(এটি ‘ছেলেদের মহাভারত’ এর রিভিউ নয়। কেন পড়েছি তা নিয়ে বিতং আলাপের শেষে কেন এর রিভিউ করা কঠিন, তা নিয়ে অল্প কথাবার্তার লিখিত রূপ।)
উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী কি বিশাল একটা দায়িত্ব নিয়েছিলেন! মহাভারতকে কিশোরদের উপযোগী করে লেখা কারো জন্যই সহজ হবার কথা না। আর তিনি যে শুধু তা করেছেন তা না, লিখেছেনও সহজতম ভাষায়।
এর আগে মহাভারত পড়ি নি। সাহসে কুলোয় নি। মনে হতো যে শুরু করলেও শেষ করা হবে না। কোন একটা কারনে যখনি পড়তে চেয়েছি, রাজশেখর বসুরটাই পড়ব ভেবেছি। কিন্তু, কবে জানি কি মনে হওয়ায় উপেন্দ্রকিশোরেরটা কিনেছিলাম। আর গতবছর শুরু করেও অন্য বইয়ে ঢুকে গিয়ে আর শেষ করি নি। শুরু করার আগে আরো কারন ছিল না পড়ার। তার মধ্যে একটা ছিল, এটা ভেবে নেওয়া যে এই আজগুবি কাহিনী হয়তো ভালো লাগবে না! কি ভুলটাই না ভাবতাম।
শেষমেশ আজকে মহাভারত পড়ে শেষ করলাম। আর তা জরুরীও হয়ে পড়েছিল। কারন, উপমহাদেশীয় সিনেমার কাহিনীর গতিপ্রকৃতি আজব ঠেকতো একটা সময়ে, বিশেষ করে প্রথম প্রথম ইউরোপীয় ছবির প্রতি আকৃষ্ট হবার পর। যতো দিন যাচ্ছে, ততো নিজের এই আকর্ষনের পিছনের কিছু অপছন্দের কারন বের হচ্ছে। মনে হচ্ছে, তাবৎ পৃথিবীর মানুষের মতো সাদা চামড়ার লোক যাই করে, তা নিয়েই যে একটা অটোমেটিক ভক্তি শ্রদ্ধা আমাদের মধ্যে চলে আসে, তা আমার মধ্যেও এসে পড়েছিল! যা আসলে কাজের কিছু না। অন্ধ করে তোলে এই মনোভাব। এই অন্ধত্বের জের ধরেই মনে হয় আমরা এলিজাবেথের মৃত্যুতেও শোক প্রকাশ করে বসি! পর্দার সবকিছুতে পরিপাটিত্বই যেন মূল দাবি হয়ে পড়েছে এর ফলে। নিজেদের জীবনের সাথে মিলুক না মিলুক, ভাবতে ভালোবাসি যে আমরা মনে হয় পর্দার ঐ সাদা চামড়ার লোকগুলোই! নিজেদের সবই এই কারনে অসহ্য লাগে অনেকের এই ভেবে যে সত্যি সত্যি কেন আমরা ‘এলিট’ জাতের অংশ হয়ে জন্মালাম না!
এসব ইউরোপীয় সভ্য লোকদের একজন কোন এক সময়ে সত্যজিতের ‘পথের পাঁচালী’ দেখতে গিয়ে সিনেমাটির চরিত্ররা হাত দিয়ে খাবার খাচ্ছে, এই দৃশ্য সইতে না পেরে পেশায় সমালোচক হয়েও সিনেমাটি শেষ করতে পারেন নি। ঘিন্নাপিত্তির জয়জয়কার বিষয়ক এই ঘটনার উল্লেখ করেছেন সত্যজিৎ রায় নিজেই, তাঁর Our Films, Their Films এ।
তাই ভাবলাম শুরু থেকে শুরু করা দরকার। এতো সিনেমায় এতো রেফারেন্স থাকে মহাভারতের, সেগুলো পুরোটা ধরতেও এটা পড়া ফরজ হয়ে পড়ছিল। আর বই বাদে যা ভালোবাসি, যা নিত্যসঙ্গী, তা সিনেমাই। তাকে আরো বুঝতে ও গভীরভাবে ভালোবাসতে নানা বিষয় পড়ালেখা বেশ সাহায্য করে।
নিজের চিন্তাভাবনার শুদ্ধিকরনের আরেকটি ধাপ হিসেবেই মহাভারত পড়লাম। জানি না, মনকে কতোটা কলুষমুক্ত করতে পেরেছি। কিন্তু, পড়ার আগেই আসলে অনেক কিছু নিয়ে ‘ছি ছি’ করার একটা যেই হালকার উপর ঝাপসা প্রবনতায় আস্তে আস্তে জড়িয়ে যাচ্ছিলাম, তাতে পুরোপুরি নিজেকে হারিয়ে ফেলার আগেই বের হয়ে এসেছিলাম। সে কারনে, মনে মুগ্ধতার উপলব্ধি সংক্রান্ত কোন পূর্বশর্ত ছিল না। আর মনের এই অবস্থাই ‘মহাভারত’ পড়ার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত, তা বুঝেই পড়ার আগ্রহ বেড়ে গিয়েছিল। এর আগের অবস্থায় থাকলে আঁটো মন যেসব প্রশ্ন করতো, অনুভব না করেই, তা মহাভারতকে অন্তত উপভোগ করতে দিতো না।
মহাভারতের রিভিউ হয়? ঠিক জানি না। কিন্তু, পৌরানিক এই উপাখ্যানের জায়গায় জায়গায় সেক্সিজমের প্রবল প্রতাপ মনকে অবশ্যই ক্ষুন্ন করে। যদিও এটা আশা করা উচিৎ না যে এতে তা থাকবে না! আর ভেবে নেওয়া উত্তম যে মুনিঋষিদের জন্য নারী বিষয়ক কল্পনায় যা এসেছে এখানে, সেটাই স্বাভাবিক। কারন, সময়ে ফিরে গিয়ে ব্যাসদেবকে নারী আর মানুষ যে আসলে একই বিষয়, তা তিনি কেন তখন বুঝে এসময়ের জন্য যুতসই কাহিনী ফাঁদেন নি, তা নিয়ে অভিযোগ করা যায় না। আর এখনো যে সেক্সিজম সাহিত্য ও বাস্তবজীবন থেকে পুরোপুরি মুছে গেছে, এমনও না। সুতরাং, অপহরণ করে বিয়ে করা যে বীরের কাজ বা দ্রৌপদীর নিজের ইচ্ছা অনিচ্ছা চুলোয় ফেলে দিয়ে পান্ডবদের পাঁচজনকেই স্বামী হিসেবে গ্রহণ করতে বাধ্য হওয়া, এসব পড়তে গিয়ে ঠিকই বিরক্ত লাগে। বাস্তবেও এখনো মেয়েদের নিয়ে এসব চিন্তা প্রকাশে বেশিরভাগ মানুষের কোন দ্বিধায় না থাকা একই রকম বিরক্তির উৎপাদন করে। অর্জুনের যুদ্ধং দেহী মনোভাবও বেশ অসহ্য। কুরুক্ষেত্রর পুরো অংশটাই পড়ে মনে হয়েছে এদের আসলেই জীবনে আর কিছু নাই! যুদ্ধটা না করলে এরা যে অকর্মাই, তা কাজের অভাবে বুঝতে বাকি থাকতো না। তাও ভালো যে এরা কাল্পনিক চরিত্রই ছিলেন। বাস্তবেও কুরুক্ষেত্রর যুদ্ধ মহাজরুরী, এটা কিছু কিছু দেশ ভেবে যে যুদ্ধ থামাচ্ছে না, তা ভেবে কষ্ট পেলেও রক্ত গরম কৌরবদের প্রাথমিক পরিণতি একটু শান্তি দেয়। চিরন্তন না হোক, বাস্তবে ঐ ক্ষণস্থায়ী পরিণতির দেখা মিললেও আসলে খুশি হবার কারন পেতাম।
শীঘ্রই উপেন্দ্রকিশোরের ‘ছেলেদের রামায়ন’ পড়ে ফেলতে হবে। হ্যা, মহাভারতের মতো আমি সেটা নিয়েও সবার মতোই স্পয়লার খেয়ে বসে আছি। তাও, এটা পড়ার পর ওটা না পড়ে থাকাটা অন্যায় হয়ে যাবে।