ধরুন যদি আপনাকে সময় এক ধাক্কায় ফিরিয়ে নিয়ে যায় অচেনা কোনও এক অভিশাপের শিকড়ে... অথবা আফ্রিকার গহীন কোনও অরণ্যে যদি আটকে পড়েন অজান্তে... স্মৃতিরা ফিরিয়ে দতে পারে না কি কোনও ফেলে আসা মৃত জীবনকে? এক ঝটকায় হারিয়ে যাবেন নাকি মহাকাশে? আআবার ঠিক তার পরেই দেখতে পাবেন তীব্র ষড়যন্ত্র অথবা লোভ কীভাবে বদলে দিচ্ছে আমাদের সুখের জীবন। কেমন হবে যদি কয়েক দশক পর খাবারের জন্যে, বেঁচে থাকার জন্যে লড়াই করতে হয়? কখনও মিশরের খনসু দেবতার মন্দির, কখনও বা বেনারসের ঘাটে মিলমিশ ঘটে যাবে ইতিহাসের সঙ্গে পুরাণের, মিথের সঙ্গে বাস্তবের, জীবনের সঙ্গে কল্পবিজ্ঞানের। রাইটার্স ব্লক থেকে বেরোনোর অদ্ভুত উপায়ের খোঁজ কোথায় নিয়ে গিয়ে ফেলবে শেষ অবধি? কীভাবে পাবেন এলিক্সির অব লাইফের খোঁজ?
এরকমই রহস্য-রোমাঞ্চ-অলৌকিক-কল্পবিজ্ঞান ঘরানার ২৯টি গল্প নিয়ে বিভা পাবলিকেশনের এই সংকলন “আবছায়া”।
গল্প শুনতে ভালোবাসেন? সেও আবার, ভয়ের গল্প? তাহলে 'মিডনাইট হরর স্টেশন'-এর "নাম তো সুনা হি হোগা।" ইদানীং এই "রূপে তোমায় ভোলাব না, শ্রুতিরূপে ভোলাব" মাধ্যমের তালিকায় যুক্ত হয়েছে 'থ্রিলারল্যান্ড' নামক একটি ইউ.টিউব চ্যানেলও। সেটিকেও নিশ্চয় চিনবেন আপনারা। তবে এ-কথা কে না জানে যে এমন অডিও চ্যানেলের প্রাণভোমরা হলেন বাচিক শিল্পী— যিনি ফুটিয়ে তোলেন "পণ্যে, পিপাসায়, লোভে" দীর্ণ জীবনের রক্তিম বা অন্ধকারময় রূপ। 'মিডনাইট হরর স্টেশন'-এ এই ভূমিকাটি অসামান্য দক্ষতায় পালন করতেন অকালপ্রয়াত দেবযানী ঘোষ। তাঁর স্মৃতিকে সম্মান জানিয়েই এল এই সুমুদ্রিত, সু-অলংকৃত এবং অতীব সু-সম্পাদিত সংকলনটি। এই সুবৃহৎ সংকলনের থিম হিসেবে হরর-কেই চিহ্নিত করা চলে। তবে তার মধ্যেই যে কী বিপুল পরিমাণ বৈচিত্র্যের সন্ধান পাওয়া যায়, তা এই সংকলনটি না পড়লে ধারণা করা কঠিন। মোটামুটিভাবে মানুষকে ভয় পাওয়ানোর যতরকম শাখা ও উপশাখা হতে পারে, তার সবক'টিই কারও না কারও হাতে ধরা পড়েছে এই সংকলনে। এতে মোট উনত্রিশটি গল্প আছে, যাদের অনেকগুলোই বেশ বড়ো আকারের। তার প্রত্যেকটিই বুদ্ধি ও মেধার দীপ্তিতে উজ্জ্বল। আমার নিজের সবচেয়ে ভালো লেগেছে, সেগুলো হল~ (১) মুকুলিকা দাস-এর 'নজর'— বড়ো মায়াবী গল্প এটি; (২) শোভন কাপুরিয়া'র 'স্কাইল্যাব'— সাম্প্রতিককালে আমার পড়া কল্পবিজ্ঞান ও হররের সেরা মিশ্রণ; (৩) অভ্রনীল পাল-এর 'বনজ'— একটি শ্বাসরোধী ফ্যান্টাসি তথা কল্পবিজ্ঞান, যার ভাবনা ও একজিকিউশন আমাকে স্তম্ভিত করে দিল; (৪) অঙ্কন মুখোপাধ্যায়-এর 'কাঁধ'— হররের মধ্যে 'মাকাবর' তথা বীভৎস-রসের প্রয়োগ যে কতটা সুচারু হতে পারে, তার নিদর্শন বলা যেতে পারে এই পরিমিত আখ্যানটিকে; (৫) প্রবীর মজুমদার-এর 'রাইটার'স ব্লক'— স্রেফ দুর্ধর্ষ গল্প, যা আপনাকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ভাবাবে এবং তারপরেও মোচড়ে অ-বাক করে দেবে; (৬) রূপেশ সরকার-এর 'উৎস'— লাভক্র্যাফটিয়ান থিমে আমার পড়া অন্যতম সেরা গল্প; (৭) শাখওয়াতুল ইসলাম-এর 'মায়া'— এই নিটোল হিচককিয়ান গল্পটি পড়ে লেখকের উদ্দেশে কুর্নিশ করতেই হয়; (৮) দেবোত্তম ঘোষ-এর 'কলি'— এক স্মরণীয় ও ধারালো গল্প, এ-ছাড়া আর কিছু বলতে পারছি না; (৯) সৌভিক মণ্ডল-এর 'গিরগিটিটা লাল রঙের'— দুর্দান্ত মনস্তাত্ত্বিক রহস্য গল্প; (১০) মেঘা ভট্টাচার্য'র 'পদ্মচক্র'— এও এক দুরন্ত রহস্য গল্প, যাতে মনস্তাত্ত্বিক ভয় আর অলৌকিকের হাতছানি মিলে-মিশে একাকার হয়ে গেছে; (১১) সায়ক আমান-এর 'ম্যাজিক'— এই বইয়ের সেরা গল্প কি এটিই? হয়তো। তবে এটি যে আলোচ্য সংকলনের সবচেয়ে গভীর অভিঘাত-সৃষ্টিকারী গল্প, এই নিয়ে কোনো সংশয় নেই। (১২) রণদীপ নন্দী'র 'অহিনা'— মুগ্ধ বিস্ময় আর একটা চাপা কষ্ট তৈরি করা এই কাহিনিটি দিয়ে বইয়ের সমাপ্তি হল, এটিই বইয়ের যথাযথ সম্পাদনার নিশ্চিত স্বাক্ষর বহন করে। বিশ্বাস করুন, মূলত নবীন লেখকদের লেখায় সমৃদ্ধ একটি সংকলনে এতগুলো স্মরণীয় গল্প খুঁজে পাওয়া রীতিমতো ভাগ্যের কথা। তাই 'হরর'-এ আগ্রহী হলে এই বইটি আপনাকে যথাশীঘ্র সম্ভব সংগ্রহ করতে অনুরোধ করব। খারাপ লাগবে না বলেই আমার বিশ্বাস। বইটির অলংকরণ যথাযথ হলেও প্রচ্ছদটি অনাবশ্যকভাবে বিকট এবং লাভক্র্যাফট-প্রভাবিত। এর বদলে আরেকটু সংযত, আরেকটু অর্থবহ কিছু থাকলে তা বইয়ের সার্বিক সুর ও তালের সঙ্গে মানানসই হত বলেই আমার ধারণা। অলমিতি।