মহাপুরুষ। এক রহস্য মানব। যাকে কোন যুক্তিতে ব্যাখ্যা করা যায় না। হলুদ পাঞ্জাবী পরে, খালি পায়ে নিজের মতোই তার পথ চলা।
বইপোকাদের মধ্যে এই মহাপুরুষকে চিনেন না এমন পাঠক পাওয়া যাবে না। আমরা হুমায়ূন আহমেদের ভক্তরা তার মৃত্যুর পর যে চরিত্রটির অভাব সবচেয়ে বেশী অনুভব করেছি সেটা এই "মহাপুরুষ"। সেই তাড়না থেকেই এই উপন্যাস "মহাপুরুষ" এর সৃষ্টি।
কেমন হতো এই ২০২০ সালে যদি মহাপুরুষ থাকতো আমাদের মাঝে? সেও কি আমাদের মতোই ভাবতো, নাকি তার স্বভাবসুলভ রহস্যময়তা ধরে রাখতো?
হুমায়ূন ভক্ত লেখক তৌফিক মিথুন তার লেখনীতে একটি মায়াবী জাল বিছিয়েছেন। সেই জাল ভালোবাসার জাল। সেই জাল হলুদ পাঞ্জাবীর, মহাপুরুষের। লেখকের মতে, “সন্তান যেমন গভীর শ্রদ্ধায় বাবার পাঞ্জাবী গায়ে জড়ায়, তেমনি কিছু কিছু চরিত্র, কথা হুবহু উনার মত করেই সাজানোর বা অনুকরণের একটা সূক্ষ্ম চেষ্টা আছে এই বইতে। এই লেখার ঝুঁকি আমি জানি। মানুষের ভালোবাসা পাওয়ার পাশাপাশি গালমন্দও যে জুটবে না, তা না।
যেহেতু কিংবদন্তীর লেখাকে ভালোবেসেই, উনার তৈরী একটা চরিত্রকে অবলম্বন করে ‘মহাপুরুষ’ এর সৃষ্টি। প্রিয় লেখকের প্রতি এ শ্রদ্ধাঞ্জলি আশা করি পাঠক-পাঠিকারা ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতেই দেখবেন।”
নাম: মহাপুরুষ লেখক: তৌফিক মিথুন প্রচ্ছদ: আইয়ুব আল আমিন প্রকাশনী: পরিবার পৃষ্ঠা সংখ্যা: ৮৫ মুদ্রিত মূল্য: ২২৫/-
ভালোবাসা চিরকাল বেঁচে থাকে! কখনো কবিতা হয়ে, কখনো গল্প হয়ে, কখনো স্মৃতি হয়ে, কখনো আবার কারো চোখের জল হয়ে।
— হুমায়ূন আহমেদ
এই নশ্বর পৃথিবীতে কি কেউ চিরস্থায়ী হয়? হয়; শুধু হয় না বরং ভালোমতোই হয়। তাঁরা এমনভাবে স্থায়ী হয়ে যায় যে তাঁদের ভুলে যাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। তেমনি একজন হলেন পাঠকপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ। লাখো পাঠক হৃদয়কে কাঁদিয়ে তিনি পাড়ি জমিয়েছেন না ফেরার দেশে কিন্তু রেখে গেছেন তাঁর বহু সৃষ্টি। তেমনি একটি সৃষ্টি 'হিমু'। হলুদ পাঞ্জাবি পড়ে খালি পায়ে রোদে ঘুরে বেড়ানো, মায়াছাড়া হয়ে বেঁচে থাকার যে প্রতিচ্ছবি হিমু পাঠক হৃদয়ে আঁকিয়েছে তা যে না ভোলার মতো তারই নিদর্শন "মহাপুরুষ"। লেখক যে হুমায়ূন আহমেদের একনিষ্ঠ ভক্ত তা লেখনীতেই ফুটে উঠেছে। হিমুর আদলে গড়া তপু। যে তার বাবার দেখানো পথ অনুসরন করে 'মহাপুরুষ' হওয়ার পথে হাঁটছে।
চারিদিকে নিঃছিদ্র অন্ধকার। কোনো অন্ধকার রাজ্যে হারিয়ে গেছে নাকি ঘুমিয়ে আছে বুঝছে না তপু। কখনও আবার মনে হচ্ছে কেউ মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু কথা হলো সে শত চেষ্টার পরও চোখ খুলতে পারছে না কেন? দূর থেকে বাবার কন্ঠস্বর যেন শুনতে পারছে তপু! কিন্তু বাবা তো তাকে ছেড়ে চলে গেছে না ফেরার দেশে। বাবা তাকে মহাপুরুষ বানাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বাবার মতে সে ফেল মেরেছে। তবুও একটি প্রশ্ন থেকে যায় তপু কি মহাপুরুষ হতে চেয়েছিল?
এই দুনিয়া মায়াময়, যে একবার এই মায়ায় পা দিয়েছে তার রখে নেয়। বাবা তপুকে বারবার সাবধান করতেন। কিন্তু সব মায়াকেই কি অগ্রাহ্য করা যায়? নীলা তার জন্য নীল শাড়ি পড়ে অপেক্ষা করে, বেবী খালা তার জন্য চিন্তায় থাকে, আশেপাশের মানুষ তাকে ভালোবাসে, শ্রদ্ধা করে। তারা যেন তাকে মায়ার বন্ধনে আবদ্ধ করতে চায়। তপু কি মায়ার বাঁধনে বন্দী হবে নাকি হেঁটে যাবে মায়াছাড়া অনন্তের পথে...?
গল্পের শুরুতেই লেখক বলে দিয়েছেন তপুর মধ্যে তিনি হিমুর ছায়া ঢেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। গল্পের শুরু হয়েছে কোমা থেকে তপুর জেগে ওঠা নিয়ে। কিন্তু সে কোমায় কিভাবে গেল তা নিয়ে কিছু বলা হয়নি। এই বিষয়ে কিছু বলা হলে ভালো হতো আমার মতে। গল্পের দুটি চরিত্রের কথা না বললেই নয়; কামাল সাহেব, লোকমান চাচা। লোকমান চাচার কিছু কৃতির কথা পড়ে না হেসে পারি নাই। লাস্ট অংশে কামাল সাহেবের ভূমিকা ভালো লেগেছে। কখনো কখনো মায়ায় জড়িয়ে যাওয়াও বেশ বটে। তবে আমার মনে হয়েছে হিমুর মতো তপু এতও মায়া ছাড়া নয়; জয়নাল সাহেবের প্রতি মায়া, আগ বাড়িয়ে তাকে সাহায্য করা। তবে হ্যা তপু হিমুর প্রতিচ্ছবি এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। লেখকের লেখনী ভালোভাবেই বিষয়টি ফুটিয়ে তুলেছে।
সহজ ও সাবলীল লেখনী। একবসায় পড়ে ফেলার মতো। গল্পের কল্পপট সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। বানান ও বিরামচিহ্নে অল্প কিছু ভুল রয়েছে।