প্রধানত আট ধরণের ঘটনা যেমন ভয় ও মনস্তত্ব, ভূত ও অলৌকিকতা, রহস্য রোমাঞ্চ, কল্পনা ও বিজ্ঞান, রম্য ও ব্যঙ্গ, প্রেম ও সমাজ, ইতিহাস ও রাজনীতি এবং অভিযান ও পুরাণ এই কয়েকটি ক্ষেত্রের উপর ভিত্তি করে আটজন লেখক গল্পগুলি লিখেছেন। গল্পগুলি নিয়ে আলোচনা করছি।
চেঘাই - নিলয় দে : প্রথম গল্পটি রহস্যরোমাঞ্চমূলক কাহিনী। অনন্ত নামের একজন জওয়ানের হাতে আসে চেঘাই নামে একটি অদ্ভুত রহস্যজনক মূর্তি। এই মূর্তিটি যার কাছে থাকবে তাকে কোনও রোগ, জরা, মৃত্যু স্পর্শ করতে পারবে না। মূর্তিটি পাওয়ার পরে অনেকগুলি বছর কেটে যায় এবং অনন্ত সেনাবাহিনী থেকে অবসরগ্রহণ করেন।অবসরপ্রাপ্ত অনন্তের স্ত্রী একদিন রহস্যজনক ভাবে মারা যান এবং অনন্তের কাছ থেকে চেঘাইয়ের মূর্তিটিও হারিয়ে যায়। ঘটনার কিনারা করতে দিগন্ত নামে একজন ভন্ড সাধুর ডাক পরে। এরপর কি ঘটে? মূর্তির আড়ালে লুকিয়ে কোন গোপন রহস্য? ভন্ড সাধুটি কি খুঁজে বের করতে পারবেন এই মূর্তিকে?
অদ্বিতীয়া - পল্লব হালদার : ব্যর্থ প্রেমিক রঞ্জন হটাৎ করে সুন্দরী অদ্বিতীয়ার মধ্যে তার হারানো ভালোবাসার সন্ধান পায়। তারপর রঞ্জন বিয়ে করে অদ্বিতীয়াকে। তারপর কি ঘটে? রঞ্জন কি সুখী হয় অদ্বিতীয়ার সঙ্গে? নাকি নতুন করে কোনও বিপদ তৈরি হয় যার নেপথ্যে আছে কোনো অলৌকিক, অধিভৌতিক পরিসমাপ্তি? প্রেম ও সামাজিক কাহিনীর উপর নির্ভর করে গল্পটি লেখা হয়েছে।
বেড়ালরা যা দেখে - অভিজ্ঞান গাঙ্গুলি : ডক্টর ব্রিজমোহন সিং নামে একজন প্রবীণ বিজ্ঞানী হটাৎ করে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেললেন। কি কারণে তাঁর হটাৎ এই মানসিক পরিবর্তন সেই নিয়ে তদন্ত শুরু হল। তদন্তের কাজে সরাসরি সহযোগিতা করলেন তাঁর গবেষণার সহকারী আরিফা। কি এমন সত্য উদ্ঘাটন হল যার জন্য ব্রিজমোহন সিং পাগল হয়ে গিয়েছিলেন? এই গল্পটি কল্পনা এবং বিজ্ঞানের উপর ভিত্তি করে লেখা হয়েছে।
হাট্টিমা টিম টিম - অর্ঘ্য দত্ত : বুলি নামের একটি বাচ্চা মেয়েকে কেন্দ্র করে একের পর এক অলৌকিক ঘটনা ঘটতে থাকে। বুলির বাবা মা একের পর এক মনোরোগ বিশেষজ্ঞর কাছে যেতে যেতে হয়রান হয়ে যায়। এমন সময় সোমা কর নামে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞর চেষ্টায় বুলি ক্রমশঃ সুস্থ হয়ে উঠতে থাকে এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন শুরু করে। কিন্ত বুলির এই অসুস্থতা কি শুধুমাত্রই কোনও মনোরোগ নাকি এর গভীরে রয়েছে কোনও লুকানো অলৌকিক ঘটনা? এই গল্পটি মনস্তত্ব এবং ভৌতিক কাহিনীর উপর ভিত্তি করে লেখা হয়েছে।
নাইট হ্যাগ - সুভাষ নীলকণ্ঠ মুখার্জি : হানিশ আর ধবল দুই ভাই হিমাচল প্রদেশে বেড়াতে যায়। বাড়ি ফিরে আসার পরে হানিশদের বাড়িতে ভয়ঙ্কর সমস্ত ঘটনা ঘটতে থাকে। কি জন্য এই ঘটনাগুলি ঘটছে? প্রাচীন কোন দেবীকে জাগিয়ে তুলেছিল হানিশ আর ধবল? কার অভিশাপে হানিশের পরিবারে হটাৎ করে বিপর্যয় নেমে আসে? গল্পটি ঐতিহাসিক তথ্যবহুল এবং বেশ উত্তেজনাপূর্ণ । এই গল্পটি অভিযান ও পুরাণ কাহিনীর উপর ভিত্তি করে লেখা হয়েছে।
ড্রিমল্যান্ড - পবিত্র ঘোষ : ১৯৮৬ সালে এক ভয়ানক পারমাণবিক বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে চের্ণবিল শহর। এই ভয়াবহ বিস্ফোরণের ফলে সেইসময় অনেক মানুষজন মারা যায় এবং পরবর্তী কালেও সেই অঞ্চলে অনেক বিকলাঙ্গ মানুষ জন্ম নিতে থাকে। সেই দুর্ঘটনার স্থান থেকে একটু দূরে একটা শহরে কিছু কাজের জন্য প্রিয়ম নামে একজন আসে। প্রিয়ম এসে কোন ভয়ানক ঘটনার সম্মুখীন হল? এই শহরে যে একবার প্রবেশ করে সে আর বেরিয়ে আসতে পারে না কেন? এই গল্পটি ইতিহাস এবং অলৌকিকতার উপর ভিত্তি করে লেখা হয়েছে।
আগুন পাথর জ্বলে - সোমনাথ আচার্য্য : প্রত্যন্ত গ্রামে থাকেন সালকি মুন্ডা নামের একজন অতিবৃদ্ধ মানুষ। অবসর সময় তিনি একটি ছোট টিলার আড়ালে সময় কাটান। কথিত আছে এই যে গ্রামের ছোট ছোট কিছু বাচ্চারা নাকি টিলার আড়ালে হারিয়ে যায়। যারা হারিয়ে যায় তারা নাকি আর ফিরে আসে না, অথবা ফিরে আসতে চায় না। কি রহস্য লুকিয়ে আছে এই বাচ্চাদের হারিয়ে যাওয়ার পিছনে? আর সালকি মুন্ডা নিজেই কি এই অতিপ্রাকৃতিক রহস্যের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে জড়িয়ে আছেন? এই গল্পটি ঐতিহাসিক এবং রাজনৈতিক কাহিনীর উপর ভিত্তি করে কল্পনানির্ভর লেখা হয়েছে।
ডুমুরফুলির ডোঙ্গারু - রসিক উপাধ্যায় : ব্রিটিশ শাসিত একটি জনবসতি হল ডুমুরফুলি গ্রাম। সেই গ্রামের পুরোহিত নীলমনির স্ত্রী হল নিস্তারিণী। এই নিস্তারিণীর প্রচন্ড ঝগড়া করা স্বভাবের জন্য গ্রামের লোকজন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। একদিন হটাৎ করে নিস্তারিণী উধাও হয়ে যায় এবং সারা গ্রাম জুড়ে অদ্ভুত নারকীয় হত্যাকান্ড শুরু হয়ে যায়। এই হত্যাকান্ডের রহস্য কি? নিস্তারিণীই বা রাতারাতি কিভাবে উধাও হয়ে যায়? গল্পটি ভয়ের গল্প হলেও কিছু কিছু জায়গাতে সুনিপুন ভাবে রঙ্গ ও ব্যঙ্গের পরিমিত প্রয়োগ এই গল্পটিকে আরও বেশি আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
সংক্ষেপে আটটি গল্প সম্পর্কে আলোচনা করলাম। প্রত্যেকটি গল্প খুবই মনোগ্রাহী এবং চিত্তকর্ষক। তার মধ্যে নাইট-হ্যাগ গল্পটিতে ঐতিহাসিক তথ্যের পরিমাণ কিছুটা বেশি হয়ে গিয়েছে বলে আমার মনে হয়েছে। আমার ব্যক্তিগতভাবে যে তিনটি গল্প সবথেকে বেশি ভালোলেগেছে সেগুলি হল হাট্টিমা টিম টিম, ড্রিমল্যান্ড এবং চেঘাই। সকল পাঠকদের অষ্টবসুর অলৌকিক ৮ বইটি পড়ার অনুরোধ জানালাম।
"অষ্টবসুর অক্টো পাশ " বইটি পড়ার পরেই অপেক্ষাতে ছিলাম কবে আবার এই আটটি কলম একসাথে ফিরবে। ফিরেছে অনেক দিন আগেই আমিই অনেক দেরিতে পড়লাম। অবশেষে পড়ে ফেললাম তাঁদেরই আটজনের মিলিত প্রয়াস "অষ্টবসুর অলৌকিক ৮" বইটি। এই বইতে আছে আটটি অলৌকিক কাহিনী। তবে প্রত্যেকটা যেহেতু ভিন্ন ভিন্ন তাই সব গুলো থেকেই পড়ার পরের অনুভূতি গুলো একটু একটু বলব। তাই রিভিউ টা বড়ো হতে পারে। মূল কাহিনীর স্পয়লার দেব না, বইয়ের পিছনে কিছু কিছু বলা আছে কমেন্ট সেকশন এ সেটার ফটো দিয়ে দেব।
১. চেঘাই :- নিলয় দে রহস্য + অলৌকিকতার মিশ্রনে একটি সুন্দর গল্প। এই গল্পটা তন্ত্র মন্ত্র সম্পর্কিত গল্পের একটি ব্যতিক্রম উদাহরণ আর সেজন্যই বিশেষ ভাবে ভালো লেগেছে। গল্পের শেষের টুইস্টটিও দারুন ছিল। লেখকের কাছে দিগন্ত ওঝা কে নিয়ে পরবর্তীতে আরও গল্প লেখার অনুরোধ রইলো।
২. অদ্বিতীয়া :- পল্লব হালদার লেখকের প্রত্যেকটা গল্পেই কোথাও না কোথাও ঠিক সাইকোলজি মিশে থাকবে। ব্যতিক্রম হয়নি এটিও। কিছুটা অলৌকিক কিছুটা মনোস্তাত্তাত্তিক আবার কিছুটা রোমান্টিক সব কিছু মিলে মিশে তৈরী হয়েছে এই গল্পটা। গল্পটা পড়ার পরে একটা কথাই বলা যায় " ওঁহো ফাটাফাটি "। গল্পের শেষ টাও সেরা ছিল শিহরণ জাগানো।
৩. বেড়ালরা যা দেখে :- অভিজ্ঞান গাঙ্গুলী ���টা অলৌকিক কাহিনী বললে অলৌকিক, সাইন্স ফিকশন বললেও হয়ত খুব ভুল বলা হয়না। ভয় জিনিসটিই এই গল্পে একটা নতুন রূপে এসেছে। আপাত ভাবে একটা সাধারণ জিনিসও হয়ে উঠতে পারে ভয়ঙ্কর কিছু, শুধু দেখানোর পার্থক্য তে।বিড়াল দের দৃষ্টি নিয়ে একটু নতুন জিনিস জানতে পেরেছি এই গল্প থেকে। দারুন একটি প্লট। বিড়াল নিয়ে লেখকের লেখা আরও গল্প পড়ার আশায় থাকলাম।
৪. হাট্টিমা টিম টিম :- অর্ঘ্য দত্ত এই গল্পটা এই বইয়ের ভিতরে অলৌকিক এর ভিতেরও একটা অন্য স্বাদের গল্প। প্রত্যেকটা বাবা মা কে যারা এই গল্পটা পড়বেন একটু হলেও তাঁদের সন্তান কে নিয়ে ভাবতে বাধ্য করবে। খুবই সুন্দর এবং বাস্তবধর্মী একটি প্লট সাথে উপস্থাপনাও চমৎকার। পড়তে পড়তে ইমোশনাল করে দেওয়া খুব কম গল্পেই হয় এটা সেই রকমের গল্প।
৫. নাইট -হ্যাগ :- নীলকণ্ঠ মহাভারতের হিড়িম্বা কে নিয়ে লেখা হয়েছে এই কাহিনী। এই গল্পটার উপস্থাপনা টা দারুন লেগেছে। চতুর্থ, তৃতীয়... গল্পের শুরুর দিকটা বেশ ভালো ছিল এবং বুঝতেও সমস্যা হয়নি। শেষে গিয়ে খুবই জটিল লেগেছে। অনেক জায়গা তে যেন অসম্পূর্ণ লাগলো। আর গল্প শেষ হবার পরেও গল্প গড়ে ওঠার গল্প বলে অংশ তে বলা অংশটা দিয়ে মনে হলো যেন আরও জটিল করে দেওয়া হয়েছে।
৬. ড্রিমল্যান্ড :- পবিত্র ঘোষ চেরনোবিল পারমানবিক বিস্ফোরনের কথা আমরা সবাই বইতে পড়েছি। এই গল্পর পটভূমি সেই এলাকা। গল্পটা প্রথম থেকেই রহস্যময় আর শেষটাও শিহরণ জাগানো। গল্পটার ভিতর দিয়ে খুবই সাধারণ জিনিস ও লেখকের বর্ণনাতে হয়ে উঠেছে অসাধারণ।
৭. আগুন পাথর জ্বলে :- সোমনাথ আচার্য অসাধারণ একটা গল্প। এটা লেখার জন্য যে বিস্তর গবেষণা করতে হয়েছে তাঁর প্রমান পুরো গল্প জুড়ে পাবেন।মুন্ডা বিদ্রোহের ইতিহাসের সাথে অলৌকিক মিশ্রনে দুর্দান্ত একটা গল্প। বিশ্বাস আর অবিশ্বাস ঘড়ির পেন্ডুলামের মতো একসাথে দুলে চলেছে এই গল্পে। একবার শুরু করলে শেষ না করে থামা যায়না।
৮. ডুমুরফুলির ডোঙ্গারু :- রসিক উপাধ্যায় নাম থেকেই লেখার পরিচয় পাওয়া যায় এটা সেই রকমের। পুরোটা একটা ভৌতিক রম্যরচনা। লেখকের এরকম হাস্যরস মেশানো ভৌতিক গল্পের আমি নিজেও ভক্ত। গল্পটার প্লট এ নতুনত্ব পাবেন না ঠিকই তবে গল্প বলার স্টাইলে অবশ্যই নতুনত্ব পাবেন। আতঙ্ক + কৌতুক এই দুটোর মিশেলে গ্রাম্য আবহাওয়াতে রচিত একটা দুর্দান্ত কাহিনী।
আগের বইয়ের সাথে একটু একটু তুলনা করা যেতে পারে। প্রথমেই নজরে আসে দাম। আগের বইটি হাতে নিয়ে সত্যিই অবাক হয়েছিলাম এরকম অসাধারণ কোয়ালিটির একটা বই এতো কম দামে কিভাবে সম্ভব (যদিও সেটা অনেক আগে ছাপা হয়েছিল এখন ছাপা হলে ৪৫০ দাম অস্বাভাবিক লাগে না ) । কিন্তু এই নতুন বইটা হাতে নিয়ে দাম হিসাবে ঠিক আছে মনে হয়েছে বর্তমানের অন্যান্য সব বইয়ের হিসাবে। আগের টাতে অলংকরণ ছিল না। এবারের বইটার প্রচ্ছদ টা মোটামুটি লাগলো তবে অলংকরন গুলো খুবই সুন্দর। পেজ কোয়ালিটি, বাইন্ডিং, প্রুফ সংশোধন সবই ভালো। তবে একটা জিনিস চোখে পড়লো অষ্টবসুদের একজন এই নতুন সংকলনে বাদ গেছেন তাঁর বদলে নতুন আরেকজন বসু যুক্ত হয়েছেন।
রহস্য রোমাঞ্চ অলৌকিক কাহিনীর ভক্ত হলে এই বইটি একদম মিস করবেন না। অষ্টবসুদের উপরে চোখ বুজে ভরসা করতে পারেন।
ভালো থাকবেন অষ্টবসুগণ। আপনাদের এই প্রচেষ্টা আরও অনেক দূর এগিয়ে চলুক। আপনাদের পরবর্তী সংকলনের অপেক্ষায় থাকলাম।