মা গান শেখাতেন। ছোটোবেলা থেকে গান শোনার অভ্যাস। তারই সঙ্গে অভ্যাস ওই মিঠে বুলিটাও শোনার— যা গলার আড়ালে থাকলেও থেকেই যায়। নিজে শিখিনি, শিখতে পারিনি। কিন্তু তবলা নামক বাদ্যযন্ত্রটি যে মোটেই ফেলনা নয়, তা উস্তাদ আল্লা রাখা থেকে জাকির হোসেন, শুভঙ্কর ব্যানার্জি থেকে বিক্রম ঘোষ— এঁরা বারবার প্রমাণ করে দিয়েছেন। কিন্তু সেই বাদ্যযন্ত্রের সূত্র ধরে যে এমন এক অসামান্য সুন্দর, একইসঙ্গে প্রবল ভয় এবং প্রবলতর মুগ্ধতা-উদ্রেককারী উপন্যাস লেখা যায়, এ আমার ধারণার বাইরে ছিল। এই উপন্যাস আদতে প্রবাদপ্রতিম তবলা-বাদক পণ্ডিত নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ সোমের সাধনা, প্রাপ্তি, অজস্র বেদনার আগুনে শুদ্ধ হয়ে প্রকৃত 'তালভৈরব' হয়ে ওঠার কাহিনি। তারই সূত্রে আমরা জেনেছি তবলার নানা ঘরানার ইতিহাস। তাল এবং তাকে ফুটিয়ে তোলার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নানা তত্ত্ব, কিংবদন্তি, আখ্যান এসেছে কাহিনিরই সূত্রে। সর্বোপরি এতে আমরা পেয়েছি ভালো-মন্দ মেশানো অসামান্য একঝাঁক নারীকে— যাঁরা কখনও যোগিনী হয়ে পণ্ডিত সোমকে দিয়েছেন আলোর সন্ধান, আবার কখনও তাঁদের আগুনের ফুলকি তাঁকে ঝলসে চালিত করেছে অন্য এক পথে। ঘরানা চিহ্নিত করতে হলে এই উপন্যাসকে 'হরর' বা 'ভয়াল'-ই বলতে হবে। কিন্তু বাজারি হরর বা তথাকথিত তান্ত্রিক থ্রিলারের মতো এতে গাঁজাখুরি বর্ণনার প্রাদুর্ভাব ঘটেনি। বরং লেখক অত্যন্ত সংযমের পরিচয় দিয়ে, রীতিমতো সুললিত ভাষায় সেই ভয়ালরসকে উপস্থাপিত করেছেন। তা পড়তে গিয়ে গায়ে কাঁটা দিয়েছে, রোমাঞ্চ নামক বিস্মৃতপ্রায় অনুভূতিটির পুনরুত্থান ঘটেছে মনের মাঝে। সবচেয়ে বড়ো কথা কী জানেন? এই বই পড়তে-পড়তে আপনার ক্রমাগত মনে হবে, আপনি যেন তবলার বাদন শুনতে পাচ্ছেন। আদিম ও বিশাল কোনো মহাদ্রুমের মতো সেই বাজনা আচ্ছন্ন করে ফেলছে আপনার মনোজগৎ। সত্যজিতের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষ্যে তাঁর সৃষ্ট একটি চরিত্রের উদ্দেশে সযত্নে, সসম্মানে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করেছেন লেখক। তবে সেটুকু না থাকলেও কোনো ক্ষতি হত না। তবলা এবং সঙ্গীতের সাধনা নিয়ে এমন এক দুর্ধর্ষ, সরস, গতিময় এবং সজীব আখ্যান রচনার জন্যই লেখক আমাদের সবার আভূমি সেলামের পাত্র হয়ে থাকতেন, থাকবেনও। বইটি অত্যন্ত সুন্দর ছাপা, লে-আউট, শুদ্ধ বানানে শোভিত। হার্ডকভার বইয়ের এত যৌক্তিক মূল্য-নির্ধারণের জন্যও প্রকাশক আলাদাভাবে প্রশংসা পাবেন। সঙ্গীত এবং/অথবা বাদ্যযন্ত্রের অনুরাগীরা এই বইটিকে অবশ্যই পড়ে দেখুন। ভালো লাগবে বলেই আমার বিশ্বাস। আর গলন্ত লাশ, জ্বলন্ত চিতা, কড়মড় করে চিবন্ত খুলি দেখে যাঁদের শিরা-ধমনীতে রক্ত ফুটন্ত হয়ে উঠেছে, তাঁরাও অবিলম্বে এই বইটি সংগ্রহ করুন ও পড়ুন। ভয়ালরস যে কতটা শোভন অথচ সূচিমুখ হতে পারে, তারও সার্থক নিদর্শন এই বইটি। অলমিতি।
এই শীতে রোমাঞ্চকর ভৌতিক উপন্যাস পড়তে কার না ভালো লাগে, তাও আবার রাতের বেলায় পড়তে পড়তে যদি শিহরণ জাগানো ভৌতিক আবহাওয়া তৈরী হয় উফ্ ভাবা যায়। তন্ত্র সাধনার গুপ্ত জগত, কাপালিকদের জীবন এবং প্রাচীন কোনো ভৈরব মূর্তিকে কেন্দ্র করে দানা বাঁধা রহস্য। গল্পের ছত্রে ছত্রে পাহাড়ের নিস্তব্ধতা, ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক এবং এক অশরীরী উপস্থিতির রোমাঞ্চকর বর্ণনা এক কথায় মারাত্মক হয়েছে । সাথে লেখক যেভাবে তন্ত্রের জটিল ক্রিয়াকলাপের সাথে রহস্যের মিশেল ঘটিয়েছেন, তা পাঠককে শেষ পর্যন্ত ধরে রাখতে সক্ষম; আমার মত যারা তারানাথ তান্ত্রিকের ফ্যান তারা এই উপন্যাসটি পড়তে পারেন নিরাশ হবেন না। #তালভৈরব #ভৌতিক
প্রথমেই বলি, আপনি যদি সংগীতের তাল, মাত্রা, মার্গ, ক্রিয়া ইত্যাদি বিষয়গুলি না বোঝেন / জানেন তবে এই বইটির প্রকৃত রসাস্বাদনে সমস্যা হবে, যা আমার মতো অজ্ঞের হয়েছে। এই বিষয়টি বাদ দিলে উপন্যাসটি এক অর্থে চমৎকার ! শাস্ত্রীয় সংগীত, বাদ্যযন্ত্রের ইতিহাস, যোগী মায় অঘোরী , একের পর এক খুন, ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ভ্রমণ - কি নেই এতে? তারওসাথে ওতপ্রোতভাবে মিশে আছে লেখকের সত্যজিৎ বন্দনা, এবং অবশ্যই, ঠাকুর বন্দনা। সত্যজিতের জন্মশতবর্ষে প্রকাশিত এই উপন্যাস যেভাবে তাঁর একটি বিখ্যাত চরিত্রের অবতারণা এবং উপস্থাপনা করা হয়েছে তা বেশ উপভোগ্য। তবে যা ভালো লাগলো না - বইমেলা থেকে বইটি কিনেছিলাম বসাকের স্টল থেকে। পড়তে পড়তে আবিষ্কার করলাম ৮০ থেকে ১০০ পৃষ্ঠার মধ্যে চার পৃষ্ঠা গায়েব ! এক্কেবারে ভোজবাজি !! প্রকাশকের কাছে এইটই অভিযোগ, আপনারা ছাপাই ও বাঁধাইয়ের পরে কোয়ালিটি চেক করলে এইরকম অবাঞ্ছিত বিপত্তি এড়ানো সম্ভব হয়তো। এত সুন্দর একটি বই পড়েও 'শেষ হয়েও হইলোনা শেষ' খেদ থেকে গেল...
এ বই কেবল সঙ্গীতের ছাত্রছাত্রীদের জন্যই। উপন্যাসের ঘটনার পাশাপাশি ভরে ভরে রয়েছে সঙ্গীত শিক্ষার ব্যকরণের অ-আ-ক-খ, যার কোন টার্মিনোলজিই বোধগম্য হল না আমার মতোন সঙ্গীতে তালিম না পাওয়া এক পাঠকের। তারপর তারিণীখুড়োর ন্যাপলা চরিত্রটিকে টেনে এনে জোর করে সত্যজিৎ ট্রিবিউট দেওয়াটা অপ্রয়োজনীয় বলে মনে হল। বাকি তান্ত্রিক গল্প হিসেবে ভালোই ছিল প্লটটা।
একজন সঙ্গীতজ্ঞের জীবনের বিভিন্ন অলৌকিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে লেখা এই উপন্যাস। কাহিনীর প্রয়োজনে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত সংক্রান্ত কিছু আলোচনা এসেছে, যেগুলি লেখক সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছেন। সত্যজিৎ রায়ের তারিণীখুড়োর গল্পগুলি থেকে লেখক অনুপ্রাণিত হয়েছেন এবং তাতে উপন্যাসটি আরও উপভোগ্য হয়েছে বলেই আমার অভিমত। আমার ভাল লেগেছে।
সঙ্গীতের ওপর লেখা একটি অলৌকিক উপন্যাস হল তালভৈরব। একজন তবলাবাদক কিভাবে নিজের বাজনার মাধ্যমে দর্শককে সম্মোহিত করার ক্ষমতা লাভ করেছিলেন সেই নিয়েই এই উপন্যাস। এই ক্ষমতা লাভ করার পেছনে তাকে কি কি অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে সেই সব ঘটনা নিয়েই গল্প ধীরে ধীরে এগিয়ে গেছে। গল্পের একটা মজার দিক হল যদি পাঠক সঙ্গীত অনুরাগী না হন তাহলে তার হয়তো ততটা ভালো লাগবে না কারণ পুরোটা জুড়েই সঙ্গীতের বিভিন্ন উপাদান আর তার তথ্য রয়েছে, তবে খারাপ লাগবে না কারণ লেখক বেশ সুন্দরভাবেই গল্পকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন।