'যাত্রাবদল' প্রকাশিত হয় ১৯৩৪ সালে। এর গল্পসমূহ - 1) ভণ্ডুলমামার বাড়ি 2) পেয়ালা 3) উইলের খেয়াল 4) কনে দেখা 5) সার্থকতা 6) একটি দিন 7) বাইশ বছর 8) বৈদ্যনাথ 9) ডানপিটে 10) যাত্রাবদল
Bibhutibhushan Bandyopadhyay (Bangla: বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়) was an Indian Bangali author and one of the leading writers of modern Bangla literature. His best known work is the autobiographical novel, Pather Panchali: Song of the Road which was later adapted (along with Aparajito, the sequel) into the Apu Trilogy films, directed by Satyajit Ray.
The 1951 Rabindra Puraskar, the most prestigious literary award in the West Bengal state of India, was posthumously awarded to Bibhutibhushan for his novel ইছামতী.
সে ছোটগল্প হোক বা উপন্যাস, কিছু কিছু বইয়ে বিভূতি বাবু দুঃখ টা এমন ভাবে উবুড় করে ঢেলে দেন যা খুব কাছের মানুষের দেওয়া দুঃখ মতই ভার হয়ে চেপে থাকে।
তেমনই একটা গল্পগ্রন্থ "যাত্রাবদল"। নাম গল্প সহ মোট দশটি গল্প আছে বইটাতে। অন্য গল্প গুলোর কাহিনি যাও হয়তো কিছু দিন পর ফিকে হয়ে যাবে, তবে নাম গল্পটা বহুদিন মাথায় এবং মনে পাথরের মত চেপে থাকবে।
লেখকের লেখা নিয়ে তো নতুন করে কিছু বলার নাই। লেখকের বিখ্যাত বই গুলো নিয়ে অনেক চর্চা তবে কিছু লেখা এতো ভালো তবু কোন আলোচনা নাই।
"যাত্রা বদলের গল্প" 🍄ভণ্ডুলমামার বাড়ি: গল্প বলছিলেন গ্ৰামের হেডমাস্টারমশাই। ছোটবেলায় মামাবাড়ির পাশেই তার পাড়াতুতো মামা ভন্ডুলমামার কথা। ভন্ডুল মামা নিজের চাকরির পয়সা একটু একটু পাঠিয়ে পৌত্রিকভিটায় বাড়ি তুলছেন। ইচ্ছা সস্ত্রীক বসবাস। কিন্তু দিন যায়, বছর যায় ভন্ডুলমামা বাড়ি আর পুরোপুরি তুলতে পারছেন না। আসলে টাকার তো দরকার। আবার অজপাড়া গাঁ, ম্যালেরিয়ার ভয়ে বউ বাচ্চা এখানে এসে থাকতেও রাজি না। শেষমেষ ভন্ডুলমামার ঘরখানা উঠবে কী না ঠিকঠাক!
🍄উইলের খেয়াল: বড়লোক হতে পারছেন না? দারিদ্রের কষাঘাতে জর্জরিত জীবনটাকে বড় তুচ্ছ মনে হয়? আরে মশাই হাল ছাড়বেন না। ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করুন। ভাগ্যে কখন কখন কার কী হয় বলা যায় না। অবনীর কথাই ধরুন না, উইলের খেয়ালে তার পুরো জীবনটাই বদলে গেছে। নইলে এইতো কয়দিন আগেও অবনীর বউ বাড়ি বাড়ি চাল ধার করে খাওয়ার ব্যবস্থা চালাতো।
শুনে অদ্ভুত লাগছে তাই না। আরে এটাই তো আসলে রহস্য। কী করে সৌভাগ্য এসে রাতারাতি অবনীর কপাল খুলে দিলো।
🍄পেয়ালা: কালাই করা মাটির পেয়ালাটি যখন কোনো বাড়ির জন্য সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায় তখন বাড়ির লোকের কিন্তু আসলেই মহা ঝামেলা। কীভাবে সামলানো যায় বিপদ! কিন্তু কী বিপদ হলো? সেটা আরো রহস্যময়।
🍄কনে দেখা: লেখকের মেসে হিমাংশু যখন লেখকের সঙ্গে থাকত, তখন তার চালচলন দেখলে মনে হবার কথা যে, সে বেশ অবস্থাপন্ন ঘরের ছেলে। তার প্রধান শখ ছিল গাছপালা ও ফুলের।হিমাংশুর গাছপালার ওপর ভালোবাসা ছিল সত্যিকার জিনিস। সে ভালো খেত না, ভালো কাপড়জামা কখনো দেখিনি তার গায়ে—কিন্তু ও ধরনের সুখস্বাচ্ছন্দ্য তার কাম্যও ছিল না। তার পয়সার সচ্ছলতা ছিল না কখনো। কিন্তু পয়সা হাতে-হলে কাপড়–জামা না কিনুক, খাওয়া-দাওয়ায় ব্যয় করুক-না-করুক, ভালো গাছপালা দেখলে কিনবেই। গল্পটা হিমাংশুর, তার কনে দেখার।
🍄যাত্রাবদল: ভাটপাড়াতে পিসিমার বাড়ি গিয়েছিলেন লেখক বড়োদিনের ছুটিতে। সারাদিন বাড়িতে বসে থেকে ভালো লাগল না। বিকেলের দিকে নৈহাটি স্টেশনে বেড়াতে গেলেন। তখন দেশেই থাকেন, বিদেশে বেড়ানোর অভ্যাস নেই, এত বড়ো স্টেশন ঘনিষ্টভাবে দেখবার সুযোগ বড়ো একটা হয়নি। বেড়াতে বেড়াতে হঠাৎ দেখলেন, প্ল্যাটফর্মের সবাই একটু সন্ত্রস্ত হয়ে উঠল। প্ল্যাটফর্মে একখানা প্যাসেঞ্জার ট্রেন সশব্দে এসে দাঁড়াল।
প্ল্যাটফর্মে একটা গোলযোগ উঠেছে। মুর্শিদাবাদের ওদিক থেকে একটি ভদ্রলোক সপরিবারে এইখানে গাড়ি বদলাবার জন্যে নেমেছিলেন পশ্চিমের লাইনে যাবার জন্যে, তাঁর স্ত্রী প্ল্যাটফর্মে নেমেই হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যান, সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে অজ্ঞান নয়, তিনি মা*রাই গেছেন। এই গল্প যাত্রাবদলের। আমরা তো জানি না জীবনের চলার পথে কখন যাত্রাবদল হয়।
🍄ডানপিটে: নেপালের জীবনের বিচিত্র গল্প এই ডানপিটে। ছোটবেলার ডানপিটে ছেলে নেপাল কীভাবে নিজের ভাগ্যের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে, কীভাবে জীবনটাকে ধাপের পর ধাপ পার করে নেয়। ছোট্ট নেপাল বড় হয়, বিয়ে করে, ছেলেপুলের বাবা হয়। বয়সের সাথে সাথে জীবনের চড়াই-উৎড়াই বাড়তে থাকে। বৃদ্ধবেলায় শেষে কী পরিনতি হবে নেপালের?
🍄বৈদ্যনাথ: মা হারা বৈদ্যনাথ ছোটবেলা থেকেই বজ্জাত, দুষ্টুমিতে সেরা। ঘরে সৎ মা তাই ছেলেটার জন্য আপনার মনে মায়া জাগলেও বৈদ্যনাথের বজ্জাতিতে অতিষ্ট হয়ে আপনি বলতে বাধ্য হবেন এমন ছেলে ঘরে রাখা বিপদ। তাই নিজের ঘরে বৈদ্যনাথের ঠাঁই মেলে না। ঘুরতে ঘুরতে কোলকাতায় চলে এলো সে। তারপর ঠাঁই হয় এক আত্মীয় দাদার বাড়িতে। সেখানে গিয়েও কিন্তু ভালো হতে পারেনি সে।
🍄বাইশবছর: মনে মনে তারুণ্য ধরে রাখতে চাওয়ার সাধ হলো লেখকের। তিনি তো এখন চল্লিশ পঞ্চাশের কোঠায়। তবে একসময় তারও তরুন বয়স ছিলো। বাইশ বছর বয়সের নানান স্মৃতি তার মনে পড়ে যায়।
🍄একটি দিন: জীবনে আনন্দ নেই, মনমরা, মনখারাপ এগুলোই লেগে আছে। কোথায় গেলে আনন্দের খোঁজ মিলবে? সারা জায়গায় খুঁজে হয়রান জীবন। আরে কোথায় গেল আনন্দ! একটি দিন তবে বৃথা যাবে! শেষমেষ আনন্দ খুঁজে পাওয়া গেল। কোথায়, কীভাবে পড়তে হবে জানতে।
🍄সার্থকতা: পুরনো দিনের কথা, পৌত্রিক ভিটার টানে ফিরে এসেছে নিজের গ্ৰামে আবার ফিরে এসেছে ননী গোপাল। নিজে এখন প্রতিষ্ঠিত, বউ ছেলেমেয়ে আছে। গ্ৰামের মানুষ আশায় বুক বাঁধে এই প্রতিষ্ঠিত ছেলেটি নিজ জীবনে সার্থক, তবে গ্ৰামের মানুষদের সে যদি সাহায্য করে আরো ভালো হয় তাতে অবশ্যই।
🍄পাঠ প্রতিক্রিয়া🍄
বিভূতির ছোটগল্প সংকলন "যাত্রাবদল" আমার কাছে বেশ ভালো লেগেছে কারণ উপন্যাসের মতো এই সংকলনের প্লটগুলো বেশ। জীবনের নানা দিক আছে। ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতে নিয়ে ঘটনা। বিশেষ করে "যাত্রাবদল" গল্পটি পড়ে কেমন উদাস চিন্তায় ডুবে গিয়েছিলাম। জীবনে আমরা কত স্বপ্ন দেখি, কত প্লান করে রাখি কিন্তু আমাদের প্লান আর স্রষ্টার চিন্তা কী এক। শেষটা খুব বিষাদময়।
আবার রহস্যময় গল্প পেয়ালা। কিছুটা ভৌতিক ভাইব দেবে গল্পটি। তবে এমন ঘটনা বা বিশ্বাস অনেক বাড়িতে শোনা যায়। আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে "কনে দেখা" গল্পটি। শেষটায় এত সুন্দর সমাপ্তি দিলেন লেখক। পড়লে মনটা খুশি খুশি অনুভব হবে।
তবে বিভূতির লেখার একটা দোষ আছে। চরিত্রদের যখন ইচ্ছে মে*রে দিয়েছেন। মাঝে মাঝে পড়তে পড়তে কিন্তু বিভূতির উপর রেগে যাচ্ছিলাম হিহিহি। বলবো পরের আলোচনায় আরো।
'যাত্রাবদল' পড়া হয়ে যাওয়ার অনেক পরেও, বিভূতিভূষণের 'ভণ্ডুলমামার বাড়ি'র কথা মনে পড়ে। কথকের শৈশব, কৈশোর, যৌবন পেরিয়ে যাচ্ছে; ভণ্ডুলমামার বাড়ি গড়া আর শেষ হচ্ছে না। শৈশবে কথক শুনত, ভণ্ডুলমামা নাকি দূরে কোথায় কাজ করে, সেখান থেকে মাঝেমাঝে টাকা পাঠিয়ে গ্রামে এই কোঠাবাড়ি তৈরি করে। টাকা পাঠাতে না পারলে বাড়ির কাজও বন্ধ। ভণ্ডুলমামা দূরে কাজ করেন বলেই কিনা, নাকি অর্থাভাবে কারণে, কথক মনে মনে খুব ভালোবেসে ফেলে ভণ্ডুলমামাকে। মনের গোপনে সে ভণ্ডুলমামার বাড়ির জন্য মনকেমনের কথা ভেবে, টাকা পাঠানোর অসুবিধের কথা ভেবে সমব্যথী হয়ে পড়ে। তবে ভণ্ডুলমামার সঙ্গে তার দেখা হয় প্রথম যৌবনে। তখন সেইসব কল্পনা, স্বপ্ন কেটে গেছে। নিতান্তই অনাড়ম্বর ভণ্ডুলমামাকে কোনোমতে সে প্রণাম করে মাত্র। যে বাড়ি শেষ হচ্ছে না দেখে একদিন তার মন হু হু করতো, আজও সেই বাড়ি হয়েই চলেছে জেনে সে ব্যঙ্গ করে ভাবে – এই তাজমহল বানানোর কাজ বেঁচে থাকতে শেষ হতে দেখব তো?
সময় কেটে যায়। শহর কলকাতার মোহে বন্দি ছেলে-বউরা খেঁকায় ভণ্ডুলমামাকে – কাজ নেই, কর্ম নেই, পাণ্ডববর্জিত গ্রামে বাড়ি তুলছে বড়! ভণ্ডুল তবুও বাড়ির টুকটাক কাজ করে চলে, একা একাই মাঝেমাঝে এসে থাকে। সে চায়, তার ছেলেরা শহরে থেকে যেন একেবারে শিকড়-বিচ্ছিন্ন না হয়ে যায়। মাঝেমাঝে তারাও গ্রামে এসে থাকুক। নিজের সে সব স্বপ্ন সে কদাচিৎ কথককে বলে। মুখে সরল হাসি, বুড়ো বয়সেও ছেলেদের শিকড় চেনানোর স্বপ্ন। নিজে এখন গ্রামের বাড়িতেই থাকেন ভণ্ডুল। রান্না করার কেউ নেই। এ বাড়ি সে বাড়ি থেকে একটু মুড়ি, বাসি সন্দেশ, খানিক খাবার পোঁটলায় বেঁধে সে বাড়িতে এনে রাখে। রাস্তা দিয়ে আনমনে ফটাশ ফটাশ করে চটির শব্দ করে হাঁটে। ভণ্ডুলমামাকে দেখে আবার মনকেমন করে কথকের। সেই ছেলেবেলার মতো।
ভণ্ডুলমামা এভাবেই তাঁর প্রিয় গ্রামের, প্রিয়তর বাড়ি তৈরি করতে করতে, ছেলেদের আশায় দিন গুনতে গুনতে একদিন মরে যান। কুড়ি হাজার কোটি ছায়াপথের একটি কোন এক অখ্যাতনামা গ্রহের কোন এক নামগোত্রহীন মানুষ কীসের অপেক্ষায়, কীসের স্বপ্নে একটা বাড়ি তৈরি করতে থাকলেন, করতেই থাকলেন, কেউ তাতে এল না, থাকল না, বাড়িটার পাঁচিল অবধি দেওয়া হল না, সে বাড়ি মানুষের জীবনবৃত্তান্ত পেরিয়ে একটা শুকনো শিকড় হয়ে রয়ে গেল। এসব তো বিভূতিভূষণেরই লেখার কথা ছিল ...
অন্যান্য গল্পগুলিও অনবদ্য। তবে আপাতত এই গল্পটি নিয়েই বলতে ইচ্ছে করছিল।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃতীয় গল্প-সংকলন "যাত্রাবদল"। নাম গল্পটি শেষে থাকলেও, এই গল্পটিই আমার মতে এ গ্রন্থের শ্রেষ্ঠ রচনা। এ গল্পগ্রন্থের গল্পগুলোতে বিচিত্র সব চরিত্র উঠে এসেছে এবং সেগুলোর নির্মাণেও নানা বিচিত্র মাধ্যম ব্যবহার করেছেন প্রণম্য বিভূতিবাবু। গল্পপাঠের সুখ ছাড়াও চরিত্র নির্মাণের কলাকৌশল রপ্ত করার ক্ষেত্রে এটি লেখকদের পাঠ্য হওয়া উচিৎ বলেই মনে করি।