সাধারণের তুচ্ছ জীবনের চারপাশেও চঞ্চলতা-ঔদাস্যের কত সমাহৃত দিনগুলি জমা হয়ে থাকে খুদকুড়োরই মতো। সেগুলো নিছক অনুস্মারক নয়, নয় অভিজ্ঞের ভূয়োদর্শন। এমনকী সবটা কারো একারও নয়। সেখানে আছে চারপাশের কত আয়োজন! তার মধ্যে থেকে যায় কত বিস্তৃত এই প্রাণবিশ্ব— থাকে কত মেঘের পরে মেঘ, কত রোদ, কত জলজ বাতাস, ‘দিন-রাত্তির’ আর ‘মোমবাতি’র উড়াল, পাকুড় গাছের ছায়া, পিটুলি গাছটিতে নাম না-জানা পাখিটির উল্লসিত ডাক, রূপেশ্বরী নদীটির বয়ে চলা।
লেখকের সাথে পূর্বপরিচয় ছিলো না।সম্পূর্ণ অচেনা এক মানুষের শৈশবের জীবন ও সময়, যা মূলত গত শতকের ষাট ও সত্তর দশক ঘিরে আবর্তিত, পড়ে আমি বেশ চমৎকৃত। সাধারণ স্বল্প আয়ের পরিবারের সন্তান ছিলেন দুর্লভ। অথচ মা দিদিদের রান্নাঘরে খাবারের আয়োজন ছিলো অফুরন্ত। দুর্লভ সেসব খাবারের জিভে জল এনে দেওয়া বর্ণনা দিয়েছেন।এতো "তুচ্ছ" খাবার এখন আর আমাদের পাতে ওঠে না। যেমন -
"রুটির সঙ্গে দেওয়া আলুর তরকারিতে মাঝে মাঝে অসামান্য বৈচিত্র্য আনা হতো-ঝিরি ঝিরি লম্বা করে কেটে ঐ একই মশলা দিয়ে রসা রসা করে চচ্চরি বানিয়ে। এই আলু-চচ্চরির বৈচিত্র্য দেখা যেত যেদিন বাটির মধ্যে অল্প তেল দিয়ে ঝিরি ঝিরি করে কাটা আলু ছেড়ে দিয়ে সামান্য হলুদ দিয়ে ঢিমে আঁচে বসিয়ে রাখা হতো। ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে সেই আলু সিদ্ধ হয়ে, রসা হয়ে হয়ে উঠত বাটি চচ্চরি। একই জিনিস কিন্তু স্বাদে-গন্ধে যোজন ফারাক যেন!"
দুর্লভ পরম ভাগ্যবান ছিলেন। তিনি এমন একটা স্কুলে পড়েছেন যার প্রধান শিক্ষক ছিলেন প্লেটোর রিপাবলিকের আদর্শে বিশ্বাসী।তাই ছাত্ররা শিক্ষকদের অধীনস্থ ছিলো না, ছিলো সমমর্যাদার মানুষ। লেখকের মুখেই শোনা যাক -
" আমাদের সেই রিপাবলিকটির অভ্যন্তরীণ আবহাওয়াটা ছিল অনেকটা এথেন্সেরই মতো। স্কুলের যে-কোনো অনুষ্ঠানের জন্য হেডস্যার স্যারেদের সঙ্গে আলোচনা করতেন, সেখানে উঁচু ক্লাসের ছেলেরাও ডাক পেত। ছেলেদের পরামর্শ গৃহীত হয়েছে-এমন উদাহরণ ছিল প্রচুর। সব ধরনের কমিটিতেই উঁচু ক্লাসের ছেলেদের স্থান ছিল পাকা। সারা বছর জুড়ে পাঠ্য-বহির্ভূত নানাবিধ বিষয়ের নিরন্তর চর্চার কারণে আমাদের ছেলেরা এক- একজন পুরাণ - ইতিহাস - রামায়ণ- মহাভারত - ও বিশ্বসাহিত্য সম্পর্কে দিগগজ হয়ে উঠেছিল, সেই সঙ্গে হয়ে উঠেছিল অতিশয় তার্কিক।স্যারেরা অবাধে দর্শন- শিল্পকলা-সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করায় রিপাবলিকটির ভেতরে সবসময় একটি স্মিত ও উত্তেজিত জ্ঞানচর্চার আবহাওয়া একেবারে 'উ-ম-মঝুম' করতো।" ভাবা যায় এখন এগুলো! ধীরে ধীরে গল্পে ঢুকে পড়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ। ছাত্ররা দলবেঁধে ঘুরে ঘুরে শরণার্থীদের জন্য টাকা জোগাড় করতো। এই বর্ণনা পড়লে মন আর্দ্র হয়। দুর্লভের গ্রামে বিচিত্র সব মানুষের পাশাপাশি আমরা দেখা পেয়ে যাই প্রণবদার।যিনি সুবোধ ঘোষের "শুন বরনারী " থেকে সরাসরি উঠে আসা বিরহী চরিত্র! এ বইটার আরো প্রচার পাওয়া উচিত।
'গাদা গাদা বই পড়লেই তো হবে না, জ্ঞানের সেরা কান্ডজ্ঞান। ঐটা থাকা চাই।'
আমার এই কান্ডজ্ঞানের অভাববোধ সব সময়। এছাড়াও লেখকের উল্লেখিত আহাম্মকের সকল বৈশিষ্ট্য নিজের মধ্যে খুজে পাই। এরপরও টুকটাক পড়াশোনা করে যদি সেই অমূল্য কান্ডজ্ঞানের অভাব কিছুটা হ্রাস করতে পারি সেই চেষ্টাই করি।
জীবন তো আমাদের একক নয়, অনেক মানুষের সমন্বয়েই গড়ে ওঠে একটা জীবন। সেই জীবনে মিশে থাকে কত মানুষের স্মৃতি, কত টুকরো টুকরো ঘটনা! কোন বিশেষ খাবারের স্মৃতিও কত আপন হয়ে ওঠে। স্কুলের শিক্ষকেরা, পাড়ার কাকারা, পাশের বাড়ির দিদিরা, কাছের মাঠটা, এলাকার কুকুরটা, নদীর পাড়টা-প্রতিটা জিনিসেরই রয়েছে জীবনে বিশেষ বিশেষ ভূমিকা।
আচ্ছা, সবাই কি খুব অসাধারণ মানুষ হয়? ভাবনায়, কর্মে কজন আর পারে পৃথিবীতে পাকাপাকি একটা ছাপ ফেলে যেতে? ক্লাসের প্রথম ছাত্রটা আর শেষ ছাত্রটাকে সবাই আলাদা করেই চেনে। আরো চেনে যেকোন বিষয়ে প্রথম কাউকে, কী গানে, কী নাচে, কী অভিনয়ে, কী খেলায়। কিন্তু বেশিরভাগই তো এমন যে অল্প অল্প পারে সব। পড়াশোনায় মাঝারি মানের, ক্রিকেটটাও মন্দ খেলে না, কোরাসে নামটা রাখতে হয়, আড্ডায় অবধারিত মুখ না কিন্তু থাকলে ভালো লাগে!
আহাম্মকের খুদকুড়োতে যেন লেখক জীবনের সেই সমস্ত টুকরো স্মৃতি জড়ো করে বলতে চেয়েছেন এক অনুপম জীবনকথা। যে জীবনের গল্প ঘুরেফিরে আমাদের সকলেরই। সেই সে মধ্যমেধার, মধ্যমানের হাজার হাজার লোকজন, যারা রোদ্দুর হতে চেয়ে হয়ে যায় নয়টা-পাঁচটা কলমপেশা কেরানী, তারাও তো কাটাতে পারে এক অসাধারণ শৈশব, এক ভূয়োদর্শি জীবন। কেবল আমরা কেউ সেই কথাগুলি শুনতে চাই না, কারণ সমস্ত আগ্রহ পুঞ্জীভূত আমাদের কেবল ওই বিখ্যাততেই।
আহাম্মকের খুদকুড়ো কেন পড়বেন পাঠক? সত্যি বলতে কী, না পড়লে আপনার পাঠকজীবন বৃথা হয়ে যাবে, বিষয়টি এমন নয়। কিন্তু পড়লে একটা সুন্দর স্মৃতির জন্ম নেবে, একটা সুন্দর সময় কাটবে, সাধারণ হয়েও অসাধারণ কিছু খাবারের গল্প মনকে আন্দোলিত করবে, আন্দোলিত করবে রিপাবলিক স্কুলের রুদ্র স্যার, পাড়ার ঘি এর ঘ্রাণ, শীতের সকাল আর সরস্বতী পুজোর স্মৃতি।
পুজোর মরশুমে পড়ার জন্য এর চেয়ে ভালো বই বোধহয় আর হতে পারে না! সৌজন্য চক্রবর্তী প্রচ্ছদটা করেছেন বেড়ে। দেখলেই হাতে নিয়ে পড়তে ইচ্ছে হয়। আত্মকথা হওয়া সত্ত্বেও কিন্তু লেখকের পরিচয় স্পষ্ট না। নিজেকে আহাম্মকের খোলসের আড়ালে রাখতেই বোধহয় ভালো লাগে তাঁর!
"মনে নেই? মণিবাবু স্যার একদিন ক্লাসে পড়াতে পড়াতে হঠাৎই জানালার বাইরে স্বপ্নিল চোখ মেলে উদাসীন গলায় বলেছিলেন— ‘সাহেব বাংলোর সামনে যে দেবদারু বীথি আছে, জ্যোৎস্না রাতে সেখানে একা একা হাঁটলে কবিতার জন্ম হবে। ' কিংবা ‘রূপেশ্বরী আনারখোলার কাছে যেখানে বড়ো একটা বাঁক নিয়ে হাঁটুরার দিকে চলে গেছে, শেষ বিকেলের রক্তাভ সোনালি আলোয় সেখানে গিয়ে দাঁড়ালে কবিতা অমনি ধরা দেবে। সেখানে দত্তচৌধুরীদের পূর্বপুরুষদের ‘কামরা।' বৃক্ষ-সজ্জিত বহু পুরোনো বাগান। সেখানে যখন থেকে থেকে ভেসে আসা কাঠচাঁপার গন্ধে চমকে উঠবে বাতাস - – তখন কবিতা এসে তোমার পাশে বসবে।'
মনে আবার নেই! স্যার মাঝে মাঝেই অমন স্বপ্নে চলে যেতেন"।
- কেউ যদি কথা না শোনে তাহলে মানুষ কীভাবে কথা বলবে? মনিবাবু স্যারের কথা অনুযায়ী _ কাগজে - কলমে । কলমের স্পর্শে ফুটে উঠবে কথার কারুমিতি !
লেখক আসলে কথার 'কারুমিতি'ই ফুটিয়ে তুলেছেন। অসাধারণ !!
দুর্লভ সূত্রধরের নাম আগে কখনও শুনি নাই। কিন্তু উনার আত্মজীবনী পড়ে ফেললাম। আত্মজীবনী বললে অবশ্য ভুল হবে, স্মৃতিচারণ বলাই সবচেয়ে ভাল। কী যে মায়া মায়া লেখা। খুব সামান্য ঘটনাকে অসামান্য করে তোলার দুর্লভ গুণ নিয়ে জন্মেছেন ভদ্রলোক। অথচ পুরো বইজুড়ে নিজেকে আহাম্মক হিসেবে উপস্থাপন করে গেছেন। লেখকের ছেলেবেলার ছোট ছোট ঘটনা, আশেপাশের পরিবেশ, মানুষ, রিপাবলিকে বিশ্বাসী স্কুল-মোটকথা জীবনে চলতে ফিরতে খুদকুঁড়োর মতো অতি সামান্য সামান্য বিষয় ভদ্রলোক রাজভোগের মত উপভোগ্য করে তুলে ধরেছেন আমাদের পাতে। অনেক দিন সময় নিয়ে পড়লাম, ভাল্লাগসে।
শুধুমাত্র বইয়ের নাম দেখেই কোনো বই পড়ার জন্য কখনো এত আগ্রহী হইনি আমি। আহাম্মকের খুদকুড়ো প্রকাশিত হয়েছিল বছর তিনেক আগে, সেই থেকেই বইটা পড়ার জন্য কৌতূহল তুঙ্গে ছিল। কিন্তু দুর্লভ সূত্রধর যেন তার নামের মতোই দুর্লভ হয়ে উঠলেন! আঁতিপাঁতি খুজেও তার সন্ধান পাচ্ছিলাম না কোথাও। এর মাঝে "অনন্যবর্তী" পড়া হয়ে গেলো, তবুও আহাম্মকের খুদকুড়ো চেখে দেখা হচ্ছিল না!
দুর্লভ সূত্রধর আগাগোড়া একজন অপরিচিত মানুষ আমার কাছে, তবুও তার শৈশবের স্মৃতিকথা পড়তে গিয়ে এতটা মুগ্ধ হব ভাবিনি। নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের সংগ্রামকে অন্য লেখকেরা গ্লোরিফাই করে দেখালেও দুর্লভ সাহেব এক দুর্লভ উপায়ে আটপৌরে গল্পচ্ছলে বলে গেলেন সেসব দিনের কিসসা-কাহিনি। সকাল বা বিকালের সাদামাটা নাশতার বর্ণনা, রাতের আধখানা ডিমের ঝোলের জন্য মরিয়া হয়ে থাকা কিছু মানুষের গল্পে আরোপিত কোনো করুণ রস নেই, নেই সংসারের ঘানিটানার কচকচানি। তবুও কী দারুণ মন নরম করে দেওয়া একটা লেখা!!
শৈশবের স্মৃতিকথা বলতে গিয়ে আর সবার মতো এখানেও এসেছে স্কুলের গল্প, কিন্তু এখানে কোনো আতিশয্য নেই, কোনো জোরজবরদস্তিমূলক হামবড়াই কাহিনি। সবটাই টলটলে স্বচ্ছ গল্প। সহজ গল্পগুলো সহজ করেই বলা!
অচেনা মানুষের স্মৃতিকথার আলাপে মনে পড়ে যায় মণীন্দ্র গুপ্তের "অক্ষয় মালবেরী" এর কথা। সেখানেও বিস্তারিতভাবে মুগ্ধ হয়েছিলাম, দুর্লভ সূত্রধরও মুগ্ধ করলেন, আমার প্রত্যাশা পূরণ করলেন। শুধুমাত্র লেখনীর জোরে অচেনা মানুষের সাদামাটা গল্পও আমাদের আপন হয়ে উঠতে পারে, নিজের গল্প হয়ে উঠতে পারে। আহাম্মকের খুদকুড়ো অনেকদিন মনে রাখার মতো।।
"ডুমাটোলার দাদু বলেছিলেন, 'বুঝলে দাদুভাই, এই জীবনটা ছাড়া জীবনে অপ্রয়োজনীয় বলে কিছু নেই। হমারা জীবন সির্ফ হমারা অকেলা নহি হ্যায়, সবারটা মিলিয়ে তবে আমাদের এক-একটা জীবন। তোমার জমানো খুদকুড়োর মধ্যে দেখবে আছে কত লোকের জীবনের দিনরাত, কিতনে লোগো কো জীবিত রহনা। কতজনের কত কথার কত শব্দ, দিল কী বাত, কতজনের কত গান, বুদ্ধি কী কিতনা সুগন্ধ, বিচারো কা হীরা-জহরৎ। সোচো দাদুভাই, ইয়ে কেবল আপকি চিজেঁ নহি হ্যায়---বলতে গেলে তোমারই নয়। তাই আলো-ভালোগুলোকে আগলে রেখো। যেদিন দেখা যাবে খুদকুড়োও নেই, ফুটন্ত ভাতের গন্ধ নেই কোথাও, সেদিন হয়তো এগুলোরই খোঁজ পড়বে। কোনোকিছু অপচয় করো না। ইয়াদ রাখনা, অপনে দিলমে কোই তরহা কোই অপেক্ষায়েঁ রাখা চলবে না। অর ফির ইসকে লিয়ে অপনে আপ মে কোই অভিমান নহি রাখনা চাহিয়ে।" -----
এভাবেই শুরু হচ্ছে 'আহাম্মকের খুদকুড়ো'র শুরুর কথা। লেখক যার নাম দিয়েছেন 'কথা: কিছু অনাবশ্যক'। সেই অনাবশ্যক কথার ধারা ধরে একে একে লেখক খুলে গেছেন তাঁর স্মৃতির প্যান্ডোরা বক্স। সে স্মৃতির ভীড়ে কখন যেন পাঠকও মিশে যাবে নিজের-ই অজান্তে। মনে হতে থাকবে - এ স্মৃতি শুধুমাত্র লেখকের-ই একান্ত যাপন নয়, এ-যাপন কোথাও যেন আমাদের মতো তুচ্ছ সাধারণ, যারা কিনা লেখকের মতোই 'ডিফার করার ঠেলা আছে জেনেও ফট করে ডিফার করে বসে, নিজের মতটা বলে বসে।--সকলের চক্ষুশূল হওয়ার ঠেলা সামলায়।'--- তেমন 'আহাম্মক'দেরও ফেলে আসা কোনো জীবনের টুকরো ছবি। 'পোড়ের ভাতে'র আখ্যান থেকে 'মা অন্নপূর্ণা' হয়ে 'রিপাবলিকের পাবলিকেরা', 'ক্ষয়িষ্ণু শীত-সকাল ও তেল-হলুদে স্নান' কিংবা রূপেশ্বরীর তীরে বিকেলের পড়ন্ত আলোয় 'বেদনার পরম গোপন কথাখানি' বুকে নিয়ে বসে থাকা কিশোরটির সাথে কোথাও যেন মিশে যাবে আমাদের কারুর কারুর চলমান জীবনের পিছুটান। আর এখানেই লেখকের ডুমাটোলার দাদুর কথাগুলো পাঠকের কাছেও একান্ত সত্য হয়ে উঠবে--- 'তোমার জমানো খুদকুড়োর মধ্যে দেখবে আছে কত লোকের জীবনের দিনরাত…'।
১৮৯ পাতার বইখানাকে লেখক ভাগ করেছেন একুশ খানা পর্বে। সেই পর্বে কখনো এসেছে জ্বরমুখে পোড়ের ভাতের স্বাদ, কখনো বা পিতলের নাগরা-জুতোর বিস্ময়। জলখাবারের সমারোহ অথবা নিখুঁত সুতার টানে আধখানা ডিম খাওয়ার নিত্য নৈমিত্তিক মধ্যবিত্ত যাপনের অভ্যেস পেরিয়ে গোটাগোটা দুটো ডিম খাওয়ার বিস্ময়। শ্রেণীর বিস্ময়। সরকারি স্কুলে সমাজের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ছাত্রের মাঝে উচ্চবিত্ত শ্রেণীর কোনো প্রতিনিধির বৈভবের বিচিত্র বিস্ময়, যে কিনা গোটা দুটো ডিম প্রাতঃরাশে পায়--- সেসব লেখকের স্মৃতির সীমানা ছাড়িয়ে আমাদেরকেও ছুঁয়ে যাবে। মা অন্নপূর্ণা আর দয়াবতী দিদিদের মুখে কখন যেন আমাদের ঘরের অন্নপূর্ণা কিংবা দয়াবতীদের আদল ফুটে উঠবে। আর স্মৃতি হাতড়ে লেখকের মতো আমরাও দুঃখু-দুঃখু মুখ করে ভাববো "---মায়েদের অনন্ত পরমায়ু পাওয়া দরকার---আমাদের সেদিনের বয়েসটা আর আজকের সক্ষমতাটুকু একসঙ্গে থাকলে কত যে ভালো হতো!' আমাদের মতো পাবলিকেরা, যারা কিনা ভাঙা ভাঙা দরজা, সংকীর্ণ অফিসঘর, দেওয়ালে দেওয়ালে পরীক্ষার টুকলিক্রিয়ার কালিমাসহ কোনো আদ্যিকালের পুরোনো ঘরে শিক্ষাজীবনের কয়েক ধাপ পেরিয়ে এসেছি, তাদের সাথে লেখকের 'রিপাবলিক ও তার পাবলিকেরা' অবলীলায় এসে জুড়ে যাবেন। 'রিপাবলিকের সাড়ে-সতেরো মজা' পেরোতে পেরোতে আমরা চলে যাব রিপাবলিকের দেওয়াল পত্রিকার অভিনব সব মণি-মুক্তোয় ভরা বিচিত্র ও মৌলিক রচনায়। স্কুলের প্রতি প্রেম নিবেদন করে চার চরণের পয়ার, মানিক্য'র 'পিঁপড়ে-পোষার উপকারিতা' নামক গূঢ় চিন্তার নিবন্ধ কিংবা ক্লাস নাইনের অমৃতের ইলিশ ও নারকেল নিয়ে সাড়া জাগানো নিবন্ধ 'ইলনারতত্ত্ব' আমাদের নির্মল আনন্দ দিয়ে যাবে। মাণিক্যকে শেষমেষ তার বন্ধুরা ডেঁয়ো পিঁপড়ের ঢিবিতে পাঠিয়েছিলো কিনা, কিংবা অমৃত ইলিশ নারকেল তত্ত্ব ভজনার জন্য রিপাবলিকের নানাবিধ গঞ্জনা পেরিয়ে শেষমেষ 'ইলিশ ও নারকেল সেলিব্রেশন' বন্ধ করেছিল কিনা, সেকথা লেখক আর সবিশেষ জানাননি। তবে এইসমস্ত মৌলিক ও বিচিত্র রচনার ফলে মাস্টারমশাইয়েরা যে আর দেওয়াল পত্রিকা নিয়ে খুব বেশী স্বস্তিতে থাকতে পারতেন না, একথা 'ইলনারতত্ত্বে'র শেষে লেখকের ভাষ্যেই জানতে পারি আমরা। প্লেটোর রিপাবলিকের মতোই লেখকের রিপাবলিকও ছিলো একটি আইডিয়াল কমনওয়েলথ বা আদর্শ রাষ্ট্র। সে রিপাবলিকের মাস্টারমশাইয়েরা ছিলেন নিজের নিজের ক্ষেত্রে স্বরাট-সম্রাট। ইস্কুলের মনোগ্রামে লেখা 'তমসো মা জ্যোতির্গময়' শ্লোকটির মতোই তাঁরা সেই রিপাবলিকের নাগরিকদের অন্ধকার থেকে আলোয় নিয়ে যাওয়ার ঐকান্তিক চেষ্টা করে যেতেন। শুধু পড়াশোনায়-ই নয়। জীবনের সর্বক্ষেত্রেই। "পরিস্থিতি আর যুদ্ধ-সময়" পর্বে যা আরোও স্পষ্টভাবে আমরা দেখতে পাব। লেখকের মুন্সিয়ানা এখানেই তিনি শুধু হাসি-মজাতেই রিপাবলিককে বেঁধে রাখেননি। বরং তার ফাঁকেই বলে গেছেন জীবনের গূঢ় কথাও। বোধের কথা। যেখানে ম্যাজিক লন্ঠনওয়ালা রহিমুদ্দি'র 'হিরণ্যকশিপু বধ' আর 'দুর্যোধনের ঊরুভঙ্গ" পালার প্রত্যেক দফা বর্ণনার পর শ্রোতাদের উচ্চকিত জয়ধ্বনি আমাদের মাঝে একটা যুগ বা সময়কে নির্মাণ করে দিয়ে যায়। যে সময়টা আজকের এই চুড়ান্ত মেরুকরণের সময় থেকে ছিলো অনেকটাই আলাদা। যেখানে রহিমুদ্দীদের অভিনব সুন্দর গলায় --
"কহ দামোদর, কৌরব ঈশ্বর ভীমে গদা প্রহারিল। ভীম মহাবল, হইয়া বিকল, যুদ্ধে হৈল অচেতন।।" ---- শুনে, কিংবা পটের গানের শিল্পীদের গানের শুরুতেই মহাদেবের ছবি মেলে ধরে বলা ----"শোনেন বাবুমশাইরা, শোনেন ছেলের দলেরা, কী করে মোরা পটুয়া হলাম শোনেন কান ভরিয়া।। মোরা ছিলাম বিশ্বকর্মার বংশ, আমাগের এক দাদামশায় করলেন তায় ধ্বংস।। মহাদেবের আজ্ঞা ছাড়াই মহাদেবের নাম রচেছিলেন কবি।। মহাদেবরে আতে দেখে ভয়ে সারা হলেন, রঙসুদ্দু তুলিখানি মুখে পুরে দিলেন।।মহাদেব তো রেগে আগুন---ক্যান নুকোলি তুলি, মুখে দিয়ে তুলিটারে সকড়ি করে দিলি।।এঁটো ঐ তুলি দিয়ে কী হবে তুই বল, এই নে তুই মোর সনে নুকোচুরির ফল।। এখন থিকে গুষ্টিসুদ্দু নি-জাত গণ্য হবি, নমাজ পড়বি মোচলমানের আর হিঁদুর গুণ গাবি।। ও বাবুমশাইয়েরা, সেই থিকে বিশ্বকর্মার আশীর্বাদে মোরা পালি মোচলমানের রীতি, ছবি আঁকি হিঁদু-দেবের আর গাই তাঁহাদের গীতি।। সেই থিকে মোরা হিঁদু-মোচল নই, ভাঙা-ঘরে এ দুই নিয়ে এক গরেতে রই।। রাম আর রহিম সব একই তো হলো, সবাই মিলে আল্লা-রসুল হরি হরি বলো।।"---- চমকপ্রদ জাতি বর্ণনা শুনে কেউ চোখ রাঙিয়ে মাথায় ফেট্টি বেঁধে তেড়ে আসতো না। বরং বড়ো স্নিগ্ধ আর নির্মল আনন্দে মানুষ সেসব উপভোগ করতো। রিপাবলিকের মাস্টারমশাইয়েরা পটের গানের শিল্পীদের ডেকে রিপাবলিকের ছাত্রদের শুনাতেন সেসব। তার সাথেই হয়তো এক সমতার বোধ ছড়িয়ে দিয়ে যেতেন উত্তরোতর প্রজন্মের মাঝে। এক আইডিয়াল কমনওয়েলথের স্বপ্নে বিভোর হয়েই হয়তো বা! দুটো সময়কে মেলাতে মেলাতে আমরা যারা 'আহাম্মক' তাদের গলার কাছটা কেন জানি না দলা পাকিয়ে উঠতে চাইবে!
একইভাবে আমরা 'পরিস্থিতি আর যুদ্ধসময়ে" পৌঁছাব। অধুনা বাংলাদেশ তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের শৃঙ্খল থেকে মুক্তির স্বপ্নে বিভোর। শেষদিকে ভারতও যুদ্ধে নামে। আমরা সেসব ইতিহাস জানি। কিন্তু সেসময়কার পরিস্থিতিতে এদেশের পূর্ব-বাংলা সীমান্ত ঘেষা মানুষেরা কেমনভাবে দেখেছিলেন সে সময়টাকে? রিপাবলিকের সেই যুদ্ধ বছরেই ক্লাস নাইনে উঠা দেবা'র মুখেই শোনা যাক সে ভাষ্য অথবা বোধ ---
"----আরে একটা দেশ লড়ছে মুক্তির জন্য, অপমান আর শোষণের হাত থেকে, অত্যাচারীদের নাগপাশ থেকে দেশটাকে স্বাধীন করার জন্য--- তাকে ঝামেলা বলবি! দেবা প্রায় শাসিয়ে ওঠে। সবুজ জমির উপর লাল গোলকের মধ্যে চ্যাপটা ম্যাপওয়ালা পতাকাটা আমরা প্রথম দেখি দেবারই হাতে।"
অথবা হেডমাস্টারমশাই যখন ইস্কুলে জরুরী সভা ডেকে ছাত্রদের গীতা-উপনিষদের শ্লোক টেনে বুঝান --- "এ-ও আসলে এক-ধরনের ধর্মযুদ্ধ। এই ধর্মযুদ্ধ কিন্তু ঠিক ক্রুসেড নয়। এ যুদ্ধ ধর্ম-সম্প্রদায়ের জন্য নয়---এ হলো বাঙালির জাতিসত্তা ও ভাষা-স্বাতন্ত্র্য রক্ষার লড়াই। আমাদের পাশের দেশটা অন্য দেশ হলেও তার মানুষগুলো আড়াই দশক আগেও আমাদেরই অংশ ছিলেন---এখনও তারা আমাদেরই লোক, আমাদের ভাষাতেই কথা বলেন---আমাদের মতো করেই খাওয়া-দাওয়া করেন, জীবনযাপন করেন। তাঁরা আজ আক্রান্ত। তাঁরা অনাচারী-অত্যাচারী-প্রজাপীড়ক-হানাদার রাজশক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করছেন। সেই কারণেই বিপন্ন সাধারণ মানুষেরা নিরাপত্তার সন্ধানে আমাদের দেশে এসেছেন। তাঁরা আমাদের অতিথি। এ যেন অত্যাচারীর বিনাশ আর সাধারণ-সাধুজনদের রক্ষার জন্য যুদ্ধ। এই পরিস্থিতিতে আমাদেরও কিছু করতে হবে, মানবধর্মের পক্ষে থাকতে হবে। এঁদের সকলকে যথাসাধ্য আতিথ্য দিতে হবে---যথা ধর্ম তথা জয়, জয় আমাদের হবেই।"--- পড়তে পড়তে চোখের সামনে দৃশ্যমান হয়ে উঠবে এনআরসি-ডিটেনশনক্যাম্প-ডি-ভোটার উত্তর অধুনা ভারতবর্ষ। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে বাঙালি শব্দের অর্থের বিনির্মাণ। আর বড় শূন্যতায় আমরা খুঁজে বেড়াবো রিপাবলিকের হেডমাস্টারমশাইয়ের মতো একজন মানুষকে। যিনি কিনা এইসময়ে এসে শুধু 'রিপাবলিকের পাবলিকদের'ই নয়, গোটা দেশের মানুষকে 'মানবধর্মের পক্ষে থাকার' পাঠ পড়িয়ে যাবেন। যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে রিপাবলিকের সম্মিলিত ছাত্রের প্রথম দিনের প্রেয়ার হলের মতোই গোটা দেশের মানুষকে শিখিয়ে যাবেন এই বীজমন্ত্র - "স্বাধীনতা বেঁচে থাকুক আমাদের ইচ্ছার মধ্যে।"
অথবা দেবা, 'পরিস্থিতি' সামলে উঠলে আমীরা নামক মেয়েটির তার দাদার সাথে নতুন দেশে ফিরে যাওয়া যার রোগাটে মুখে এঁকে দিয়েছিলো বিষাদের আল্পনা। বেজনা বিলের জলে সেই বেদনাহত কিশোরের ছায়ার মাঝেই একদিন শহর স্বাভাবিক হয়ে আসে। রিপাবলিক খুলে যায়। বরুণকে দুলিয়ে দিয়ে যায় বেতসলতা মেয়েটির নাকছাবির 'ছিলা-কাটা বিন্দু-পাথরের অরোরার ছটা'। যুদ্ধসময়ে রিপাবলিকের পাবলিকেরা দ্রুত বড়ো হয়ে ওঠে।
সেই বড়ো হওয়া সময়ে গিয়ে আমরা পাবো প্রণবদাকে। মায়েদের প্রণব, ঠাকুমা-দিদিদের পনা বা পোনু। বউদিদিদের প্রণব ঠাকুরপো। তাকেও আমরা একদিন খুঁজে পাবো দেবার-ই মতো বিষাদঘন মুখে প্রত্যেক বিকেলে ঘুড়ি উড়াতে। "নীল আকাশের মাঝে সাদা থোপা থোপা মেঘের পাশে উড়ছিল 'দিন-রাত্তির', শেষ বিকেলে প্রণবদা সাঁ সাঁ করে উড়িয়ে দিল 'মোমবাতি'। 'দিন-রাত্তির'ও জেতেনি, মোমবাতিও জেতেনি।"
হেরে যাওয়া প্রণবদার বিষাদ চোখের কাছে চিক-চিক করার মাঝেই আমরা দেখতে পাবো ছন্দিতাদের পাড়া ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যাওয়া। আর সে বিষাদগাঁথা বুকে নিয়ে এক আহাম্মককে, "যার সাদা-মাটা জীবনে পুঁজি-পাটা ছিল কম। তবু কী করে যেন ছন্দিতা নামের সেই মেঘদূতীর মুখে বাহ্যত ফুটে না-ওঠা দুঃখের রেখা সে পড়তে শিখেছিল। আ-কৈশোর ত্বকের ভেতরে সেই বালিকার মুকুল-মুকুল গন্ধকে লালন করেছিল--- নিজের তন্ত্রীতে তন্ত্রীতে ঝিম্-ধরানো নৃত্যের ছন্দকে অভিযোজিত করেছিল সে। সেই ছেলেটিই একমাত্র বুঝতে পেরেছিল---'বেদনার পরম গোপন কথাখানি'--- যে কথা কাউকে বলা যায় না, কারোর সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া যায় না।" গোপন দুঃখ বুকে নিয়ে সে কিশোরকে তার পরবর্তীতে আমরা দেখতে পাবো রূপেশ্বরী নদীর পাড়ে। এপার ওপারের পারাপার দেখতে দেখতে, শ্যাম ঘোষের অপূর্ণ জীবন বয়ে চলার মাঝে দরদ ঝরে পড়া কণ্ঠে --- "ও আধে গো/চইলা গেলি কেনে?/মোরে ফেইলা কুথায় গেলি?/কোন্ সুখেরই টানে/চইলা গেলি কেনে?" শুনতে শুনতে আহাম্মকটাও অস্ফুটে বলে উঠবে ---'আমি তো ছিলামই, আমি তো আছিই, আমি তো থাকছিই!' আর এভাবেই নিজের নিজের রূপেশ্বরীর জলে সমস্ত দুঃখ ভাসিয়ে পাঠকও সেই ডুমাটোলার দাদুর কথা-র মতো - 'আলো-ভালোগুলোকে আগলে রাখতে' আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসবে। গলার কাছটার ব্যথা অথবা চোখের কোনের চিক-চিক নিয়েই।
স্বর্ণের দোকানের আশেপাশে কিছু লোক ঝাড়ু দিয়ে আবর্জনা সংগ্রহ করে, তারপর সেগুলো পুড়িয়ে ছেকে বের করে আনে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বর্ণের কণা । লেখক যেগুলোকে খুদকুড়ো বলেছেন সেগুলা এই ছাইয়ে পাওয়া স্বর্ণকণা মনে হয়েছে। গ্রামের শৈশব আর কৈশোরের এত চমৎকার বর্ণ্না এই শহুরে পাঠকের মনে যে কিছুটা ঈর্ষার সঞ্চার করেছে তা বলাই বাহুল্য। লেখক যে বিষয়টিকেই নিয়ে লিখেছেন তা এমনভাবে তুলে ধরেছেন যাতে কোন স্বর্ণকণিকায় বাদ পড়তে না পারে। কয়েকবছর আগে জাপানি বই "তেত্তোচান" পড়ে মনে হয়েছিল ঈশ যদি এমন একটা বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে পড়ালেখা শুরু করতে পারতাম। এই বইটি পড়ে আবার সে অনুভুতি হচ্ছে । ইশ!! আমাদের হাইস্কুলগুলোও যদি সে "রিপাবলিক" এর মতো হত। লেখকের রিপাবলিক এর স্যারদের এমন ব্যক্তিত্ব আজকাল গল্প উপন্যাসেও দূর্লভ হয়ে উঠেছে। যার ফলাফল আমরা দেখতে পাচ্ছি শিক্ষাব্যবস্থা , সর্বোপরি নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অধঃপতনের মধ্য দিয়ে। আবার আমাদের বর্তমান মা-রাও অন্নপূর্ণা হয়ে উঠতে পারছেন না।তাই হতদরিদ্র থেকে কোটিপতি সবার ঘরেই সদা-অভাব । তাই মায়েদের সন্তানরাও "মানুষ" হয়ে উঠতে পারছে না। মোটের উপর লেখকের সাথে নিজেদের শৈশব কৈশরে�� তুলনা করতে গেলে দীর্ঘশ্বাসের প্যারেড বয়ে যাবে। সাদামাটা অনাড়ম্বর জীবনও কত রঙিন , কত জমকালো হতে পারে এ বই-ই তার প্রমাণ।
কে জানে , হয়ত আমরা যে শৈশব নিয়ে আফসোস করছি, আমাদের পরের কোন এক জেনারেশন এসে আমাদের বলবে, আপনারাই ভাগ্যবান, আপনারাই আসল শৈশব কাটিয়েছেন ,আমরা তো কিছুই পেলাম না। শৈশব - কৈশোরগুলো থেকে এভাবে ক্রমাগত আনন্দ হারাচ্ছে কেন??
৫-৬ দশক আগেকার এক মফস্বল শহরের মাঝে বেড়ে ওঠা দুর্লভ সূত্রধর আমাদের নিয়ে যান তার রিপাবলিকে, সরস্বতীপূজায় কিংবা সকালের জলখাবারের পাতে। ইচ্ছা হয় আর যেদিন জ্বর হয়ে ছেড়ে যাবে সেদিন যেন একটু পোড়ের ভাত খেতে পাই।
বইটার ফ্ল্যাপের লেখা দেখে আর অনেক পজিটিভ রিভিউ দেখে গায়ে লেখা দামের চেয়ে ডাবল দামে রকমারি থেকে কিনলাম। কারণ ওপাড়ের বই বাজারে পাওয়াটা দূর্লভ। এ কারণে বইটা নিয়ে আমার প্রত্যাশা ছিলো তুঙ্গে। বইটাতে মূলত যা যা পেলাম তা হলো লেখকের নিজের শৈশব, কৈশোরের গল্প, শৈশবে খাওয়া বিভিন্ন খাবারের বর্ণনা, ইস্কুলের সবিস্তারে বর্ণনা যে কি করতেন না করতেন সেসব, স্যারদের গল্প, মুক্তিযুদ্ধের সময়ে নিজের গ্রামের পরিস্থিতি, আশেপাশের কিছু মানুষের বর্ণনা, বিভিন্ন অনুষ্ঠান বা পূজায় কি করতেন তার বর্ণনা, কিভাবে কি কি বই পড়তেন সেসব এবং শেষে এসে রূপেশ্বরী নদীড় পাড়। সঅব মিলিয়ে পড়তে খারাপ লেগেছে তা বলার সুযোগ নেই। কিন্তু মন তৃপ্ত হচ্ছিল না পড়ে। কিজানি!! হয়তো আমার এক্সপেকটেশন এর জন্যই এমন হচ্ছিল। বইতে কি পাবো আশা করেছিলাম ঠিক জানি না!! সম্ভবত আরো গভীর জীবনবোধ নিয়ে লেখা আশা করেছিলাম।
টুকরো টাকরা জীবন, যাদের নাম দিই খুদকুড়ো ------------------------------
ইদানিং কি বড্ড বেশি স্মৃতিকথা ছাপার অক্ষরে? ইদানিং কি বড্ড বেশি মুড়ে ফেলার চেষ্টা আমাদেরকে নস্টালজিয়ায়? এই সন্দেহ মনে আসতে আসতেই খেয়াল করা যাচ্ছে, বইটা অর্ধেকেরও বেশি শেষ হয়ে গেছে। জ্বরো রুগীর ভাত, ভাই-বোনদের খুনসুটি, মায়ের হলুদ আঁচল কিংবা মাথার উপর বাবার ছায়া নিয়ে কখন যেন অন্য একটা দুনিয়ায় নিয়ে গেছে আমাদের এই বই। নিয়ে গেছে ধুলো-ময়লার স্কুল আর তার কাঠের বেঞ্চ কিংবা চক-ডাস্টারের আজীবন গল্প-বলা, গল্প-ভোলা যার সঙ্গে, সেই ব্ল্যাকবোর্ডের কাছে। ঠিক যখনই মনে হচ্ছে এত খাবার গল্প কেন, তার ঠিক পরেই এসে পড়ছে অবধারিত ভাবে মায়ের কথা। এবং এসে পড়ছে মধ্যবিত্ত সরস্বতী পুজো, ন্যাড়াপোড়া, দোল উৎসব, কিংবা ঝুলন সাজানো। এবং এই সবই যেন থেকে যাচ্ছে একটা জীবনের থেকে চলকে পড়া নিতান্তই সাধারণ কিছু খুদকুড়ো হিসেবে।
ইদানিং বই পড়া সম্পর্কে আরো একটা কথা শোনা যায় বড় বেশি, 'লেখাটা ভাবালো'। কিন্তু বলতে দ্বিধা নেই, এই বই খুব বেশি ভাবায় না আমাদের। বরং প্রায় ফাঁকা মাথায় বয়ে যায় শ্রাবণের বিকেলের বাতাসের মতো।
এবং এসব কিছুর সঙ্গে বড় হওয়ার মধ্যেই হুশ করে কখন যেন এসে যায় একটা মুক্তির যুদ্ধ! ইতিউতি জেগে ওঠে সবুজ রঙের উপর লাল একটা গোলক। শরণার্থী শিবির। কৌটো নাড়িয়ে চাঁদা তোলা। একটা দেশ বুঝি সত্যিই এত ভাবে আরেকটা দেশের জন্য? আর ঠিক তখনই এক ঝটকায় খানখান হয়ে যায় 'দেশ' নামের ভূগোলটার সামগ্রিক ধারণা-- পূব বাংলাই বলো, কিংবা পূব পাকিস্তান বা এখনকার মতো বাংলাদেশ, সেই সবই তো আমাদের সেই একখানা মাত্র দ্যাশ... 'যাইর নাম চালভাজা তাইর নামই মুড়ি'। তবু হাজার মনে ভাঙচুর হলেও, শহরে মিছিল বেরনো থামে না।
এদিকে কে কাকে পছন্দ করে যেন? তার মুখের আদলেই তৈরি করে ফেলে সে দুর্গা ঠাকুরের মুখ। আর একটা আকাশ জুড়ে পেটকাটি চাঁদিয়াল নয়, বরং আরও বেশি বেশি উড়তে থাকে মোমবাতি। কার লাটাই যে কার হাতে থাকে!
আর এইসব খুদকুড়ো নিয়ে বইটার সঙ্গেই আমাদের বসে পড়তে ইচ্ছে হয় রূপকথার মতো এক নদী রূপেশ্বরীর ঘাটে। খানিকটা এই আড্ডা বাদ দিয়ে, আর তো কিছু দেওয়া-নেওয়ার কথা ছিলই না আমাদের আদতে।
বইটিতে সবচেয়ে বেশী ভালো লেগেছে তথ্যগুলো। শৈশবের স্মৃতি থেকে এত বিশদ বিবরণ খুবই প্রশংসনীয়। আমাদের সবারই এমন কিছু কিছু স্মৃতি থাকে যা আমরা মনে রাখতে পারি শুধুমাত্র তাদের বিচিত্রতার জন্যে। যেমন লেখকের ক্ষেত্রে সেটি হবে শৈশবে কোনো এক প্রানীর কামড় খাওয়া। যদিও তার স্মৃতি তাকে কোন প্রানী কামড়িয়েছিলো তা মনে রাখতে দেয়নি। তবুও, দৈনন্দিন জীবনের যাবতীয় জিনিসপত্র মনে রাখতে পারাটা বিস্ময়কর। খাবারদাবার নিয়ে লেখকের আলাদাই একটা নস্টালজিয়া বিদ্যমান। আর্থিক অবস্থার দরূণ বিলাসিতা না থাকলেও বৈচিত্রের প্রাচুর্য ছিল। আর খাবারের স্বাদের বিবরণী এত নিঁখুত যে পড়লেই স্বাদ উপলব্ধি করা সম্ভব। আরেকটা আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে তার স্কুলকে “রিপাবলিক” হিসেবে সম্বোধন করা। আমার কাছে এটা নতুন কারণ আজীবন স্কুল কলেজকে “গুলাগ”-এর সাথে তুলনা করে এসেছি। পরে অবশ্য বুঝা গিয়েছে কেন লেখকের কাছে তার স্কুল “রিপাবলিক” ছিল, “গুলাগ” নয়। প্লেটোর সমসাময়িক রিপাবলিকের মতোনই পন্ডিতদের দ্বারা পরিচালিত। বন্ধুসুলভ হলেও তারা খুবই সম্মানীয়। সুখ্যাতি না থাকলেও তার স্কুলের অনুষ্ঠানগুলো নিয়ে তাদের মাঝে একটা ন্যাশনালিস্টিক প্রাইড ছিল। এছাড়াও মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে এবং রিপাবলিকের তখনো জন্ম না হওয়া বাংলাদেশকে সমর্থন জানানো পাঠকের মনে দাগ কাটতে সক্ষম। সামগ্রিকভাবে, বইটি পড়া একটি আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতা ছিল।
২০২৩ এর একদম শেষের দিকে শুরু করেছিলাম দুর্লভ সূত্রধরের স্মৃতিগদ্যের বই আহাম্মকের খুদকুড়ো। কিছু কিছু বই আছে যেসকল বই তাড়াতাড়ি পড়া যায়না বা ইচ্ছাও করে না। এই স্মৃতিগদ্য এর বইটিও সেইরকম। ১৮৯ পাতার বই কিন্তু পড়তে সময় লাগলো প্রায় ২০ দিন। আসলে পাতায় পাতায় লেখকের নিজের স্মৃতির সঙ্গে প্রায় মিলে যাচ্ছিল আমাদের বড়ো হয়ে ওঠার সময়টা। আর নস্টালজিয়া বড়ো বাজে জিনিষ একবার অনুভূত হতে শুরু করলে দিন সময় কাল সব বয়ে চলে যায়। বইটির প্রচ্ছদটিও দারুন, এক পলকে মনের মধ্যে একটা প্রশ্ন জেগে ওঠে আর ব্লার্বের লেখা সেই প্রশ্নের পালে হাওয়া দিয়ে বইটি কিনতে আপনাকে বাধ্য করবে। ধন্যবাদ লেখক এবং সুপ্রকাশ প্রকাশনী কে এত সুন্দর একটি বই উপহারের জন্য।
পটভূমি -
জীবন তো আমাদের একক নয়, অনেক মানুষের সমন্বয়ে, অনেক মানুষের ঘটনা, গল্প, স্মৃতি এইসব নিয়েই গড়ে ওঠে একটা জীবন। লেখক নিজের জীবনের প্��ান্ডোরার বক্স খুলে বসেছেন এই গল্পে কি নেই সেখানে কত স্মৃতি, টুকরো টুকরো ঘটনা কোনো বিশেষ খাবারের গন্ধ, স্কুলের শিক্ষক, নিজের দিদিরা, মা, পাড়ার বন্ধুরা, নিজেদের স্কুল, মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশ থেকে আগত অতিথি তাদের জীবন আর জীবনের গল্প। মধ্যমেধার, মধ্যমানের হাজার হাজার মানুষকে সমাজ এর লোকজন সবাই ভুলে যায়। ভাবনায় কর্মে এই মধ্যমেধার মানুষেরা সমাজে হয়তো ছাপ ফেলতে পারে না। কিন্তু এদেরই সংখ্যা পৃথিবীতে বেশি অনেক বেশি। এর সব কাজেই থাকে সব কাজ পারে কিন্তু বিশেষ ভাবে কোনো কিছুই এদের আয়ত্তে নেই। পড়াশোনায় মাঝারি মানের, ক্রিকেটটাও মন্দ খেলে না, আড্ডা মারাতেও এর নিয়মিত মুখ হয়েও আচরণে অনিয়মিত। লেখক এই মধ্যমেধা পাবলিকের কথাই তুলে ধরেছেন নিজের লেখায়। লেখকের পরিচিতি বইতে কোথাও নেই কিন্তু লেখা দেখে ধরে নেওয়া যেতে লেখকও এই মধ্য মেধার মধ্যেই একজন। লেখক যে জীবনের কথা বলতে চেয়েছেন তার অধিকাংশ জুড়েই আছে এই মানুষদের ভিড়। তারা চেয়েছিল জীবনে হয়তো কিছু করে দেখাবে কিন্তু হয়ে গেছেন একজন কেরানি বা নটা পাঁচটার চাকুরীজীবী। কিন্তু এদের শৈশব, এমনতো হতেই পারে এদের শৈশব ছিল অসাধারণ, মূল্যবোধে ভরপুর, ঘটনার ঘনঘটা আর জীবনের অভিজ্ঞতায় ভরপুর। কিন্তু এদের কথা মানুষ শুনবে কেনো, এরা তো কোনোদিন ফার্স্ট হয়নি বা বিখ্যাত হয়নি এর হলো ভিড়। এদের জীবনের অভিজ্ঞতাই লেখক তুলে ধরেছেন এই বইতে।
পাঠ প্রতিক্রিয়া -
এই বই যদি না পড়ে থাকেন তাহলে যে বিশাল একটি সাহিত্যকর্ম থেকে নিজেকে বঞ্চিত রেখেছেন তা কিন্তু না। এই লেখা আপনাকে নিয়ে যাবে সেই ছোটবেলায় যেখানে সরস্বতী পুজো পাড়া বেড়ানো ছিল, দোল এর দিন সকালবেলা বন্ধুদের সাথে পাড়া বেরোনো ছিল, ন্যাড়াপোরা ছিল আর ছিল কিছু অসাধারণ খাবার। যে খাবারের ঘ্রান এখনও পাওয়া যায়। আর তার সাথে ছিল রিপাবলিকের মত স্কুল আর কিছু বন্ধু, যারা সারাজীবনের। আমরা যারা নব্বই দশকে বেড়ে উঠেছি তাদের কাছে এই বই স্মৃতি রোমন্থনের একটা মাধ্যম। পূজাবার্ষিকী পড়ার যে কত ধূম ছিল সেই সময়ে, আমি নিজে দুটো লাইব্রেরির সদস্য ছিলাম, ঝুলন সাজান ছিল নিজেদের শিল্পকর্মের নিদর্শন। এই বইটি পড়তে পড়তে এই সকল স্মৃতিগুলোই ভেসে উঠছিল চোখের সামনে। আত্মকথা হওয়া সত্ত্বেও কিন্তু লেখকের পরিচয় স্পষ্ট না। নিজেকে আহাম্মকের খোলসের আড়ালে রাখতেই বোধহয় ভালো লাগে তাঁর! এই বই পড়ুন হারিয়ে যান সেই ফেলে আসা দিনগুলোতে যেখানে আমরা হয়তো বারবার ফিরে যেতে চাই কিন্তু পারে উঠি না।
এক কথায়-আহাম্মকের শক্তিশালী জীবনী। যা শৈশব, ছাত্রজীবন এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে লেখকের চিন্তা ও অনুভূতির চিত্র তুলে ধরে। লেখক সমাজ ও দেশ সম্পর্কে গভীর দৃষ্টিভঙ্গি ব্যক্ত করেছেন, বিশেষ করে ৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের সময় ওপারের স্কুল ছাত্রদের মানবিক দায়িত্বের প্রসঙ্গে। বইটি শিক্ষার গুরুত্ব, ভালো শিক্ষকের প্রভাব এবং গ্রাম্য জীবন নিয়ে এক অন্তরঙ্গ আলোচনা। লেখক- জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত সোজাসাপটা, কিন্তু প্রাণবন্ত ভাষায় তুলে ধরেছেন। বইয়ের প্রতি ভালোবাসা এবং তার মানসিক বিকাশের প্রক্রিয়া পরিষ্কারভাবে ফুটে উঠেছে।
দূর্লভ সূত্রধর সুলেখক, সন্দেহাতীতভাবেই। লিখেছেনও অনেক ভালোবাসা, স্নেহ নিয়ে ফলে বইটা হয়েছে অত্যন্ত সুপাঠ্য।
ছেলেবেলার স্মৃতির মাঝে সব মানুষই এক নিষ্পাপ সারল্য খুঁজে পায়, দূর্লভবাবুও তার ব্যতিক্রম নন। বইয়ের হাইলাইট হচ্ছে চমৎকার একটি স্কুল ও তার শিক্ষকদের বর্ণনা, লেখকের সৌভাগ্য বটে এত চমৎকার ইশকুলে, চমৎকার সব শিক্ষকের সান্নিধ্য পাবার সৌভাগ্য তার হয়েছিল।