মহাকাশের অন্ধকার ভেদ করে ছুটে চলেছে এক নভোযান। গন্তব্য অজানা, পথ অচেনা। যাত্রী আলাদা চরিত্রের তিনজন মানুষ। আদর্শ আর জ্ঞানের পার্থক্যের জন্য তাদের মধ্যে সারাক্ষণ লেগে আছে দ্বন্দ্ব। সেই ঝগড়া থামাতে বা উস্কে দিতে হাজির হচ্ছেন সক্রেটিস, রবীন্দ্রনাথ, হুমায়ূন আহমেদ। কখনো সুফি শেখ ভানু, কখনো আদরের লালন। হঠাৎ হয়ত বেহালা নিয়ে উদয় হলেন আইনস্টাইন। তাহলে মহামতি বুদ্ধই বা বাদ যাবেন কেন? তাঁদের আলোয় চলছে নভোযাত্রীদের যাপিত জীবন। নভোযানও থেমে নেই। চলছে।
-এই ভ্রমণ শেষ হবে কোথায়?
-গন্তব্যহীন মানুষ বা সভ্যতা কি কোথাও পৌঁছাতে পারে?
-যারা মহামানবদের অনুসরণ করে, তারা কি শেষ পর্যন্ত গন্তব্যহীন থাকতে পারে?
পারে না। ওরা একদিন ঠিকই পথ খুঁজতে শুরু করে। খুঁজে খুঁজে পেয়ে যায় অনন্তপুরের ঠিকানা।
❝Space is big. You just won't believe how vastly, hugely, mind-bogglingly big it is. I mean, you may think it's a long way down the road to the chemist's, but that's just peanuts to space.❞― Douglas Adams, The Hitchhiker's Guide to the Galaxy - ❝অনন্তপুর❞ - ❝অনন্তপুর❞ বইটির ঘটনাকাল আজ থেকে অনেক বছর পরের কোন এক সময়ে। সে সময়ে দেখা যায় মৃন্ময়ী, কল্প আর কিটি নামের তিন নভোচারী সায়েন্স কাউন্সিলের একটি মহাকাশযানের যাত্রী। মহাকাশযানের প্রধান যাত্রী মৃন্ময়ী হলেও তার স্বামী কল্প আর মানব-রোবটের সংমিশ্রণের কিটিও মৃন্ময়ীর সেই যাত্রায় সঙ্গী হয়। মহাকাশযান চালানোর মূল ভার কিটির উপর থাকলেও পুরো মহাকাশযানে নানা ধরনের সাহায্য-সহযোগিতার জন্য আরো কিছু নিম্ন-শ্রেণীর কর্মী রোবটও তাদের যাত্রায় সামিল হয়। - প্রথমদিকে এই মহাকাশযাত্রা সুন্দরভাবে চললেও আবেগবর্জিত কিটি তার ভেতরে নানা ধরণের আবেগ সঞ্চালনের চেষ্টা করলে মহাকাশযানের বাকি যাত্রীদের ভেতর বেশ সমস্যা তৈরি হয়। যে উদ্দেশ্যে মহাকাশযানটি চালিত হচ্ছিলো সেই কাজগুলোও ব্যাহত হতে থাকে। এখন মহাকাশ যানে শুরু হওয়া এই সমস্যা সমাধান মৃন্ময়ী আর কল্প কী উদ্যোগ গ্রহণ তা নিয়েই লেখক বিমান ধর- এর রম্য সায়েন্স ফিকশন ঘরানার ❝অনন্তপুর❞ গল্পটি। - ❝অনন্তপুর❞ বইটি মূলত রম্য ধারার একটি সায়েন্স ফিকশন। খুবই হালকা ধাঁচে লেখা বলে সায়েন্স ফিকশন হলেও সাধারণ পাঠকদেরও বুঝতে তেমন সমস্যা হবার কথা না মূল গল্পটি। রম্য এবং সায়েন্স ফিকশন ছাড়াও বইতে রোমান্স আর আর দর্শনের ছোঁয়াও ছিলো, যা কোন কোন সময় গল্পের সাথে খাপ খেয়েছে আবার কখনো চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে মনে হয়েছে। গল্পের মাঝে নানা যুগের কীর্তিমান ব্যক্তিদের হোমেজ দেওয়া হয়েছে, যা মোটামুটি ভালোই লাগলো। - ❝অনন্তপুর❞ বইয়ের চরিত্রগুলোর ভেতরে মৃন্ময়ী বা কল্প প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত একই ধাঁচের ছিলো, আর কোন চরিত্রকেও মনে রাখার মতো লাগেনি। বিভিন্ন সাই ফাই ট্রোপ এবং ভবিষ্যতের হাজার বছরের ইতিহাসের কিছু গ্লিমস দেওয়া হলেও সেগুলো বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়নি। শেষের দিকে গল্পটা কিছুটা ইন্টারেস্টিং দিকে মোড় নিলেও শেষটা প্রেডিক্টেবলই লাগলো। - ❝অনন্তপুর❞ বইটি সাইজে সেবার পেপারব্যাকের মতো হলেও হার্ডকভারে হওয়ায় বেশ কিউট সাইজের প্রোডাকশন লেগেছে। বইয়ের প্রচ্ছদের মূল রহস্য একেবারে শেষে গিয়ে বোঝা যায়। ❝অনন্তপুর❞ বইয়ের প্রতি অধ্যয়ের শুরুতে যে ব্রাশ স্টাইল ব্যবহার করা হয়েছে তা লেখার ভেতরেও অনেক সময় চলে এসেছিল যেখে তেমন ভালো লাগলো না। এছাড়া বইয়ের বাঁধাই, সম্পাদনা ইত্যাদি মোটামুটি ঠিকঠাকই লাগলো। - এক কথায়, বাংলা মৌলিক সাই ফাই এর জগতে রম্য সাই ফাই হিসেবে অবস্থান নেওয়ার একটি চেষ্টা করা হয়েছে ❝অনন্তপুর❞ বইটিতে। যাদের হালকা চালের সাই ফাই ভালো লাগে,তারা খুব বেশি এক্সপেক্টেশন না রেখে ❝অনন্তপুর❞ বইটা পড়ে ফেলতে পারেন।
প্রায় একমাসের মতো সময় ধরে Reader's block-এ আছি। উপন্যাস ,আত্মজীবনী , নাটক, ছোট গল্প সব পড়ার চেষ্টা করেছি। কিন্তু পড়াই কিছুতেই মন বসে না।শেষে হাতে নিলাম ছোট্ট বই 'অনন্তপুর'। এতোদিন যেখানে অন্যবই এক ঘন্টায় এক পৃষ্ঠাও পড়তে পারছিলাম না, সেখানে এই বইটা শেষ না করে হাত থেকে রাখাই আমার জন্য দুষ্কর হয়ে পড়ে। পড়ছি, পড়ছি। কখনো ভ্রু-যুগল কুঁচকে চিন্তার ছাপ মেখে নিচ্ছি, চোখ কপালে তুলছি, কখনো নিজে নিজে হেসে উঠছি, আবার কখনো কল্পর প্রেম দেখে ঠোঁটের বিস্তৃত হাসিটা মুহূর্তে সংকুচিত করে মুচকি হাসি বানিয়ে নিচ্ছি। Science Fiction-এর ভক্ত নই আমি।কিন্তু অনন্তপুর হাতে নেয়া মাত্রই চোখ আটকে গিয়েছিল বইয়ের প্রধান বিজ্ঞানীর নাম 'মৃন্ময়ী'তে। পড়া শুরু করে পেলাম - কল্প আর কিটির কথোপকথনে রম্যের স্বাদ, কল্প-মৃন্ময়ীতে প্রেম, দর্শন, আইনস্টাইন, রবীন্দ্রনাথ, লালন। সবকিছু মিলিয়ে পুরো বইটা জুড়ে এমন একটা ঘোর তৈরী করেছেন লেখক, আমি ডুবে ছিলাম সারাক্ষণ। আমার ঘোর কাটেনি,তবে Reader's block কেটে গেছে।
সাইন্স ফিকশন আমার কাছে অতটা জমেনা। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আমি পড়তে পারিনা। রিডার্স ব্লক হয়ে যায়। এই বইটা তেমন ছিল না। শুরু থেকে একদম শেষের আগ পর্যন্ত আমার ধৈর্য আর জানার আকাঙ্খা দুই ই টিকে ছিল।
কিন্তু শেষে এসে বোধয় লেখক কোনোমতে শেষ করে দিতে চাইলেন। আই ওয়াজ এক্সপেক্টিং কিটি কিছু করবে ভয়ংকর বা আগ্রাসী বাট এই ফিনিশিং নিয়ে ব্যাপক হতাশ।
অনন্তপুর পড়েছি অনেক দিন হলো। কিন্তু কিছু লেখা হয়নি। আমি একা থাকতে ভালোবাসি। আর তাই আমার জগতটাই কাল্পনিক। সায়েন্স ফিকশন আমার কাছে কল্প কাহিনী ই মনে হয়। কিন্তু তবুও একটা অদ্ভুত ভালো লাগা কাজ করে। প্রথম যখন বইটা পড়া শুরু করি অদ্ভুত একটা অনুভুতি হচ্ছিল। তারপর দুদিনে পড়ে শেষ করে ফেলি। মনে হচ্ছিল অনেক দিন পর কেউ একদম আমার জন্য মনের মতো করে বই লিখেছে। এত সুন্দর সাবলীল লেখা অনেক দিন পড়িনি। লেখককে নতুন করে বলার কিছুই নেই। অত্যন্ত যত্নে লেখা বই বুঝা যায়। এভাবেই সবসময় লিখে যাবেন। এবং আমি বিশ্বাস করি আপনি সত্যিই খুব ভালো লিখবেন। শুভ কামনা রইলো।♥️♥️♥️
শেষ করলাম এই বইমেলায় প্রকাশিত Biman Dhar ভাইয়ের অনন্তপুর বইটি। বইয়ের ভেতরে সুন্দর চিঠির জন্য একটা রিভিউয়ের মত কিছু লেখা উচিত বলে মনে হল। তো কিছু বলার আগে জানিয়ে রাখা উচিত, আমি আসলে থ্রিলার বিশেষ করে স্পাই থ্রিলার ছাড়া এখন আর কিছু পড়ি না- বা পড়লেও মজা পাই না। এইজন্য এই বইটির ব্যাপারে আমার মতামত লেখকের আমলে না নেওয়াই ভাল। প্রথমে ইতিবাচক যেটা বলতে চাই, লেখকের লেখার হাত মানে গল্প বলার ভঙ্গি খুবই সাবলীল। একটানা গড়গড়িয়ে পড়া গেছে। প্রচ্ছদ বেশ ভাল লেগেছে, গল্পের সাথে মানানসই। লেখক দাবি করেছেন- উনি এই প্রথম সায়েন্স ফিকশনের মধ্য দিয়ে প্রেম, রম্য, বাঙালি ইত্যাদি এনেছেন। উনার সাথে দ্বিমত, সত্যজিৎ রায়, শীর্ষেন্দু, এমনকি মুহম্মদ জাফর ইকবালের অনেক সায়েন্স ফিকশন বইয়েই আমি প্রেম, রম্য, বাঙালি পেয়েছি। তবে হ্যাঁ- সায়েন্স ফিকশনে দর্শন, কবিতা, এবং হালের চটুল ভাষা এইসব আমি প্রথম এই বইয়েই পেলাম। যাই হোক, পূর্বের সায়েন্স ফিকশন পাঠ থেকে আমি আশা করতেছিলাম যে কিছু একটা ঘটবে। কিন্তু লেখক আসলে কোন ঘটনার প্লট নিয়ে আগান নাই। একারণে আমি একটু আশাহত। গল্পটা আসলে এক আবেগহীন কৃত্রিম মানুষের মানুষকে চেনার অভিযান, মানব দর্শনের দিকে যাত্রা। এই যাত্রাটি অনেক হাস্যরসে ভরিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন লেখক। কিন্তু সত্যি বলতে, আমার অত হাসি পায় নি- অনেকাংশে জোর করে হাসানোর চেষ্টা মনে হয়েছে। এটা আসলে উপন্যাসের ক্ষেত্রে আমি খেয়াল করেছি। ফেসবুকের ছোট্ট একটা পোস্টে একটু হাস্যরস দিলে বেশ মজাই লাগে। কিন্তু উপন্যাসের মত বিশাল একটা জায়গায় শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একইভাবে মজা দেওয়ার মত সাহিত্যিক বাংলা সাহিত্যে বিরল- হাল আমলে কেউ আছে বলে আমার জানা নাই। সব মিলিয়ে, দুঃখজনক হলেও সত্যি- আমার কাছে বইটি সায়েন্স ফিকশন নামের একটি জগাখিচুড়ি মনে হয়েছে। এটা হয়তো পাঠক হিসেবে আমারই ব্যর্থতা। যাই হোক আমার রেটিং হবে- ৩/৫। দুইই দিতাম, কিন্তু ১০৭ পৃষ্ঠাটির জন্য ১ বেশি। ওই পৃষ্ঠায় একটি ব্যাখ্যা আমার বেশ ভাল লেগেছে, আমাকে ভাবিয়েছে। . পুনশ্চঃ লেখকের প্রতি আমার অনুরোধ থাকবে, শীর্ষেন্দুর অদ্ভুতুড়ে সিরিজের মত শিশুতোষ কিছু লেখা। অদ্ভুতুড়ের বইগুলোয় ভূত, এলিয়েন, রাজরাজরা, গ্রাম সব মিলে একাকার আর রসে টইটম্বুর, কিন্তু গুরুতর কিছু নাই- সরল মজার গল্প। এ ধরনের লেখা বাংলাদেশে কেউ লেখে না। লেখকের সেই দক্ষতা আছে বলে আমার বিশ্বাস।
চমৎকার একটি বই। বইটি অজানার উদ্দেশ্যে ধাবমান একটি নভোযানে থাকা তিনটি প্রাণীর মানসিকতা ও আদর্শ নিয়ে লেখা । একজন বিশ্বাস করে সাহিত্য ও দর্শনে। আরেকজন এগুলোকে মনে করে অনুৎপাদনশীল। একজন মনে করে আবেগ ও অনুভূতিগুলোই মানুষের বেঁচে থাকার প্রেরণা। কিন্তু অন্যজন মনে করে এসব আবেগ ও অনুভূতি মানবজাতির উন্নতির পথে প্রধান অন্তরায়। বইটির তৃতীয় চরিত্রটি আবেগ ও বাস্তবতার মধ্যবিন্দুতে। কবিতা ,প্রেম,সাহিত্য,দর্শন এগুলো আমাদের জীবনে কি সত্যিই প্রয়োজন নাকি এসব নিছকই এক ধরনের অনুৎপাদনশীল ভাবনা । এসব প্রশ্নের উত্তরই বলে দেবে বইটি। প্রসঙ্গের খাতিরে লেখক রবীন্দ্রনাথ,সক্রেটিস,সুকান্ত,শেখ ভানু ,আইনস্টাইন প্রমুখ চরিত্রের অবতারণা করেছেন। প্রযুক্তির দ্রুত প্রসারের কারণে আগামী বিশ্বের চিত্রটি কেমন হতে পারে সেটির আভাসও পাওয়া গেছে বইটিতে। আক্ষেপের বিষয় ,বইটিতে লেখক একটি প্রেমের উপাখ্যান তুলে ধরতে চাইলেও সেটা ঠিকভাবে হয়নি। মহাবিশ্বের ছবিটিও যথাযথভাবে তার লেখনীতে ফুটিয়ে তুলতে পারেননি। এছাড়াও কোনো বানান ভুল চোখে পড়েনি। সব মিলিয়ে বইটি পড়ে দারুণ অভিজ্ঞতা হলো।