গল্পগুলােতে লেখক বিষয়বস্তু, শব্দব্যঞ্জনা ও দৃশ্যপট বর্ণনার সমাহারে নির্মাণ করেন ত্রিমাত্রিক এক আরশি—যাতে প্রতিফলিত হয়, গ্রামীণ বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে ব্যতিক্রমী কতিপয় চরিত্র। প্রারম্ভে পাঠক পরিচিত হন শিক্ষা, সংস্কৃতি ও বিত্তে পরিশীলিত এক বয়ােবৃদ্ধের। সাথে—যিনি জরাজনিত কারণে অনুভব করেন, আত্মপ্রকাশে তাঁর অক্ষমতা। পরবর্তী কয়েকটি গল্পে মুক্তিযুদ্ধের দুর্যোগ-দীর্ণ পরিস্থিতিতে পল্লবিত হয় কিছু মানুষের আতঙ্ক ও সঠিক পথ অনুসন্ধানের প্রচেষ্টা। অন্য দুটি গল্পে প্রাধান্য পায়, একজন তস্করও শিশু লালন পালনের দায়িত্ব নিয়ে শিকড়চ্যুত এক আয়ার অন্তর্গত দ্বন্দ্ব ও দোলাচল। স্বল্প পরিসরে লেখক বয়ান করেন—গৃহহীন এক ফকির গােছের মানুষের সাথে পরিযায়ী পাখির নিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠার কাহিনি। দৃষ্টিহীনতায় ভােগা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আমলের এক সাবেক সৈনিকের দিনযাপনের বিবরণ পাঠকের মনে যুগপৎ জন্ম দেয় ঘৃণা ও সহানুভূতির। চলিষ্ণু জীবনের ঘাত-প্রতিঘাতে আত্মবিস্মৃত—এমনকি জন্মভূমির ঠিকানা ভুলে যাওয়া বা মমতাদর্শের সাবেক এক রাজনৈতিক কর্মী বা মানসিকভাবে বিপন্ন প্রাইমারি স্কুলের হেডমাস্টারের ঘটনাও পাঠককে সামগ্রিকভাবে মানবজীবনের পরিণতি সম্পর্কে সচেতন করে তুলে।
মঈনুস সুলতানের জন্ম ১৯৫৬ সালে, সিলেট জেলার ফুলবাড়ী গ্রামে। তাঁর পৈতৃক নিবাস মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলায়। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস থেকে আন্তর্জাতিক শিক্ষা বিষয়ে পিএইচডি। খণ্ডকালীন অধ্যাপক ছিলেন ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস এবং স্কুল অব হিউম্যান সার্ভিসেসের। ছিলেন ইউনিভার্সিটি অব সাউথ আফ্রিকার ভিজিটিং স্কলার। শিক্ষকতা, গবেষণা ও কনসালট্যান্সির কাজে বহু দেশ ভ্রমণ করেছেন। তাঁর ‘জিম্বাবুয়ে : বোবা পাথর সালানিনি’ গ্রন্থটি প্রথম আলো বর্ষসেরা বই হিসেবে পুরস্কৃত হয়। ২০১৪ সালে ভ্রমণসাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের জন্য পান বাংলা একাডেমি পুরস্কার। প্রাচীন মুদ্রা, সূচিশিল্প, পাণ্ডুলিপি, ফসিল ও পুরোনো মানচিত্র সংগ্রহের নেশা আছে মঈনুস সুলতানের।
প্রায় সবগুলো গল্পের প্রধান চরিত্রের মধ্যে অভিন্ন কিছু বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়। চরিত্রগুলো একা, বিচ্ছিন্ন, ভাবুক ও স্মৃতিকাতর এবং অনেকেই ঘর-পালানো ভবঘুরে। তাই বলে গল্পগুলো একঘেয়ে লাগে না। কারণ, তাদের প্রত্যেকের গল্প ভিন্ন। বেছে বেছে বৈশিষ্ট্যগত দিক থেকে একই রকমের মানুষদের হরেক কিসিমের গল্পগুলোকে যেন একই মলাটে বন্দি করা হয়েছে।
মঈনুস সুলতানের ফিকশন পড়া হলো এবারই প্রথম। এক জামানায় তিনি কবিতা ও গল্প লিখতেন এই তথ্য জানা এবং তাঁর ভ্রমণকাহিনী পড়া থাকায় ধারণা ছিল তিনি গল্প লিখবেন ভালো। ধারণা সত্যি প্রমাণ করল ‘আতই চোরার আতান্তর’। ‘কারাগার রবীন্দ্রসঙ্গীত ও রোগজীবাণু’ নামে লেখকের অন্য যে গল্পগ্রন্থটি আছে সেটিও বিলম্ব না করে পড়ে ফেলতে হবে।