। হাওরের অভাবের জীবনে শীতের পাতার মতো ঝরে যাওয়া ছাত্ররা যখন বাল্যবিবাহ আর অর্থ উপার্জনের হাতিয়ার হয়ে ওঠে আর কাজের সন্ধানে চলে যায় দূর পার্বত্য এলাকায় তখন বুকে ব্যথার পাহাড় নিয়ে ছাত্রছাত্রীর খোঁজে বাড়ি বাড়ি ছুটে বেড়ান আফাজ মাস্টারেরা।

আফাজ মাস্টারের পর একে একে অনেক চরিত্রের অণুপ্রবেশ ঘটে এই উপন্যাসে। ধরমপাশা থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ডাক্তার আতিকুর রহমান, প্রান্তিক কৃষক তবারক, দাদন ব্যবসায়ী আখের মিয়া, ব্যাংক ম্যানেজার কুদ্দুস, আখেরের পুত্র সোলেমান, তাজুল চেয়ারম্যান, ধরমপাশার সবচেয়ে বড় বিল নিয়ন্ত্রণকারী ব্যবসায়ী আয়নাল, চাঁদপুরের হাইমচর থেকে ভাগ্যান্বেষনে আসা সফদরের বাবা সেলাম, সফদরের ছেলে বাতেন, আখেরের শালী রুমা, খোকন এসব চরিত্রের সাথে সাথে টাঙ্গুয়ার হাওর পাড়ের আদি বাসিন্দা হাজং, সাধারণ মানুষের জীবনে শেকড়ের মতো গেড়ে থাকা কুসংস্কার, ফসল নষ্ট হবার অপার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও ফসলের জন্য আরাধনা এসব বিষয়ের সাথে এই উপন্যাসের পথ পরিক্রমায় আমরা পরিচিত হই। তবে এই উপন্যাসের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হচ্ছে, জলমহাল ইজারার নেপথ্যের ঘটনাবলী লেখক দক্ষতার সাথে বর্ণনা করেছেন।

প্রকৃতির সাথে সমঝোতা করে বেঁচে থাকা হাওরের মানুষগুলো রিতু পরিক্রমায় অবলোকন করে হাওরের বৈচিত্র্যময় রূপ। বর্ষার থৈ থৈ হাওরের রূপবদল হয় চৈত্রে। চৈত্রে গুমাই, ঘাসি, কংস নদী হয় কংকালসার। তখন বৃষ্টির আশায় ব্যাঙের বিয়ে দিতে মেয়েরা গান ধরে, বেঙাই মারে নাকে ফোটা/মেঘ পড়েছে ছইলতা ফোটা/ও বেঙাই মেঘ আন গিয়া। আবার বৈশাখের ঝড়-বৃষ্টির হাত থেকে ফসল রক্ষার জন্য ‘হিরালি’ আচারের মাধ্যমে হিরাল বা পিরালরা কৃষকের সাথে তার জমিতে যেয়ে নানা মন্ত্রপাঠ করে। একসময় সকল বাঁধা পেরিয়ে যখন কৃষষের ঘরে ফসল ওঠে তখন অনাবিল আনন্দে মুখরিত হয় জনজীবন। এসবের সাথে সাথে এই উপন্যাসের খোপে বন্দি আছে জল-অধিপতিদের কাছে শোষিত মানুষের হাহাকার আর পানির উপর আধিপত্য নিয়ে বিস্তৃত দ্বন্দ্ব-সংঘাতের ভয়াবহ রূপ।

এই উপন্যাসের যে অংশটুকু হৃদয়ে গভীরভাবে দাগ কাটে সেটি হলো, আফাজ মাস্টারকে লেখা তার স্কুলের ঝরে যাওয়া ছাত্র আব্দুল বাতেনের চিঠি, যে চিঠিতে বাতেন নিজের জীবনের গল্প বলতে বলতে হালকা হয়। অভাবের তাড়নায় স্কুল ছেড়ে যাবার পর বাতেনের জীবনের ঘাত-প্রতিঘাত আর বাতেনের জীবনবোধ পাঠককেও তাড়িত করে। আফাজ মাস্টার একদিন খুব ভোরে ট্রলার ভাড়া করে খাল, বিল নদী পার হয়ে তাহিরপুরে রক্তি নদীর পাড়ে চলে যায় যেখানে শত শত মানুষ নগরায়ণকে গতিশীল করতে বুক পানি, গলা পানিতে নেমে নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে বালু তোলে। এই বালু শ্রমিকদের ভিড়ে আবেগে ক্ষতবিক্ষত আফাজ মাস্টার খুঁজে পান হিরু, বাতেনসহ অনেক প্রাক্তন ছাত্রকে। যাদের শরীর রুগ্ন-শীর্ণ, গায়ে কাপড় আর মাংসের বালাই নেই, পরনে কেবলমাত্র শতছিন্ন প্যান্ট।

এদের দেখে নিজের অপারগতায় আফাজ মাস্টার লজ্জা পান। তার মনে হয় আশেপাশের মানুষ হয়তো ভাবছে, ‘কেমন মাস্টার, যার এতডি ছাত্র স্কুল ছাইড়া বালু তুলতো জমা অইছে।’ এই ছাত্রদের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি কাজী নজরুল ইসলামের কষ্টকর জীবনের গল্প বলেন। কিন্তু তার প্রাক্তন ছাত্ররা শ্রমজীবী বলে তাদের কাছে আবেগের চেয়ে সময়ের দাম বেশি তাই তারা কাজের তাগিদে একে একে চলে যায়। শুধু বাতেন একটি পুটলি নিয়ে তার শিক্ষকের সাথে ট্রলারে ওঠে। আফাজ মাস্টার মনে মনে ভাবেন, ‘ছোট্ট প্রদীপ অন্ধকারের বিশাল গহ্বরকে জয় করতে পারে না, অন্ধকারে থাকা মানুষদের আলোর পথ দেখাতে পারে শুধু।’ একসময় ভাবতে ভাবতে আফাজ মাস্টারের বুক থেকে দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসে আর শিক্ষকের জন্য বাতেনের ছোট বুকেও বুদবুুদের মতো দীর্ঘশ্বাস তৈরি হতে থাকে। এই দৃশ্যপটের সাথেই সমাপ্তি ঘটে ‘দীর্ঘশ্বাসেরা হাওরের জলে ভাসে’ উপন্যাসের।

২০১৭ সালে ধ্রুব এষের করা নান্দনিক প্রচ্ছদে কথাশিল্পী মাসউদুল হকের ‘দীর্ঘশ্বাসেরা হাওরের জলে ভাসে’ উপন্যাসের তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশ করেছে ‘চৈতন্য’ প্রকাশনী। উপন্যাসটি যে বাংলা সাহিত্যের জগতে একটি স্থায়ী অবস্থান করে নিতে যাচ্ছে তা এর পাঠে মন দিলেই নিশ্চিত হওয়া যায়।
Profile Image for Mostaque Ahmed.
3 reviews6 followers
October 31, 2022
একটি অবিশ্বাস্য এথনোগ্রাফিক উপন্যাস

মাসউদুল হকের সাথে প্রথম পরিচয় হল ২০১৫ সালের বইমেলায়, শাহদুজ্জামানকে ঘিরে অন্যান্যদের সাথে তিনি আড্ডা দিচ্ছিলেন। আড্ডা শেষে আমাকে তার একটি উপন্যাস উপহার দেন। মাস দুয়েক পরে উপন্যাসটা পড়ে আর পাঠ প্রতিক্রিয়া না লিখে পারিনি। লেখাটি এরকম ছিলঃ
ডিসক্লেইমারঃ
‘দীর্ঘশ্বাসেরা হাওরের জলে ভাসে’ (২০১২) মাসউদুল হকের প্রথম উপন্যাস। আমার পক্ষে এই উপন্যাসের মাহাত্ম্য কোনোভাবেই আলোচনায় ধারণ করে বোঝানো সম্ভব না। পাঠ প্রতিক্রিয়া লেখার অভ্যাসবশত লিখে রাখা মাত্র।
পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ
হাওর জনপদ নিয়ে লেখা আমার পড়া প্রথম এবং একমাত্র উপন্যাস।
বাংলা সাহিত্যের এ এক অকর্ষিত ভূগোল।
লেখকের সূক্ষ্ণ ও ডিটেলস বর্ননা চোখের সামনে এক অদেখা জগতকে তুলে ধরে চলচিত্রের মতো।
মনে হয় লেখক বুঝিবা নিজেই টাঙ্গুয়ার হাওরকে রামসার সাইট ঘোষনার ফলে বঞ্চিত ও প্রকৃতির হাতে লাঞ্ছিত এক মাইমল মানব – এমনই এক এথনোগ্রাফিক –সততায় উপন্যাসের প্রতিটি লাইন লিখে গেছেন।
কিংবা মাসউদুল হক রচনা করেছেন এক রূপকথা! হাওর অঞ্চলের সমাজে কিছু আধুনিক পৃথিবী প্রতিফলিত-প্রতিসরিত হলেও তাঁর সমাজব্যবস্থা রয়ে গেছে প্রাচীন। এখানে আছে দারিদ্র, আছে টাকার উল্লাস; আছে গুমোট, আছে বর্ষন; আছে হিংসা- অবিশ্বাস-দ্রোহ- দ্বন্দ্ব ; আছে বন্ধন আছে সরলতা, আছে গরিব মানুষের নীরবতার সংস্কৃতি।
উপন্যাসের সংলাপগুলো স্থানীয় ভাষার- জীবন্ত ও মজার; তবে প্রথম সংলাপটি পেতে ২১ পৃষ্ঠা অপেক্ষা করতে আর তর সইছিল না।
‘দীর্ঘশ্বাসেরা হাওরের জলে ভাসে’ পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল এটি একটি ক্লাসিক মানের উপন্যাস, লেখক এই একটি উপন্যাসেই যে শক্তিমত্তা্র পরিচয় দিয়েছেন তা বাংলা সাহিত্যে তাঁর অপরিহার্যতা প্রমান করে। নিখুঁত বর্ননায়, জীয়ন্ত সংলাপে, ক্লাসিক মেজাজে এই উপন্যাস একটি কালজয়ী চলচ্চিত্রও হয়ে যেতে পারে । কিন্তু এখানে কোনো নায়িকা তো নেই-ই, নায়কও নাই। মূল চরিত্র ধরে নেয়া যেতে পারে বিস্তীর্ন হাওরকে কিংবা বিধির মতো এর অদৃশ্য স্রষ্টাকে।
উপন্যাসের পরতে পরতে ঘটনার ঘনঘটা, কুসংস্কারাচ্ছন্ন অধিবাসীদের কল্পনার রথে চড়েও কিছু ঘটনা এসেছে। মানুষের লাঞ্ছনা বঞ্চনা, জীবন সংগ্রাম , অপরাধ –শাস্তির চক্র এক একটি দীর্ঘশ্বাস হয়ে হাওরের বুকে বৃষ্টি ধারার মতো বয়ে যায়।
Profile Image for Saifullah.
Author 1 book7 followers
January 30, 2023
দীর্ঘশ্বাসেরা হাওরের জলে ভাসে।

নামের মতই পুরো বই জুড়েই দীর্ঘশ্বাসেরা ভেসে বেড়ায়। অভাবের তাড়নায় স্কুল থেকে ঝরে পড়া শিশুদের স্কুলে ফেরাতে ব্যর্থ আফাজ মাস্টারের দীর্ঘশ্বাস, প্রকৃতির সাথে নিরন্তর লড়াইয়ে শস্য খোয়ানো আলতাব অথবা তবারকদের দীর্ঘশ্বাস, জলমহালের মালিকানা নিয়ে আয়নাল অথবা খসরুদের নিষ্ঠুরতম দীর্ঘশ্বাস।

খাদ্যের অভাবে শীর্ণকায় গবাদিপশুর দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয়ে আসে বইয়ের পাতা। অনেক যত্নে লালন করা ষাড়টিকে নিদারুণ অভাবে বেঁচে দিয়েও কেন যেন মকবুলকে ষাড়ের লড়াইয়ে কপালের ফেরে নিজের ষাড়ের বিরূদ্ধে লড়তে হয়। অদৃষ্ট নিষ্ঠুর হাসে।

অসংখ্য চরিত্র, বইটি শুরু করে প্রথম ২০-৩০ পাতা খেই হারিয়ে ফেলার উপক্রম হয়। একটু ধৈর্য ধরতে পারলে চরিত্রগুলো ক্রমে পরিচিত হয়ে উঠে। তাদের সাথে সাথে টাঙ্গুয়ার হাওর, সুনামগঞ্জ, মোহনগঞ্জ, নেত্রকোনা, বারহাট্টা প্রভৃতি জায়গা ঘুরে না এসে উপায় থাকে না। এবং এ ঘোরা নিতান্ত ট্যুরিস্টের ঘোরা নয়, বরং, নিজেকেই বারবার প্রশ্ন করতে হয়, সমাজের এই ধরণের মানুষের এই ধরণের দুঃখগুলো তো এইভাবে কখনও এভাবে দেখিনি!

সবশেষে মনে হয়, লেখক সফল হয়েছেন, তার লেখার দীর্ঘশ্বাসেরা সেই ধরমপাশা পার হয়ে কিভাবে কিভাবে যেন পাঠককেও বিষন্ন করে তোলে।
Profile Image for Mohammad Kamrul Hasan.
395 reviews14 followers
January 26, 2021
বইটি পড়ার পর হাওর অঞ্চলের মানুষদের জীবন সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছি। যা আগে আমি জানতাম না।
তাদের জীবনটাও একরকম সংগ্রামী জীবন। লেখক তার সুন্দর লেখনীতে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন সেখানকার খন্ড চিত্র।
Displaying 1 - 10 of 10 reviews