‘অনুসূর্যকে লেখা রূপকথা’ শিশুকিশোরদের জন্যে লেখা কোনো রূপকথার বই নয়। এটা বড়দের জন্যে লেখা গল্পের সংকলন। তবে পড়ে মনে হতে পারে এ যেন গল্পের ভিতর কবিতাই লেখা হয়েছে। তাই এইসব গল্পকে কাব্যগল্পও বলা যায়।
‘অনুসূর্যকে লেখা রূপকথা’ ছোটগল্পের বই। পড়তে ইচ্ছা হওয়ার কারণ এর নাম। নামের প্রতি আমার বিশেষ দুর্বলতা আছে। অনুসূর্য অর্থ আমি জানি না কিন্তু শুনতে সুন্দর, বলতেও সুন্দর। যে গল্পটা খুব ভালো লেগেছে তার নাম ‘শঙ্খমালার শেষ লাইন’। আমার বোনের নাম শঙ্খমালা হওয়ায় এই শব্দটাও প্রিয়। গল্পটার দ্বিতীয় প্যারা : “শিরোপার সঙ্গে আমার ঘটনা শুরু হয়েছিলো সামান্য কারণেই, তার শিরোপা নামটা আমার ভালো লেগে গিয়েছিলো। আমার হঠাৎ মনে হলো এমন নাম আমি আর কারো শুনিনি আগে।” কোইনসিডেন্সের চূড়ান্ত!
ভায়োলন্স পড়তে আমার ভালো লাগে না। কারোরই লাগে না হয়তো। আমি একটু এড়িয়ে চলার চেষ্টা করি। বইয়ের প্রথম গল্পটাই খুব ধাক্কা দিয়েছে। এখনও মাথা ঝিম ঝিম করছে ভাবতে। আরো কয়েক জায়গায় আছে এমন, সবটুকুতেই কেমন যেন চোখ ফিরিয়ে নিতে হয়। একবার এই ভায়োলেন্ট কিছু পড়তে/দেখতে অপছন্দ করি বলে একজন আমাকে ‘দুর্বল হৃদয়ের অধিকারী’ লেবেল দিয়েছিলেন। তাই হবে হয়তো। ‘যখন গায়ত্রী ছিলাম’ গল্পটা অদ্ভুত। আমি একটা জায়গায় নিতে পারিনাই (সব গল্পেরই দুয়েকটা লাইন নিতে পারি নাই), সেটা আমার অপারগতা। এরকম অনেস্ট, ছুলে ফেলা টাইপ লেখা ভালো লাগে।
শঙ্খমালা গল্পটা মনে রাখতে চাই। নাম নিয়ে ফ্যাসিনেশন দেখতে ভালো লাগে।
I liked the concept of the stories, they have different dimension. I wanna appreciate the writer for the different approach.. he tried something different by not following the trend. Loved the language, so poetic and easily accessible.
১৩টা গল্প নিয়ে বইটা দারুণভাবে সাজানো। কয়েকটা অবশ্য আগেই পড়েছিলাম ফেসবুকে। তবে বইটা পড়ে মনে হলো লেখকের আরো আরো ছোটগল্প পড়তে চাই। কি দারুণভাবেই না গল্পগুলো বলে গেছেন। মাঝেমধ্যে মনে হচ্ছিল কবিতা পড়ছি। আর বইয়ের মাঝে মাঝে লেখকের আঁকা কিছু ছবি বইটাকে আরো দারুণ করে তুলেছে। গল্পগুলোর নামগুলোই অসাধারণ। কয়েকটা গল্প এমন যেন সত্যি সত্যি কাউকে গল্প শোনাচ্ছেন লেখক। "অনুসূর্যকে লেখা রূপকথা" এবং "দীর্ঘশ্বাসের পাখি" আমার প্রিয় দুটা গল্প। তবে "যখন গায়েত্রী ছিলাম" নামটা আমার দারুণ লেগেছে। গল্পটাও তেমন দারুণ। "ঘ্রাণের রং" "লুপ্ত নামের দাগ" "অ্যাসক্লেপিয়াসের মোরগ" "গোলকধাঁধার কবি" এই নামগুলো আর গল্পগুলো পড়তে বেশ ভালোই লেগেছে। কখন যে পড়া শেষ হয়ে গেলো বুঝে উঠতে পারলাম না। তবে বইটা আমার ভালো লাগার বইগুলোর মধ্যে একটা হয়ে গেছে৷
'অ্যাসক্লেপিয়াসের মোরগ' গল্পটা পড়ার সময় মনে পড়ে বুনুয়েল আর দালির 'Un Chien Andalou' এর কথা, যেই শর্টফিল্ম দেখে প্রথম 'surreal' টার্ম টার সাথে পরিচিত হয়েছিলাম। মজার ব্যাপার হচ্ছে গল্পের এক পর্যায়ে দালি নিজেই এসে হাজির হন এবং বলেন, 'শোন পাগলা, আমি মদ খাই না। আমি নিজেই মদ।'
অনেক গল্পেই উঠে এসেছে এই 'surrealism'। পড়ার সময় মাঝেমধ্যে মনে হয়েছে- গল্প নয়, কবিতা পড়ছি। কয়েকটা গল্প কমবেশি ভালো লেগেছে, কয়েকটা নয়। সবকিছু মিলিয়ে চেখে দেখবার মতো।
একটা সময় প্রায় সকলের জীবনে রূপকথা বিপুল গুরুত্ব বহন করতো। এখনো করে। অনেকে হয়তো ব্যাপারটা বুঝতে পারেন না। অথচ শৈশবে তো কি সুন্দরভাবেই না এই উপলব্ধি সবার মাঝে ছিল।
১৪ টি গল্পের সমন্বয়ে এই বইয়ের গড়ে ওঠা। অনুসূর্যকে উদ্দেশ্য করে একটির পর আরেকটি স্টোরি যেন রূপকথার মতই বলা হয়েছে। স্টোরিটেলিঙে জীবনঘনিষ্ঠ বাস্তব আখ্যানের সাথে সাথে জাদুবাস্তবতা সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে। একজন ক্ষমতাশালী গদ্যকারের দেখা পেয়ে গেছি এই আশ্চর্য ভ্রমণের মধ্য দিয়ে।
স্টোরিটেলিং অনেকটা হাতে হাতে উলের কাপড় বোনার মত। লেখক অত্যন্ত দক্ষতার সাথে তাঁর রাইটিং ক্রাফ্টের ব্যবহার করে গল্পকারের চমৎকার দায়িত্ব পালন করে গেছেন। অনুসূর্যকে একটার পর একটা ফেইরি টেইল শুনিয়ে গেছেন।
এই বইয়ের সব গল্প একইরকম ভালো লাগেনি। এরকম কোন বইয়ে হওয়াটা বিরল বিষয়। তবে লেখক, একইসাথে কবি এবং চিত্রকলার শিল্পী হওয়াতে বেশিরভাগ গল্প জায়গায় জায়গায় মনে হয়েছে যেন কবিতার এক ঝিলিক দিয়ে গেল। কিছু গল্প যেন গল্প নয়, চিত্রণ। বাংলা ভাষায় সমসাময়িক অন্যতম সেরা গদ্যকারের লেখার সাথে এই প্রথম পরিচিত হতে পেরে ভালো লাগলো।
কিছু গল্প অবশ্য বেশ ক্লিশে। দশজনে দশরকম মিনিং করতে পারেন। এটা একদিকে খারাপ না। তবে নির্মেদ লেখনীর সাথে প্রাঞ্জল ভাষার কম্বিনেশন ভালো হয়েছে। আমার সবচেয়ে প্রিয় গল্পদু'টোর একটি হল "যখন গায়ত্রী ছিলাম"। এই আখ্যান আমাকে ব্যাপক হাসিয়েছে। লেখকের প্রথম কয়েকটি লেখা অপ্রত্যাশিতভাবে আমার মন খারাপ করে দেয়। যেটি তাঁর লেখনীর শক্তি বলতে চাই। "অনুসূর্যকে লেখা রূপকথা" গল্পটি আমার আরেকটি প্রিয় গল্প। বাংলাদেশ এবং গ্রেট ব্রিটেনের ঐতিহাসিক দুই চরিত্রের ক্রশওভার খুব ভালো লেগেছে।
নির্ঝর নৈঃশব্দ্য বর্তমান সময়ের অন্যতম সেরা গল্পকার। আমার মতে। প্রায় এক দশক ধরে লিখে চলা এই লেখকের অন্যান্য বইয়ের প্রতি আগ্রহবোধ করছি। এই বছর আমার বই ভাগ্য ভালো। একটার পর একটা ভালো বইয়ের মধ্য দিয়ে চলছে ছুটে চলা।
আমার কেন জানি মনে হয়েছে অনুসূর্য এখনো পৃথিবীতে না আসা এক কন্যাসন্তান। নাকি সে চলে এসেছে? আমার এই চিন্তা ত্রুটিপূর্ণ হলে তার লেখনীর সাথে পরিচিত কেউ শুধরে দিয়েন।
বাস্তব জীবনের গল্পগুলো যখন আমরা স্মরণ করি বা স্টোরিটেলিং করি তখন অতীতের ঘটে যাওয়া স্মৃতির অনেক শূন্যস্থান কল্পনা এবং দেখার ভঙ্গিমা দিয়ে আমরা অবচেতনভাবে নিজেরাই পূরণ করে ফেলি। এই কারণে সত্যি ঘটনাও একধরণের রূপকথাই।
এক একজনের জীবন লেখকের ভাষাতেই অনেক রূপকথার সমষ্টি। অনুসূর্যকে লেখা রূপকথায় বাস্তবতা এবং কল্পনা মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।
মানুষের মনের খেয়াল হলো রূপকথা, মানুষের মুখে ফিরে গল্প গুলোও রূপকথা। রূপকথা তো এমনই, কিছু সত্য, কিছু মনের কল্পনার সংমিশ্রণ। শুনতে অদ্ভুত মনে হবে তবুও বিশ্বাস হবে, কল্পনায় ভালোলাগা কাজ করবে৷ . "অনুসূর্যকে লেখা রূপকথা" বই এর গল্প গুলো সুন্দর। অনেকগুলো গল্প, এরমধ্যে বেশ কিছু গল্প পড়ে চমকে উঠেছি, ভালো লেগেছে। মন ছুঁয়েছে, লেখকের কল্পনার মিশেলে মিশে গেছি। আবার কিছু গল্প খাপছাড়া মনে হয়েছে, হয়তো লেখক কি বুঝাতে চেয়েছে বুঝে উঠতে পারি নি, তবে গল্প থেকে কখনো ছুটে যাই নি। অনেকগুলো গল্প আছে, কিছু সত্য, কিছু অভিজ্ঞতা, কিছু কল্পনা, কিছু পাগলামি যেনো সব মিলেমিশে সুন্দর গল্পগুলো দাঁড়িয়েছে। অনুসূর্য যে ঠিক কে, তার খবর বইতে বলা নেই, কিন্তু লেখক তাকে উদ্দেশ্য করে অনেক গল্পই বলে গেছেন। পড়তে পড়তে মনে হয়, ঠিক আমিই যেনো কোনো এক অনুসূর্যকে এই গল্পগুলো শুনাচ্ছি। এর মধ্যে 'নিমফুলের দেশ', 'আবলুস কাঠের চেয়ার', 'ইচ্ছেকুয়া' গল্পগুলো ভালো লেগেছে। . অন্য আরেকটি গল্প, 'ঘ্রাণের রঙ' এখানে একটা ব্যাপার বলতেই হয় গল্পের শুরুটা অনেক সুন্দর, কয়েকটা কথা দিয়ে শুরু যেমন- "আমি স্বপ্ন ও স্মৃতির মধ্যখানে থাকি চিরদিন৷ এটা অনেকটা রোদ ও জ্যোৎস্নার মধ্যবর্তী যে-রূপ, সেই রূপ শরীরে ধরে অনন্তের দিকে যাওয়ার মত ব্যাপার। জন্মান্তরে বিশ্বাস নেই আমার, তবু জাতিস্মর স্মৃতির ভিতর স্বপ্ন জেগে ওঠে, এই জেনে ফুরিয়ে যেতে যেতে পুনর্বার সবুজ হই পাতার ছায়া মেখে।" . আরো কয়েকটি গল্প- 'লুপ্ত নামের দাগ', 'যখন গায়ত্রী ছিলাম', 'অনুসূর্যকে লেখা রূপকথা' এগুলোও ভালো লেগেছে। শেষ গল্পটি হলো, 'চব্বিশ আগষ্টের সন্ধ্যা' এই গল্পের মাঝখান থেকে লাইন গুলো নেয়া - "তোমাকে এখন যে গল্পটা লিখছি, এই গল্প আমার নিজের হলেও তুমি একে রূপকথা ধরে নিতে পারো। কারণ প্রত্যেক মানুষই এক হাজার একটা রূঁঁপকথা দিয়ে তৈরি। আমি যেমন, তুমি ও তেমন।" . এমন সুন্দর করে কথার খেয়াল এঁকে লেখক এই বইতে গল্পগুলো বলতে চেয়েছে সেই অনুসূর্যকে। তাই বলি, মানুষের জীবন ও রূপকথার মতোই৷ হয়তো আমরা টের পাই না৷ টের পেলে তা গল্পে উঠে আসে। স্বপ্ন, বাস্তব, কল্পনা মিলে পাগল পাগল কিছু গল্প।
বইটার চারটা গল্প খুব ভালো লেগেছে, বাকিগুলো মোটামুটি। তবে সব গল্পের ক্ষেত্রেই যে একটা বিষয় নজরে এসেছে সেটা হচ্ছে লেখকের গল্প বলার ধরণ। চিত্রকর ও কবি লেখকের গল্প বলার ধরণেও সুন্দর একটা ঝংকার আছে। সবগুলো গল্প সমান ভালো না লাগলেও পড়তে খারাপ লাগেনি একটাও। কোন কোন গল্পে কিছুটা জাদুবাস্তব আবহও সৃষ্টি করেছেন লেখক। তবে যে বিষয়টা নিয়ে না বললে অন্যায় হবে সেটা হচ্ছে বইয়ের প্রচ্ছদ এবং গল্পগুলোর নাম। এই বইটির প্রচ্ছদ সম্ভবত এ বছরে পড়া বইগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর। গল্পের নামগুলোও কী চমৎকার! শঙ্খমালার শেষ লাইন, ইচ্ছেকুয়া, ঘ্রাণের রং, দীর্ঘশ্বাসের পাখি।
ট্রিভিয়াঃ অনুসূর্য মানে আসলে চাঁদ। অনুসূর্যকে লেখা রূপকথা মানে চাঁদকে বলা গল্প।