৩৪৩ সালকাব্দ। শীত শেষের শালবনের মত রিক্ত নিঃস্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে উত্তরাপথ। সুপ্রাচীন প্রথাকে ভেঙে কিষ্কিন্ধ্যা জন্ম দিচ্ছে তার প্রথম রাজার। আর আট বছরের রক্তস্নান শেষে ক্লান্ত সম্রাট তখন রচনা করছে তাণ্ডব স্তোত্র। তবু দক্ষিণ আকাশে শোণিতের বাস! তবু এক ঋষি, এক প্রেমিক আর এক পুরুষ (?) সন্ধান করে চলে তাদের নিয়তির। সেই পুরুষ যার ব্যক্তিমায়া অতিক্রম করতে পারে না স্বয়ং মহেশ মহেশ্বর। যার রথচক্রের ধুলোয় ঝড় ওঠে দক্ষিণের সমুদ্রমেখলায়, শত দগ্ধ জনপদের ভস্ম ওড়ে সেই ঝড়ে — একে একে তা গ্রাস করে কোশল, কুরু, পাঞ্চাল, অলকাপুরী। সেবার সে ঝড় থামিয়েছিল একাকিনী এক মুণ্ডিতমস্তকা ব্রহ্মবাদিনী। কিন্তু এবার? ক্ষুদ্র স্বার্থ আর নেতৃহীনতায় দীর্ণ উত্তরাপথ কি এবার মালিনীর মতোই নিজেকে মুছে ফেলবে এক প্রশ্নহীন আনুগত্যে? নাকি শতবর্ষের অবিশ্বাস আর শত্রুতার ইতিহাস পেরিয়ে শেষবারের মতো ঐক্যবদ্ধ হবে দাক্ষিণাত্যের অরণ্যে পর্বতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ঋক্ষ বানর নাগ পক্ষীদের দল? নচেৎ মহাকাল যে বড় নির্মম! কড়ায় গণ্ডায় তার শোধ মিটিয়ে দিতে হবে সকলকেই।
কালদক্ষিণা শুধু যুযুধান দুটিপক্ষ নয়, একাধিক মতাদর্শ, অগণিত জীবনবোধ আর আপাত বিপরীত দুটি সংস্কৃতির মধ্যে দ্বন্দ্বের চিরন্তন কাহিনী। ইতিহাসের আকরে বর্তমানকে খুঁজে পাওয়ার নাম এই কালদক্ষিণা। প্রচলিত মিথের অন্তরাল থেকে সত্যের রূপভেদের সাধনা এই কালদক্ষিণা। শুধুই কি রাজ্যলিপ্সা? নারীসঙ্গবাসনা? তাই কি ব্রহ্মজ্ঞানী বন্দিনী করে আনে সাতাত্তর সহস্র রমণী? নাকি মননের গভীরে বাসা বেঁধে থাকে কোন দুস্তর অতীতের সাক্ষর? সময়ের অরৈখিক গতিতে সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজল এই গ্রন্থ। ভারতের প্রতিটি মানুষের চেতনায় গ্রন্থিত রামায়ণের যে কাহিনী, তারই এক ভিন্ন আঙ্গিকের সূত্রে সমকালীন সময়কে অনুবীক্ষণের নীচে নিয়ে এল কালদক্ষিণা। জিয়ন কাঠি ছোঁয়ালো সেই রাবণকথাকে যে ঘুমিয়ে আছে চিরচেনা রামকথার হৃদয়কোরকে।
সমুদ্রবেষ্টিত দক্ষিণ থেকে গিরিশোভিত উত্তরের দিকে এগিয়ে চলেছে এক অজেয় বাহিনী। তাদের সামনে চূর্ণ হয়ে যাচ্ছে সব প্রতিরোধ; নিশ্চিহ্ন হচ্ছে 'অপর' বলে পরিগণিত হয় এমন সব কিছু। কিন্তু এই বাহিনী তথা তার নায়কের অতর্কিত পরাজয় ঘটল এক পর্বতশৃঙ্গে— এক সাধিকাকে ধর্ষণ করতে গিয়ে। তখনকার মতো ফিরে এল সেই নায়ক। কিন্তু তার বাসনার তৃপ্তি হল না। অনন্ত ক্ষুধা নিয়ে সে আবার উত্তরাভিমুখী হল। কালদর্শী এক ঋষি উপলব্ধি করলেন তার এই যাত্রার লক্ষ্য। মরিয়া হয়ে তিনি সন্ধানে রত হলেন অন্য একজনের— যে ওই ভয়ংকরকে রুখতে পারবে। ক্রমে তিনি বুঝতে পারলেন, সামান্য কারও সাধ্যের বাইরে এই কাজ। তবে সত্যিই যদি এমন কাউকে পাওয়া যায়, তাহলে সফল হলে একদিন সে সংজ্ঞায়িত করবে ধর্মকে, হয়তো কাল নামক মহাশক্তিধর সেই শক্তিকেও— যার প্রবাহ প্রতিনিয়ত মুছে দেয় মদগর্বী সভ্যতা ও শক্তিকেও। তারপর? "যে নক্ষত্রেরা আকাশের বুকে হাজার হাজার বছর আগে মরে গিয়েছে তারাও কাল জানালার ভিতর দিয়ে অসংখ্য মৃত আকাশ সঙ্গে করে এনেছে; যে রূপসীদের আমি এশিরিয়ায়, মিশরে, বিদিশায় মরে যেতে দেখেছি কাল তারা অতিদূর আকাশের সীমানার কুয়াশায় কুয়াশায় দীর্ঘ বর্শা হাতে করে কাতারে কাতারে দাঁড়িয়ে গেছে যেন— মৃত্যুকে দলিত করার জন্য? জীবনের গভীর জয় প্রকাশ করবার জন্য? প্রেমের ভয়াবহ গম্ভীর স্তম্ভ তুলবার জন্য?" হাওয়ার রাত! কালচেতনা নামক অব্যক্ত, বিমূর্ত ভাবনাটি যে কবি নিজের নিতান্ত অগোছালো ভাবনাতেও মিশিয়ে দিতেন অনায়াসে, তাঁর লেখা এই কবিতাটার কথাই বারবার মনে হচ্ছিল আলোচ্য বইটি পড়তে গিয়ে। এই লেখার বিপুল বৈভব, গরলসমা অন্ধকার এবং সর্বগ্রাসী অগ্নির সামনে আমারও "পৃথিবী কীটের মতো মুছে গিয়েছে!" কেন? কী এমন আছে এই নিতান্ত সহজ প্রচ্ছদের, শক্ত মলাটের, ঠাসবুনোট অথচ স্বচ্ছন্দ লে-আউটের বইতে? আছে কাল— যা আমাদের কাছে দক্ষিণা চাইছে আগামীর সন্ধান দেবে বলে! এ বই এক অন্য রাবণায়ন— যার কেন্দ্রে রয়েছে এক মহাজ্ঞানী, অথচ নিঃসীম লোভের গভীরে যাবতীয় 'অপর' সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চাওয়া পুরুষ। তার রিরংসা প্রকট হয় অজেয় রাক্ষস বাহিনীর সামনে রাজ্যের পর রাজ্য লুণ্ঠিত ও নিশ্চিহ্ন হওয়ায়, রাজ্যের পর রাজ্যের সমস্ত নারী ও পুরুষের দাসত্বে, তথাকথিত দেবলোকের নিঃশব্দে তার 'কোলাবরেটর' হয়ে ওঠায়। তার প্রেমহীন কামনার বলি হয় নারী, দেশ, ধর্ম, কাল। তার বিরুদ্ধে লড়বে কে? কেনই বা সেই যোদ্ধা এমন ভয়াল, আক্ষরিক অর্থে সর্বশক্তিমান পুরুষের বিরোধী হবে? এই বই রামায়ণের পূর্ব তথা অকথিত অধ্যায়ের মাধ্যমে এক অনন্তযাত্রার কথা বলে। সেই অনন্তযাত্রার পদে-পদে আছে ষড়যন্ত্র, বদলাতে থাকা সময়ের স্বাক্ষর, বিশ্বাস ও কূটনীতির সমন্বয়, প্রতিহিংসা, লোভ, ভালোবাসা! এ-বইয়ের সম্পদ কী-কী? নিতান্ত করণিকের মতোই তাদের লিপিবদ্ধ করি এখানে। (ক) বিষয়ের গুরুত্ব ও গতি ব্যক্ত করতে সক্ষম ভাষা ও বাক্যগঠনের ব্যবহার; (খ) অসামান্য ভুবন-নির্মাণ— যার ফলে আরণ্য, পার্বত্য, সৈন্ধব, নাগরিক পটভূমি পরিবেশিত হয়েছে ত্রিমাত্রিক ও বর্ণাঢ্য এক চরিত্র-রূপে; (গ) নাক্ষত্র দ্যুতিতে দীপ্যমান একঝাঁক নারী-চরিত্র, সাদা ও কালোর মাঝে স্থায়ী এক ধূসর জগতে বিচরণকারী নানা পুরুষ-চরিত্র; (ঘ) 'পণ্যে, পিপাসায়, লোভে' নিমজ্জিত, আপাত উপেক্ষণীয় চরিত্রদেরও সূক্ষ্ম ও সরস রূপায়ন; (ঙ) শ্বাসরোধী থ্রিলারের মতো নির্মাণ; (চ) বেদানুসারী এবং অবৈদিক সাধনপথের সূক্ষ্ম তারতম্য তথা তার ফলে সমাজে দ্বন্দ্বের কথা বলেও অন্তর্লীন ঐক্য ও শক্তির উল্লেখ করে কুয়াশাচ্ছন্ন ভবিষ্যতের দিকে ইঙ্গিত করা। এ-বইয়ের দুর্বলতা কী-কী? ১) এই বইয়ে এমন কিছু প্রযুক্তি ও কৌশলের কথা উল্লিখিত হয়েছে যা সেই কাল্পনিক কালের নিরিখেও অলৌকিক বলে মনে হয়। ফ্যান্টাসির ভক্তরা একে সোৎসাহে গ্রহণ করবেন, কারণ উইচার সিরিজের রক্ত ও অশ্রুসিক্ত বাস্তবেও আমরা ম্যাজিকের সগর্ব উপস্থিতি দেখি। তবে এক কাল্পনিক সমান্তরাল ভারতের বুকে ঘটে যাওয়া এই কাহিনি অন্য নানা বিষয়ে কঠোরভাবে বাস্তবানুগ থাকার ফলেই আমার এক্ষেত্রে ঈষৎ আপত্তি আছে। ২) বইটি অন্ধকারের কালো ও রক্তের লালে প্লাবিত। বিমলা প্রসঙ্গে সীরধ্বজের সংক্ষিপ্ত চিন্তনের ক'টি বাক্য ছাড়া এই বইয়ে এমন কোনো অংশই পাইনি যা ওষ্ঠাধরকে কিঞ্চিৎ বঙ্কিম করে তুলতে পারে। এ-যুগের আসল হিরো আমাদের বলেই গেছেন, "হোয়াই সো সিরিয়াস?" তাই বইয়ের আগামী পর্বটিতে কিঞ্চিৎ সরসতার অনুপ্রবেশ ঘটালে তা নেহাত বেমানান ঠেকবে না বলেই আমার অনুমান। যদি মহাকাব্যের বিনির্মাণ আপনার পছন্দ না হয়, বা যদি রাবণকে আপনি নিষ্কলঙ্ক নায়ক বলে ভাবতে চান, তাহলে এই বইয়ের ত্রিসীমানায় আসবেন না। যদি সাহিত্য এবং ভারতের ইতিহাসে আগ্রহ থাকে, তাহলে বইটি অবশ্যই পড়ার চেষ্টা করবেন। এই ধাবমান কাল নিত্যই আমাদের দুঃসাহসী ভ্রমণের পথে নিজের থেকেই দূরে নিয়ে যায়। তার মাঝে দু'দণ্ড কাল না হয় দক্ষিণাই দিলেন অবসরকে। ক্ষতি কী? ইতিমধ্যে, আমি লেখকের এই 'অন্য রামায়ণ'-এর পরবর্তী খণ্ডের জন্য সাগ্রহে অপেক্ষায় রইলাম। সঙ্গে রইল লেখকের উদ্দেশে অজস্র শুভেচ্ছা। কাল তাঁর সহায় হোন!
রামায়ণ। এক অনন্য মহাকাব্য। ভারতাত্মার এক অর্ধ। কিন্তু কখনো মনে হয় না, যদি সত্যিই রাম সীতা রাবণ ছিলেন, তবে কেমন ছিল তাঁদের কাহিনী? অলৌকিকতাকে ছেঁচে বাদ দিলে কেমন ছিল সেই ঘটনাপরম্পরা? যদি কখনো এই প্রশ্ন আপনার মনে এসে থাকে, তাহলে এই বই আপনার পড়া উচিত।
আপনি ঐতিহ্যবাদী হতে পারেন, সংস্কারবাদী হতে পারেন, রাজনৈতিকভাবে যে কোনো মতানুসারী হতে পারেন, তাতে কালদক্ষিণার প্রতি আপনার মুগ্ধতা, বিরক্তি বা সতর্কতা আসতে পারে। কিন্তু কোনোমতেই আপনি কালদক্ষিণাকে অস্বীকার করতে পারবেন না। আর আপনি যদি আমার মত সাহিত্যানুরাগী হন, তাহলে এ বই আপনার মনের খিদে মেটাবেই মেটাবে।
কিছুটা আমিশ ত্রিপাঠীর ঢং এ মহাকাব্যের বিনির্মাণ, কিন্তু আমার ব্যক্তিগতভাবে কালদক্ষিণার স্ট্যান্ডার্ড, আমিশের বহু বহু ওপরে মনে হয়েছে।
এত প্রশংসা সত্ত্বেও কেন চার রেটিং দিলাম? কারণ, উন্নতির জায়গা আছে। প্রথমতঃ, বইয়ের শুরুতে যে মানচিত্রটা আছে ভারতের, সেই মানচিত্র আরো বিস্তারিত হওয়া দরকার। প্রতিটা জায়গার উল্লেখ, যা লেখায় আছে, তা মানচিত্রে আসা প্রয়োজন। যে স্থানগুলোর অবস্থান সম্পর্কে লেখক নিশ্চিত নন, সেগুলো ম্যাপের নীচে লিখে দিলে ভালো হয়। স্থানসংকুলানে অসুবিধা হলে দুই পাতা জুড়ে ম্যাপটাকে ছাপানো যায়। দ্বিতীয়তঃ, বয়সে, সম্মানে, পদাধিকারে বড় ব্যক্তিদের সম্পর্কে করল, বলল জাতীয় ক্রিয়ার ব্যবহার আমার অর্থোডক্স মননকে একটু অস্বস্তিতে ফেলেছে। করলেন, বললেন হলে আমি স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করতাম। যদিও, আমার মনে হয়েছে, এই ব্যবহার লেখকের ইচ্ছাকৃত৷ হয়তো, বর্ণনায় নৈর্ব্যক্তিকতা আনতে।
বইয়ের প্রচ্ছদ পরিচ্ছন্ন। মিনিমাল। অল্প কিছু মুদ্রণ প্রমাদ আছে। খেয়াল করে পরে শুধরে নিতে হবে। পাতার কোয়ালিটি, বই বাইন্ডিং আমার ভাল লেগেছে। ছাপার অক্ষরের সাইজ ও ঠিকঠাক।
This entire review has been hidden because of spoilers.
রাম জন্মপুর্ব ভারতবর্ষের চেহারা, সামাজিক রাজনৈতিক অবস্থা কেমন ছিল সেটাই ফুটে উঠেছে প্রতিবর্তর কলমে। সাথে এক সুন্দর ছবি ফুটে ওঠা পৌরাণিক ক্লাসিক এই বইটি।
#আমার_বই_পড়া_২০২২ #bookish_subhajit #শুভর_আলোচনায় 📚 বই- কালদক্ষিণা 📚 লেখক- প্রতিবর্ত 📚 প্রকাশনা- কোলাহল প্রকাশনী 📚 দাম- এই বই এর মূল্য আমার কাছে অপরিসীম। কারণ এটা এক ভাইকে দেওয়া এক দাদার উপহার। [ মুদ্রিত মূল্য- ৩৯৯/-] 📚 প্রচ্ছদ ও অলংকরণ- তিতাস পান্ডা 📚 প্রথম প্রকাশ- ২০২১ 📚 হার্ড বাইন্ডিং এর বই। 📚 ধরণ- পুরাণ নির্ভর কাহিনী। -------------------------------------------------- 🔱 বিষয়বস্তু- আচ্ছা প্রথমেই আমি বলে রাখি এই বই এর পাঠক প্রতিক্রিয়া করার মত ক্ষমতা বা সাহস কোনটাই আমার নেই। তাই এই বই এর ক্ষেত্রে আমি শুধু মাত্র একজন ছোট্ট পাঠক হিসেবে ভালোলাগা বা মন্দলাগা টা আপনাদের সাথে শেয়ার করছি। এই কালদক্ষিণা এমন একটা বই যার তুলনা সে নিজেই। কারণ, কালদক্ষিণা নিজ গুনে হয়ে উঠেছে একদম পরিপূর্ণ। এই বই এর বিষয়বস্তু এককথায় বলা যায়, এটি একটি অন্য রামায়ণ। আর তার থেকেও উৎকৃষ্ট ভাবে বললে এটি হলো ভারতায়ন। আমদের পরিচিত রামায়ন এর নায়ক রাম। কিন্তু এই রামায়নের নায়ক রাবণ। যেমন মাইকেল মধুসূদন দত্তের "মেঘনাদবধ" ঠিক তেমন লেখক প্রতিবর্ত এর "কালদক্ষিণা"। কালদক্ষিণা শুধু যুযুধান দুটি পক্ষ নয়, একাধিক মতাদর্শ, অগণিত জীবনবোধ আর আপাত ভাবে বিপরীত দুই সংস্কৃতির মধ্যে এক মিলনের কাহিনী। প্রচলিত বিভিন্ন মত, বিভিন্ন মিথ কে অনুবীক্ষণের তলায় এনে তার মধ্যে সত্যের রুপভেদকে খুঁজে পাওয়ার নাম এই কালদক্ষিণা। আমাদের মত প্রতিটি ভারতীয় এর হৃদয়ে গাঁথা আছে যে রামায়ণ কাহিনী, তারই এক অন্য রুপ এই বই। তবে এই কাজ সহজ নয়, তাইতো এই সবে কালদক্ষিণা এর প্রথম পর্ব। আর সেই চেনা রামায়ন এর পটভূমি কেই বিস্তৃত ভাবে তুলে ধরেছেন লেখক এই বই এর মাধ্যমে। আর আমাদের চিরপরিচিত রামকথার হৃদয়কোরকের মধ্যে লুকিয়ে থাকা এক রাবণকথাকে তুলে আনা হয়েছে কালদক্ষিণা এর মাধ্যমে। এর সাথে এই লেখা নারী শক্তির পরম সাধনার কথা তুলে ধরেছে পাঠকের সামনে। ফল্গু নদীর ন্যায় নারীশক্তির জয়গান প্রবাহিত হয়েছে লেখার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। তাতে সে হনুমান মাতা অঞ্জনা এর কথা হোক, কিংবা বেদবতী এর কথা হোক, বা তারা, শুর্পনখা , শান্তা, অথবা রাবণ পত্নী মন্দোদরি এর কথায় হোক, অথবা ধাণ্যমালিনীর পরিণতির দৃশ্যই হোক। আদতে নারী শক্তির আহ্বান এই লেখার অন্যতম শ্রেষ্ঠ অংশ। আর তাই হয়তো শ্রীমৎ আদি শঙ্করাচার্য রচিত মহিষাসুরমর্দিনী স্তোত্রম্ "অয়ি গিরি নন্দিনি নন্দিতমেদিনি বিশ্ব-বিনোদিনি নন্দনুতে গিরিবরবিন্ধ শিরোধিনিবাসিনি বিষ্ণু-বিলাসিনি জিষ্ণুনুতে, ভগবতি হে শিতিকণ্ঠ-কুটুম্বিণি ভূরিকুটুম্বিণি ভূরিকৃতে জয় জয় হে মহিষাসুরমর্দিনি রম্যকপর্দিনি শৈলসুতে।" এর অসাধারণ বিশ্লেষণ করা হয়েছে লেখাতে, যা পড়ে রিতিমত মুগ্ধ হতে হয়। এর সাথে কাহিনীর মধ্যে রাবণ এবং মেঘনাদ এর চরিত্র সৃষ্টি করা হয়েছে, তা পড়ার পর এক অন্য রকম মুগ্ধতা গ্রাস করেছে আমায়। বার বার ভাবিয়েছে বিষয়টি। এর সাথে এই কাহিনীর একটি অন্যতম অংশ হলো অখন্ড ভারতবর্ষের এক মনমোহন দৃশ্য। তাতে যেমন আমরা দেখতে পায়, বাহুবলী এর মাহিষ্মতী, তেমনই পায় অঞ্জনগিরি, ত্রম্বকেশরী, অমরাবতী, অযোধ্যানগরী, থেকে লঙ্কানগরী এর বর্ণনা। এই বই এর ঘটনা প্রবাহ হয়েছে ৩৪০-৩৫২ সালকাব্দ এর মধ্যে। মোট ৩৩ টি পর্বে রচিত এই বই এ পাঠক যেমন প্রত্যক্ষ করবে রাবণের কলিঙ্গ জয়, সীতার জন্ম, বেদবতীর ধর্ষণ, কিষ্কিন্ধ্যার যুদ্ধ, এর মত অসাধারণ ঘটনার বিবরণ। ---------------------------------------------- 🔱 ভালোলাগা- ১.) প্রথম ভালোলাগার দিক হলো, মার্জিত লেখনী। আমি দেখেছি বেশ কিছু লেখক লেখিকাদের বই এর প্লট যখন এহেন বিস্তৃত হয়, তখন বহু অবাঞ্ছিত চরিত্র এসে ভীড় করে, তাতে লেখা বড্ড জটিল হয়ে যায়। কিন্তু এই লেখার মধ্যে আমি তার ছিটেফোটাও পাইনি। চরিত্র আছে কিন্তু তাদের অপ্রযোজনীয় বর্ণনা, বা কোন জায়গায় অপ্রাসঙ্গিক কথপোকথন নেই। ২.) রাজনৈতিক অবস্থান বর্ণনা। লেখক এই লেখার মাধ্যমে ভারতবর্ষের সেই সমসাময়িক যে রাজনৈতিক অবস্থান এর সুনিপুণ বর্ণনা করেছেন, তা সত্যিই পাঠক মনকে প্রভাবিত করে। ৩.) চরিত্র সৃষ্টি। প্রতিটি চরিত্রের মধ্যে একটা অসম্ভব দৃঢ়তা দৃশ্যমান। রাবণ , মেঘনাদ থেকে শুরু করে প্রতিটি নারী চরিত্র মুগ্ধ করেছে বারবার। ৪.) কাহিনীর পটভূমি ও অভিমুখ। এক কথায় যদি বলতে হয় এই কাহিনী হলো বহুমুখী। তার সাথে অসাধারন পটভূমি তে গড়ে ওঠা এক অসম্ভব সুন্দর লেখা। ৫.) দৃশ্য বর্ণনা। লেখক বই এর মধ্যে বহু জায়গায় অনেক দৃশ্য বর্ণনা করেছেন। আর তা এতটায় বাস্তব হয়ে উঠেছে আমার কাছে যে এই বইকে "জ্যান্তবই" বললেও ভুল বলা হয় না। অসাধারণ এবং দৃষ্টিনন্দন প্রতিটি বর্ণনা। ৬.) মেলবন্ধন। এই উপন্যাস এক মেলবন্ধন এর কথা বলে। যা আদতেই পাঠক হৃদয় দোলা দিতে যথেষ্ট ভূমিকা নেয়। ৭.) মানচিত্র। বই এর শুরুতে যে মানচিত্র টা আছে, তা যেন এই বই এর বিষয়বস্তু এবং ভারত সম্পর্কে অনেক কথা বলে দেয়, তার সাথে কালপ্রবাহ ও অসাধারণ। ৮.) লেখার ধারা। এই কাহিনী প্রবাহিত হয়েছে চির প্রবাহমান শৈবাল দল হীন এক স্রোতস্বিনী নদীর ন্যায়। কোন অংশে বিরক্তি নামক মনোভাবটির উদয় হয়নি। আরও বহু ভালো লাগার দিক আছে বলতে গেলে শেষ হবেনা, তাই এখানেই থামলাম। --------------------------------------------- 🔱 খারাপ লাগা - তবে এই গুলোকে ঠিক খারাপ লাগা বলা চলে না, এগুলো আসলে লেখকের কাছে অভিযোগ। ১.) এই উপন্যাস এর আগের কাহিনী জানার ইচ্ছা তৈরি হলো প্রবল। সেটা নিয়ে একটা লেখা আসুক। ২.) ভাষা ব্যাবহার অত্যন্ত জটিল এবং বর্ণনা বেশ কঠিন। তাই বেশ কিছু অর্থ আমার বোধগম্য হয়নি। ৩.) এই বই এর প্রুফ দেখা একটা বিশাল বড় চ্যালেঞ্জ। তাও বেশ কিছু জায়গার ই কার ঈ কার এর , আ কার ও কার এর সমস্যা আছে। এগুলো আশাকরি পরের মুদ্রণ এ এটা সংশোধন হয়ে যাবে। ---------------------------------------------- 🔱 বই সম্পর্কে- 🍂 প্রচ্ছদ- প্রচ্ছদ টি অত্যন্ত সাধারণ হলেও, শিল্পীর তুলিতে তার যেন হয়ে হয়ে উঠেছে অসামান্য। আমার ব্যাক্তিগত ভাবে দারুন লেগেছে প্রচ্ছদ টি। কারণ এর কালার কম্বিনেশন ও ছবির বিষয়বস্তু সাথে কালদক্ষিণা লেখার ক্যালিওগ্রাফি অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন। ধন্যবাদ প্রচ্ছদ শিল্পী কে। 🍂 বাঁধন এবং পাতার মান- কোলাহল প্রকাশনী এই নামটাই আমি প্রথম শুনলাম, তারপর তো ওনাদের বই আগে পড়ার কথাই নেই। কিন্তু তা হলেও ওনাদের কাজে আমি সত্যিই অভিভূত। শুধুমাত্র যে ওনাদের বই এর বাঁধন অত্যন্ত মজবুত এবং ছিমছাম , কিংবা পাতার মান অত্যন্ত ভালো তাই নায়, তার সাথে ওনাদের বই পাঠানো ও অসাধারণ। অত্যন্ত যত্ন সহকারে বইটির কাজ ওনারা করেছেন, এবং বইটি পাঠিয়েছেন। ধন্যবাদ কোলাহল প্রকাশনী এর কর্ণধার কে, এবং তাদের সকল টিম মেম্বার দের। 🍂 বই এর অভাব অল রেটিং- ( ৯.৫/১০) [ যদিও এটা দেওয়ার যোগ্যতা আমার মত একজন নগণ্য পাঠকের আছে কিনা জানিনা, তাও সাহস করে দিলাম] ⭐⭐⭐⭐⭐⭐⭐⭐⭐🌟 -------------------------------------- 😍 এবার ধন্যবাদ দেওয়ার পালা তাদের, যাদের জন্য এই বই আমি পড়তে পেড়েছি। প্রথমেই ধন্যবাদ অত্যন্ত প্রিয় দিদি সুচেতনা দি মানে সুচি দি কে, কারণ দিদিই প্রথম এই বই এর কথা আমায় বলছিল। আর ধন্যবাদ দেবো সেই দাদাকে যে আমাকে বইটা উপহার দিয়েছে। কারণ আর্থিক কারণে আমার অনেক বই পড়ার ইচ্ছা থাকলেও পড়া হয়ে ওঠেনা। তার নামটা নাহয় গোপন ই থাকুক। ☺️🙏 -------------------------------------------------------- 🔱 এবার লেখকের কাছে দাবি- এর পরের পর্ব তারাতারি নিয়ে আসুন প্লিজ 🥺 মানে অধির আগ্রহে অপেক্ষা করে থাকবো 🥰। আমি যদিও বুঝতে পারছি এই ধরণের রচনা কাজ অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ এবং কঠিন তাও এটা দাবি জানিয়ে গেলাম।☺️ ধন্যবাদ 🙏 সকলে ভালো থাকুন সুস্থ থাকুন 😍 অবশ্যই সাহিত্যে থাকুন।
রামের জন্মগ্রহণ থেকে কৈশোরে পদার্পনের আগে অবধি অযোধ্যার বাইরে সমগ্র জম্বুদ্বীপে কী ঘটছিল? বাল্মীকি রামায়ণ বা রামায়ণের ক্রিটিক্যাল এডিশনে এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না। আর অতি সংক্ষেপে এই প্রশ্নটাই হল কালদক্ষিণা বইয়ের বিষয়বস্তু। এ যেন সমগ্র রামায়ণের context setting।
এ ধরণের বই লেখার প্রধান সমস্যা হল এই যে মানুষ জানে কী ঘটতে চলেছে। আর এখানে তো বেস মেটেরিয়াল পৃথিবীর সর্বাধিক জনপ্রিয় মহাকাব্য। হ্যাঁ, জনপ্রিয়তায় ও ব্যাপ্তিতে রামায়ণ মহাভারতের চাইতে এগিয়েই বটে। অসংখ্য বিনির্মাণ হয়েছে, অসংখ্যবার নতুন করে বলা হয়েছে এ গল্পকে। তো, যে গল্প সবার জানা, সেখানে নতুন কোনো আঙ্গিক এনে পাঠকের মনোযোগ শেষ অবধি ধরে রাখা যথেষ্ট কষ্টসাধ্য কাজ। কালদক্ষিণা কী পেরেছে এই কাজে সাফল্য পেতে?
প্রথমে সমস্যার জায়গাগুলো আলোচনা করে নেওয়া যাক।
প্রথমেই বলব মুদ্রণ প্রমাদের কথা যা কিনা বইয়ের প্রথম পাতা থেকে বর্তমান (মানচিত্রে কাশ্যপমীরের জায়গায় কাশ্যমীর)। খুব বেশি না হলেও, আরো আছে। যেটা আরো বাজে সেটা হল কন্টিনিউইটি এরর। তবে সেটা খুবই ক্ষুদ্র আর হয়ত বেশিরভাগ পাঠকের চোখেও পড়বে না। তবে সম্পাদকের চোখে পড়া উচিৎ ছিল।
এবারে গল্পে আসা যাক। আপনি যে ধারার গল্পই লিখুন না কেন, সে গল্প যত ব্যক্তিগত হবে, ততই মনের গভীরে ঢুকবে। আপনি রামায়ণ ধরুন বা মহাভারত, ইলিয়াড অডিসি ধরুন বা গিলগামেশ, আনা ক্যারেনিনা ধরুন বা তুঙ্গভদ্রার তীরে, প্রত্যেকটা কাহিনীর ব্যাপ্তি বৃহৎ হলেও গল্পগুলো নিতান্তই ব্যক্তিগত। ব্যক্তির মাধ্যমেই সমাজের, জাতির চিত্রাঙ্কন হয়েছে, জাতির মাধ্যমে ব্যক্তির নয়। আমার ব্যক্তিগত ধারণায় এই বইয়ের তিন চতুর্থাংশের প্রধান সমস্যা এটাই।
আমি বোধ করতে পারছি যে লেখক এক সময়ের কথা তুলে ধরতে চেয়েছেন, আর উনি ক্যানভাসও খুবই বড় বেছেছেন, যার ফলে চরিত্রের সংখ্যাও প্রচুর - টু বি ফেয়ার, লেখক সেই ব্যক্তিগত টাচ আনার আপ্রাণ প্রয়াস করেছেন, কিন্তু পর্বগুলো বড্ড তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গিয়ে অন্য দিকে চলে গেছে, যার ফলে পাঠক হিসেবে আমি সেই চরিত্রের গভীরে ঢুকতে পারিনি। যতক্ষনে সেই চরিত্র ফিরে এসেছে, ততক্ষনে আগের সুতো কেটে গেছে। এই সমস্যা গল্পের শেষ দিকে নেই। কেন নেই? কারণ শেষ দিকটায় বইটা খুবই স্ট্রিমলাইন্ড। যার ফলে আয়েশ করে চরিত্রগুলোর ভেতরে ঢুকেছেন লেখক।
উপরেই লিখেছি বেশিরভাগ পর্বগুলো বড্ড ছোট। যেন একেকটা পর্ব একেকটা ফেসবুক পোস্ট। এই কাহিনী ফেসবুকে প্রকাশিত হলে পর্বের সাইজ পারফেক্ট।
এবারে একটা অন্য কথা বলি। এটা আমারই বোঝার অক্ষমতা হয়ত, কিন্তু বইতে লেখক ইন্ট্রা স্পিসিস স্ট্রাগল দেখাতে চেয়েছেন নাকি ইন্টার স্পিসিস, সেটা আমি নিশ্চিতভাবে বুঝতে পারিনি। ইন্টার স্পিসিস না হয়ে ইন্টার জিনাসও হতে পারে - আমি ঠিক শিওর নই। আমার মনে হয়েছে ইন্টার স্পিসিস, তবে আমি ভুলও হতে পারি। তবে যদি লেখক ইন্ট্রা স্পিসিস বোঝাতে চেয়ে থাকেন, তাহলে কবি কিছু জায়গায় কেঁদেছেন। কারণ সেক্ষেত্রে বেশ কিছু প্রশ্ন উঠবে যেগুলোর সন্তোষজনক ব্যাখ্যা বইতে নেই। সে আলোচনা এখন থাক।
ভাষার কথা বলি। ভাষা এই বইয়ের সম্পদ ও বিপদ দুইই। প্রকৃতি ও পারিপার্শ্বিক কতটুকু বর্ণনা করব আর কীরকম ভাষায় করব, সে বড় তীক্ষ্ণ ধারযুক্ত তরবারি। সে ধারের উপর হাঁটা খুবই দুঃসাধ্য ব্যাপার। আমার মতে লেখক কিছু জায়গায় পিছলে পড়েছেন। তবে পিছলে পড়লেও উনি শীঘ্রই রাশ টেনে ধরেছেন ওঁর প্রধান অস্ত্রের সাহায্যে - সংলাপ। এই বইয়ে প্রায় প্রতিটি সংলাপ (কয়েক জায়গা বাদে) অনবদ্য ও চিন্তাশীলভাবে নির্মিত। পড়তে ভালো লাগে। কুশীলবদের কেউই অকারণে আঁতেলমার্কা কথা বলেনি। প্রত্যেকের সংলাপ সহজ সরল। অযথা দার্শনিক নয়। এর ফলে চরিত্রগুলো বিশ্বাসযোগ্য হয়েছে।
গল্প অলৌকিক বা অতিলৌকিক মুক্ত নয়। যদিও সে দাবি লেখক কোথাও করেনও নি। বরং রামায়ণের গভীর মিস্টিসিজমকে এক্সপ্লোর করাই এই বইয়ের অন্যতম উদ্দেশ্য বলে মনে হয়েছে। আর মিস্টিসিজমের সাহায্যেই কিন্তু এই বইয়ের সবচাইতে শক্তিশালী দৃশ্যকল্পগুলো তৈরি হয়েছে।
লেখক বলছেন ইন্দ্রের মত বিশ্বামিত্রও একটা পদ। খুব ভালো কথা। ইন্দ্র কারা সেটা পাঠক স্পষ্ট বুঝতে পারছে। কিন্তু বিশ্বামিত্র কারা? বশিষ্টও কী পদ? সেক্ষেত্রে ব্রহ্মদণ্ড কী ক্ল্যান ওয়েপন? শেষে রাম ও তার ভাইরা কি চিহ্নিত হলেন নাকি নির্বাচিত? নির্বাচিত হলে ওরাই কেন? বিশ্বামিত্রকে এতগুলো জায়গায় এতগুলো বছর ধরে কেন ঘুরতে হল? এসব ও এরম আরো প্রশ্ন আমার মনে উঠেছে। হয়ত পরবর্তী খণ্ডে লেখক এগুলো এড্রেস করবেন কিন্তু যেহেতু এই বইতে খুব যত্নসহকারে পটভূমিকা সাজিয়েছেন লেখক, এসব প্রশ্ন এই বইতেই এড্রেসড হলে বোধহয় বেটার হত।
লেখক পাঠককে নির্বোধ ও অজ্ঞানী মনে করেন না, সেটা খুবই আনন্দের কথা হলেও, পাঠককে সবজান্তা মনে করাটাও কাজের কথা নয়। দিল্লির ছোকরারা যেমন কথায় কথায় নেম ড্রপিং করে, এখানে কিছু জায়গায় অকারণে "সংস্কৃত ড্রপিং" হয়েছে। তাতেও সমস্যা নেই। তবে পাতার নিম্নে টিকা থাকলে আরো ভালো হত। কিংবা সেই সংলাপেই বা অন্যত্র মানে বুঝিয়ে দিলে ভালো হত হয়ত। তবে এটা ক্ষুদ্র বিষয়। গল্পের প্রবাহ এর জন্য কোথাওই হোঁচট খায়নি। তবে লেখককে ভবিষ্যতে হয়ত আরেকটু সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে যাতে কোনো অবস্থাতেই পাঠকের এটা না মনে হয় যে লেখক নিজের বিদ্যা জাহির করছেন। সন্দেহাতীতভাবে খুবই কষ্টকর কাজ, কিন্তু একটা দুরূহ বিষয় যেরকম মুন্সিয়ানার সাথে সামলেছেন উনি, তাতে আমার পূর্ণ আস্থা আছে যে উনি এটাও পারবেন। এব্যাপারে শরদিন্দুবাবুর লেখাগুলো লক্ষণীয়।
বইতে রূপক ও বর্তমানের সাথে প্যারালেলের ছড়াছড়ি। যদিও তাতে সমস্যা নেই, রামায়ণ তো ইতিহাসই (হিস্ট্রি নয়)। as it was before so shall it be again। তবে কোথাও কোথাও একটু on the face হয়ে গেছে। হয়ত সেটাই উদ্দেশ্য ছিল।
একটা কূটবিদ্যার প্রতি সমর্পিত চ্যাপ্টারে, তর্কযোগ্যভাবে এই বইয়ের সর্বাধিক শক্তিশালী দৃশ্যকল্প রচিত হয়েছে। ওটাই অন্তিম চ্যাপ্টার হলে হয়ত আরো জমত। অনেকটা ডেথলি হ্যালোজ পার্ট ওয়ানের এন্ডিংএর মত - ভোল্ডেমর্ট এলডার ওয়ানড হস্তগত করে আকাশ বিদীর্ণ করে দিল ক্ষমতার আস্ফালনে। এ প্রশ্নও আমার মনে জেগেছে যে ক্লাইম্যাক্টিক যুদ্ধে এ কুটবিদ্যার ব্যবহার হল না কেন।
এতগুলো কথা বললাম কেন? কারণ আমি মনে করি এই বই বাংলা সাহিত্যে এক মাইলস্টোন আর প্রপার মার্কেটিং হলে সহজেই বেস্টসেলার হত। মার্কেট ও মার্কেটিং নিয়ে লেখক ও প্রকাশকের কোনো পিউরিটান মানসিকতা আছে কিনা জানি না, তবে যে ব্যবসার যা নিয়ম।
সে যাকগে যাক, যেটা আসল কথা সেটা হল এই যে বইটি সুপাঠ্য আর পাঠককে চিন্তার যোগান দেয়। রামায়ণের মত অতিপরিচিত কাহিনীতেও লেখক নতুন আঙ্গিক প্রতিষ্ঠা করার ব্যাপারে সফল হয়েছেন। অবশ্যই কিনুন ও পড়ুন। ঠকবেন না।
প্রচ্ছদ আপাতদৃষ্টিতে ভালো লাগলেও, কাহিনী পড়ার পর যথাযথ মনে হয়নি। ইনফ্যাক্ট মিনিংলেস মনে হয়েছে। বাকি প্রোডাকশন ভ্যালু মোটের উপর ভালোই।
শেষ করলাম কালদক্ষিণা পাঠ। কিছু গ্রন্থ শুধু পড়লে হয় না, পাঠ করতে হয়। পাঠ আর সাধারণ পড়ার মধ্যে পার্থক্য আছে অবশ্যই সেটা পাঠক মাত্রই জানেন।
প্রথমেই বলি এর বিষয়বস্তু সম্পর্কে। এটি রামায়ণের বিনির্মাণ এবং প্রকাশিত বইটি সবে এর প্রথম খন্ড। সুতরাং বুঝতেই পারছেন, আশা আছে; সিনেম্যাটিক ভাষায় 'পিকচার অভি বাকি হ্যায় মেরে দোস্ত'। লেখকের লেখনী নদীর স্রোতের মত, সবেগে তা ভাসিয়ে নিয়ে চলে পাঠককে। কখনও বর্ণনা কখনও কথোপকথন, পাঠক হয়ত হাত থেকে বই নামিয়ে রাখতেও ভুলে যাবেন। ধীর লয়ে এগিয়েছে কাহিনীবিন্যাস, যেন এক মাকড়সার জাল। পাঠক প্রবেশ করবেন এবং হারিয়ে যাবেন; বিস্মৃত হতে পারেন বর্তমানকেও এতটাই সম্মোহন রয়েছে লেখকের কলমে। প্রতিটি নারীচরিত্র অসম্ভব শক্তিশালী; রাবণ আর মেঘনাদের চরিত্র চিত্রণ অতুলনীয়। বরং তুলনায় সীরধ্বজকে অনেক ম্রিয়মান লাগল। অবশ্য মূল মহাকাব্যেও তিনি আর কতই বা উজ্জ্বল? তবে যেভাবে এই মহাকাব্যকে ভেবেছেন ও নিজের কল্পনাকে শব্দের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন... লেখকের কল্পনাশক্তিকে কুর্ণিশ। বিশেষ করে চোখে জল আনে ধান্যমালিনীর করুণ পরিণতি, আর মীনক্ষির সঙ্গে পক্ষীশ্রেষ্ঠ ও ঋক্ষশ্রেষ্ঠের কথোপকথন; আর বিদ্যুজ্জিহ্বের অবসানের সময় রাবণের মুখটা মানসচক্ষে যেন বাহুবলীর ভল্লালদেব হয়ে ধরা দেয়, এতটাই জীবন্ত বর্ণনা তাও স্বল্প শব্দে। আর হ্যাঁ একটা ঘটনা ঘটেছে; কার্তবীর্যার্জুনের সভার ঘটনা বিশেষ করে তার সংলাপ পড়ে বেদম হেসেছি। এতটাই বিশ্রীভাবে যে ছেলে ঘুম ভেঙে অবাক হয়ে তাকিয়ে ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলেছে। অপূর্ব কিছু বাক্য মনে রয়ে যাবে চিরকাল, যেমন
'শিলা ক্রীড়াতুরা মাতঙ্গীর ন্যায় অদম্যা'
এর সঙ্গেই পাঠক সঙ্গী হবেন এক যাত্রার, যা থামে না, যা আজও চলেছে। সেটা কী বলতে পারছি না, স্পয়লার হয়ে যাবে।
ভাল লাগল
১) চরিত্রচিত্রণ। শক্তিশালী নারীচরিত্রের আনাগোনা। রাবণ ধূসর অথচ তার চরিত্রের কালোরও একটা মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা, আমার দুর্দান্ত লাগল।
২) কাহিনীর বহুমুখিতা। কাহিনী যেহেতু সরলগতিতে সোজাভাবে এগিয়ে চলেনি তাই প্রতিপর্বেই একটা না একটা বাঁক হঠাৎ নিজেকে মেলে ধরেছে, পাঠক কখনও চমকে উঠেছে কখনও আনন্দ পেয়েছে কখনও বা গভীর বিস্ময়ে ভাবজগতে পাড়ি দিতে বাধ্য হয়েছে।
৩) অহেতুক কোনও চরিত্রকে গ্লোরিফাই না করা ও অহেতুক কোনও চরিত্রে কালিমালেপন না করা
৪) বইয়ের শুরুতেই একটি মানচিত্র ও তাতে উপন্যাসে ব্যবহৃত স্থানের চিহ্নিতকরণ। সেই সঙ্গে সালের একটি তালিকা যা বিশ্বাসভাজন করে তোলে উপন্যাসকে।
৫) কিছু অপূর্ব মায়াবী দৃশ্যের অবতারণা যা একাধিকবার পড়তে বাধ্য হবেন পাঠক
৬) সমসাময়িক রাজনীতির সুস্পষ্ট চিত্র
৭) গল্পের অন্দরে বয়ে চলা মাতৃকাশক্তির জয়গান
ভাল লাগেনি
১) ভূমিকার অনুপস্থিতি। এমন মায়ারাজ্যে হঠাৎ করে উপস্থিত হওয়াটা পাঠকের পক্ষে বেশ চাপের। ভূমিকা/প্রাককথন সেই সেতুর কাজ করে যে বর্তমানের সঙ্গে সেই মেঘে ঢাকা রাজ্যের সংযোগের কাজ করে যা বইয়ের পাতায় আবদ্ধ।
২) গ্রন্থপঞ্জীর অনুপস্থিতি; যারা আরও জানতে চান তাদের সুবিধা হত।
৩) ভাষা বড় মায়াবিনী। সে নিজের জালে জড়িয়ে অনেকসময় শ্বাসরোধ করে ফেলে সাহিত্যের। এই প্রসঙ্গে বিদগ্ধ লেখক সমালোচক ও পাঠক শ্রী ঋজু গাঙ্গুলী বলেছিলেন "ভাষা একটা হনি-ট্র্যাপ। খুব বুঝেশুনে সেটা এড়িয়ে যেতে হয়।"
কালদক্ষিণার ভাষাপ্রয়োগে আমি কিঞ্চিৎ আশাহত। লেখক যে ভাষায় এটি রচনা করেছেন তা আমার প্রিয়, আমি নিজে এই ভাষাশৈলী ভালবাসি। কিন্তু কিছুক্ষেত্রে এমন শব্দপ্রয়োগ করেছেন যা সঙ্গের অপূর্ব সুন্দর অলঙ্কারগুলিকে ব্যঙ্গ করেছে রীতিমত। যেমন
পিছনে ঝপাস করে একটা জলে নামার শব্দ শ্রুত হল।
আর উদাহরণ আমি দিতে পারছি না। আবার বেশ কিছুক্ষেত্রে আমার মনে হয়েছে অত্যধিক ভারী শব্দের জন্য ভাষা তার গতিময়তা হারিয়েছে; সেই জায়গাগুলো আমার যেন কেমন মেকি মনে হয়েছে। উপযুক্ত শব্দ প্রয়োগের প্রয়োজন ছিল। তবে গল্প যত এগিয়েছে ভাষা অনেক সুসংহত মনে হয়েছে। একদম শুরুতে মানে বানরদের ইন্ট্রোর সময়ে একবার যে ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে, উয়ারা আমাদের নষ্ট করি দিবে কন্যে...
খুব দরকার ছিল না। পাঞ্চজন্যেও নিষাদের মুখে স্বাভাবিক ভাষাই ব্যবহার করেছিলেন গজেন্দ্রকুমার মিত্র। তাতে তার গ্রহণযোগ্যতা কমেনি। তবে পরে বানরদের মুখে এই ভাষা আর ব্যবহৃত হয়নি দেখে নিশ্চিন্ত হলাম।
৪) এই গ্রন্থের এই প্রচ্ছদ! কেন? প্রচ্ছদের প্রতি যত্নশীল হওয়া প্রয়োজন ছিল সম্ভবত প্রকাশকের। এ কথা আলাদা আমার পছন্দ না হলেও আমার ছেলে এই প্রচ্ছদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে বইটিতে হাত বুলিয়েছে বারবার।
বইটির সযত্ন প্রুফ রিডিং দরকার ছিল; আর দরকার ছিল সম্পাদনা। একটি জায়গায়, রত্নাকর মৈথুনহন্তারককে দেখে কেঁদে বলবে 'মা নিষাদ!'... এটুকু লিখেই ছেড়ে দিয়েছেন লেখক। এটা পুরোটা দিলে সত্যিই রোমাঞ্চিত হতেন পাঠক। এটা দরকার ছিল। ঋচীকপৌত্র হয়েছেন ঋচীকপুত্র; এইরকম টুকটাক ত্রুটি আছে যা পরবর্তী মুদ্রণে নিশ্চয়ই শুধরে নেবেন লেখক প্রকাশক জুটি।
এখন বইটির বিষয়বস্তু যেহেতু রামায়ণ তাই এবারে
আসবেন সবে হাতে নিয়ে অসি আপন কোমরবন্ধনীখানি কষি
রাম খারাপ রাবণ ভাল; রাবণ কেন ভাল? মেঘনাদবধকাব্য পড়েননি? এ ব্যাটা বাঙালি নয়।
দুইদলই ভুলে যান রামায়ণের আবেদন চিরন্তন; একেক জনের কাছে তা একেক রকম। আমি একে মহাকাব্য হিসেবেই পড়ি; তাই রামকে ভাবার বা রামচরিত্রকে নতুন করে প্রচার করার যে হিড়িক উঠেছে তা আমি সযত্নে এড়িয়ে যাই৷ আবার আমিও তার আরাধনা করি যার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভক্ত ছিলেন রাবণ। এখন সঙ্গত কারণেই রাবণের ভিতরের সাদাটুকুকে প্রাণপণে আস্বাদন করতে ইচ্ছে হয়। এই প্রসঙ্গে আরও একটি কথা, ইচ্ছাকৃতই বিশ্বামিত্রের মুখে 'পাষণ্ড শিব' শব্দবন্ধ ব্যবহার করেছেন যা তার বেদপাঠী প্রকৃতি বোঝাতে পাঠককে সাহায্য করবে; কারণ খুব ভাল করে রামায়ণ পড়লে দেখা যায় রুদ্র তখনও মূল সারির দেবপদ অর্জন করেনি। তিনি তখনও যেন উড়ে এসে জুড়ে বসা প্রকৃতির যাকে অন্যান্য সাধারণ গোত্রের দেবতাদের সঙ্গেই সম্মান পেতে হয়(যদি উত্তরকান্ড হয় প্রক্ষিপ্ত। পুনশ্চ, এ প্রসঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করা যাবে একদিন)। উমাপতি যে বিস্তীর্ণ সমাজের আরাধ্য ছিলেন তার অঙ্গ হয়ে ওঠেননি বিশ্বামিত্র, হয়ত এ উপমা তারই প্রতীক।
মহাকাব্যিক সমস্ত চরিত্রই ধূসর; বিচিত্র তাদের গতি প্রকৃতি। সেই গতিপথে অনায়াসে বিচরণ করেছে লেখকের কলম। সার্থক! অপেক্ষায় থাকলাম পরবর্তী পর্বের।
কালদক্ষিণা মানে কালকে দেওয়া দক্ষিণা কিংবা কালের নেওয়া দক্ষিণা। আচ্ছা, কাল মানে কী? গতকাল, ভূতকাল, আগামীকাল, ভবিষ্যৎকাল নাকি সব কালের শেষ মহাকাল? কাল মানে সময়। কাল মানে শেষ। এই বইটির নাম নিয়ে একটা কৌতুহল থেকেই যায়। কে দিচ্ছে এই কালদক্ষিণা? বৈশ্রবণ নাকি মন্দোদরী? মীণাক্ষী নাকি অঞ্জনা? জাম্বুবান নাকি হনুমান? এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে এই বইতে।
বর্তমানে পৌরাণিক কাহিনীগুলোর বিনির্মাণ আর পুনর্কথনের একটা চলন চলছে। সেইখানে এই বইটা যেটার শীর্ষকে লেখা আছে অন্য রামায়ণ, সেটা কিভাবে অন্য? কিভাবে আলাদা অন্য বইয়ের থেকে? রামায়ণ মানে তো সেই রামায়ণ, সেই সীতা, সেই রাবণ। আমার এক বান্ধবীর দাদু বলতেন “এক থে রামান্না, এক রাবণন্না। এক নে দুসরে কী নার চুরাই। দুসরে নে উসপর কী চড়াই। কহানী বস ইত্তি সী। ইসীপর বাল্মিক লিখিস পোথন্না।” কিন্ত সত্যিই কি রামায়ণের কাহিনি এত সহজ, এত সরল? নাকি এর প্রতিটি ঘটনার পেছনে লুকিয়ে আছে আরও অনেক ঘটনার ঘনঘটা, আড়ালে আছে আরও ইতিহাস যাকে আমরা আজ ভুলে গেছি?
সমাজ মাতৃতান্ত্রিক থেকে পিতৃতান্ত্রিক হয়ে উঠছে। রাজ্যের উত্তরাধিকার রাণীর হাত থেকে সরে রাজার হাতে যাচ্ছে। যোগ্যতার চেয়েও বেশী প্রাধান্য পাচ্ছে জন্ম। শক্তিশালী নিজের স্বার্থের জন্য চোখ বন্ধ করে রেখেছে। ক্ষমতাবান নিজকৃত পাপকর্মের দায় গোপন করছে। আর্য অনার্যের ভেদ ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে। এমনই এক উত্তাল সময়ে পুরাতনকে ভেঙে নতুনের সৃষ্টির নির্দয়ী আনন্দে মেতেছে এক পরমজ্ঞানী, নিজের শিষ্যের প্রাণ নিতে যার হাত কাঁপে না, ধর্ষনে যে তৃপ্তি লাভ করে। একে একে ধ্বংস হচ্ছে প্রাচীন রাজ্য, শেষ হয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যশালী গোষ্ঠী, তবুও ঐক্যবদ্ধ হতে পারছে না কেউই। পুরোনো বিদ্বেষ, ক্ষুদ্র স্বার্থ প্রাচীর হয়ে দাঁড়াচ্ছে সবার মাঝে।
এই লেখাতে নায়ক রাবণ নয়, হনুমান নয়, কেশরী নয়, অঞ্জনা বা তারা নয়। নায়ক হল স্বয়ং কাল যে নিরপেক্ষভাবে আদায় করে চলেছে নিজের দক্ষিণা, কারুর ক্ষেত্রে প্রাণ নিয়ে তো কাউকে প্রাণদান করে।
এক অসম্ভব সমান্তরাল জগত সৃষ্টি করেছেন লেখক শব্দ দিয়ে! আজ শেষ করলাম কালদক্ষিণা এবং আজ থেকেই শুরু হল অপেক্ষা এই বইয়ের পরবর্তী অংশের।
এই বইয়ের সেরা অংশটি হলো যুদ্ধের বর্ণনা। তার জন্যই তিনটি তারকাচিহ্নে অলঙ্কৃত করলাম।
সমস্যার জায়গা হলো এই বইয়ের ভাষা। লেখক সাধু ও চলিতের মধ্যে যে কোনো একটি চলনে মনঃস্থির করতে পারেন নি। সংস্কৃত তথা তৎসম শব্দের সাথে অসংখ্য কথ্য চলিত একই বাক্যে ব্যবহৃত হওয়ায় শ্রুতিকটু হয়েছে। উদাহরণ "চেপে যাওয়া" কথাটি ব্যবহৃত হয়েছে বিশ্বামিত্রের মুখে, ঋষিলোকে! কিছু শব্দের বানান ও প্রয়োগ ভুল। উদাহরণ, মাকড়শার সাধুভাষা লূতা, লেখক সর্বত্র মাকড়শাকে লূকা লিখেছেন। বাংলার বেনেবৌ পাখিকে প্রাচীনকালে কাঞ্চনপক্ষী বলা হতো, লেখক তার চলিত বাংলা নামকে আক্ষরিক অনুবাদ করে করেছেন, বণিক বধু! এরকম আরো কিছু ত্রুটি ও মূদ্রণপ্রমাদ চোখে পড়লো।
ব্যক্তিগতভাবে, আমার অবশ্য আর একটি সমস্যার জায়গা আছে, তা হলো প্রাচীন কাহিনীর চরিত্রগুলিকে মূল উৎস থেকে নিয়ে তাদের আমূল পরিবর্তন। যেকারণে আমি আমিশ ত্রিপাঠীর বইয়ের রসগ্রহণে ব্যর্থ। কিন্তু বিনির্মাণ কথাটিকে মাথায় রেখে সেই পরিবর্তনগুলিকে মেনে নিতে চেষ্টা করলেও, অনেক ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হয়েছি। যেমন কার্তবীর্য্য অর্জুনের চরিত্র চিত্রণ আমায় বিরক্ত করেছে, জাম্ববানের স্বরূপ আমায় স্তম্ভিত করেছে।
কিন্তু এই সমস্ত ত্রুটিগুলিকে উপেক্ষা করে বইটি উপভোগ করাই যায়। বইটি যথেষ্ট উত্তেজক এবং মনোগ্রাহী। লেখকের প্রথম প্রচেষ্টা, সেকথা মাথায় রেখে, ভবিষ্যত উদ্যোগের জন্য শুভেচ্ছা রইলো।