এই উপন্যাস পড়তে পড়তে প্রথমেই মনে পড়ে যায়—“কী মধুর আমার মায়ের হাসি/চাঁদের মুখে ঝরে।” শিরোনামেই যেমন আবেগের স্বাক্ষর, তেমনি বইটির ভিতরেও মাতৃত্বের কোমলতা, মধ্যবিত্ত ���ংসারের টানাপোড়েন এবং ভালো মানুষ হয়ে ওঠার দীর্ঘ অনুশীলন লক্ষণীয় স্পষ্টতায় ফুটে উঠেছে।
গল্পের বিস্তার বড় নয়, কিন্তু অভিজ্ঞতার পরিসর বিস্তৃত: ছোট ছোট ঘটনার ভিতর দিয়ে যে জীবনবোধ ধীরে ধীরে জেগে ওঠে, তা কিশোর মনের জন্য যেমন প্রাসঙ্গিক, তেমন প্রাপ্তবয়স্ক পাঠকের কাছেও গভীরভাবে স্পর্শকাতর।
উপন্যাসের গতি প্রথম দিকটা কিঞ্চিৎ সংযত, এমনকি ধীর লয়ের মনে হতে পারে। কিন্তু সেই ধীরতা আসলে চরিত্র ও অনুভবের স্তরগুলি সাজিয়ে নেওয়ার সময়। একবার আবহটি ঠিকঠাক বসে গেলে বৃত্তান্তের টান আপনাকে শেষ পর্যন্ত নিয়ে যাবে।
সঞ্জীবের বাকভঙ্গি স্বচ্ছ, প্রাঞ্জল; শিক্ষকসুলভ কোনও গাম্ভীর্য নেই, আছে জীবন-শিক্ষার অনাড়ম্বর সরলতা। তাঁর স্মরণীয় উচ্চারণ—“প্রতিষ্ঠা মানে সত্যের প্রতিষ্ঠা। ঐশ্বর্য হল চরিত্র। যুদ্ধ হল নিজের সঙ্গে। জয় হল নিজেকে জয়”—উপন্যাসটির নৈতিক মেরুদণ্ডের মতন কাজ করে। এই কথাগুলি কোনও ভাষণ নয়, চরিত্রদের দগ্ধ অভিজ্ঞতার ভেতর থেকে উঠে আসা একধরনের আলোকিত বোধ।
মধ্যবিত্ত পরিবারের সীমাবদ্ধতা, সংসারের অনিশ্চয়তা, সময়ের দোলাচল—“আজ সময় ভালো, কাল খারাপই হতে পারে”—এসবই এখানে কিশোর চোখে দেখা। ভালোমন্দের দ্বন্দ্ব সমাজে যেমন চলমান, সেভাবেই মানুষের ভিতরেও তা অনিবার্য; বইটি মনে করিয়ে দেয়, আগুনে না পোড়ালে যেমন সোনা খাঁটি হয় না, তেমনি বিপদ-দুঃখ না পেরোলে ভালো মানুষ হওয়ার প্রক্রিয়াও পূর্ণতা পায় না। লেখক এই সত্যটি দেখিয়েছেন সস্তা নীতিকথা দিয়ে নয়, বরং ছোট ছোট ক্ষত—হারানোর যন্ত্রণা, অনুতাপ, স্মৃতির গাঢ়তা—এসবের মাধ্যমে।
বাবা-মা না-থাকার শূন্যতা নিয়ে যে অনুভবগুলির উল্লেখ আছে, সেগুলো পড়তে পড়তে চোখ ভিজে ওঠা একেবারেই স্বাভাবিক; কারণ পাঠযোগ্যতার আড়ালে এখানে আসলে চলেছে শোককে শিক্ষায় রূপান্তরের এক নীরব সাধনা।
চরিত্রচিত্রণে সঞ্জীব নির্ভুল পর্যবেক্ষক। মা যেমন এই বইয়ের অবলম্বন, তেমনি একজন প্রবীণ মানুষের জীবনদর্শনও কিশোর পাঠকের কাছে দীক্ষার মতো কাজ করে—শুধু কথায় নয়, কাজে, অভ্যাসে, এবং নিজেকে জয় করার অনুশীলনে। বইটি দেখায়, ‘প্রতিষ্ঠা’ বাহ্যিক চাকচিক্য নয়; চরিত্রই আসল ঐশ্বর্য। নিজের সঙ্গে যুদ্ধ মানে নিজের দুর্বলতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সেগুলিকে শাসন করা। পরিবার-পরিচয়ের গর্ব, পূর্বজদের স্মরণ—এসবও এখানে আত্মগঠনকেই জোরদার করে। ফলে উপন্যাসটি কেবল ‘মায়ের উদ্দেশে চিঠি’ নয়, বরং নিজের কাছে নিজেরই এক শপথপত্র।
ভাষা ও বিন্যাসের দিক দিয়ে বইটি সহজপাঠ্য; সংলাপগুলিতে একটি ঘরোয়া উষ্ণতা আছে, যা চরিত্রদের কাছাকাছি টেনে আনে। লেখক আবেগকে অতিরিক্ত ফুলিয়ে তোলেননি, তবে সংযমী আবেগের ভেতর দিয়ে যে দীপ্তি তৈরি হয়, তাতেই বইটির আত্মা। হালকা রসের মুহূর্তও আছে, কিন্তু সেগুলো কখনও বিষাদের গভীরতাকে হালকা করে না; বরং টানাপোড়েনের মাঝখানে শ্বাস নেওয়ার জায়গা দেয়। কিশোর পাঠকের জন্য যে আত্মোন্নয়নের ব্যাকরণ বইটি রচনা করে—নিজেকে প্রশ্ন করা, ভুল থেকে শেখা, অল্পে সন্তুষ্ট থাকতে শেখা—তা পাঠশেষে লেগে থাকে থিতিয়ে থাকা পরশের মতো।
তবে সামান্য একটি কথা বলা দরকার: শুরুর দিকে ধীর ছন্দ এবং কয়েকটি স্থানে স্পষ্ট নীতিবোধের উচ্চারণ কিছু পাঠকের কাছে খানিকটা direct মনে হতে পারে। যাঁরা আখ্যানকে একেবারে ‘অ্যাকশন-চালিত’ ভঙ্গিতে খোঁজেন, তাঁদের জন্য এই বই নয়। কিন্তু যারা চরিত্রের ভেতরের নীরব পরিবর্তন, সম্পর্কের উষ্ণতা, আর বেদনার ভিতর দিয়ে জন্ম নেওয়া আলোর দিকে তাকাতে চান, তাদের কাছে “ইতি তোমার মা” এক দুর্লভ অভিজ্ঞতা।
কিশোরদের জন্য এটি যেমন উপদেশ-পুস্তক নয়—বরং উপদেশকে জীবনের অনুশীলনে নামানোর গল্প—তেমনি বড়দের জন্য এটি স্মৃতির সঙ্গে একরকম অধিবাস; যে অধিবাসে মায়ের হাসি চাঁদের মতো ঝরে পড়ে, আর পাঠ শেষে অনেকক্ষণ মনটা এক ধরনের দীপ্ত শোক-আনন্দে ভরা থাকে।
সার কথা, “ইতি তোমার মা” শেষ করার পর একটা ঘোর লেগে থাকে—যেন নিজেরই জীবনের দিকে একটু দূর থেকে তাকিয়ে দেখলাম। যারা এখনও সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়কে পড়েননি, তাদের জন্য এটি একটি কোমল অথচ দৃঢ় time portal —ভালো মানুষ হয়ে ওঠার পথে প্রবেশের portal । আর যারা পড়েছেন, তাদের জন্যও এটি পুনরায় মনে করিয়ে দেওয়া: জল নয়, আগুন—সেখানেই চরিত্রের শুদ্ধি; সেখানেই নিজের সঙ্গে নিজের যুদ্ধে, জয়ের শুরু।
শারদীয় আনন্দমেলায় পড়েছিলাম প্রথম। কেঁদেওছিলাম বেশ এক সমুদ্দুর। আজ আরেকবার স্মৃতিপটে ভেসে উঠলো এই বই।
অলমতি বিস্তরেণ।