রিঙ্গণপুর: স্বপ্ন ও প্রত্যাশার উত্থান পতন ▫ “অযাচিত যেকোনো কিছু জীবনের সংস্পর্শে এলে তা গ্রহণ করে মানিয়ে নিতে বেসামাল লাগে। তারপর একটা দীর্ঘ সময়ের জন্য জীবনের সাথে জড়িয়ে থাকে সেই অসামাঞ্জস্যতা। না চাওয়া যখন জোরপূর্বক সঙ্গী হয় তখন তা নির্মূলে অক্লান্ত পরিশ্রমেও বিশেষ কিছু হয় না। তবে ক্লান্তির ফল সুনিশ্চিত হয়, এবং তা প্রাপ্তি হয়ে জীবনে আসে একবার হলেও।”
রাজনীতি সমাজবান্ধব সেবামূলক কাজ। রাজনৈতিক মঞ্চের বক্তারা সব সময় বলে থাকেন, তারা ক্ষমতায় গেলে জনগণের কাছে প্রতিশ্রুত কল্যাণ সাধনে আত্মনিয়োগ করবেন। জনগণের চাওয়া-পাওয়া থেকে শুরু করে একটি জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অনেকাংশ রাষ্ট্রক্ষমতার সাথে সংশ্লিষ্ট। তাই জনগণের সাথে কৃত প্রতিশ্রুতি এবং সমাজের উন্নয়নের জন্য রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়া অপরিহার্য। তবে রাষ্ট্রক্ষমতা ব্যবহার করে বিরোধীদের চাপা দেওয়া এবং নিজের স্বার্থসিদ্ধি করাই যেন বর্তমান রাজনৈতিক বক্তাদের মূল কাজ হয়ে উঠেছে। মূলত কোনো সমাজ বা রাষ্ট্রে গণতন্ত্র বা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত না থাকলে সে সমাজ সুকৃতির চর্চা করা সহজ নয়; বস্তুত কোনো সমাজে সুকৃতির চারা রোপণ থেকে বেড়ে ওঠার যা প্রয়োজন, তা হলো- গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সুশাসন। আমাদের সমাজে ও রাষ্ট্রে এই প্রয়োজনীয়তার উল্টো চিত্র বরাবরই দেখা মিলে। ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতায় নিজের মনগড়া আইন হয়ে উঠে মূখ্য। মূলত আমাদের রাষ্ট্র-সমাজ গণতান্ত্রিক কার্যকারিতা হারিয়েছে আরো আগে।সাংবিধানিকভাবে সংসদীয় গণতন্ত্র চালু থাকলেও তা অনেকটাই অলঙ্কারিক। ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতা ধরে রাখা আর বিরোধীদের দমিয়ে চাপিয়ে রাখা, এবং বিরোধী দল ক্ষমতা লাভের প্রতিযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর প্রতিপক্ষকে মোকাবেলা করতে হচ্ছে নিজস্ব শক্তি দিয়ে। আর ক্ষমতাসীনরা দেশ বিরাজনীতিকরণের জন্য প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রযন্ত্রের অপব্যবহার করছে যা প্রতীয়মান।
মাঝেমধ্যে মনে হয় দেশে রাজনীতি বলতে এখন কিছুই নেই। যা আছে তা দলগত ক্ষমতাচর্চা। রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক বেহাল অবস্থার চিত্র ভেসে উঠে উপন্যাসে এক সীমান্তবর্তী অবহেলিত গ্রামে। ব্যবসা-বানিজ্য, শিক্ষা-দীক্ষা, গণ মানুষের যাপিত জীবন সবকিছুতে বিরাজমান ক্ষমতাচর্চার প্রভাব। সেই প্রভাবে সবকিছু হয়ে উঠে বিশেষ কোন গোষ্ঠীর উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তাদের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হস্তক্ষেপে বদলে একটি সমাজের স্বাভাবিক চিত্র। উপন্যাসে দেখা যায় একটা স্কুলের কুৎসিত অবস্থা। “বলাই যায় স্কুলটা নামেই স্কুল। রাজনৈতিক সব কার্যক্রম যেন এই স্কুলকে ঘিরেই। মাধ্যমিক পাস করে না যাওয়া ছেলেটাও আজ অকাজে স্লোগান দিতে শিখে গেছে। মোড়ে দাঁড়িয়ে মেয়ে সহপাঠীদের অশ্লীল গান শুনিয়ে দেয়। রাজনৈতিক ছায়ার ভরসা আছে তার ওপর নির্ভর করে নানান অপরাধ করে বসে।”
আহমদ ছফা বলেন, ‘আমাদের রাষ্ট্রের বয়স সাঁইত্রিশ-চল্লিশ কিন্তু আমাদের সমাজ হাজার বছরেরও পুরনো। তাই রাষ্ট্রকে সমাজের দেহে হাত রাখার আগে চিন্তা করতে হবে।’ আমাদের সমাজ ব্যতীত রাষ্ট্রের কিছুই নেই। কিন্তু দুঃখজনক সত্যি এখন দেখা মিলে বীভৎস এক চিত্র যেখানে রাষ্ট্র সমাজকে গিলে খেতে শুরু করেছে, সামাজিক প্রথা, সমাজকর্ম, সমাজসেবা, সামাজিক সম্পর্ক সবকিছুতেই ফেলছে ক্ষমতাচর্চার প্রভাব। রাজনীতি আর সমাজনীতি একে অপরের পরিপূরক হলেও রাজনীতি সমাজনীতির কাছে দায়বদ্ধ। তাই শুদ্ধ রাজনীতি যেমন সমাজের রক্ষক তার বিপরীতে দলগত ক্ষমতাচর্চা হয়ে উঠে সমাজ ভক্ষক। উপন্যাসের দৃশ্যপটে দেখা মিলে দলগত ক্ষমতাচর্চার প্রভাববলয় একটি অঞ্চলকে বীভৎসভাবে গিলে খাচ্ছে। যা বর্তমান দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রতিচ্ছবি।
“নারীই শ্রেষ্ঠ, নারীই উৎকৃষ্ট; পুরুষ তাহাদের ঘনিষ্ঠজন মনের মিলনে মিলিয়া থাকিলে, নর-নারী যুগের পর যুগ আপন। পুরুষই ছায়া, পুরুষই দয়া; নারী তাহাদের ফুলচন্দন মনের মিলনে মিলিয়া থাকিলে, নর-নারী যুগের পর যুগ আপন।”
এঙ্গেলস বলে,“অথনৈতিক কারণেই নিজেদের ভরণ পোষণের জন্যে, বিশেষকরে সন্তান-সন্তুতির ভবিষ্যৎ ভেবেই মহিলারা পুরুষদের দ্বিচারিতা বা বিশ্বাষঘাতকতা সহ্য করতে বাধ্য হয়।” এমন চিত্র যেমন সমাজে প্রতীয়মান। তার উল্টো ভালোবাসার জুড়ে টিকে থাকা অনেক সম্পর্ক আছে যেখানে এসব অর্থ, ভার সবকিছুর উর্ধ্বে থাকে প্রেম। সেঁজুতির সংসারে কী ছিল? সেঁজুতি চরিত্রটি বেশ ইন্টারেস্টিং। একজন নারীর কখনো হার না মানা জীবনযুদ্ধ। নারীর শরীর, যৌনতা তার নিজের জন্য নয়, বরং পুরুষের ভোগের বিষয় এটা অনেক সমাজের মানুষের চিন্তার রূপ। নারীকে পাদতলে রেখে ভোগ করাতেই তাদের বিজয়। ভোগের সুযোগ না পেলে নারীর প্রতি অপবাদের তীর ছুড়ে মারে, কুৎসা রটিয়ে বেড়ায়। কিছু অসাধু একটি সুন্দর পরিবার ভেঙে তছনছ করে দেয়। সেঁজুতি এবং প্রভাকরের সুখদুখ ভাগাভাগির সংসার ভেঙে তছনছ হয়ে যায় অপবাদের মুখে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অকৃত্রিম ভালোবাসা তাদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয় থমকে দাঁড়ানো এক মধ্যদুপুর!
২. রিঙ্গণপুর বাংলাদেশের দক্ষিণ সীমান্তবর্তী এলাকার এক অবহেলিত প্রত্যন্ত অঞ্চল। যেখানে অবস্থিত অলকানন্দা বাড়ি। আজাদ রেজওয়ান শহরের রাজনীতি ছেড়ে উঠেছে অলকানন্দা বাড়িতে, এই বাড়িটি আজাদের বাবার স্বপ্ন। “মাকে হারিয়েছি জীবনের এক ভুলে, বাবাকে হারিয়েছি মায়ের শোকে। রাজনীতি! রাজনীতি কেড়ে নিল মা।” রিঙ্গণপুরের এক কবরস্থানে বাবা-মা পাশাপাশি শুয়ে আছে। আজাদ কবরে গিয়ে কথা বলে মায়ের সাথে, বাবার সাথে।
আজাদ তখন এক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। বিদ্যালয়ে রাজনৈতিক দলের ক্ষমতাচর্চা দেখে আজাদ প্রতিবাদ করে। তখন রিঙ্গনপুরে ক্ষমতাসীন দল মহালপন্থী এবং বিরোধী দল দণিপন্থী। ক্ষমতার জোরে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে বিরোধীদলকে দমিয়ে চাপিয়ে রাখা হয়। প্রায় কোণঠাসা অবস্থা। স্কুলের সমস্যা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে একসময় ফের রাজনীতিতে জড়িয়ে যায় আজাদ। তখন তার সামনে রিঙ্গণপুরের সমস্যা তার সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। ‘একজন মানুষ তার চারপাশের মানুষ, জনজীবন ও স্থান নিয়ে চিন্তা করে তার পরিবেশের পরিধি ততটুকু। যে শুধু পরিবার নিয়ে চিন্তা করে তার পরিবেশ সেই পরিবার পর্যন্ত। যে পুরো দেশ নিয়ে চিন্তা করে তার পরিবেশ তখন পুরো দেশ নিয়ে গঠিত। এভাবে যে বিশ্ব নিয়ে চিন্তিত তার জন্য বিশ্ব নিয়ে তার এক পরিবেশ।’ আজাদের জন্য এখন রিঙ্গণপুর তার পরিবেশ। রিঙ্গণপুরের মানুষ, মানুষের জীবন, রাজনীতি, সংস্কৃতি, জনজীবনের সমস্যা ও সমাধান সব তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে যায়। এভাবে রাজনীতিতে জড়াতে জড়াতে আজাদ চিন্তা করে, “রাজনীতি! রাজনীতি কেড়ে নিয়েছে মা!”
দল, স্থানের যত ভিন্নতা থাকুক স্বপ্নের মিল দুই বিরোধী দলের নেতার মধ্যে গড়ে দেয় সখ্যতা। দু'জনের স্বপ্ন রিঙ্গণপুর। স্বপ্নের রিঙ্গণপুর সাজাতে দু'জনের একসাথে পথচলা শুরু হয়। সেই সাথে পরষ্পর বিরোধী দুই দলের পথচলা। রিঙ্গণপুরের মানুষদের হঠাৎ এই মিলন তাদের মাটির প্রতি প্রেম ভেসে উঠে। যেখানে বিশ্বাস, আলো, প্রেম, অহিংসা, ভরসার অবস্থান নিশ্চিত হয়; সেখানে অবিশ্বাস, অন্ধকার, ঘৃণা, হিংসা ও অনাস্থা অজান্তেই ভর করে বসে। সেটুকু ঘৃণা, অনাস্থা ও হিংসা টেনে দিতে চাই কালো দাগ।
“তোমার চেহারা নিয়ে অন্য একদিন বলব। —‘কী বলবেন! এক্ষুনি শুনতে চাই’, বায়না করে দূর্বা। ‘মুগ্ধতা’, ছোট্ট শব্দট��� আচমকা বলেই ফেললো আজাদ।” আজাদের প্রতি দূর্বার প্রেম না কি মোহ? আজাদের মনে দূর্বার প্রতি টান থাকে। দূর্বার পাগলামো মোহ না কি প্রেম? এই প্রশ্ন গভীর এক রহস্য।
বিরোধী দুই দলের এক হওয়ার কিছুদিনের মধ্যে নির্বাচন। মনোনয়ন পায় দু'দলের দুই তরুণ নেতা যাদের হাত ধরে এই একই লক্ষ্যের একতা। দুইজনই নির্বাচনে দাঁড়ায়। এরপরে আসে জয়। একদিকে বিজয় উল্লাস, অন্যদিকে রাজ্যের দুশ্চিন্তা! কেউ আপ্রাণ চেষ্টা করে গোপন সংবাদ শুনাতে, বিজয়ীকে রক্ষা করতে প্রাণপণ চেষ্টা। জয়ের মিছিল যায় বড় বাজারের দিকে। আনন্দ মিছিলের সম্মুখ থেকে গুলি ছুঁড়ে, সে গুলি বিজেতার বুকের বাম পাশে ছিদ্র করে ঢুকে যায়। উপস্থিত মৃত্যু নামে দুইজনের শরীরে।
দেড় বছর পরে ট্রেনে করে হিমানী জংশন হয়ে পা রাখে রিঙ্গণপুরে সে। প্রেমিক হৃদয় যখন প্রেমিকার প্রেমে সায় দেয় তখন প্রেম থেকে গেলেও অস্তিত্ব থাকে না। স্বপ্ন দেখা তরুণের মনে হয় “এই রিঙ্গণপুর অভিশপ্ত। সব সাধনার পূর্ণতা দিয়েও এই অভিশাপ মুছা যাবে না।” সে হারিয়ে যায় “আঁধারের আড়ালে, সকলের অগোচরে।”
কিছুদিন পরে নন্দী পাহাড়ের উপর থেকে ভেসে আসে আবারো তিন তিনবার গুলির শব্দ। ঠাস্! ঠাস্! ঠাস্! স্বপ্নের রিঙ্গণপুর!
৩. তকিব ভাইয়ের সাথে সেদিন দাঁড়িয়ে উনার লেখা অর্বাচীনের উপাখ্যান বই নিয়ে কথা হচ্ছিল। তকিব ভাই কথার এক ফাঁকে বলেছিলেন ‘তুমি রিঙ্গণপুর পড়ো’। তখন থেকেই পড়তে চাচ্ছিলাম রিঙ্গণপুর।
লেখকের লেখায় এটা আমার পড়া দ্বিতীয় বই, আমার প্রথম পড়া বই অর্বাচীনের উপাখ্যান। রিঙ্গণপুরের চিত্রপটের সাথে অর্বাচীনের উপাখ্যানে কিছু গল্পের দারুণ মিল রয়েছে। সেই যোগসূত্র রাজনীতি, সমাজ, প্রেম ও পরিবেশ ভর করে এসেছে দুই উদ্যানে।
রিঙ্গণপুর ভাবতেই সামনে এক ভূস্বর্গ ভেসে উঠে। পাহাড়, নদী, জংশন যে স্বপ্নের মতো সুন্দর প্রকৃতিতে ঘেরা চারপাশ। সেখানে আবার বিবিধ মানুষের মিলেমিশে থাকা। ভাবতেই আনন্দ লাগে। আবার যখন অলকানন্দা বাড়ি ভাবি মনে হয় ঋজ, লিলিয়া আমার সাথেও কথা বলছে। স্বপ্নের মতো সুন্দর এই সব কাহিনি।
গল্পের মাঝে কিছু কবিতা এনেছেন লেখক। সেগুলোতে আরেকটু সচেতন হওয়া উচিত ছিল।সুন্দরতা আরও ভালোমতো ফুটে উঠতো। গল্পের প্লট ও চিত্রপট ছিল চমৎকার। গল্প আমাকে এক বসাতেই শেষ করিয়েছে এই বই। হ্যাঁ, এটা এক বসাতেই শেষ করতে হয়েছে। ইফতার থেকে সাহরি পর্যন্ত পড়ে শেষ করা। যখন পড়ি মনে টান উত্তেজনা সামনে কী? তবে শেষে গিয়ে মনে এক আন্দোলন তৈরি হয়, আন্দোলন স্বপ্নের ঘোরে গল্পের খোঁজ করে।
প্রেম, রাজনীতি, সমাজনীতি, সামাজিক মিলমিশ, ফ্যাসাদ, নারী এবং স্বপ্ন নিয়ে স্বপ্নের মতো সুন্দর এক উপন্যাস রিঙ্গণপুর। রাজনৈতিক ক্ষমতাচর্চায় একটি রিঙ্গণপুরের উত্থান পতন। ▫ ▪বই: রিঙ্গণপুর ▪লেখক: Tokib Towfiq ▪ধরন: উপন্যাস ▪প্রকাশক: নালন্দা ▪মুদ্রিত মূল্য: ৳৩৫০ ◾ _______________ খোবাইব হামদান #পাঠপর্যালোচনা ১৯ বৈশাখ'২৯ | চাঁনখালী, চট্টগ্রাম