শ্রী নীরেন্দ্রনাথ ভাদুড়ি। সরকারি কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক। পড়াতেন সংস্কৃত কিন্তু অ্যাকাডেমিক কৌতূহলে ডুব দেন তন্ত্রের অন্দরে। গভীর সাধনা ও অভ্যাসে দেশ বিদেশের তন্ত্র তাঁর নখদর্পণে। বিচিত্র সব অভিজ্ঞতায় ভরপুর বহুবর্ণ জীবন। এই বইয়ের একটি উপন্যাস এবং দু'টি বড় গল্প তারই প্রতিফলন।
বাংলা সাহিত্য জুড়ে এখন তন্ত্রনির্ভর কাহিনির প্রাচুর্য, তা হলে কেন সেই বিষয়েই একটি নতুন চরিত্রের অবতারণা? তার কারণ নীরেন ভাদুড়ি মানে বাজারচলতি অলৌকিক কাহিনি নয়, বরং অলৌকিকের অ্যান্টিথিসিস। বুদ্ধি দিয়ে অমোঘ শক্তির সাথে পাঞ্জা কথা। তাই তো ভাদুড়ি মশায় বলেন, ‘পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অলৌকিক হল মানুষের বুদ্ধিমত্তা, ইনটেলিজেন্স।
৩.৫/৫ তন্ত্র - তান্ত্রিকদের নিয়ে লেখা গল্প সচরাচর পড়া হয় না। এ বই উল্টেপাল্টে দেখতে গিয়ে পুরোটা পড়ে ফেললাম। সৌভিক চক্রবর্তীর সাবলীল লেখনীর কারণেই এটা সম্ভব হয়েছে। বইতে কাহিনি আছে তিনটি। এর মধ্যে "অরণ্যের প্রাচীন প্রবাদ" একেবারেই সাধারণ মানের, "পর্ণশবরীর শাপ" ভালো আর "নিকষছায়া" টানটান উত্তেজনাপূর্ণ। পড়ার সময়টা আনন্দে কেটেছে। তান্ত্রিকদের কর্মকাণ্ড সহ্য করা মুশকিল, এজন্য হয়তো পরের বইগুলো পড়ার আগ্রহ পাবো না।
প্রায় বছরখানেকের হিসেব। অনেক, অনেক কটা দিন লেগে গেলো বইটি শেষ করতে। বইয়ের প্রথম দুটি গল্প পড়ে, কোনো কারণে আর এগোনো হয়ে উঠছিল না। শেষমেষ ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে কোনমতে শেষ করা। তাও আবার 'নিকষছায়া'র মতন একটি অসাধারন অতিপ্রাকৃত উপন্যাসের হাত ধরে।
ভাদুড়ি মহাশয়ের পৃথিবীর সাথে পরিচিত হতে গেলে অবশ্য, এই উপন্যাসটি দিয়েই শুরু করতে পারেন। আদতে 'পর্ণশবরীর শাপ' গল্পটির প্রিকুয়েল হিসেবে লেখা হলেও, উপন্যাসটির দ্বারা অনেক মূল চরিত্রদের সাথে প্রাথমিক পরিচয় সারা হয়ে যায়, তার সাথে এড়ানো যায় এরূপ চরিত্রদের শেষ পরিণতির প্রতি স্পয়লারও। দোসর হিসেবে মেলে, একজন স্মরণীয় ভিলেন এবং তার ভয়াল নৃশংসতা। কেবল এই একটি উপন্যাসের জেরেই লেখকের সুচারু ওয়ার্ল্ড-বিল্ডিংয়ের প্রশংসা না করে পারা যায় না।
বাকি গল্পদুটো নিজগুনে খারাপ না হলেও, 'নিকষছায়া'র ধারেকাছে ঘেষবে না বলেই আমার বিশ্বাস। তাই পারলে পড়ে দেখুন। ভয়, তন্ত্র, লোকাচার মিশ্রিত এক কৌতূহলী ককটেল হিসেবেই নাহয় পড়ুন। বাজারে আর পাঁচটা তান্ত্রিক-হরর থেকে কিছুটা স্বতন্ত্র কিছুর খোঁজ পেলেও পেতে পারেন।
আপাতত এ জিনিস আমার Currently Reading শেলফ ফাঁকা করে বিদেয় হোক। আমিও বাঁচি।
সাম্প্রতিক কালে এপার বাংলায় 'তান্ত্রিক হরর' নামক ধারায় যত বইপত্র লেখা হয়েছে, তাদের মধ্যে একটি অত্যন্ত বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছে এই বইটি। কার্যত একটানা পড়ে শেষ করলাম সেটিকে। এতে আছে মোট তিনটি লেখা। অদ্ভুতভাবে তাদের সাজানো হয়েছে অভ্যন্তরীণ কালানুক্রমের ঠিক উলটো করে। পূর্ণ রসাস্বাদনের জন্য এদের যেভাবে পড়া উচিত তা হল~ ১) নিকষ ছায়া: এই উপন্যাসটির মধ্য দিয়েই আমরা নীরেন্দ্রনাথ ভাদুড়ির জগতে প্রবেশ করি। একইসঙ্গে আমরা পরিচিত হই একগুচ্ছ অত্যন্ত বাস্তবানুগ চরিত্রের সঙ্গে— যাদের সঙ্গে ঘটতে থাকা নানা ঘটনার মধ্য দিয়েই ধীরে-ধীরে এক ভয়ংকর, অমানবিক অপজগতের দরজা খুলে যেতে থাকে। এই উপন্যাসটির মতো শক্তিশালী লেখা আমি কমই পড়েছি। আগে স্বতন্ত্র বই হিসেবে পড়া থাকলেও লেখার গুণে এটিকে আরও একবার প্রায় রুদ্ধশ্বাসে পড়ে ফেলতে হল। ২) পর্ণশবরীর শাপ: প্রথম উপন্যাসের মধ্য দিয়ে চেনা-জানা হওয়া চরিত্ররা ফিরে আসে এই বড়োগল্পে। এবার তারা জড়িয়ে পড়ে পাহাড় ও জঙ্গলের বুকে এক অপ্রাকৃত রহস্যের সঙ্গে— যার ভিত্তি অপবিশ্বাস হলেও প্রকাশ একান্ত লৌকিক তথা মনস্তাত্ত্বিক। এই কাহিনির আবহনির্মাণ এবং অন্তিম সংঘাতটিও মনে স্থায়ী রেশ রেখে যায়। ৩) অরণ্যের প্রাচীন প্রবাদ: উপরোক্ত দুটি লেখার পর এই গল্পটি অনেকটাই লঘু এবং দুর্বল মনে হয়। সুখপাঠ্য হলেও এতে চরিত্রদের চিৎকৃত প্রকাশ হাড় হিম করে দেওয়ার বদলে বিরক্তিরই উদ্রেক করে। তবে হ্যাঁ, লেখার গুণে হু-হু করে ছুটে চলতে হয় শেষ অবধি। তৃতীয় লেখাটি এমন কিছু আহামরি নয়। কিন্তু প্রথম দুটি লেখা স্পেকুলেটিভ ফিকশনের পাঠকদের মনে দীর্ঘস্থায়ী রেশ রেখে যায় তিনটি কারণে। তারা হল~ প্রথমত, লোকনাথ চক্রবর্তীর মতো ঋণাত্মক চরিত্র বাংলায়— এমনকি তথাকথিত ধ্রুপদী সাহিত্যকে হিসেবের মধ্যে রাখলেও— কমই এসেছে। দ্বিতীয়ত, লেখক প্রমাণ করে দিয়েছেন, মানুষের বুদ্ধিমত্তার চেয়ে বড়ো জাদু— সাদা হোক বা কালো— আর কিছু হয় না। তৃতীয়ত, প্লট-ডিভাইস হিসেবে এমন অনেক কিছু এসেছে যারা শুধু প্রাপ্তবয়স্ক পাঠকের জন্যই নয়, বরং প্রাপ্তমনস্ক পাঠকের জন্য। পাঠককে সম্মান দেওয়ার এই পদ্ধতিটি ভারি ভালো লাগল।
বইটির ছাপা পরিষ্কার হলেও অজস্র মুদ্রণ প্রমাদে আকীর্ণ। পরবর্তী সংস্করণে সেগুলো শুধরে নিতে অনুরোধ করব। ওঙ্কারনাথ ভট্টাচার্যের প্রচ্ছদ ও অলংকরণ কাহিনিগুলোর পক্ষে সম্পূর্ণ যথাযথ হয়েছে। সব মিলিয়ে বলব, সিরিয়াল বা সিনেমা নয়, বরং পড়ার মতো লেখা হিসেবে খোলা মনে এদের বিচার করুন। দেখবেন, এমন বই বাংলায় কমই আছে। তবে সামাজিক ও শারীরিক নানা 'ট্যাবু' বিষয় নিয়ে মানসিক আড়ষ্টতা থাকলে এদের এড়িয়ে যাওয়াই হয়তো ভালো হবে। লেখকের উদ্দেশে শুভেচ্ছা রইল।
সবমিলিয়ে ৪.৫/৫। নীরেন ভাদুরীর প্রত্যেকটা কাহিনীই দারুণ উপভোগ্য। অলৌকিকের সাথে কিছুটা লজিক, সেইসাথে মিথের ব্যবহার। শুধু ভাদুরী সাহেবের ওপরই ফোকাসড নয়, অন্যান্য চরিত্রগুলোও গুরুত্বপূর্ণ। অনেকদিন পর এই জনরার বই পড়ে মজা পেলাম। “সবথেকে বড় অলৌকিক হল মানুষের ইন্টিলিজেন্স।” আর “লেগেপড়ে থাক নীরেন। শুধু লেগেপড়ে থাক। অলৌকিক হবেই।” বইয়ের সবথেকে প্রিয় দুটো ডায়লগ। রিকমেন্ডেড।
তারানাথ তান্ত্রিক হাল আমলের মতো জনপ্রিয় আজ থেকে একযুগ আগেও ছিলেন না। ভালো লেখা হওয়া সত্ত্বেও পাঠকেরা তারানাথের খোঁজ বড়ো পরিসরে জানতো না। তারানাথ তান্ত্রিকের খবর পাওয়ার পর তখন এক বিস্ময়কর কাণ্ড হয়ে গেল। সবাই রাতারাতি তারানাথ তান্ত্রিককে নিয়ে লেখা বিভূতিবাবু ও তার পুত্র তারাদাসবাবুর লেখা গোগ্রাসে গিলতে লাগল। ফল হলো এই যে, তন্ত্রমন্ত্রনির্ভর কাহিনি চাহিদা আকাশচুম্বী। তাই দেখে ভৌতিক সাহিত্যের প্রথাগত ধারা বাদ দিয়ে সবাই তন্ত্রমন্ত্রকেন্দ্রিক ভূতের গল্প লিখতে শুরু করলো। বাজার নানা রঙের, সাইজের ও মাপের 'নকল তারানাথ'-এ ভর্তি হয়ে গেল। সবগুলোই তারানাথ তান্ত্রিকের দুর্বল অনুকরণ তথা হনুকরণ! এসবের ভিড়ে লেখকদের নিজের পঠন-পাঠন ও লেখনশৈলীর ছাপ পাওয়া যায় এমন লেখা নেই বললেই চলে। এক্ষেত্রে সৌভিক চক্রবর্তী বাকিদের চাইতে অগ্রগামী। তার সৃষ্ট চরিত্র নীরেন ভাদুড়ি তারানাথ হয়েও তারানাথ নয় ; নিজের কিছু ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য, প্লটের বৈচিত্র্যময়তার কারণে ভাদুড়ি মশাই আলাদা। সংস্কৃত ভাষার পণ্ডিত একসময়ের কলেজ শিক্ষক অশীতিপর ভাদুড়ি মশাইয়ের তিনটি ভিন্নধর্মী 'অভিযান' নিয়েই 'নীরেন ভাদুড়ি সমগ্র-১'। যেখানে স্থান পেয়েছে একটি উপন্যাস ও দুইটি বড়োগল্প।
১. নিকষ ছায়া ২. পর্ণশবরীর শাপ ও ৩. অরণ্যের প্রাচীন প্রবাদ।
প্রাপ্তবয়স্ক ভৌতিক উপন্যাস হিসেবে 'নিকষ ছায়া' বেশ সুখপাঠ্য। কখন কী হয় তা নিয়ে পাঠকের মনে টেনশন তৈরি করতে পারা লেখকের সাফল্য। এখানে অনায়াসে পাস নম্বর পাবেন সৌভিক চক্রবর্তী। উপন্যাসের মূল বিষয়বস্তুর কারণেই এটি প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য লেখা। চাইলেই খুব সহজে কিশোরপাঠ্য করার সুযোগ নেই। গেনু পিশাচ হিসেবে ফার্স্ট কেলাস! রোমাঞ্চের কিছু আধিক্য আছে। সেইসব না থাকলেও ক্ষতিবৃদ্ধি হতো না।
উপন্যাসের পর সবচেয়ে রোমাঞ্চ ও আনন্দ নিয়ে পড়েছি 'অরণ্যের প্রাচীন প্রবাদ'। দিনশেষে বিভূতিবাবুর প্রভাব এড়ানো কঠিন। এখানে অত্যন্ত সফলভাবে 'আরণ্যক'-এর বুনো মহিষের দেবতা টাঁড়বারো হাজির হয়েছে।
'পর্ণশবরীর শাপ' সত্যিই ভালো গল্প। বেশ ভয়ের আবহ সৃষ্টিতে এই গল্পে লেখক দারুণ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন।
প্রাচীন ধর্ম জরথুস্ত্রবাদ। পারস্যের অতিপ্রাচীন এই মতবাদে বিশ্বাস করা হয়, দুনিয়াতে আহির মান ও আহির মাজদা অর্থাৎ ভালো বনাম মন্দের লড়াই প্রতিক্ষণে চলছে। লড়াইয়ে শেষতক ভালোর জয় হবেই। ঠিক তেমনি বইয়ের প্রত্যেকটি কাহিনিতে শুভ ও অশুভের যুদ্ধের শুভের জয় দেখানো হয়েছে। সেই জয় প্রত্যাশিত অথচ নাটকীয়তায় ভরা।
বিভূতিবাবু ও তারাদাসের সঙ্গে তুলনা করা অসমীচীন হবে। সৌভিক চক্রবর্তী তরুণ লেখকদের মধ্যে নিঃসন্দেহে প্রতিশ্রুতিশীল। আগামীতে সুযোগ পেলে অবশ্যই নীরেন ভাদুড়ির আরও অভিযানে সঙ্গী হবো।
প্রবাদের এই পরম বাক্য প্রয়োজনে আমরা প্রয়োগ করি বহুবার। যার সরলার্থের আড়ালে ভাবার্থের ভাবনা আমাদের বড় বেশি একটা নেই;বিপুলা এ পৃথিবীতে কতকিছু ই তো ঘটে,সবটা নিয়ে সময়ক্ষেপনের সুযোগ কোথায়! সুতরাং বন্যেরা যেমন বনে তেমনি প্রবাদ শুধু পুস্তকে মাঝেসাঝে মুখেই সুন্দর।
কিন্তু তন্ত্র যদি হয় মন্ত্রের প্রয়োগিক রূপ ,তখন?
তন্ত্র মন্ত্রের আদি উৎস নিয়ে ওপার বাংলায় উৎপাত ইদানিং বইয়ের পাতায় এতটাই বাড়াবাড়ি রকমে শব্দে জব্দ হয়ে গেছে যে রীতিমত আতকে উঠি!এই বুঝি তারানাথের নব্য সংস্করনের স্রোতে ভেসে না যাই। গোঁদের উপর বিষফোঁড়া হয় তখন ভয়ের বদলে যখন কখনো বিরক্ত কখনো বিষম খেয়ে আসন গেড়ে নিজেকে ভাষন দিয়ে এসব প্রহসনের প্ররোচনায় পুনরায় না পড়ার পরামর্শ দি।
তবে মাঝেমধ্যে অবোধ মন মানে প্রবোধ ,তারই ধারাবাহিকতায় পড়ে ফেললুম সৌভিক সাহেবের নীরেন ভাদুড়ী সমগ্ৰ -১.
দুটো ছোট গল্পের শুরুটায় সেফেই খেলছিলেন কাহিনীর বুনট , বাঁধুনি নিয়ে।কিস্তিমাত হলো উপন্যাসের আয়োজনে। আধুনিক কলকাতার প্রেক্ষাপটের পরিপ্রেক্ষিতে পদার্পনের আগে বনদেবী আর প্রাচীন প্রবাদের বন্দেগী নেহাত খারাপ লাগবে না।
তবে তৃপ্তি হোক বা তুষ্টি তৃষ্ণাখানি আমার মিটেছে একদম শেষের পাতায়।খিস্তি খিল্লি বা খুল্লামখোলা লেখায় একটু আধটু প্লটহোল পেলেও সময়টা সুন্দর করে কেটে যাবে একথা বলা বাহুল্য বোধহয় হবে না।
নীরেন ভাদুড়ির সাথে আমার পরিচয় অরন্যের প্রাচীন প্রবাদের মাধ্যমে। গল্পটি শোনা হয় সানডে সাসপেন্স এ। এই গল্পটার মাধ্যমে বেশ আগ্রহ জন্মায় এই লোকটির উপর। বেশ যা ভাবা তাই কাজ, পড়ে ফেললাম নীরেন ভাদুড়ি সমগ্র এক।
কালিগুনিন পড়ার মাধ্যমেই তান্ত্রিক হররের প্রতি একটা অদ্ভুত আকর্ষন কাজ শুরু করে৷ তারানাথ তান্ত্রিক, কাউরিবুড়ির মন্দির, কালীগুনিন ইত্যাদি পড়েছি। নীরেন ভাদুড়ি কে বেশ পছন্দ হলো। সমগ্র ১ এ পেয়েছি দুটো ছোট গল্প আর একটি উপন্যাস।
লেখক নিঃসন্দেহে বেশ গুছিয়ে লিখেন। রহস্যের জালা কে আস্তে আস্তে পেজে পেজে নিজ লেখনির জাদুতে গুছিয়েছেন। বেশ মোহনীয় বলা যায় আর আমার বেশ পছন্দসই হয়েছে। লেখনি যেমন তেমনি গল্পের প্লটিং এবং চরিত্রায়ন। প্রতিটি চরিত্রকে কলমের আচড়ে জীবন্ত করেছেন। দীপক, অমিয়, পল্লব, তিতাস সবগুলোকে বেশ পছন্দ হয়েছে।
প্রথম গল্পটি অরন্যের এক প্রাচীনতম প্রবাদ নিয়ে যেখানে নীরেন ভাদুড়ি যুদ্ধ করেন এক অপশক্তির সাথে, কিন্তু জয় হবার আশংকা খুবই ক্ষীন। নিজের বন্ধুর বদলিতে সাথি হয় তার সাথে, আর তাই যেনো তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়
দ্বিতীয় গল্পটি পর্নশাবরীর অভিশাপ। এক আদিম দেবি যার নম্র রূপ রূপান্তর হয় রুদ্রমূর্তিতে। কিন্তু কেন? কেনই বা একটি সামান্য ট্যুর বয়ে আনতে পারে এক ভয়ংকর অভিশাপ?
শেষটি হচ্ছে উপন্যাস নিকষছায়া। এখানে লেখক শুধু স্টোরির পাশাপাশি আরো অনেক ছোটো ডিটেইলিং এ গুরত্ব দিয়েছেন। গল্পটি শুরু হয় অতীতের এক ধাক্কা দিয়ে, যা ধীরে ধীরে মিশে যায় বর্তমানের কিছু মিসিং কেস এর সাথে। আস্তে আস্তে লৌকিকতা ছেড়ে কেসটি যেনো সকল যুক্তি হারাতে থাকে। আর অমিয় যেনো খেই হারিয়ে ফেলতে থাকে। কারন এক কিম্ভুত আকৃতির এক পিশাচ, এক দুর্গন্ধ আর লাশ হাওয়ায় মিশে যাওয়া যেনো সব যুক্তিকে হার মানিয়েছে। আস্তে আস্তে আরো রহস্য ডালপালা গজিয়ে শুরু হয় এক ভয়ংকর যাত্রা।
লেখকের ভুল ধরতে গেলে ধরা যায়, কিন্তু সমালোচনার দিকে আমি যাচ্ছিনা। কারন সেই ছোটোখাটো ব্যাপারগুলোতে চোখ না দিয়ে বেশ উপভোগ করেছি। যদিও নিকষছায়ার ফিনিশিং আরেকটু ক্লাইমেক্স ভরপুর হতে পারতো। সব মিলিয়ে নিরাশ করবার মত নয়।
বইয়ের নামঃ নীরেন ভাদুড়ি সমগ্র ১ প্রকাশনীঃ দীপ প্রকাশন প্রথম প্রকাশঃ এপ্রিল ২০২১ পার্সোনাল রেটিং ৪/৫
নীরেন ভাদুড়ি। যে সকল তন্ত্র সম্পর্কে অবহিত। অশুভ কিছু থেকে বাচতে তার কাছেই আসে সবাই। সেই নীরেন ভাদুড়ি সমগ্রের তিনটি গল্প বেশ উপভোগ করেছি। গল্পকার ভালোই গল্প ফেঁদেছেন কিন্তু পর্ণশবরীর শাপ আর নিকষছায়াতে ভাদুড়ি মশাইয়ের চরিত্র অনেকটা দুর্বল লেগেছে কিন্তু অরণ্যের প্রাচীন প্রবাদে যথেষ্ট শক্ত ছিলেন। তিনটা গল্পের মাঝে অরণ্যের প্রাচীন প্রবাদ, নিকষছায়া, পর্ণশবরীর শাপ এই ক্রমেই ভালো লেগেছে বলতে গেলে।
অরণ্যের প্রাচীন প্রবাদ আর পর্ণশবরীর শাপ দুটাই দুর্দান্ত! নিকষছায়া দুর্ধর্ষ একটা ভিলেন চরিত্র দিয়েছে, কিন্তু গল্প হিসেবে বিশেষ জমেনি আমার কাছে। তিনটা লেখা থেকেই ওয়েব সিরিজ/সিনেমা হয়েছে, অডিও ড্রামা হয়েছে। আগে সিনেমার ট্রেলার দেখেছিলাম বলে এতদিন আগ্রহ পাইনি বইটা পড়ার। অবশেষে পড়লাম, এবং মজে গেছি! একশ-একশ বাংলা তান্ত্রিক হরর। আর সুন্দর ব্যাপার হলো, তন্ত্র ব্যবহার এখানে যতটা না মুখ্য, তন্ত্রের obviousness, স্থানের আবহ, লোকজ বিশ্বাস এখানে অনেক গুরুত্ব পেয়েছে। তারানাথ আস্বাদনের ক্ষুধা ভাদুড়ির ঘোলে কিছুটা মিটেছে বলতেই পারি।
একটা অনুরোধ : গল্পগুলোর অডিও ড্রামা বেশ ভাল হলেও লেখকের লেখার স্বাদ পেতে হলে বইটা পড়ুন। বেটার এক্সপিরিয়েন্স পাবেন।
প্রথমে শুনলাম অডিও। নিকষ ছায়া বাদে দুটো গল্প। পরে বই খুঁজতে ওটা পেয়ে ওটাও পড়ে ফেললাম। নীরেন ভাদুড়ী চরিত্রটাকে মনে ধরেছে আর লেখকের লেখা��� ধরণ ভালো লেগেছে বিধায় পড়া। নাহলে সাধারণত তন্ত্র মন্ত্র সাধক কালাজাদুর বই এই বয়সে আর টানেনা তেমন। কিশোর বয়সে জমতো ভালোই। ৩.৫*
'নিকষছায়া' উপন্যাসটার খুব ভাল কিছু হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। ভিলেইনটা ভয়ঙ্কর। কিন্তু কাহিনী নানা জায়গায় এলোমেলো হয়ে গেছে, মাঝে মাঝে লেখক নিজেই দ্বিধায় ভুগেছেন চরিত্রগুলোর কোনটাকে গুরুত্ব দেয়া উচিত সেটা ভেবে। কাজেই যা সম্ভাবনা ছিল সেটা আর বাস্তবে রূপ নিতে পারেনি। বড়গল্প দু'টো--'অরণ্যের প্রাচীন প্রবাদ' এবং 'পর্ণশবরীর শাপ'--একেবারেই দাঁড়ায়নি।
অতি অবশ্যই দারুণ। বেশ ঝরঝরে লেখা। দুটো গল্প আর একটা উপন্যাসের প্রত্যেকটা লেখায় একবার শুরু করলে শেষ না করে উঠবার জো নেই। বর্তমানে হরর তন্ত্র টা খাচ্ছি খুব। সহজে এতে অরুচি আসবে বলে মনে হয় না। যাইহোক, হরর তন্ত্র প্রেমিকদের জন্য এ এক অবশ্যপাঠ্য সংযোজন। নির্দ্বিধায় শুরু করতে পারেন।
তন্ত্র - মন্ত্র থেকে বহুদিন মুখ ফিরিয়ে ছিলাম। হঠাৎ বইটা হাতে পেলাম। দু - দশ পাতা পড়ার পর একদিনে পুরোটাই শেষ করে উঠলাম। গল্পগুলো সম্পর্কে কিছু না বলে সরাসরি প্রতিক্রিয়ায় চলে যাই। লেখক চেষ্টা করেছেন একটা ভয়ের আবহ ফুটিয়ে তুলতে এবং তাতে তিনি সফল। বিশেষ করে পর্ণশবরীর শাপ গল্পে ঘন আঁধারে ঘেরা পাহাড়ি হোম স্টের জানলার পাশে ঢুপ ঢুপ আওয়াজ শুনে আমার প্রায় গলা শুকিয়ে গেছিল 😅। নিকষছায়া তে অদ্ভুত গা ঘিনঘিন একটা অনুভূতি হয়। গল্প লেখার গতি দ্রুত, পড়তে আরাম। চরিত্রায়ন বরং দূর্বল। বিশেষ করে পল্লব বলে ছেলেটি বিরক্তিকর লেগেছে নিকষছায়াতে। অপালা তথৈবচ। অমিয়, সঞ্জয়, তিতাস - পরের গল্পগুলোতে আরো সময় দেওয়ার দাবি জানালাম। ভাদুড়ী মশাইকেই বরং বেশ ভাল লাগলো। সব মিলিয়ে রাতে পড়তে ভালই লাগবে নীরেন ভাদুড়ীর অ্যাডভেঞ্চার।
বিগত ৫-৬ বছরে যেকটা সমকালীন তন্ত্রনির্ভর বই পড়েছি, সেগুলোর মধ্যে নিঃসন্দেহে নীরেন ভাদুড়ি অন্তত পাতে দেওয়া যায়। তার কারণ বোধহয় এই যে লেখক অলৌকিকের অহেতুক ব্যবহার স্বচ্ছন্দে এড়িয়ে গেছেন। তার বদলে মানবিক সম্পর্ক এবং বুদ্ধিমত্তাকে তিনি নিপুণহাতে ব্যবহার করেছেন। 'নিকষছায়া' এই বইয়ের সবচেয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণ লেখা। 'অরণ্যের প্রাচীন প্রবাদ'-এ 'আরণ্যক' উপন্যাসে ব্যবহৃত মিথের প্রয়োগ অসাধারণ লেগেছে। 'পর্ণশবরীর শাপ'ও ভালো, তবে শেষে স্বয়ং দেবীকে ছলনা করার প্রসঙ্গটা আরোপিত মনে হয়েছে।
সত্যি বলতে এই চরিত্রটি বা লেখক সম্পর্কে কোন ধারণাই আমার ছিল না। বিগত কয়েক বছর ধরে সম্ভবত তারানাথ তান্ত্রিকের জনপ্রিয়তার পর থেকে দুই বাংলায় তন্ত্রনির্ভর অলৌকিক কাহিনীর একটা জোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। তার কিছু কিছু ভালো লেগেছে কিছু কিছু লেগেছে বিলো এভারেজ। তবু কি জানি কি ভেবে কিছু না জেনেই বইটি কেনার আগ্রহ অনুভব করেছিলাম। ঠকিনি বা সে নিয়ে কোন মনস্তাপ নেই এটুকু বলতে পারি। নীরেন ভাদুড়ি সেই তন্ত্রনির্ভর বাংলা অলৌকিক সাহিত্যে একটি নতুন সংযোজন। তবুও লেখক সচেতনভাবেই অন্য অনেকের মতো অন্ধ অনুকরণ না করে তন্ত্রের অলৌকিকত্বের সাথে মানুষের বুদ্ধিমত্তা ও উদ্যোগের মাধ্যমে অশুভের সাথে শুভর লড়াইয়ে শুভশক্তির জয় দেখিয়েছেন এই বইয়ের তিনটি লেখাতেই। কাহিনীগুলোর নায়ক অবশ্যই তান্ত্রিক নীরেন ভাদুড়ি যিনি বারাসাত কলেজ এর সংস্কৃত বিভাগের একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, একটি বিশেষ ঘটনার পর প্রায় ত্রিশ বছর ধরে এই চর্চা ছেড়েই দিয়েছিলেন বর্তমানে পঁচাশি বছর বয়স্ক বৃদ্ধ হলেও এবং জরাগ্রস্থ হলেও শরীরে এবং বিশেষ করে মনের শক্তিতে এখনো শক্তিশালী, এখনো ঋজু। তবে কাহিনীগুলোতে তিনি একাই নায়ক নন, সহনায়ক হিসেবে আছেন সাধারণ মানুষেরাও মানুষের সৃষ্টিশীল আবিষ্কার ও শুভবুদ্ধিও। তাই স্বয়ং নীরেন ভাদুড়ির মতেই মানুষের বুদ্ধিমত্তাই হলো সবচেয়ে বড় অলৌকিক শক্তি।
প্রতিটি লেখায় ( দুটি গল্প ও একটি উপন্যাস) একজন কেউ তন্ত্রের অশুভ শক্তির মাধ্যমে অমঙ্গল ডেকে এনেছেন অর্জন করেছেন প্রভূত শক্তি কিন্তু তন্ত্রের শুভশক্তি ও মানুষের কল্যাণী মানসিকতার কাছে হেরে গেছে বারবার। তবে একথা সত্য লেখক সার্থকভাবেই ভয়ের আবহ সৃষ্টি করতে পেরেছেন, বিশেষ করে উপন্যাস নিকষছায়া ও গল্প পর্ণশবরীর শাপ এই দুটি গল্পই ভয়ের এবং লেখা হিসেবে দারুণ। অরণ্যের প্রাচীন প্রবাদ গল্প হিসেবে আকাড়ে ছোট এবং মনে হয়েছে বাকি দুটো গল্পের মতো এত ব্যাপক ভয় এবং রহস্য এখানে সৃষ্টি হয় নি। সূচীর ক্রম অনুসারে বইয়ে প্রথমে আছে অরণ্যের প্রাচীন প্রবাদ, তারপর পর্ণশবরীর শাপ এবং একেবারে শেষে উপন্যাস নিকষছায়া রচনাক্রম যদিও সম্পূর্ণ উল্টো। লেখক ভূমিকায় উল্লেখ করেছেন নিকষছায়া উপন্যাসটি প্রথমে পড়ার জন্য, এই উপন্যাসে নীরেন ভাদুড়ির এন্ট্রি কিন্তু অর্ধেক উপন্যাস শেষ হয়ে যাবার পর। এই লেখার আর গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি চরিত্র অমিয়, মিতুল, পল্লব, সঞ্জয়, তিতাস ও পালদা আছেন পর্ণশবরীর শাপ গল্পেও। এই চরিত্রগুলোও সমান মন জয় করে নিয়েছে, যেমন নিয়েছে নিকষছায়ার সমীর, মামী ও তার ছোটদুটো অকালমৃত শিশুও। অরণ্যের প্রাচীন প্রবাদ গল্পটি সময়ক্রম অনুসারে সবচেয়ে আগের সময়ের গল্প, যখন নীরেন ভাদুড়ির মধ্যবয়স, তার আবির্ভাবের গল্পও। এই গল্পে তিনি এনেছেন আরণ্যকে উল্লিখিত বুনো মহিষের দেবতা টাঁড়বারোকে। লেখক নীরেন ভাদুড়িকে নিয়ে আরও অনেক লেখা লিখবেন আশা করি, পাঠকপ্রিয়তা পাওয়ার প্রায় সব উপাদানই ছিল এই বইয়ের প্রতিটি লেখাতেই। নীরেন ভাদুড়িকে নিয়ে আরও পরিণত ও দারুণ সব লেখা ভবিষ্যতে পড়বার আশায় রইলাম।
একটা ছোট অস্বস্তি,বইয়ের শুরুতেই লেখকের দাবী ছিলো (আমি অবশ্য বই শেষ করে ভূমিকা পড়েছি), এই বইয়ের কাহিনী তিনটি আর দশটা তন্ত্র নির্ভর গল্পের চাইতে আলাদা। এ কাহিনীগুলো আদ্যন্ত লজিক্যাল, অলৌকিকের এন্টিথিসিস !! আমার অবশ্য মোটেও তেমন মনে হয় নি। সেই যথারীতি, আর দশটা গল্পের মতই... প্রত্যেক গল্পেরই শুরু থেকে প্রায় ��েষ পর্যন্ত নানা রকম ভয় ভীতি দেখিয়ে, বিভীষিকাময় পরিস্থিতি তৈরী করে, নানান মন্ত্র টন্ত্রের ক্ষমতা দেখিয়ে, একদম বিপদের শেষ সীমায় পৌছে হাল টাল ছেড়ে দেওয়া সিচুয়েশনে পৌছে একদম অন্তিম বেলায় উদ্ধার পেয়ে যাওয়া। তবে লেখকের এইসব দাবী দাওয়া পাশে সরিয়ে রাখলে, এমনিতে লেখা ঝরঝরে, পড়তে তাই হয় নি। গল্পের বুনট মন্দ না। পাঠক হিসেবে আমার তাতেই চলবে।
আর একটা সাজেশন, এই বইয়ের শুরুতে দুটো বড় গল্প আর তারপর "নিকষছায়া" নামে একটা উপন্যাস আছে। তা এই উপন্যাসটিই সম্ভবত নীরেন ভাদুড়ি সিরিজের প্রথম লেখা। তাই ছোট বড় নানান ক্যারেক্টার বিল্ড আপ আর ইন্টার ক্যারেক্টার ক্যামেস্ট্রির পুরো অনুভবটা ঠিকঠাক নিতে উপন্যাসটা দিয়ে পড়া শুরু করাই ভালো!
যাক, তান্ত্রিক গল্প গাথায় আরো এক নতুন চরিত্র যোগ হলো। পাঠক হিসেবে আনন্দ আর আশার সংবাদ এটা :)
পর্ণশবরীর অভিশাপ: চার বন্ধু জঙ্গলে ভ্রমণ করতে গিয়ে কুপিত করেন মা তারার একুশতম অবতার পর্ণশবরী দেবীকে। ফলে তার অভিশাপ নেমে আসে ব্যাধি রুপে। নীরেন ভাদুড়ী কি হয়ে ওঠেন রক্ষাকর্তা? পরিশেষে ইন্টেলিজেন্স ই হয়ে ওঠে সব চেয়ে বড় তন্ত্র।
নিকষ ছায়া: স্বয়ং নীরেন ভাদুড়ীর শিষ্য মহা তান্ত্রিক এক ভয়াবহ সাধনায় নিজেকে লিপ্ত করেন এবং শেষে বাধা হয়ে দাঁড়ায় তারই একমাত্র গুরুদেব। দীর্ঘ এই গল্পে মিশ্রণ ঘটেছে একটি প্রেমকাহিনী, বাবা মেয়ের প্রতি বাৎসল্য, কর্মফল, বন্ধুত্ব আর সাহসিকতার।
অরণ্যের প্রাচীন প্রবাদ: সানডে সাসপেন্সে শোনা অন্য ধাঁচের একটি সুন্দর গল্প।
কদিন আগেই পড়ে শেষ করলাম বাংলার রহস্য ও তন্ত্রভিত্তিক সাহিত্যে নতুন সংযোজন - নীরেন ভাদুড়ি সমগ্র (প্রথম খন্ড)। রিভিউ একটু দীর্ঘ বলে ক্ষমাপ্রার্থী।
নিকষছায়া উপন্যাসটি বইয়ের সর্বশেষ লেখা হলেও পাঠকরা আগে সেটি পড়ে নিবেন। কারণ বারাসাত গভর্নমেন্ট কলেজের সংস্কৃতের প্রাক্তন অধ্যাপক শ্রী নীরেন্দ্রনাথ ভাদুড়ির আবির্ভাব এই উপন্যাসেই। বয়স যাঁর পঁচাশি কিন্তু তন্ত্রবিদ্যা এখনো টনটনে।
উপন্যাসটি এককথায় বলতে নট ব্যাড। সবগুলো চরিত্রের উৎপত্তি ও সম্পর্ক সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। ভিলেন হিসাবে গেনু আর লোকনাথ চক্রবর্তী দুর্দান্ত ছিল। গেনুর বর্ণনাটা ভীতিকর হলেও কল্পনায় আনা যায়না৷ হয়তো প্রচলিত ভারতীয়র বদলে আফ্রিকান পিশাচ হওয়ায়। তবে এই দুই ভিলেনের চরিত্রায়ণ দারুণ। বিশেষ করে ঢাকাইয়া ভাষার ব্যবহার। একটু হুমায়ুন আহমেদের ছাপ পেলাম।
কিছু মোমেন্ট যেমন সঞ্জয়ের মামাবাড়ি থেকে মৃত মামীর সাহায্যে পালানো, সমীরের বীভৎস মৃত্যু, তিতাসের তন্ত্রের স্পট খুঁজে পাওয়া, বাচ্চা শালিকের কান্ড- এগুলো সাসপেন্স তৈরী করেছে।
লেখক খুব সাবলীলভাবে এক সিন থেকে আরেক সিন এ মুভ করেছেন৷ খাপছাড়া লাগেনি। কাহিনীতে বিরক্তি আসেনি। স্মুদলি এগিয়েছে।
নেগেটিভ হিসাবে উপন্যাসে অপ্রয়োজনীয় যৌনতার ব্যাপারটা চোখে লাগছিলো। হয়ত লেখক গুরুত্ব বুঝাতে টেনেছেন, এটা হতে পারে। আধুনিক কলকাতার রাফ এন্ড টাফ ইয়ুথ, ওপেন সেক্স, লিভ টুগেদারের মত বিষয়ও এসেছে। কিছু জায়গায় পল্লব আর তিতাস ক্যারেকটার দুটোকে বিরক্ত লেগেছে।
ক্লাইমেক্সে মেজর কিছু হয়নি। লোকনাথ চক্রবর্তীর মত এত শক্তিশালী ও ইমপেক্টফুল ভিলেন গাড়ির এক ধাক্কাতেই মরে গেল। মানছি সে তখন শক্তিহীন ছিল, বাট তাকে কিছু স্পেস দেয়া যেতে পারত।
এদিকে গেনু বনাম ভাদুড়ি মশাই আর শেষে মৃত আত্নার দল দ্বারা গেনুকে হজম করা - এই দুটো জায়গা বেশ নাটুকে লেগেছে।
ভাদুড়ি মশাই এই উপন্যাসের মূল চরিত্র নন। তেমন ভূমিকা নেই। মূল চরিত্র লোকনাথ চক্রবর্তী আর গেনু। এক জাদুকরি ভিলেইনিতে পুরো নভেলের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল তারা। আর প্রোটাগনিস্টদের মাঝে প্রধান চরিত্র তিতাস। মেয়েটি যে দারুণ বুদ্ধিতে মিতুলকে বাঁচালো তা বাহবা দেয়ারই মত। একদম 'পিরিয়ডিক' বুদ্ধি!
বইটিতে দুটো ছোটোগল্প আছে। দেবী পর্ণশবরীকে নরবলি দিয়ে জাগায় এক প্রতিশোধপরায়ণ মহিলা - তারপর আশু নরকাগ্নি থেকে সমগ্র চটকপুর, সেইসাথে পাগলপ্রায় মিতুল ও তিতাস কে বাঁচাতে দেবীর মুখোমুখি হন ভাদুড়ি মশাই। গল্পটির ক্লাইমেক্সে পল্লব আর ভাদুড়িমশাইয়ের দেবীর সামনে আত্মাহুতি দেবার প্রতিযোগিতা আর সেইসাথে শেষমেশ দেবীর স্বরূপে আবির্ভাব - এই দুটো বর্ণনা দারুণ সাসপেন্সের। যেন মুভি দেখছিলাম।
তবে এপিলগটা হতাশাব্যাঞ্জক। আর যাই হোক অন্তর্যামী দেবীকে ঠকানো মানুষের কর্ম নয় - এটা আমার দৃঢ় বিশ্বাস।
হয়তো এই দুষ্কর্ম থেকেই পরবর্তী এডভেঞ্চার এর শুরুটা করবেন লেখক, তাই একটা ক্লিফহ্যাঙ্গার টাইপ রেখে দিয়েছেন।
সবচে ভালো লেগেছে 'অরণ্যের প্রাচীন প্রবাদ'। ভাদুড়ি মশাইয়ের যৌবনকালের গল্প এটি। জলদাপাড়ায় গন্ডার পোচিং, মাথা গরম অফিসার বন্ধু, এক শয়তান তান্ত্রিক, মাকড়খাকি প্রেতের দল আর শেষে জঙ্গলের মহিষ দেবতা টাঁড়বারোর আবির্ভাব - সব মিলিয়ে ছোট গল্পটি দারুণ এগিয়েছে। তন্ত্র আর অরণ্য - দুয়ে একদম মিলেমিশে গলে গেছে।
গল্পে লেখক সমাজে পতিতাদের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে হৃদয়গ্রাহী বর্ণনা দিয়েছেন। নীরেন ভাদুড়ির গুরুর মুখ দিয়ে বলানো লেখকের এ বক্তব্যের সাথে আমি পুরোপুরি একমত।
নীরেন ভাদুড়ি সমগ্র (প্রথম খন্ড) - লেখক সৌভিক চক্রবর্তী, প্রকাশনায় - দীপ প্রকাশন। গায়ের মূল্য ৩০০/-।
৩.৫/৫। এই সংকলনের ভেতর নিকষছায়া অনেক আগেই পড়েছিলাম। নানান চরিত্রের সমাহারে আর টানটান উত্তেজনাপূর্ণ জমাট কাহিনি। নীরেন ভাদুড়ি সিরিজ এই গল্পে(বা উপন্যাস, ভুলে গেছি এখন) শুরু হলেও গল্পে অনেক পরে তার প্রবেশ ঘটে। এই কাহিনিতে প্রেম বা শরীরী ব্যাপার স্যাপারে মাঝে মাঝে খাপছাড়া লাগছিলো, যে এটা হরর গল্প নাকি টিনেজ টক ঝাল প্রেমের গল্প। শেষের দিকের কাহিনি কিছুটা তাড়াহুড়ো করা লেগেছে, কিছু ব্যাপার মনে হয়েছে না থাকলেই ভালো হতো।
কিন্তু নিকট অতীতে পড়া সবচে ভয়ংকর ভিলেন এই গল্পেই আছে। পিশাচটা যথেষ্ট ভীতিকর, কিন্তু তার চেয়েও ভয়ংকর তার মালিক। এই কারণেই গল্পটা আলাদা একটা মাত্রা পেয়েছে।
দ্বিতীয় গল্প অরণ্যের প্রাচীন প্রবাদ। এটা প্রচলিত ভূত বা তন্ত্রের গল্পের ভেতর একটু ভিন্ন। জঙ্গলের পোচিং এবং তার ভেতর কিছু অলৌকিকতা নিয়ে গল্পটি। এই গল্পটা সাধারণ, কিন্তু এটা আমার সবচে ভালো লেগেছে। এখানে ভয় কম, অলৌকিকতা বেশি। তার সাথে জঙ্গলের আবহ মিশ্রণটা খুব ভালো খাপ খেয়েছে।
তৃতীয় গল্প(উপন্যাস?) পর্ণশবরীর শাপ। এই গল্পেও জঙ্গল, অলৌকিকতা সাথে ভয় তিনটারই মিশ্রণ আছে। এই কাহিনিটার শুরুটা চমৎকার। কিন্তু মাঝখান থেকে সবকিছু যেন ঘোড়ায় চড়ে এগোয়, গল্পের এতোই তাড়াহুড়ো। গল্পের শুরুর বিস্তার যেমন সময় নিয়ে, ডালপালা এগিয়ে সেটা আরও শাখা বিস্তার করবে আশা হয়, কিন্তু সে আশা পূরণ হয় না। কিছু অসমাপ্ত প্রশ্ন আছে, সাথে আছে এন্টাগনিস্টের অনুপ���্থিতি। এজন্য গল্পটা যেরকম প্রত্যাশা নিয়ে শুরু হয়, সেটা শেষ পর্যন্ত ধরে রাখতে পারে না। কিন্তু শেষে যে ট্যুইস্ট আকারে গল্পের একটা উপসংহার আছে, সেটা যথেষ্ট বুদ্ধিদীপ্ত। আমার বেশ পছন্দ হয়েছে।
নীরেন ভাদুড়ি বাংলা তান্ত্রিক হররের মধ্যে একটু অন্যরকম। তিনি অলৌকিকেও লজিক মানেন। এই এপ্রোচে গল্প পড়তে ভালো লেগেছে। এই সিরিজে সবচে উজ্জ্বল মনে হয় অন্যান্য চরিত্রগুলো। চরিত্র চিত্রণ��� লেখক অনেক সময় দেন, হরর গল্পে যা ব্যতিক্রমই ধরতে হয়। পরের পর্ব পড়ার আশা রাখি।
2.5 stars Overall an ok read. Nikashchhaya was a page turner, and for most of the part, was well-written. The ghouls and demons could have been depicted better. The starting was excellent. The climax could have been better written. It was definitely quite a good and interesting story. The plot of Aranyer Prachin Probaad was childish. Parnashbarir Shaap could have been better. The ending was unnecessarily extended and forced. It was pretty obvious that the author wanted to somehow push Marxist ideologies into a horror story. (When the author is writing about Gods, Demi-Gods, Tantra Sadhana, etc., it becomes ludicrous when he sprinkles that with leftist principles). The central character of Niren Bhaduri for some reason seems to be always worried and lacking in confidence. In almost every situation when asked by any other character what is the way out, his response is always diffident and doubtful. In conclusion, one of the stories was a good one time read, and the others passable.
ক্রম:- ১.নিকষছায়া:- নীরেন ভাদুড়ি মহাশয়ের প্রবর্তন। তাঁর পুরনো শিষ্য তথা সঞ্জয়ের মামা লোকনাথের আর গেনুর হাত থেকে মিতুলকে বাঁচানোর জন্য সঞ্জয়ের মামি , তিতাস আর ভাদুড়ি মহাশয়ের অলৌকিকের সাথে যুদ্ধ, প্রথম খন্ড শেষ হয় গেনুর মৃত্যু এবং লোকনাথের ভাঙ্গা কোমর নিয়ে কিন্তু এখনও লোকনাথের প্রতিশোধ বাকি.... ২.পর্ণশবরীর শাপ:- তিতাস, অমিয়, পল্লব , মিতুল চটকপুরে শিকার হয় পর্ণশবরীর শাপের, এরপর দীপক পালকে নিয়ে এন্ট্রি হয় ভাদুড়ি দাদুর। ফিরিয়ে আনেন তিতাস আর মিতুল কে মৃত্যুমুখ থেকে। হিউম্যান intelligence এবং আত্মাবলিদান এর অসাধারণ গল্পঃ। ৩.অরণ্যের প্রাচীন প্রবাদ:- কলেজ বেলার বন্ধু জ্যেতিরিন্দ্রনাথকে নিয়ে উপস্থিত হন জলদাপাড়া, কারণ সেইখান থেকে উধাও হয়ে যাচ্ছে গন্ডার। এর পিছনে রয়েছে সাধক সুখবিলাস সে প্রত্যেক তিন মাস অন্তর পিশাচ ডেকে গন্ডার শিকার করে, কিন্তু এইবার ভাদুড়ি মশাই আহ্বান করেন রক্ষক বুনো মহিষের দেবতা, ৺টাড়াবারোকে ,তিনি এসে অঙ্কুরে বিনষ্ট করেন এই সমস্যা, কুৎসিত মৃত্যু হয় সুখবিলাশের। বন্ধু জ্যোতিকে শেষে বিশ্বাস করতে হয় অলৌকিক বিষয়ে।
This entire review has been hidden because of spoilers.
বইটার মূল উপন্যাস নিকষ ছায়া আমি আগেই পড়েছি। এবার বড় গল্প দুটো পড়লাম। এবারের অনুভূতি আগের মতই। পড়ে ভালই লাগল। কিন্তু ব্যাপক ভাল লেগেছে সেটা বলা যাচ্ছে না। প্রথম গল্প হল অরণ্যের প্রাচীন প্রবাদ। নীরেন ভাদুড়ির যুবক বয়সের কাহিণী। বড় সরল গল্প। গল্পের স্থান অরণ্য, কিন্তু সে অনুযায়ী গা ছমছমে বর্ণনা পেলাম না। কিন্তু পর্ণশবরীর অভিশাপ আমার কাছে বেশ ভাল লাগল। প্লটটা বেশ জমে উঠেছিল। কিন্তু মূল অপরাধী ধরাও পড়ল না আর শাস্তিও পেল না। সেটা নিয়ে আমার প্রতিশোধপরায়ণ মন বেশ অশান্ত। আর শেষের দিকের যে একটা নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হলয সেটাও খুব একটা বাল লাগে নাই। যাই হোক, নীরেন ভাদুরি শক্তিশালী হচ্ছেন, ভবিষ্যতে ভাল ভাল লেখা পাব বলে আশা রাখি।
Exceptional Narration! I love the way the author narrates the story in the tone of the character. Narration is very poetic when the chapter is about Pallab and friends, who falls in the demography of intellectuals and educated citizens. And the narration changes to very street level slang-ful words when the chapter is about a guy from the streets who often get into fights. I like this shift and how all the other things of lietaractur is complementing the character. Also, this can be a new direction for the popular Tantra- Fiction genre in bengali literature!
চক্রবর্তীর লেখনী পরিষ্কার ও প্রাঞ্জল, যা পাঠকদের জন্য সহজবোধ্য। তিনি ভাদুড়ির সাহিত্যকর্মের পেছনে থাকা সামাজিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটগুলিকে তুলে ধরেছেন, যা ভাদুড়ির চরিত্র ও প্লটের গভীরতা বোঝাতে সহায়তা করে। বিশেষ করে, ভাদুড়ির ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও সমাজের চিত্রায়ণ তাঁর রচনাকে বিশেষভাবে জীবন্ত করে তোলে।
বইটিতে ভাদুড়ির ভাষা ও শৈলীর বিশ্লেষণ অত্যন্ত নিপুণ। চক্রবর্তী পাঠকদের কাছে ভাদুড়ির সাহিত্যিক দক্ষতা ও কৌশলগুলি স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করেছেন, যা সাহিত্যের গভীরে প্রবেশের পথ প্রশস্ত করে। তাঁর বিশ্লেষণের গতি ও সংজ্ঞা পাঠকদের মধ্যে ভাবনার উদ্রেক করে।