শ্রীকৃষ্ণকীর্তন নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে আচমকাই অপহৃত হল তরুণ গবেষক সুকান্ত সেনাপতি। কেন? কারাই-বা অপহরণ করল? প্রবীণ শিক্ষক সোমনাথবাবুর কাছে হাজির হয় সুকান্তর স্ত্রী শর্মিষ্ঠা। সোমনাথবাবু ডেকে পাঠালেন প্রিয় ছাত্র শুভময় ভাদুড়িকে। এবং সুকান্তর অসমাপ্ত কাজের দায়িত্ব দিলেন। সেই কাজে হাত দিয়ে শুভময় বুঝতে পারল সুকান্ত এক আশ্চর্য পুথির খোঁজ পেয়েছে। সেই পুথিই রয়েছে সুকান্তর অপহরণের পিছনে। ধীরে-ধীরে সুকান্তর মতো শুভময়ও জড়িয়ে পড়ল এক জটিল এবং ভয়ংকর জালে। যে ভয়ংকর জাল থেকে বেরিয়ে আসার সূত্র শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের পুথি থেকে দিয়েছে সুকান্ত। ‘আগুন পাহাড়ের পুঁথি’র পর আবার শুভময় ভাদুড়ির থ্রিলার লিখেছেন সিজার বাগচী। ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন রহস্য’-এর টানটান কাহিনি ঘুরে বেড়িয়েছে ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষ থেকে এই সময় পর্যন্ত।
সিজার বাগচী-র জন্ম ১৯৭৭ সালে। দক্ষিণ কলকাতায়। পূর্বপুরুষের বসবাস ছিল অধুনা বাংলাদেশের ময়মনসিংহে। অল্প বয়সে পিতৃহীন। কলেজে পড়ার সময়ে লেখালিখি শুরু। ফিচার, গল্প, প্রবন্ধ, সমালোচনা, চিত্রনাট্য, কথিকা, উপন্যাস। সহজ তরতরে ভাষায় লেখা সব গল্প-উপন্যাসের বিষয়ই আলাদা। এবং তা উঠে আসে রোজকার জীবনযাত্রা থেকে। বড়দের পাশাপাশি ছোটদের গল্পও লিখছেন নিয়মিত৷ নানা পেশায় যুক্ত থেকেছেন। দীর্ঘদিন সাংবাদিকতার চাকরি করেছেন ‘আনন্দলোক’ পত্রিকায়। বর্তমানে ‘আনন্দমেলা’য় কর্মরত৷ লেখালিখি ছাড়াও বাংলার লোকসংস্কৃতি নিয়ে কাজ করতে ভালবাসেন।
এক সময় অন্ধকার যুগের অবসান হয়, আবার জ্বলে দীপশিখা বাঙলা সাহিত্যের আঙ্গিনায়। এবার যে-দীপ জ্ব'লে ওঠে, তা আর কোনো দিন নেভে নি, সে-শিখা ধারাবাহিক অবিরাম জ্ব'লে যেতে থাকে। অন্ধকার যুগের অবসানে নতুন নতুন সাহিত্য রচিত হ'তে থাকে বাঙলা ভাষায়; অসংখ্য কবি এসে হাজির হন বাঙলা সাহিত্যের সভায়। তাঁদের কণ্ঠে শুধু গান আর গান। কবিদের বীণা বেজে ওঠে নানা সুরে। শুরু হয় বাঙলা সাহিত্যে মধ্যযুগ; চতুর্দশ শতাব্দীর দ্বিতীয় ভাগ থেকে। এ-মধ্যযুগের শুরুতেই রচিত হয় একটি দীর্ঘ অসাধারণ কাব্য, যার নাম শ্রীকৃষ্ণকীর্তন। এ-কাব্যটি যিনি রচনা করেন, তাঁর নাম বড়ু চণ্ডীদাস। যিনি আমাদের বাঙলা ভাষার প্রথম মহাকবি। আমাদের প্রথম রবীন্দ্রনাথ।
শ্রীকৃষ্ণকীর্তন সম্পর্কে প্রথম যে ধারণাটুকু আমি পাই তার সবটুকুই হুমায়ুন আজাদের ‘লাল নীল দীপাবলি’ হতে। তারপর এখান থেকে ওখান থেকে ভাসা ভাসা কিছু তথ্য। তার মধ্যে সবচেয়ে আশ্চর্য হতাম এই ভেবে যে, পুরো কাব্যটির পুষ্পিকা অংশটুকু কেন ছিল না! কবির নাম পরিচয় কেন লোপাট করা হয়েছিল! সদুত্তর জানা ছিল না। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন নিয়ে লেখা এই রহস্য উপন্যাসটি পড়ার পূর্বে অবশ্যই আশা করেছিলাম এই ব্যাপারটার একটা তত্ত্ব লেখক দাড় করাবেন। এবং করিয়েছেনও। সেটা খারাপ লাগে নি।
শুভময় ভাদুড়ির এটা দ্বিতীয় রহস্য সমাধান। অ্যান্টাগনিস্ট চরিত্রের মোটিভ খুব একটা জোড়ালো মনে হয় নি। তবে গল্পটির মাঝে মাঝে পারিবারিক আবহ, খানিকটা রোমান্টিসিজম বেশ মন্দ লাগে না। মোটের উপর সময় কাটানোর জন্য আর নিজের খানিক কৌতুহল দমনের জন্য হালকা ধাঁচের এসব উপন্যাস বেশ উপাদেয়। তাই শ্রীকৃষ্ণকীর্তন নিয়ে যাদের সামান্য আগ্রহ আছে তারা এ রহস্য উপন্যাস পড়ে দেখতে পারেন। ভালো লাগবে।
এক নিঃশ্বাসে পড়ে শেষ করলাম সিজার বাগচীর লেখা শ্রীকৃষ্ণকীর্ত্তন রহস্য। এর আগে লেখকের আগুন পাহাড়ের পুঁথি ভালো লেগেছিল। তাই এই বইও পড়ে ফেললাম।
উপন্যাসের গল্পে যদি আসি - শুভময়ের কলেজের বন্ধু সুকান্ত কিডন্যাপড হয়ে যাওয়া থেকেই কাহিনী শুরু। সে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন নিয়ে রিসার্চ করছিল। বড়ু চণ্ডীদাস আসলে কে? মধ্যযুগের বাংলার এই বিখ্যাত পুঁথির পুষ্পিকা অংশ খুঁজে পাওয়া যায়না কেন? এসবই ছিল গবেষণার বিষয়। কিন্তু সুকান্তের অন্তর্ধানের পর তার স্ত্রী শর্মিষ্ঠা কলেজের শিক্ষক সোমনাথবাবুর কাছে পৌঁছায় আর তিনি ফোন করে ডাকেন শুভময়কে। এইভাবে শর্মিষ্ঠা আর শুভময়ের আবার দেখা হয়। কলেজে দুজন ক্লাসমেট ছিল। সোমনাথবাবুর অনুরোধে সুকান্তর অন্তর্ধানের রহস্য সলভ করতে মাঠে নামে সুকান্ত।
এই রহস্যের সাথে আছে প্রেমের সাবপ্লট। ওনার লেখায় প্রেমের আঙ্গেলটা খুব রিফ্রেশিং লাগে। আত্মীয়া কুলুর বিয়েতে কুলুই আত্রেয়ীর সাথে পরিচয় করিয়ে দেয় শুভময়ের। অ্যারেঞ্জড ম্যারেজের আবহে কথাবার্তা চলতে লাগলেও দুজনের দুজনকে পছন্দ হয়ে যায় । এরপর শুভময়ের এই অভিযানে সঙ্গী হয়ে ওঠে আত্রেয়ী।
উপন্যাসের গতি খুব ভালো। পেজ টার্নার যাকে বলে। উপন্যাসের ৬০% পড়ার পর যদিও সন্দেহ জাগে আসল ভিলেইন কে তবুও বেশ ভালো লাগে শেষ অবধি পড়তে। হিংসা, আইডেনটিটি ক্রাইসিস কী ভয়ানক জিনিস তার উপরে আলোকপাত করে উপন্যাস। এছাড়া সেটিং হিসাবে কলকাতা আর বিষ্ণুপুর ভালো লাগে। শুভময়ের সাথে আত্রেয়ী চরিত্রটাকেও বেশ ভালো লেগেছে আমার। সবশেষে বলব, এনজয়েবল রিড!
আগুন পাহাড়ের পুঁথি উদ্ধারের পরে শুভময় ভাদুড়ি এবার শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের পুঁথির সন্ধানে। কলকাতা থেকে কালনা হয়ে বিষ্ণুপুরে গিয়ে রহস্যের পরিসমাপ্তি (তাই হলো কি?) ।
উপন্যাস গতিময়, এবং বড়ু চণ্ডীদাসের প্রকৃত পরিচয় নিয়ে লেখক যে স্পেকুলেশন করেছেন তা বেশ ভালো লাগলো, এবং ভাববার বিষয়ও ।
তবে, ওভাবে জিমেইল হ্যাক (?!) , আর কফি হাউসের ইনিফিউশনের প্রশংসা - এই দুটো একদমই হজম হলো না।
আগের উপন্যাসের তুলনায় এটি বেশী ভালো লাগলো, সাড়ে তিন তারা ⭐
শুভময়ের সাথে আত্রেয়ীর বিয়ে হবে কি? এর পরে কোন রহস্যের সন্ধানে জড়িয়ে পড়তে হবে শুভময়কে? অপেক্ষায় রইলাম...