ভিয়েতনাম যুদ্ধের সাবেক সৈনিকের জবানবন্দির সাথে তথ্য হিসেবে যুক্ত হয়েছে ইরাকে লড়াইরত যোদ্ধার জার্নাল। আহত সৈনিকের গোঙানির সাথে মিশে আছে স্লোগানের শব্দ, কবিতাপাঠ ও ড্রামবিট। যুক্তরাষ্ট্রের নানা শহরের পারিপার্শ্বিকতায় উল্লিখিত হয়েছে আফগানিস্তান, ফিলিস্তিন ও ইরাকে ক্রমাগত বেধড়ক হামলায় খুন-জখম হওয়া মানুষের আহাজারির প্রসঙ্গ।
মঈনুস সুলতানের জন্ম ১৯৫৬ সালে, সিলেট জেলার ফুলবাড়ী গ্রামে। তাঁর পৈতৃক নিবাস মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলায়। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস থেকে আন্তর্জাতিক শিক্ষা বিষয়ে পিএইচডি। খণ্ডকালীন অধ্যাপক ছিলেন ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস এবং স্কুল অব হিউম্যান সার্ভিসেসের। ছিলেন ইউনিভার্সিটি অব সাউথ আফ্রিকার ভিজিটিং স্কলার। শিক্ষকতা, গবেষণা ও কনসালট্যান্সির কাজে বহু দেশ ভ্রমণ করেছেন। তাঁর ‘জিম্বাবুয়ে : বোবা পাথর সালানিনি’ গ্রন্থটি প্রথম আলো বর্ষসেরা বই হিসেবে পুরস্কৃত হয়। ২০১৪ সালে ভ্রমণসাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের জন্য পান বাংলা একাডেমি পুরস্কার। প্রাচীন মুদ্রা, সূচিশিল্প, পাণ্ডুলিপি, ফসিল ও পুরোনো মানচিত্র সংগ্রহের নেশা আছে মঈনুস সুলতানের।
ওয়েপনস অব ম্যাস ডেসট্র্যাকশনের বানোয়াট ইলজাম এনে বুশ প্রশাসন যখন ইরাক আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছিল তখন থেকে শুরু করে আগ্রাসনের গোটা সময়টায় মঈনুস সুলতান শামিল হয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত যুদ্ধবিরোধী সভা-সমাবেশ, প্রতিবাদী মিছিল, কবিতাপাঠ এবং আরও নানান কর্মকাণ্ডে। সংগ্রহ করেছেন প্রচুর তথ্য (তখনকার সময়ে মিডিয়াতে আসতে না দেওয়া গোপন সব তথ্যও)। যেসব থেকে যুদ্ধের নৃশংসতা ও ভয়াবহতার রক্ত হিম করা চিত্র পাওয়া যায়। বইটি পড়েই স্নায়ুর মধ্যে যে চাপ অনুভূত হয়েছে তাতে অবাক হই না এই ঘৃণ্যকর্মে বাধ্য হয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত যুদ্ধফেরত অনেক আমেরিকান সৈনিক আত্মহননের পথ বেছে নেওয়ায়। যুদ্ধের দরুন সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকট, যুদ্ধ বিষয়ে মার্কিন জনমত, নাহক এ যুদ্ধে নিহত বা মারাত্মকভাবে আহত সৈনিকদের আত্মীয়পরিজনের আহাজারি—মঈনুস সুলতান আলো ফেলেন সবদিকে। যেহেতু বিশ্ব মোড়লদের নাশকতা ও নির্মমতার এটাই প্রথম নিদর্শন নয়, ফলে প্রসঙ্গত আরও এসেছে, আমেরিকার মদদে ইসরায়েল কর্তৃক ফিলিস্তিনিদের ওপর নিগ্রহ এবং ২০০৬ সালে লেবাননে বেধড়ক বোমাবর্ষণ, ভিয়েতনাম যুদ্ধ, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ, প্রথম গালফ ওয়ার, এমনকি চেচেন যুদ্ধও। আছে ‘মর্ত্যের নরক’ বলে কুখ্যাত গুয়ানতানামো বে কারাগারের বন্দীদের ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার মর্মন্তুদ বর্ণনা।
মার্কিনীদের বড় একটি অংশ (প্রকৃত শিক্ষিত, ভালো-মন্দের সমঝদার, উগ্র জাতীয়তাবাদের বিষবাষ্প হতে মুক্ত, সংবেদনশীল মানুষজন) এ অন্যায় যুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। যুদ্ধের ফলে আমেরিকার অর্থনীতিতে ধস নেমেছিল। বেকার ও গৃহহীনের সংখ্যা বাড়ছিল হু হু করে। স্বাস্থ্য ও শিক্ষা—গুরুত্বপূর্ণ দুই খাতের বাজেট সংকুচিত হয়ে ক্রমশ বর্ধিত হচ্ছিল সামরিক বাজেট। নানাভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছিল নাগরিক অধিকার। বুশ সরকারের অপশাসনে ফুঁসছিল জনতা। কিন্তু কোনোভাবেই টনক নড়ছিল না হর্তাকর্তাদের। আশ্চর্য কী, শাসক কবে আর ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দেশ বা দেশের জনগণ কিংবা বৃহৎ অর্থে মানবকল্যাণের কথা ভেবেছে? শান্তিবাদী মানুষজনকে হতাশ করে পৃথিবীর কোথাও না কোথাও যুদ্ধ তাই চলতেই থাকে।
তামাম দুনিয়া চষে বেড়ানো মঈনুস সুলতানের লেখার মধ্যে আত্মগর্বী ব্যাপার-স্যাপার কখনো খুঁজে পাইনি। নেই বেহুদা জ্ঞান ফলানোর কোনো চেষ্টা। আন্দোলনে শরিক হয়েছেন বলে নিজেকে সাহসী জাহির করার প্রবণতা নেই বইয়ের কোথাও। বেকায়দায় পড়ে নিজের আশৈশব পুলিশভীতির কথা পাঠকদের কাছে স্বীকার করে নিয়ে পুলিশের হাত থেকে নিস্তার পেতে দ্রুত সটকে পড়ার কথা তিনি নিঃসংকোচে বলতে পারেন।
প্রকাশের দিক থেকে এটি সম্ভবত মঈনুস সুলতানের প্রথমদিকের বই। তাই তাঁর যে শ্রমলব্ধ পাঁচমিশালি গদ্যের আমি ভীষণ ভক্ত, তা এ বইয়ে পাওয়া যাবে কি না এ নিয়ে থোড়া সন্দিহান ছিলাম। পড়তে বসে দেখা গেল আমার এ সন্দেহ অমূলক। তবে লেখকের অন্যান্য বই যেভাবে গোগ্রাসে গিলি, শুরু করলে কখন শেষ হয় টেরই পাই না, এটার বেলায় এমন হয়নি। অনেকদিন লাগল পড়ে শেষ করতে। বারবার থামতে বাধ্য হচ্ছিলাম। কারণ, আমার বর্তমান মানসিক হালত একলগে এত এত বীভৎসতা নেওয়ার উপযোগী ছিল না। যুদ্ধের ভয়াবহতা বিবেচনায় ডক্টর সুলতানের অধিক আলোচিত ও সমাদৃত ‘কাবুলের ক্যারাভান সরাই’কেও ছাড়িয়ে গেছে ‘মৃত সৈনিকের জুতার নকশা’।
২০০১ এর টুইন টাওয়ার হামলার পর পর ইরাক ও আফগানিস্তানে আমেরিকান আগ্রাসনের সময়টাতে লেখক খুব কাছ থেকে দেখেছেন যে আমেরিকার সাধারন জনগনও এই যুদ্ধের বিপক্ষে। যুদ্ধ আমেরিকার অর্থনীতিকেও ধীরে ধীরে পংগু করে দিচ্ছিলো। সাধারন জনগণ তাই যুদ্ধের বিপক্ষে মিছিল স্লোগান আর প্ল্যাকার্ড হাতে রাস্তায় নেমে এসেছিলো। লেখকের নিজ চোখে দেখা সেইসব ছোট ছোট মিছিল আর আন্দোলনের স্মৃতিকথা নিয়ে এই বই। এইসব টুকরো টুকরো স্মৃতির ভীড়ে বিভিন্ন মানুষের কথায় উঠে এসেছে আফগানিস্তান আর ইরাকের মানুষের দু:খ দুর্দশা আর সংগ্রামের কথা। বরাবরের মত মঈনুস সুলতানের এই বইটাও ভালো লেগেছে।