যে কোন ফুলের ঘ্রাণ আমাকে ভ্রান্ত করে, পাহাড়ের উচ্চতা আমাকে শেখাতে চায় মাধ্যাকর্ষণ শক্তি। কোন এক নির্জন দ্বীপে পা রাখলে লোকালয়ে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে, লোকালয়ে থাকলে দ্বীপে। সমুদ্র আমার ভাই, ঢেউ আমার বোন। কখনও কখনও গাছের মতো স্থির হতে চাই, পারি না। তবে ঠিকই পাতা ঝরে যায়, পাতা ঝরে যায়। আকাশ হেসে ওঠে বিকট শব্দে, মেঘেরা করে টিটকারি। আমি সে'ই মেঘ, ভেসে যাওয়ার আগে বৃষ্টি হতে ঝরে পড়ি। ঝরে পড়ি এই পৃথিবী থেকে বহুদূরে, কোন এক শূন্যে হারানো অরণ্যে।
নাহিদের শব্দেরা সরল, উপমারা প্রকৃতিমুখী। তার কবিতারা যা নিয়ে বলতে চায়, একশব্দে সেই ব্যাপারটাকে বলা যায় বিষাদ।
কিছু শব্দ সে প্রচুর ব্যবহার করে। ভালো কবিতার ক্ষেত্রে যা হয়, হঠাৎ হঠাৎ সেই শব্দেরা কাজ করে একটা ইমোশনাল পোর্টাল হিসেবে, মানে মুহুর্তে মনে তীব্র আবেগ সৃষ্টি করে।
সেই ফেব্রুয়ারি থেকে পড়ব ভেবেও 'শূন্যে হারানো অরণ্যে' এর কবিতাগুলো পড়তে বেশ সময় লাগলো। বইয়ের প্রথম কিছু কবিতা পড়া হলো কলোরাডোর ছবির মতো ছোট্ট শহর মিকারে। এয়ার বিএনবির বাইরে তখন অঝোরে পড়ছে তুলার মতো তুষার। কাঠের বারান্দায় পায়চারি করতে করতে পড়লাম অন্ধ যাদুকর, পাথরে আঁকা ফুল, ভাষা...
দ্বিতীয় দফায় কবিতাগুলো পড়া হলো আরও কিছুদিন পর। বাড়ি ফিরে এসে। সেদিনও অদ্ভুত এক আবহাওয়া ছিল। সকাল হতেই আচমকা মিহি তুষারে ঢাকা পড়ে গেলো শহর। বসন্তের আগমনের যত আয়োজন ছিল একটা সকালেই তা ঢেকে গেলো নিস্তব্ধতায়। তবে, দুপুর থেকে সূর্য এসে গলিয়ে ফেলল তুষারের সমস্ত শুভ্রতা। আর থেমে থেমে পড়ে যাওয়া কবিতাগুলো— প্রকৃতির সাথে যোগসূত্র, বিচিত্র কিছু বোধ ও একাকীত্বর অনুভূতি জাগিয়ে শেষ হয়ে এলো...
* "ভুল করে ঢুকে পড়েছি কাফকা'র উপন্যাসে। আমার কোন চরিত্র নাই— তবু, সমস্ত ট্রমা আমার দিকে আসে।"
* * "আত্মহত্যা ছিল মায়াকোভস্কির জীবনের সবচেয়ে বড় বিপ্লব।"
*** যুদ্ধে নিহত হলেও ঘোড়াদের কেউ বলেনা শহীদ।
**** "কত ঋতু এলো, কত মেঘ উড়ে গেলো দূরে— বোদলেয়ার তুমি কোন মেঘের কথা বলেছিলে? ভালোবাসার জন্য শুধু বিচ্ছিন্নতা ছাড়া কেউ ছিল না।
"পাতায় পাতায় জোনাক জ্বলে সন্ধ্যাবেলা ছাউনি তলে এসেছে মাটির গন্ধ নিয়ে হয়তো প্রাচীন দূত - অন্ধকারে, হিজল দোলে তাকায়ে দেখি জানলা খুলে হাওয়ার সাথে নাচছে যেন বৃষ্টি ভেজা ভূত"
ধ্রুব ভাইয়ের কবিতা পড়া হয়েছে তার ফেবু-প্রোফাইলে। বেশ কিছু কবিতা মনে ধেরেছে এবং এখনো পড়ি সময়ে অসময়ে। তো ভাবলাম উনার এই কবিতার বইটা পড়া যাক
"আমার শরীরে অস্থির বন চঞ্চল কতো পাখি, দূরারোহ এক পাহাড়ের মতো গ্রাম ছেড়ে দূরে থাকি নিচু হয়ে আসে জলজ আকাশ মেঘে মেঘে ফোটে ফুল ঈথারের বুক অবিরাম জ্বলে গান গায় বুলবুল"
এই বইয়ের অনেক কবিতা আছে যেগুলো মাঝেমাঝে কানে গুনগুন করার মতো, দাগিয়ে রেখে মাঝে মাঝে পড়ার মতো। ঐ কবিতাগুলো দাড়িয়ে রেখেছি মাঝেমধ্যে পৃষ্ঠা উল্টিয়ে পড়ব ভেবে। তবে হা, কবির আরো বহু কবিতা পড়ার ইচ্ছে রাখি
বিভিন্ন পরিবেশে কিছু কবিতা বেশ গুরুত্ববহ হয়ে উঠতে পারে আপনার কাছে৷ কিছু কবিতা আছে যেগুলো বিকেলে বা দুপুরে পড়তে ভাল লাগতে পারে, যেগুলো বেশ একাকিত্ব অনুভব করলে তখন ভাল লাগতে পারে, কিছু কবিতা ভাল লাগতে পারে যখন আপনার হারিয়ে যেতে মন চাইবে, আবার কিছু পড়ে আপনি নস্টালজিক হয়ে যেতে পারেন
"গাছ চেয়েছিল একা থাকতে তার ফুল ছুঁয়ে দেখি নাই, অনেকদিন দেইনি জল তীব্র রোদে শুকায়েছে তার সমস্ত ফল দূর থেকে দেখি ঝরে পড়ছে পাতা গাছ চেয়েছিল একা থাকতে থাকুক সে একা" 🌻
"ভেজা শরীরে ফিরে এলাম ঘরে – আম্মা ছিল চুলার কাছে বসে মিষ্টি আলু পুড়ে যাচ্ছে তাপে – হঠাৎ দেখে আমার গায়ে কাঁদা আম্মা এলো খুন্তি নিয়ে হাতে ছোট হবার কষ্ট গেলো বেড়ে"
তখনো যদি জানতাম--- সুন্দর সমস্ত দিন পড়ে থাকে অতীতে
কবিতা গুলো পড়তে পড়তে একটা ঘোর আসে। সেই ঘোরে হারিয়ে যেতে কবি বাধ্য করেন। বিষাদ মাখানো গলি ঘুপচি তে ঘুরতে ঘুরতে একসময় সত্যি ই মনে হয় "আমার জীবন যেন বিতাড়িত পাখি। যে কখনো দেখেনি সকাল...
বিষন্নতার মোড়কে অদ্ভুত সুন্দর করে সাজানো কবিতাগুলো,তবে একঘেয়ে নয় মোটেও। বিষন্নতাই বোধহয় নাহিদের ট্রেডমার্ক। কারণ এর আগে " মৃত্যুর মতো বানোয়াট" পড়েছিলাম,সেটাও বিষন্নতায় ঢাকা ছিল। যাই হোক,আমি একটা নতুন কবি পেয়েছি,যার কবিতা আমাকে টানে,ব্যাপারটা ভাবতে ভালো লাগছে। বইটা দিয়ে সাহায্য করছে আমার বড় ভাই, তাঁকে ধন্যবাদ।
ওগো ঝড়,প্রিয় চাঁদ আহা সূর্য ---- অনুতাপ জগতের জন্ম থেকে যারা আছো এতো এতো মৃত্যু দেখে ---- তোমরা কী করে বাঁচো?
আমি ঠিক সেই অর্থে কবিতার পাঠক নই। তবে নাহিদের কবিতার সরলতা আমাকে আকর্ষণ করে। তৈরি করে ইল্যুশন। বইয়ের অনেক কবিতাই আছে কোট করার মতো। কবিতার বই হিসেবে জনপ্রিয় হওয়ার উপাদান বইটিতে আছে।
"ঘুলঘুলিতে গিয়া অন্ধ হইলো বক- জগতে যা গোপন আছে সব শিকারের ছক-"
ঘুলঘুলিতে আটকে পড়া শিকারি বকের মতো আমরা নিজেরাই মূলত প্রতিনিয়ত আটকে পড়ি পৃথিবী জুড়ে এঁকে রাখা অজস্র শিকারের ছকে। অস্তিত্বের সংকট তাই হয়ে ওঠে আমাদের জীবনের নৈমিত্ত্বিক অনুষঙ্গ। পাশাপাশি এটাও ঠিক যে মানুষের অস্তিত্ব ব্যপকতা পায় মূলত তুমুল অসহায়ত্বে-বিলাপে-আর্তনাদে।
এইসব বিবিধ সঙ্কটই ঘুঁচিয়ে দেয় মানুষ কিংবা পশুত্বের ফাঁরাক। আমরা শুধু তখন পোশাকে নয়, পরিচিত হই স্রেফ প্রাণী নামে। নিয়তি বা গন্তব্য বলে যাকে ডাকি তাও মূলত হয়ে যায় বড় কোন শিকারির শিকারের ছক।
"মানুষ এমন আজন্ম শিশু- চিৎকার ছাড়া কোন ভাষা নাই যার"
এরকম বেশ কিছু অর্থবহ আবিষ্কার খুঁজে পাওয়া যাবে নাহিদ ধ্রব'র কবিতায়। যা আপনাকে বাধ্য করবে পাঠক হিসেবে নড়েচড়ে বসতে। জীবন বিষয়ক নানাবিধ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে হয়রান হওয়াটা মানুষের কাছে নতুন কিছু নয়। তবুও সেসব কি অপূর্ব বৈচিত্রময় হয়ে ধরা পড়ে কবিতায়। নাহিদ ধ্রুব'র কবিতা পড়তে পড়ত�� আবারো মনে হয় অনুভূতি প্রকাশের ক্ষেত্রে কবিতার চেয়ে বড় ভাষা আর কি হতে পারে।
"মাঝরাতে ডেড টেলিফোন কানে বসে থাকি কোন এক সুসংবাদের আশায়। এইতো জীবন।"
প্রচলিত কারণসমূহের বাইরেও মানুষের সাথে প্রকৃতির শক্তিশালী কোনো একটা যোগসূত্র আছে যা প্রকট করে তোলে একে অপরের মধ্যে বিলীন হয়ে যাবার আকাঙ্খাকে। যাপিত জীবনের বাইরেও কল্পনায় যে আরেকটা জগত নির্মাণ করে নেওয়া যেতে পারে তারও একটা চমৎকার রুপরেখা পাওয়া যাবে নাহিদের কবিতায়।
"এইখানে একদিন তুমিও বেড়াতে এসো- খুব ভোরে হরিণ দেখার নাম করে একা একা হারায়ে যেও অরণ্যে..”
এই বইয়ের বেশীরভাগ কবিতায় ইমেজারি বা দৃশ্যনির্মানের সাথে সাথে রয়েছে চমৎকার এক ধরনের লিরিকাল এসেন্স। যেকারণে সঙ্গীত ও সুর আত্মিক যোগাযোগের সবচেয়ে বড় মাধ্যম, সেই একই কারণে নাহিদের বেশীরভাগ কবিতার সাথেই পাঠকের আত্মিক যোগাযোগ ঘটে যাবে খুব সহজেই।
নিচের কবিতার কথায় ধরা যাক-
ভাই বোনের ঝগড়া থেমে গ্যাছে। নালিশ জানাবে কাকে? একটা বিষণ্ণ বাড়ি আছে পৃথিবীতে- যে বাড়ির মা নক্ষত্রের দেশে থাকে।