অমরা রুটিন কেন করি? রুটিনে যে টাস্কগুলো করব বলে আমরা ঠিক করি, সেগুলো তো আমরা জানিই! কখন খাব, কী খাব, কখন ঘুমাব, কখন কতক্ষণ পড়াশোনা করব, কী পড়ব, কখন জিম করব—এসবই তো! তাহলে সেই জানা টাস্কগুলো নিয়েই রুটিন করা কেন? কারণ, রুটিন আমাদেরকে একটা লক্ষ্য ঠিক করে দেয়—আমাদেরকে একটা উদ্দেশ্য দেয়। আর একটি কাঙ্ক্ষিত সময় পর্যন্ত এই রুটিনমাফিক চলার পুরস্কার হিসেবে আমরা একটা কিছু অর্জন করি। পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট, ওজন কমানো, সিক্স প্যাক বড়ি- এসব হলো রুটিনমাফিক জীবন যাপনের শেষে আমাদের প্রাপ্তি। . তেমনিভাবে জান্নাত যদি আমাদের সত্যিকারের লক্ষ্য হয়, তাহলে সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্যও আমাদের কিছু মূলনীতি ঠিক করতে হবে, একটি রুটিন তৈরি করতে হবে, একটি জীবন যাপন পদ্ধতি ঠিক করতে হবে—যার অনুসরণ আমাদেরকে জান্নাত পর্যন্ত নিয়ে যাবে। 44 Ways To Man hood বা ‘পুরোষোত্তম- ইসলামের আলোকে মুসলিম পুরুষের বৈশিষ্ট্য’ হলো সেই মূলনীতি, পথনির্দেশিকা।
অত্যন্ত যুগোপযোগী একটি বই মা শা আল্লাহ। আমরা এমন একটি অদ্ভুত সময় পার করছি যেখানে নারী-পুরুষ সকলে কেবল নেক্সট কোথায় ট্রিপে যাওয়া যায়, ভালো মানের আকর্ষণীয় কাপড় কোথা থেকে কেনা যায়, মজার সকল খাবার কোন কোন রেষ্টুরেন্টে পাওয়া যায় এসব নিয়েই চিন্তা ফিকিরে পরে থাকি। প্রাপ্ত বয়স্ক যুবকেরা গেইম খেলা, খেলা দেখা, ইউটিউব, ফেসবুক, মুভি, নাটক এগুলোতেই বুঁদ হয়ে জীবনের বড় একটা সময় পার করে দিচ্ছে। যেন এগুলোই জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান বিষয়। অথচ মৃত্যু হয়তো তাদের দোরগোড়ায়।
অধিকাংশ যুবক কেমন যেন দায়িত্বজ্ঞানহীন আর এ ব্যাপারে তাদের কোনো পরোয়া নেই। বরং এসব ব্যাপারে সিরিয়াস কোনো আলোচনা করতে চাইলে উল্টো তারা বিরক্তবোধ করে, মাই লাইফ মাই রুলস টাইপ পোস্ট দিয়ে বসে এফবিতে। অথচ তাদের অনেকের মা-বাবারাও চরম পেরেশান ও অসন্তুষ্ট তাদের এমন অবস্থার উপর।
বইটি আমাদেরকে সাহায্য করবে এই ঘোর থেকে বের হয়ে আসতে ইন শা আল্লাহ। একজন সত্যিকার মুসলমান পুরুষের জীবন যাপন পদ্ধতি কেমন হওয়া উচিত এ বিষয়ে উত্তম দিকনির্দেশনা আমরা পাবো এই বইটিতে। বইটি মূলত ৪৪ টি উপদেশমূলক অধ্যায় দ্বারা সাজানো হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম ১১ টি উপদেশ মৌলিক যার উপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে বাকি উপদেশগুলো।
উপদেশ গুলোর মধ্যে কিছু আছে মনস্তাত্ত্বিক বিষয় নিয়ে যেমন আমাদের আক্বিদাহ,মন মানসিকতা, চিন্তাভাবনা ইত্যাদি কেমন হবে এগুলো। কিছু উপদেশ হচ্ছে একজন মুসলমান পুরুষের আচার-আচরণ, কথাবার্তা কেমন হবে এগুলো নিয়ে। আবার আরও কিছু উপদেশ আছে যেগুলো ইবাদাত সংক্রান্ত যেমন কোরআন তেলাওয়াত করা,জামাতে সালাত আদায় করা,সাদাকা দেয়া ইত্যাদি।
বইটি সকল বয়সের পুরুষদের জন্য হাইলি রেকোমেন্ডেড। আর কেবল পুরুষদের জন্য না বোনরাও বইটি পড়ে লাভবান হতে পারবেন ইন শা আল্লাহ। যেমন আগামীতে মা হলে বা স্বামী নির্বাচনের ক্ষেত্রেও বইটিতে বিদ্যমান শিক্ষা কাজে লাগানো যেতে পারে। বইয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলকে আল্লাহ উত্তম প্রতিদান দিন আর আজীবন দ্বীনের উপর অটল রাখুন, আমিন। সকল প্রশংসা এই বিশ্বজাহানের একক স্রষ্টা ও প্রতিপালক আল্লাহর।
মুসলিম হিসেবে আমরা জানি একটা পরিবারের অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে হয় ঘরের কর্তাকে। তিনি হতে পারেন বাবা, ভাই বা, দাদা । বর্তমান সমাজে অনেক ism আছে যেখানে নারী-পুরুষ সমতার কথা বলে গলাফাটানো হয়। কিন্তু সমতাই তো যাস্টিস নয়। মানবরচিত এসব ism এ এসব ভুল থাকবে স্বাভাবিক। আল্লাহ তায়ালা প্রদত্ত যে বিধান সেখানে কোনো অসংলগ্নতা আপনি পাবেন না। তিনিই আমাদের সৃষ্টি করেছেন তিনিই জানেন কোন জিনিস আমাদের জন্যে বেশি উপকারী। সেকারণে ইসলামে নারীপুরুষের জেন্ডার রোল আলাদা আলাদা যাই ন্যায্য। ইসলাম পুরুষের আর নারীর দায়িত্ব আলাদা করে দেয় একটা পরিবারে। নারীদের যেমন নারীসুলভ আচরণই কাম্য সেখানে পুরুষদেরও উচিত সত্যিকারের পুরুষ হয়ে উঠা। কিন্তু আজকাল সমাজে পুরুষ হওয়ার মানদন্ডটাই পাল্টে গেছে। সিক্সপ্যাক বডি আর সিক্স ডিজিট ইনকামেই আজকাল আমরা পুরুষ খুঁজে বেড়াই। অথচ ইসলামে কাজে, গুণে, সততায়, ন্যায়নিষ্ঠার মাধ্যমে নিজের, পরিবারের তথা সমাজের মানুষের দুনিয়া-আখিরাতের কল্যাণে অবদান রাখতে পারাই পৌরুষের কাজ। পরিবারে পুরুষের ভুমিকা নাবিকের মতো। একজন দায়িত্বজ্ঞানহীন পুরুষ পরিবার-সমাজ সবার জন্যই ক্ষতির কারণ হতে পারে। এজন্য আমাদের হতে হবে সত্যিকাররের পুরুষ যার মানদন্ড হবে আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দেখানো পদ্ধতিতে। কুরআন-হাদিস থেকে বের করে আনা ৪৪টি মূলনীতি এই বইয়ে সংকলিত হয়েছে। অনেকেই হয়তো মনে করতে পারেন এই বইটি বিবাহিত পুরষদের জন্য অথচ এখানে ওরকম কিছু স্পেশালি বিবাহিতদের জন্য নেই। এটা সব বয়সী সাধারণ পুরুষের জন্যে যারাই এটি পড়ে বুঝতে পারবেন। কিশোর থেকে শুরু করে আরো বেশি বয়সী সবাই।
বইঃ পুরুষোত্তম (ইসলামের আলোকে মুসলিম পুরুষের বৈশিষ্ট্য) 44 Ways To Manhood
"ফার্মের মুরগির মতো বাপের হোটেলে খেয়ে,কোনো দায়িত্ব-কর্তব্যের ধারেকাছেও না থেকে,ইন্সটাগ্রাম-ফেসবুক-টুইটারে সবজান্তা আর সর্বগুণসম্পন্ন সাজার নাম পুরুষ নয়। -------- পুরুষোত্তম-ইসলামের আলোকে মুসলিম পুরুষের বৈশিষ্ট্য।বইটি মূলত ইংরেজি থেকে বাংলা অনুবাদ।বইয়ের মূল লেখক হচ্ছেন,তাইমুল্লাহ আব্দুর রহমান এবং বাংলায় অনুবাদ করেছেন,আশিক আরমান নিলয়।
নাম দেখেই মোটামুটি বুঝতে পারছেন বইটি মূলত মুসলিম পুরুষদের নিয়ে লেখা।বইটি অনেক আগেই কেনা হয়েছিলো এবং পড়া হয়েছিলো কিন্ত সময় করে রিভিউ লেখা হয়নি।অবশেষে আজকে ভাবলাম একটু লেখি কারণ আজকে আবার বইটি পড়ে শেষ করলাম।
বইটিতে লেখক পৌরুষের ৪৪টি মূলনীতি সংকলন করেছেন।সেই ৪৪টা মুলনীতিকে আবার ২ ভাগে বিভিক্ত করে বইটি সম্পূর্ণ করেছে।প্রথম ভাগে মূলত ১১টি পূর্বশর্ত এবং শেষে ৩৩টি উপদেশ এনেছেন।
১১টি পূর্বশর্তে গুরুত্বপূর্ণ কিছু টপিক আলোচনা করা হয়েছে।যেগুলা একজন মুসলিম পুরুষের জন্য অনেক বেশিই গুরুত্বপূর্ণ।যেমন: ইখলাস,তাওহীদের জ্ঞান,হালাল জীবিকা,ফিকহের বুঝ ইত্যাদি ইত্যাদি।
এবং ৩৩টি উপদেশে অনেক উপকারি বিষয়গুলো তুলে আনা হয়েছে যেগুলার দ্বারা একজন পুরুষ সত্যিকারের পুরুষ হিসেবে গড়ে উঠবে।
আজকাল সমাজে সত্যিকারের 'পুরুষ' হওয়ার মানদন্ড পাল্টে গেছে।অর্থ সম্পদ কার বেশি,কার সিক্স প্যাক বডি,কে কয়টা মেয়ে পটাতে পারল--এসব আজ পুরুষ হওয়ার মানদন্ড।কিন্ত ইসলামে পুরুষ হওয়া মানে দায়িত্ব নেয়া,নিজের উপর অর্পিত কর্তব্য পালন করতে পারা।চারিত্রিক মাধুর্য,সততা,ন্যায়নিষ্ঠা,সর্বোপরি ইসলাম একজন পুরুষের জন্য যেসব গুণ অর্জন করার তাগিদ দিয়েছে সেগুলা অর্জনের মাধ্যমে নিজের পরিবার,সমাজ,রাষ্ট্রে সত্যিকারের অবদান রাখতে পারাটাই পৌরুষ।এসব বিষয় বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে বইয়ে।
পুরুষত্বের সাথে পশুত্বকে মিলিয়ে ফেলে অনেকে।এর একটি কারণ হতে পারে ইতিহাসে যুদ্ধ সংক্রান্ত ঘটনাবলিকে ভুল দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা।ফলে অনেকেই সহিংসতাকে সাহসিকতার সমার্থক ভেবে নেয়।কিংবা বীরত্ব আর নির্মমতাকে এক ধরে নেয়।কিন্ত শুধুমাত্র আক্রমণাত্মক হওয��াকেই ইসলাম পুরুষত্ব বলে না। একজন পুরুষ হবে তার পরিবারের নাবিক! সবাই এটাই চায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হয়েও থাকে এমনটি। নাবিক জাহাজ ত্যাগ করলে নারী-শিশুর পক্ষে উত্তাল সমুদ্রের সাথে লড়াই করে গন্তব্যে পৌঁছানো খুবই কঠিন। বাবা না থাকলে মা কখনো সন্ত��নদের মানুষ করতে পারবে না— আমি এটা বলছি না। অনেক সময় উল্টোটাও দেখা যায়। কিন্তু স্বামীর অবর্তমানে একজন স্ত্রীর দায়িত্ব অনেক কঠিন হয়ে যায়। কারণ সহজাতভাবেই নারীরা চায় এমন একজন পুরুষের অধীনস্ত হতে যে হবে দায়িত্বশীল ও সাহসী। স্বামীকে হতে হয় স্ত্রী জন্য রোল মডেল বা অনুকরণীয় আদর্শ। এই কথাটি মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সবার জন্যই প্রযোজ্য। তাই কোনো পুরুষকে পৌরুষ অর্জনে সাহায্য করা মানে পুরো পরিবারকে উপকৃত করা।
আশা করি বইটি পড়লে সত্যিকারের একজন দায়িত্ববান পুরুষ হিসেবে গড়ে উঠার কিছু পথ ও পন্থা পাবেন ইনশাআল্লাহ।ব্যক্তিগতভাবে বইটি পড়ে আমি নিজে অনেক উপকৃত হয়েছি।