শেক্সপিয়র’র সেই বিখ্যাত উক্তির বাংলা করলে দাঁড়ায় “নামে কী এসে যায়?” আপাতদৃষ্টিতে ঠিক হলেও সবক্ষেত্রে নয় মোটেই। আমাদের প্রত্যেকেরই এক একটা নামের প্রতি অদ্ভুত ভালোবাসা থেকে যায়, বলা ভালো ‘অবসেশন’। কোনো জায়গায় সেই নাম শুনতে পেলেই নিজের অজান্তে মাথা ঘুরিয়ে খুঁজে বেড়াই সেই নামের উৎসখানা। কিন্তু সেই নামে যদি মিশে থাকে কোনো অশরীরীর ভালোবাসা আর অপেক্ষা মেশা দীর্ঘশ্বাস? তখন সেই ‘অবসেশন’ হয়ে দাঁড়ায় সাক্ষাৎ শমনের হাতছানি।
মধ্যবিত্ত পরিবারের চাকুরিজীবী মিহির সরখেল নিপাট ভালো মানুষ। স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে সুখের সংসার। নতুন চাকরিতে জয়েন করার ঠিক পর থেকেই এক যুগ আগের এক অমীমাংসিত রহস্যের অশরীরী কালো থাবা আঘাত হানে মিহির আর তাঁর পরিবারের উপর। সাথে তাঁর অফিসের কলিগরাও পড়েন বিপাকে। জীবন আর মৃত্যুর মাঝে না দেখতে পাওয়া সূক্ষ্ম ব্যবধানে আটকে পড়া এক প্রেমিকার সারল্য মাখা প্রেম, আকাঙ্খা, কামনা, ঘৃণা, প্রতিশোধ ঘুরে বেড়ায় অফিসের দেওয়ালের মাঝে।
কী চায় মিহিরের ‘তিলু’?
অলোকের নামের আড়ালে আলো কি ফেলতে পারবে সায়ন?
নীলাম্বর কি পারবেন এই মহা শক্তিশালী প্রতিশোধউন্মুখ অশরীরীর সংঘে যুঝতে?
সময় বড় কম, ঊষাকালের মধ্যে খুলবে কি এই রহস্যের জট? নাকি একটু একটু করে অদৃশ্য হাত গুটিয়ে নেবে সুতোর শেষ প্রান্ত?
প্রশ্ন অনেক, উত্তর মিশে আছে ‘তেরো নম্বর ফ্লোর’এর অন্ধকার আর পোড়া গন্ধে।
পাঠ-প্রতিক্রিয়াঃ এমন গতিশীল, উত্তেজনাপূর্ণ, রোমাঞ্চকর, রহস্যাবৃত অলৌকিক কাহিনীকে রেটিং-এর বেড়াজালে না বেঁধে সরাসরি চলে আসব বইটির ভাল-খারাপ দিক গুলিতে।
লেখকের ঝরঝরে গদ্য আর টানটান প্লট আপনাকে বাধ্য করবে ঘড়ি দেখা ভুলতে। প্রত্যেক পাতায় ভরপুর উত্তেজনার আবেশে যেই মুহূর্তে আপনি ডুবে যাবেন, ঠিক সেই সময় মনে হবে সে এসে দাঁড়িয়েছে ঠিক আপনারই পিছনে, তাঁর গরম নিশ্বাস কাঁপিয়ে দেবে আপনার বুক; কিন্তু না…, পিছনে আপনি ঘুরতে পারবেন না আর না পারবেন বইটি ছেড়ে উঠতে। এখানেই লেখকের সার্থকতা।
এমন রিয়েলিস্টিক ভৌতিক কাহিনী আজকাল বিরল। সেখানে দাঁড়িয়ে প্লটের সাথে সামঞ্জস্য রেখে অভিষেক চট্টোপাধ্যায় সাজিয়ে গেছেন একের পর এক চরিত্র। প্রতিহিংসার ভাঁজে কখন জড়িয়ে যাবে আপনার দুচোখের অশ্রুধারা, আপনি নিজেও বুঝতে পারবেন না। আরেকটি বিষয় যা না বললেই নয়, তা হল লেখক গল্পটিকে শুধু অলৌকিক জঁনরার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি, অলৌকিকের সাথে এ কাহিনীতে জড়িয়ে গেছে রহস্য, খুন, প্রেম, অনুভুতি আরও অনেক কিছু। তাই লেখকের কথাতেই, “ভূতের নেশা অনেকটা ড্রাগের নেশার মতো। প্রথমে মাথায় চাপে। তারপর সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। এর পর প্রতি মুহূর্তে যেন কোনো অলৌকিক ভৌতিক ক্রিয়াকর্মের দিকে টেনে নিয়ে চলে। ছাড়তে চাইলেও ছাড়ে না।” এই বইটিও তেমনি না ছাড়তে পারার মতো বই।
তবে, ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়েছে বইয়ের প্রচ্ছদ কাহিনীর ঘনঘটার কাছে একেবারেই সাদামাটা হয়ে গিয়েছে।
কাহিনীর লেখা যেমন স্বচ্ছন্দ, ছাপা ও বানানও তেমনই শুদ্ধ।
সব মিলিয়ে বলতে পারি, বেশ একটা গা-ছমছমে ভয়ের ও রহস্যের উপন্যাস পড়তে চাইলে এটিকে আপন করে নিতে পারেন। হতাশ হবেন না।
অলমিতি।