এ এক অন্য দুনিয়ার গল্প। যে দুনিয়া আপনার চেনা দুনিয়া থেকে অনেকটাই আলাদা, আবার অনেক কিছু একই রকম। এ দুনিয়ায় মাটি থেকে অনেকটা উচ্চতায় বাতাসে ভেসে বেড়ায় কিছু ভাসমান ভূখণ্ড। এখানে গল্পের শুরু, যখন সেরকমই একটা ভূখণ্ড বলা নেই, কওয়া নেই, হঠাৎ করে মূল ভূখণ্ড থেকে দূরে সমুদ্রের বুকে অবস্থিত মান্দুব নামের একলা একটা দ্বীপের ওপর এসে ভেড়ে; আর সেই ভূখণ্ড থেকে নেমে আসতে শুরু করে বৃহৎ আকারের ভয়াল দর্শন কিছু পোকা। যাদেরকে দ্বীপবাসী নাম দেয় আসমানের পোকা। এই আসমানের পোকাগুলো কয়েকদিন অন্তর অন্তর একজন-দুজন করে তুলে নিয়ে যেতে থাকে দ্বীপবাসীকে। ইব্রার, যে কিনা এই দ্বীপবাসীদেরই একজন, সকলের দিশেহারা অবস্থায় সেই প্রথম রুখে দাঁড়ায়। শুরু করে সংগ্রাম। আস্তে আস্তে তার সাথে যোগ দেয় অনেকে। সংগ্রামের ঘাত প্রতিঘাতে এগিয়ে যায় গল্প, দ্বীপবাসী খোঁজে পরিত্রাণের উপায়। দ্বীপের লবন ব্যবসায়ী কায়াস হাম্মান আবার ভিন্ন কথা বলে সংকট নিয়ে। এতদিন যাবৎ ভুল উপাস্যের উপাসনা করার কারণেই নাকি এই সংকট। রুষ্ট হয়ে দেবতা আরাহুট এই সংকট পাঠিয়েছেন, সবার উচিত আরাহুটের উপসনা করা। অন্যদিকে, নাইভা রাস্কি, যে কিনা একজন তাম্বুলক্রিয়ক, এই দ্বীপে ভ্রমণে এসে আটকা পড়ে যায় সংকটে। সে দেয় পরিত্রাণের ভিন্ন এক উপায়। বড় ঝুঁকিপূর্ণ সে উপায়। আশিয়া, দ্বীপের বৈদ্যবাড়ির মেয়ে, ভেতরে ভেতরে পছন্দ করে ইব্রারকে। স্বপ্ন দেখে একদিন ইব্রার ওর ভালোবাসা বুঝবে। অসহায় মুহূর্তে সেও নেয় মরিয়া এক সিদ্ধান্ত। দুর্দান্ত অ্যাকশন, কখনও বুদ্ধির পরীক্ষা, কখনও কখনও মুগ্ধ বা অবাক করার মতো তথ্য, জীব, ইতিহাস, উপকথা বা জায়গা—‘দাবনিশ আখ্যান: আসমানের আঁধার’ এরকমই এক উপন্যাস। তানজিরুল ইসলামের পক্ষ থেকে দাবনিশ আখ্যানের প্রথম নিবেদন আসমানের আঁধার। লেখক ও প্রকাশনীর পক্ষ থেকে লেখকের কল্পনায় অভিনব এক যাত্রায় সঙ্গী হতে পাঠকদের সাদর আমন্ত্রণ।
তানজিরুল ইসলামের জন্ম লালমনিরহাটে। এসএসসি রংপুর জিলা স্কুল থেকে আর এইচএসসি ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ, রংপুরে। স্নাতক শেষ করেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের যন্ত্রকৌশল বিভাগ থেকে। বর্তমানে স্বনামধন্য একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন। শৈশব থেকেই লেখালেখির প্রতি আগ্রহ। সায়েন্স ফিকশন, ফ্যান্টাসি ও থৃলার সাহিত্যের প্রতি রয়েছে তার প্রবল ঝোঁক। ‘অনুভূতিহীন’ নামক তার একটি সাইয়েন্স ফিকশন গল্প প্রথম প্রকাশিত হয় কলেজ-ম্যাগাজিনে। এরপরে লিখেছেন বেশ কয়েকটি পাঠক-প্রিয় গল্প ও উপন্যাস, যা তাকে অন্যতম সম্ভাবনাময় লেখক হিসেবে চিহ্নিত করেছে। মার্কিন থৃলার লেখক হারলান কোবেনের ‘টেল নো ওয়ান’ তার প্রথম অনুবাদ গ্রন্থ। ‘প্রজাপতি বসে আছে মাত্রায়’ তার প্রথম মৌলিক সায়েন্স ফিকশন উপন্যাস।
কাহিনী, ওয়ার্ল্ড বিল্ডিং সবই ভালো লেগেছে। ইভেন টুইস্টটাও ভালো। ছিমছাম গতিতে কাহিনী এগিয়েছে। একসময় গিয়ে গতি পেয়েছে। লড়াই, আবেগ, ভালোবাসা, জাদু সবই আছে। চরিত্র গঠনও ভালো। মূল চরিত্র ইব্রার ও সহযোগী রাতাশকে ভালো লেগেছে। বইয়ের ভেতরে গুণী শিল্পী ওয়াসিফ নূরের আর্টওয়ার্ক আলাদা মাত্রা এনেছে। দাবনিশের পরিণতি জানার জন্য পরের বইয়ের অপেক্ষায় থাকলাম। ফ্যান্টাসিপ্রেমী ও সাধারণ পাঠক উভয়েরই ভালো লাগবে।
3.5 Literary, Fall in love with storytelling ability of Tanjirul Islam! He deserves a hats' off for his efforts. লেখনশৈলী তে কিছু একটা আছে, চুম্বকের মতো টানে। 'শো, ডোন্ট টেল' - এই তত্ত্ব অনুযায়ী একদম ১০০% পারফেক্ট! সবকিচ্ছু চোখ এর সামনে দেখতে পাচ্ছিলাম! জটিল,কম্পলিকেটেড ইশ্যুর ডিটেইলিং বা কম্পলিকেটেড ঘটনার গল্প বর্ণনাও খুব সাব্লীল। ভাল্লাগসে আমার লেখকের গল্প বলা আর তার গল্পের ভান্ডার। হাইলি হাইলি রিকমেন্ডেড ফর এনি ফ্যান্টাসি লাভার। নবীন লেখক হিসেবে তাকে এপ্রিশিয়েট করছি আমি।
সবচেয়ে ভালো দিক- এই ধরনের উপন্যাসে যে সমস্যাটা হয়, তাড়াহুরা। এইখানে লেখকের কোনো তাড়াহুরা পাইনি একদম শেষ লাইন অবধি। মনে হয়েছে লেখক নিজেও তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করে লিখেছেন।
তবু, রেটিং এর পেছনে দুটো জিনিস উল্লেখ্য-
1.সংলাপ দুর্বল মনে হয়েছে মাঝে মাঝে বারংবার। কোথাও কোথাও কিছুটা বিরক্তিবোধ এসেছে।
2.মূল চরিত্র ইব্রার চরিত্রায়ন ঠিক আছে, সাথে কিছু পার্শ্বচরিত্রও ভূমিকা রেখেছে, ইনফ্লুয়েন্স করেছে ঠিক আছে। কিন্তু তবু মনে হয়েছে আরেকটু কোথাও জানার ছিলো,কিছু একটা কমতি বা একটু খাপছাড়া। সে কারনে কী না জানি না, কোনো কোনো সময় পারফেক্টলি এক্সিকিউটেড একশান সিনের পর পর গল্প কথনে বা বর্ণনায় আমি মনোযোগ হারিয়েছি বেশ কয়েকবার। উল্লেখ্য- ইব্রা অস্পৃশ ওয়ার্ল্ডে যাবার পরে যখন অস্পৃশ সম্রাটের হেরেমে গিয়েছিলো। বুঝাতে চাইছি, কিছু জায়গায় চরিত্রায়নের বিল্ডাপ বা ঘটনা বর্ণনা দুর্বল লেগেছে।
বাংলায় এপিক ফ্যান্টাসি এখনও হাঁটি-হাঁটি-পা-পা করে এগোচ্ছে। এরকম সময়ে দাবনিশ আখ্যান: আসমানের আঁধার নিঃসন্দেহে দারুণ একটি সংযোজন। আর সচরাচর এপিক ফ্যান্টাসির ক্ষেত্রে যা হয়, প্রথম পর্বটা গোটা গল্পের সূচনা মাত্র। অনেক প্রশ্নের জবাব জানা বাকি রয়ে গেল। ওয়ার্ল্ড বিল্ডিং এবং ম্যাজিক সিস্টেম প্রশংসনীয়।
“When someone tells you a piece of their life, they’re giving you a gift, not granting you your due.” ― Patrick Rothfuss, The Wise Man's Fear - দাবনিশ আখ্যান: আসমানের আঁধার - ইব্রার, মান্দুব দ্বীপ নামক এক দ্বীপবাসী। মাত্র ৫০০ এর মতো অভিবাসী রয়েছে এই দ্বীপে। একদিন এই দ্বীপে নেমে আসে এক উড়ন্ত বিভীষিকা। তাদের দ্বীপের একপাশে হঠাৎ আবির্ভূত হয় এক ভাসমান ভূখন্ড। আর সেখান থেকে তাদের দ্বীপে নেমে আসে একঝাক পোকাসদৃশ প্রাণী।
"আসমানের পোকা" নামক এই পোকাগুলো এসেই উঠিয়ে নিয়ে যেতে থাকে দ্বীপের একের পরে এক অভিবাসীদের। তাই এদের মোকাবিলা করার জন্য গঠন করা হয় এক বাহিনির। সেই বাহিনির প্রধান করা হয় ইব্রারকে। এখন হঠাৎ তাদের দ্বীপে পোকাদের আক্রমণ করার কারণ কি? কিভাবে ভেসে আছে সেই ভাসমান ভূখন্ডটি? আর এইসব কিছুর সাথে "দাবনিশ" নামটি কিভাবে জড়িত? তা জানার জন্য পড়তে হবে লেখক তানজিরুল ইসলামের এপিক ফ্যান্টাসি ধারার উপন্যাস "দাবনিশ আখ্যান: আসমানের আঁধার"। - "দাবনিশ আখ্যান: আসমানের আঁধার" মূলত একটি এপিক ফ্যান্টাসি ভিত্তিক উপন্যাস। গল্পের পুরোটাই এক সেকেন্ডারি ওয়ার্ল্ডে ঘটে। যদিও সেই দুনিয়ার সাথে আমাদের চেনা পরিচিত পৃথিবীর বেশ অনেকটাই মিল রয়েছে। গল্পের প্লট বাংলা ভাষার হিসেবে বেশ ইউনিক। কাহিনি বিন্যাসও প্রথম দিকে ভালোই লাগলো, তবে শেষের দিকটা টিপিক্যাল "হিরো'স জার্নি" টাইপ মনে হয়েছে।
"দাবনিশ আখ্যান: আসমানের আঁধার" গল্পের মূল প্রোটাগনিস্ট ইব্রার। গল্পের কাহিনির সাথে মোটামুটি ভালোই মানিয়ে গিয়েছে সে। গল্পের বাকি চরিত্রগুলোও মোটামুটি চলে, তবে কয়েকটি চরিত্রকে একেবারে ওয়ান-ডায়মেনশনাল মনে হয়েছে এবং চরিত্রগুলোর সংলাপ কয়েক যায়গায় কাহিনি অনুসারে দুর্বল মনে হয়েছে। ফ্যান্টাসি উপন্যাস বলে এখানে বেশ কিছু ম্যাজিকের ব্যবহার চোখে পড়েছে, যা বেশ ইন্টারেস্টিং। গল্পের ওয়ার্ল্ডবিল্ডিং পার্টও বেশ চমৎকার। গল্পের প্রয়োজনে বেশ কিছু ফাইটিং সিকোয়েন্স এসেছে, যেগুলোর কয়েক জায়গায় আরো উন্নত করা যেতে পারতো বলে মনে হয়েছে।
"দাবনিশ আখ্যান: আসমানের আঁধার" বইটির প্রোডাকশনের দিকে তাকালে বইটির দামের তুলনায় এর বাঁধাই, কাগজের মান ভালো মনে হয়েছে। বইটির নামলিপি আর প্রচ্ছদের ফ্রন্ট পার্ট ভালোই, তবে কাহিনি অনুসারে প্রচ্ছদের ব্যাককভারে আরো কাজ করা যেতে পারতো।বইতে বানান ভুল ও টাইপো কিছু দেখলাম, এক জায়গায় প্রোটাগনিস্ট এর নামও ভুল লেখা দেখলাম, ব্যাপারগুলো পরবর্তী সংস্করণে ঠিক করা হবে আশা করি।
"দাবনিশ আখ্যান: আসমানের আঁধার" বইয়ের আরেক উল্লেখযোগ্য দিক হলো গল্পের সাথে ম্যাপ যুক্ত করা। বিদেশি সাহিত্যে এই দিকটা অহরহ দেখা গেলেও ব্যাপারটা বাংলা সাহিত্যে খুব একটা চোখে পড়েনি। তবে ম্যাপের সাথে লিজেন্ড যোগ না করাটা একটু দৃষ্টিকটু লাগলো, যেটা খুব সহজেই করা যেতে পারতো। আর বইয়ের আরেক missed opportunity মনে হয়েছে এর ভেতরের ইলাস্ট্রেশন পার্টকে।"দাবনিশ আখ্যান: আসমানের আঁধার" বইয়ের ভিতরে এত চমৎকার কিছু ইলাস্ট্রেশনের জায়গা থাকলেও সেগুলো বাদ দিয়ে কয়েক জায়গায় খুবই সিম্পল কিছু ঘটনা ইলাস্ট্রেশনের জন্য বেছে নেয়া হয়েছে। সেই ইলাস্ট্রেশনগুলোও দারুন হয়েছে, তবে পার্সোনালি মনে হয়েছে সেই ইলাস্ট্রেশনগুলো না থাকলেও চলতো।
এক কথায়, বাংলা এপিক ফ্যান্টাসির এই উত্থানকালের এক নতুন সংযোজন হচ্ছে "দাবনিশ আখ্যান: আসমানের আঁধার"। যাদের এপিক এবং হাই ফ্যান্টাসি ধারার বই পড়তে ভালো লাগে তারা বইটি পড়ে দেখতে পারেন। এই আখ্যান এর পরবর্তী পর্ব পড়ার অপেক্ষায় থাকলাম।
বাংলায় লেখা ফ্যান্টাসীগুলোর প্রতি অন্যরকম এক্সাইটমেন্ট কাজ করে আমার। এই বইটাও তার ব্যাতিক্রম নয়। হার্ড ম্যাজিক সিস্টেমের এপিক ফ্যান্টাসী, সাথে ম্যাপ ও ইলাস্ট্রেশন যুক্ত করে লেখক বাংলা সাহিত্যে ফ্যান্টাসীর যে এক নতুন যাত্রা শুরু করলেন তার জন্য সাধুবাদ জানাই।
লেখনী বেশ সুখপাঠ্য। চমৎকার বর্ণনাভঙ্গি পড়ে দৃশ্যগুলো চোখের সামনে কল্পনা করা যাচ্ছিলো সুন্দরভাবে। লেখা নিয়ে একটাই অভিযোগ, সংলাপগুলো একটু দূর্বল মনে হয়েছে। ওয়ার্ল্ডবিল্ডিং চমৎকার। এই বইয়ে মান্দুব দ্বীপ এবং অস্পৃশ্য জগতের মাধ্যমে পুরো দুনিয়ার বেশ ছোট একটা অংশ উঠে আসলেও আরো বিস্তৃত দুনিয়ার সংক���ত দেওয়া আছে বইতে। তাম্বুলক্রিয়া নামক ম্যাজিক সিস্টেমটা বেশ জটিল এবং চমৎকার। এর মাধ্যমে রূপান্তর, স্থানান্তর, শমনসহ আরো অনেক কিছু করা যায়।
ইব্রারকে ঘিরেই পুরো বই আবর্তিত। তার জীবনের গল্প ভালোভাবে বলা আছে বইতে, তার সম্পর্কে অনেককিছুই জানা যায়। পার্শ্বচরিত্রগুলোকে আরেকটু ভালোভাবে জানতে পারলে মন্দ হতো না।
যে ম্যাপ আর ইলাস্ট্রেশন নিয়ে সবথেকে বেশি উত্তেজনা কাজ করছিলো সেগুলোই হতাশ করলো কিছুটা। চমৎকার ম্যাপ, কিন্তু সাথে লিজেন্ড না থাকায় পড়ার সময় ম্যাপ ঘুরে দেখে মেলানো যায়নি। ইলাস্ট্রেশনগুলো দুর্দান্ত তবে রাতের বন, জাহাজ, সাগরের চলমান নৌকার দৃশ্য কাহিনীতে বিশেষ কিছু যোগ করেনি। বরং ফ্যান্টাসীর আরো কিছু উপাদান যেমন, তাম্বুলক্রিয়া, সাংকেতিক চিহ্ন বা অস্পৃশ্য জগতের দৃশ্যাবলি থাকলে বেশি উপভোগ করতাম।
পুরো বইটাই বেশ গতিশীল ছিলো। যেই মুহূর্তে যেয়ে গল্প সবচেয়ে আকর্ষনীয় হয়ে ওঠে তখনই বইটা শেষ হয়ে যায়। এ কারণেই পরবর্তী পর্বের জন্য বেশ আগ্রহভরে অপেক্ষা করবো। সবমিলিয়ে ৭-৮ টা বইয়ের সিরিজের শুরু হিসাবে বেশ ভালো একটা বই আসমানের আঁধার।
ওহ, এতকিছুর মধ্যে দাবনিশের কথা ভাবছেন? পুরো সিরিজের নামকরণ হয়েছে যার নামে কী সেই বস্তু? বইটির শেষের দিকে খোঁজ পেয়ে যাবেন দাবনিশের।
বাংলাদেশে ফ্যান্টাসি জনরাটা এখনো বাচ্চা। ঠাকু'মা'র ঝুলি থেকে শুরু করে যে রিচ একটা লোককথা এবং রূপকথার ভান্ডার আছে, সেটাকে বাদ দিয়ে হিসেব করলে অবশ্যই। তবে সেটাও দিব্যি বড় হয়ে যাচ্ছে দেখতে দেখতে। সম্প্রতি এই জনরায় 'আ ব্যাচ অব ফ্রেশ রাইটারস' এসে যোগ দিচ্ছেন, প্রত্যেকেই ভালোরকম প্রস্তুতি নিয়েই নামছেন এবার, আর এই সেকেন্ড এইজের শুরুর একটা বই বলা যেতে পারে 'দাবনিশ আখ্যান'কে।
যা আমাকে বইটার প্রতি আগ্রহী করেছিল : প্রথম বাংলা ফ্যান্টাসি যেটায় ম্যাপ যোগ হয়েছে। হাই-এপিক ফ্যান্টাসি জনরা। এমন একজন লেখকের হাত দিয়ে এসেছে যিনি ডেব্যুতেই মাত করে দিয়েছিলেন (প্রজাপতি বসে আছে মাত্রায়, সাইফাই, প্রকাশকাল ২০১৮)। বইটার নির্মাণ খুবই ভাল লেগেছিল, তাই যখন জানতে পারলাম তানজিরুল ইসলাম এবার ফ্যান্টাসি লিখছেন, প্রকাশের মাসখানেক আগে থেকে অস্তিরতার শেষ ছিল না! এবং ইলাস্ট্রেশন। প্রচ্ছদ করেছেন ইশমাম, তাতে টাইপোগ্রাফি আবার লর্ড জুলিয়ানের, তার ওপর ভেতরে ইলাস্ট্রেশন করেছেন নূর-ম্যান! একেবারে আরমাডা নেমে গেছে বইটার জন্য!
অল্প কথায় দাবনিশ আখ্যান : - লেখক যেখানে যেয়ে আমার আগ্রহ জাগাতে পেরেছেন, সেখানে বই শেষ হয়ে গেছে। যেভাবে শুরু করেছিলেন ওই দৌড়ে বাকিটাও চললে খুব ভাল হতো। - ম্যাপ আছে, লিজেন্ড নেই। ঘটনাপ্রবাহের সাথে ম্যাপ মেলানোর মজা-টা মিস করেছি। ম্যাপ দেওয়াটাই সার। - ওয়ার্ল্ড বিল্ডিং ভালো। জীবনযাপনের খুঁটিনাটি এসে পড়েছে, আরো অনেকদূর দেখা বাকি। - টার্গেট অডিয়েন্স যে কারা, এ ব্যাপারে আমি সন্দিহান। বাচ্চাদের জন্য তুলে রাখতাম, একটা সিকোয়েন্স তা নাকচ করতে বাধ্য করেছে। - ইলাস্ট্রেশন মুগ্ধ করেছে! - ম্যাজিক সিস্টেমও চমৎকার। তাম্বুলের নিয়ম-কানুন বেঁধে দিলে দুর্দান্ত হবে। (যদি হার্ড ম্যাজিক আনতে চায় আরকি লেখক)।
বিস্তারিত মন্তব্য :
শুরুর কথা, আড়াইশ পেইজের বইয়ের পয়লা দেড়শ পেইজ পড়েছি একটানা। বাকিটা এক সপ্তায়।
শুরুর দৃশ্যেই লেখক পক্ষ-বিপক্ষ বুঝিয়ে দিয়েছেন, একশন শুরু হয়ে গেছে, ভূমিরূপের আপাত ধারণা দেওয়া হয়ে গেছে তক্ষুনি। চমৎকার গতি নিয়ে শুরু হওয়া গল্পটায়, প্রটাগনিস্ট ইব্রারের চরিত্রকে আমরা চিনতে পারি কমবেশি। বাকপটু, নেতৃত্বের গুণসম্পন্ন, আবার খানিকটা অপ্রাপ্তবয়স্ক-ও। সবসময় এগিয়ে যেয়ে লড়াই করা আর ঝুঁকি নেওয়া যেমন তার স্বভাব, তেমন বিপদের আঁচ পাওয়ার ঘাটতিও চোখে পড়েছে কমবেশি। সর্বোপরি মনে হয়েছে, ইব্রার তার সেরা-টায় এখনো পৌঁছেনি, তার ডেভেলপমেন্ট এখনো অনেকাংশে বাকি আছে। ন্যারেটিভে তাকে বারবার 'ছেলেটা' বলে নির্দেশ করাটাও এটাই মনে করিয়েছে, ইব্রার এখনো অপক্ব।
ওয়ার্ল্ড বিল্ডিঙের বৈশিষ্ট্যগুলো আমাদের চেনা পৃথিবীর অনেকটাই সদৃশ, কিন্তু যেন একটা প্রতিচ্ছবি, এটা উপভোগ করেছি। এক জায়গায় রক-পেপার-সিজার খেলার অনুরূপ খেলা দেখানো হয়েছে, আবার অন্যখানে আমাদের পৃথিবীর আমাদের চেনা ফলমূল-কে দেখানো হয়েছে অন্য দুনিয়ার অচেনা খাবার হিসেবে। লেখক বিভিন্ন উদ্ভিদের পরিচয় দিয়েছেন, কোনোটা থেকে পানীয় আসে, কোনোটা ঐষধ, কোনোটা তেল দেয়। তাদের দুনিয়ায় ইতিহাস শেখার জন্য নাট্যশালা আছে, ইতিহাস শোনার জন্য গল্পকাররা আছেন গল্প বলতে। পাঁচশো লোকের আবাসভূমিতেও এদের স্থান আছে যখন, তাদের গুরুত্বটা বুঝাই যায়!
ম্যাজিক সিস্টেমের পরিচয় এসেছে অনেকটা পরে এসে। তাও এই সিস্টেমের ওপর বেশিকিছু নির্ভর করেনি, তবে বুঝতে পেরেছি এই দুনিয়ায় অভাবিত ব্যাপারগুলো এই এক প্রকারের ম্যাজিকের দ্বারাই ঘটে, তাই লেখক হয়তো পরের বইগুলোয় তার বিস্তারিত লিখবেন। 'তাম্বুলক্রিয়া' নামের এই ম্যাজিক করে একটা নির্দিষ্ট জাতি, যাদের প্রতি অন্যান্য জাতিও মুখাপেক্ষী। একমাত্র ম্যাজিক সিস্টেম, সেটা হার্ড ম্যাজিক হলে খুব চমৎকার লাগবে যেহেতু বাংলা ফ্যান্টাসিতে এখনো হার্ড ম্যাজিক দেখা যায়নি।
কিছু জায়গায় সংলাপ পড়ে মনে হয়েছে প্রাপ্তবয়স্কদের ফ্যান্টাসি পড়ছি না, বাচ্চাদের বই পড়ছি। কিন্তু দাবনিশ আখ্যান অবশ্যই বাচ্চাদের উপযুক্ত না। এমনটা একই লেখকের আগের বইয়ে ঘটেনি। এছাড়াও আমার মনে হয়েছে, কিছু লেখকের উচিৎ রোমান্টিসিজম বা ইমোশনালিটি পরিহার করা। বাচ্চাবাচ্চা আবেগী চিন্তাভাবনা বিরক্তি আনে :3
( এই অংশটুকুতে স্পয়লার পেতে পারেন। বই পড়া না থাকলে শেষ প্যারায় চলে যান।)
- আসমাইন, অস্পৃশ, অস্তার, তাম্বুলক্রিয়ক। জাতিগুলোর নিজস্বতা খুব ভূমিকা রাখবে সামনে। বিশেষত, অস্পৃশ! - অনেক প্রশ্ন আর খটকা জমে গেছে। হয়তো লেখকের কাছেও এগুলোর উত্তর নেই, লেখকও এই ব্যাপারগুলোকে কোনোকিছু ভেবে লিখেননি, হয়তো কাহিনীতে ভূমিকা রাখেনা ব্যাপারগুলো, এটা ভেবে হতাশ লাগছে। এই যেমন, একটা দ্বীপ, তার একটা শাসন-সভা আছে, অথচ সৈন্যবাহিনী বা আইন-প্রয়োগকারী সংস্থা নেই। আগে ছিল না। - পোকাদের বিরুদ্ধে কোনো যুদ্ধকৌশল নেই, শুধু মুখোমুখি সংঘাত আছে। তীর-ধনুকের উল্লেখ একটা ইলাস্ট্রেশনে দেখতে পেলেও, তীরের ব্যবহার কোথাও করা হয়নি। ঢাল-বল্লম-বর্ম নাই, যুদ্ধকৌশল নাই আগেই বলেছি। এমন একটা সৈন্যদল গড়ে তুলে সেটাকে কেবল ওয়ান-টু-ওয়ান কমব্যাটে ব্যবহার করা, কেন? কোন সমরনায়ক এটা করাবে? - আর হ্যাঁ, স্বাভাবিক কারণেই দ্বীপে রাত-নির্ভর জীবনযাপন ব্যবস্থা গড়ে ওঠার কথা, যেহেতু পোকা শুধু দিনেই আক্রমণ করে। কিন্তু তার বদলে সবার দিন-নির্ভর জীবনব্যবস্থা গ্রহণ একটু খটকা জাগায়। - আর সবচে আক্ষেপের জায়গা, ম্যাপটা কোনো কাজেই লাগেনি। ম্যাপদুটো স্রেফ ছবির কাজ করেছে, কোথায় কোনটা কি, কোথায় কি ঘটেছে, এগুলো মিলিয়ে দেখার জন্য কোনো নির্দেশক যোগ করা হয়নি ম্যাপে।
সামনেই আরো কিছু ফ্যান্টাসি বই আসছে। লর্ড জুলিয়ানের 'আশিয়ানি' আসছে, আল কাফি নয়নের 'রাজকীয় উৎসর্গ' আসছে। ম্যাপের এই দুর্বলতাটা আশা করি নয়ন ভাইয়ের বইয়ে ঘটবে না, কেননা ইতিমধ্যে প্রকাশিত ছবিতে দেখেছি, স্থানগুলো নামাঙ্কিত করেছেন তিনি। এমনকি সিদ্দী��� আহমেদ-ও ফ্যান্টাসি লেখায় নামছেন, এটা অবশ্যই দারুণ খবর আমাদের জন্য! দাবনিশের মতো বই আরো আসুক, দাবনিশকে ছাপিয়ে যাক, আর দাবনিশের পরের বইগুলো যেন এবারের চেয়ে সমৃদ্ধ হয়, এটুকু চাও নিয়ে পরের বইয়ের অপেক্ষায় রইলাম।
বইটা শেষ করলাম কিছুক্ষণ হলো। কি দারুণ একটা বই! প্রতিটি মুহুর্ত অসাধারণ উপভোগ্য ছিল। ওয়ার্ল্ড বিল্ডিং, চরিত্রায়ন, ম্যাজিক্যাল ইলেমেন্টস, পরিবেশ-পরিস্থিতির অনবদ্য সমন্বয়। লেখনীর চমৎকার ভঙ্গিমায় আমি মুগ্ধ। সিরিজের পরবর্তী বই দ্রুত আসবে,সেই আশা নিয়ে অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় থাকব। লেখক তানজিরুল ইসলামের প্রতি অনেক ভালোবাসা এবং শুভকামনা জানাই <3
কাহিনি সংক্ষেপঃ (ফ্ল্যাপ থেকে) এ এক অন্য দুনিয়ার গল্প। যে দুনিয়া আপনার চেনা দুনিয়া থেকে অনেকটাই আলাদা, আবার অনেক কিছু একই রকম। এ দুনিয়ায় মাটি থেকে অনেকটা উচ্চতায় বাতাসে ভেসে বেড়ায় কিছু ভাসমান ভূখন্ড। এখানে গল্পের শুরু, যখন সেরকমই একটা ভূখন্ড বলা নেই, কওয়া নেই, হঠাৎ করে মূল ভূখণ্ড থেকে দূরে সমুদ্রের বুকে অবস্থিত মান্দুব নামের একলা একটা দ্বীপের ওপর এসে ভেড়ে, আর সেই ভূখণ্ড থেকে নেমে আসতে শুরু করে বৃহৎ আকারের ভয়াল দর্শন কিছু পােকা | যাদেরকে দ্বীপবাসী নাম দেয় আসমানের পােকা। এই আসমানের পােকাগুলাে কয়েকদিন অন্তর অন্তর একজন-দুজন করে তুলে নিয়ে যেতে থাকে দ্বীপবাসীকে। ইব্রার, যে কিনা এই দ্বীপবাসীদেরই একজন, সকলের দিশেহারা অবস্থায় সেই প্রথম রুখে দাঁড়ায়। শুরু করে সংগ্রাম। আস্তে আস্তে তার সাথে যােগ দেয় অনেকে| সংগ্রামের ঘাত প্রতিঘাতে এগিয়ে যায় গল্প, দ্বীপবাসী খোঁজে পরিত্রাণের উপায়। দ্বীপের লবন ব্যবসায়ী কায়াস হাম্মান আবার ভিন্ন কথা বলে সংকট নিয়ে। এতদিন যাবৎ ভুল উপাস্যের উপাসনা করার কারণেই নাকি এই সংকট। রুষ্ট হয়ে দেবতা আরাহুট এই সংকট পাঠিয়েছেন, সবার উচিত আরাহুটের উপাসনা করা। অন্যদিকে, নাইভা রাস্কি, যে কিনা একজন তামুলক্রিয়ক, এই দ্বীপে ভ্রমণে এসে আটকা পড়ে যায় সংকটে। সে দেয় পরিত্রাণের ভিন্ন এক উপায়। বড় ঝুঁকিপূর্ণ সে উপায়। আশিয়া, দ্বীপের বৈদ্যবাড়ির মেয়ে, ভেতরে ভেতরে পছন্দ করে ইব্রারকে। স্বপ্ন দেখে একদিন ইব্রার ওর ভালােবাসা বুঝবে। অসহায় মুহূর্তে সেও নেয় মরিয়া এক সিদ্ধান্ত। কি সেই উপায়? কিভাবে পরিত্রাণ পাবে তারা এই সমস্যা থেকে? জানতে হলে বইটি পড়ুন।
পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ অসাধারণ একটা বই। দারুণ থ্রিলিং পাশাপাশি দুর্দান্ত একশন। পুরোটা সময় টান টান উত্তেজনা বিরাজমান ছিল। ফ্যান্টাসি ইলিমেন্ট গুলোও বেশ ভালো। গল্পের প্রতিটা চরিত্রের প্রতি সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং চরিত্র গঠনও বেশ ভালোভাবে করা হয়েছে। যেহেতু এটা একটা সিরিজ এবং বইটি সিরিজের প্রথম বই তাই বেশ কিছু ব্যাপার এখনো ধুয়াশাতেই আছে। বেশ কিছু মাইন্ড গেম রয়েছে যেগুলো মাথা ঘুরিয়ে দিবে। স্টোরি টেলিং ও খুব ভালো। বইয়ের ডায়লগ গুলোতে লেখকের আরেকটু নজর দেওয়া দরকার। পাশাপাশি নাম নিয়ে বেশ কয়েকবার বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। কয়েক জায়গায় বানান ভুল রয়েছে কিছু। তাছাড়া বইয়ের প্রডাকশন বরাবরই ভালো। বইয়ের পেইজ, বাইন্ডিং সবকিছুই ছিল বেস্ট। বাকি বইগুলোর জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি। লেখকের জন্য শুভকামনা। তো আর দেরি না করে ঘুরে আসুন দাবনিশের অসাধারণ জগৎ থেকে। Happy Reading
বইটি পড়ে লেখকের কল্পনাশক্তির গভীরতা দেখে মুগ্ধ হয়েছি, আসলেই বইটি বাংলা সাহিত্যে ফ্যান্টেসি জনরায় এক অনন্য সংযোজন । বইটির বর্ণনাভঙ্গি ছিলো একদম সাধারণ, সহজ সাবলীল যার কারণে বইটি শেষ করেছি খুব দ্রুতই। ইব্রার, রাতাশ, পুঁচি, নাইভা রাস্কি সহ বেশ কয়েকটা চরিত্র খুব ভালো লেগেছে। বেঁচে থাকার লড়াই, আবেক, ভালোবাসা, অতিপ্রাকৃতের মিশ্রণে লেখকের কল্পনার দুনিয়া আসলেই দারুণ ছিলো। চিরকুটের প্রোডাকশন, ওয়াসিফ নূরের অংকন গুলো বইটিতে অন্য মাত্রা যোগ করেছে। এখন পরের বইটির অপেক্ষায় থাকবো দাবনীশকে নিয়ে জানার আগ্রহে।
হারানোর অনুভূতি ঠিক কেমন হয়? প্রিয় কিছু হারিয়ে গেলে কী হয়? আপনজন ছেড়ে গেলে যন্ত্রণা ঠিক কতটুকু হয়? ভাবছেন আমি হয়তো কোনো রোমান্টিক উপন্যাসের আলোচনা করছি, ব্যাথা-বেদনা শুধু কি সমকালীন উপন্যাসে থাকে? হারিয়ে ফেলার তীব্র অনুভূতি যখন বড়ো দগদগে ক্ষতের সৃষ্টি করে তখন নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ কতটুকুই বা থাকে? হারানোর অনুভূতির বিপরীতে যখন আপন মানুষদের ভর্ৎসনা সহ্য করা লাগে তখনকার অবস্থা ঠিক কেমন হয় জানতে ❛দাবনিশ আখ্যান : আসমানের আঁধার❜ এপিক ফ্যান্টাসি উপন্যাসে আপনাকে ছোটো করে স্বাগত জানাচ্ছি। ছোটো করে স্বাগত জানানোর যে একটা কারণ আছে! যে জগতে আপনাকে স্বাগত জানাচ্ছি সেটা মূলত সমুদ্রে থাকা অনেকগুলো দ্বীপের একটি, নাম—মান্দুব। যে দ্বীপের ওপরে মৃত্যুর কালোছায়া হয়ে ঝুলে আছে এক ভাসমান ভূখণ্ড! যেখান থেকে নেমে আসে বিভীষিকা। বাকিটা উপন্যাসের অন্তরালে...
এই অন্তরালে বিভীষিকার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পাশাপাশি চলে বেঁচে থাকার লড়াই, ক্ষমতার লড়াই, ধর্মের লড়াই, নিজ স্বার্থ ও অস্তিত্ব উদ্ধারের লড়াই। আদতে লড়াইয়ের কোনো নির্দিষ্ট সীমারেখা নেই। যা এই দুনিয়ায় চলে তা অন্য দুনিয়ায়ও চলে। তবে এই লড়াইয়ের আসল ভিলেন কারা জানেন? মনুষ্য নামের হিংসালু জীব। যে জীবের বিরুদ্ধে লড়াই করা অন্য যে-কোনো কিছুর চেয়ে কঠিন। শঠতা ও কূটকৌশলে পূর্ণ এই জীব বড়ো ভয়ানক। এই জীব আপনার অন্তরের, আপনার পাশের, আপনার শ্রদ্ধার, আপনার সম্মানের। ঘরের শত্রু বিভীষণ, এই ঘর আমাদের পৃথিবী আর সেখানের শত্রু আমাদের আপনজন। যা ছিল, যা আছে আর যা সর্বদা থাকবে।
যে ঘরে লড়াই হয় ধর্ম নিয়ে, অধিকার নিয়ে। অধিকার আদায় করার হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেয় ধর্মকে।
➲ আখ্যান—
এ এক অন্য দুনিয়ার গল্প। যে দুনিয়া আপনার চেনা দুনিয়া থেকে অনেকটাই আলাদা, আবার অনেক কিছু একই রকম। এ দুনিয়ায় মাটি থেকে অনেকটা উচ্চতায় বাতাসে ভেসে বেড়ায় কিছু ভাসমান ভূখণ্ড। এখানে গল্পের শুরু, যখন সেরকমই একটা ভূখণ্ড বলা নেই, কওয়া নেই, হঠাৎ করে মূল ভূখণ্ড থেকে দূরে সমুদ্রের বুকে অবস্থিত মান্দুব নামের একলা একটা দ্বীপের ওপর এসে ভেড়ে; আর সে-ই ভূখণ্ড থেকে নেমে আসতে শুরু করে ব��হৎ আকারের ভয়াল দর্শন কিছু পোকা। যাদেরকে দ্বীপবাসী নাম দেয় আসমানের পোকা। এই আসমানের পোকাগুলো কয়েকদিন অন্তর অন্তর একজন-দুজন করে তুলে নিয়ে যেতে থাকে দ্বীপবাসীকে।
ইব্রার, যে কি-না এই দ্বীপবাসীদের-ই একজন, সকলের দিশেহারা অবস্থায় সে-ই প্রথম রুখে দাঁড়ায়। শুরু করে সংগ্রাম। আস্তে আস্তে তার সাথে যোগ দেয় অনেকে। সংগ্রামের ঘাত প্রতিঘাতে এগিয়ে যায় গল্প, দ্বীপবাসী খোঁজে পরিত্রাণের উপায়।
দ্বীপের লবন ব্যবসায়ী কায়াস হাম্মান আবার ভিন্ন কথা বলে সংকট নিয়ে। এতদিন যাবৎ ভুল উপাস্যের উপাসনা করার কারণেই না-কি এই সংকট। রুষ্ট হয়ে দেবতা আরাহুট এই সংকট পাঠিয়েছেন, সবার উচিত আরাহুটের উপসনা করা। অন্যদিকে, নাইভা রাস্কি, যে কি-না একজন তাম্বুলক্রিয়ক, এই দ্বীপে ভ্রমণে এসে আটকা পড়ে যায় সংকটে। সে দেয় পরিত্রাণের ভিন্ন এক উপায়। বড় ঝুঁকিপূর্ণ সে উপায়।
আশিয়া, দ্বীপের বৈদ্যবাড়ির মেয়ে, ভেতরে ভেতরে পছন্দ করে ইব্রারকে। স্বপ্ন দেখে একদিন ইব্রার ওর ভালোবাসা বুঝবে। অসহায় মুহূর্তে সেও নেয় মরিয়া এক সিদ্ধান্ত।
দুর্দান্ত অ্যাকশন, কখনও বুদ্ধির পরীক্ষা, কখনো কখনো মুগ্ধ বা অবাক করার মতো তথ্য, জীব, ইতিহাস, উপকথা বা জায়গা—‘দাবনিশ আখ্যান: আসমানের আঁধার’ এরকম-ই এক উপন্যাস।
➤ পাঠ প্রতিক্রিয়া ও পর্যালোচনা—
ফ্যান্টাসি হিসেবে ❛দাবনিশ আখ্যান : আসমানের আঁধার❜ উপন্যাসকে পুরোপুরি এপিক বলা যাবে কি-না এই নিয়ে দ্বিধায় আছি। কারণ লেখক সেকেন্ডারি ওয়ার্ল্ড বিল্ডিংয়ে ‘পৃথিবী’-এর বিপরীতে অন্য কোনো নাম প্রয়োগ করেননি। মান্দুপ দ্বীপটি এই পৃথিবীর কোনো এক সমুদ্রে রয়েছে ধরে নিতে হচ্ছে। কোন সমুদ্রে সেটার নামও উল্লেখ নেই। থাকলে ভালো হতো। উপন্যাসের পুরো কাহিনি ঘটেছে এই মান্দুব দ্বীপ ও ভাসমান ভূখণ্ড কেন্দ্র করে। তবে লেখক শুধুমাত্র এই দ্বীপের অভ্যন্তরীণ কাহিনি নিয়ে বসে থাকেননি। কাহিনির ধাপে ধাপে তুলে নিয়ে এসেছেন বিভিন্ন জাতির কথা, তাদের ক্ষমতার কথা।
তারমধ্য উল্লেখযোগ্য হচ্ছে—সিওকিন, অস্তার, তামাউন ইত্যাদি। ক্ষমতার দিক থেকে ‘সিওকিন’রা তাম্বুল ক্রিয়ক হয়ে থাকে। তাম্বুল হচ্ছে কোনো ক্রিয়া প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যম। হতে পারে সেটা ম্যাজিক, যাদু-টোনা এই টাইপ। এই তাম্বুল ক্রিয়কের মধ্যে আবার ভাগ রয়েছে, সেখানে যারা নিজেদের ‘রূপান্তর’ করতে পারে তারা আবার ‘স্থানান্তর’ করতে পারে না। বাধ্যবাধকতা এক্ষেত্রে রয়েছে। তবে এই তাম্বুল ক্রিয়া করতে প্রয়োজন হয় ‘কা’-এর। কী এই কা?
অন্যদিকে ‘অস্তার’ জাতির লোকেরা হচ্ছে লড়াকু প্রজাতির। জন্ম থেকে তারা লড়াই করার মনোবলের পাশাপাশি হিলিং অ্যাভিলিটি ধারণ করে। অর্থাৎ কেউ আহত হলে, তার শরীর নিজ থেকে হিলিং সাপোর্ট দিয়ে দ্রুত সুস্থ করে তোলে। এছাড়া মান্দুব দ্বীপের মতো পুরো সেকেন্ডারি ওয়ার্ল্ডে একইরকম আরও দ্বীপ রয়েছে। তবে সেগুলো নিয়ে বিস্তারিত বর্ণনা নেই, সিরিজের পরের বইগুলোতে আসবে হয়তো। এক দ্বীপ থেকে আরেক দ্বীপে যাতায়াতের জন্য জাহাজ রয়েছে। জাহাজ যেহেতু আছে জলদস্যু তো থাকবেই।
আরেকটি জাতি রয়েছে সেটি হচ্ছে—অস্পৃশ। কারা এই অস্পৃশ আর কে এই জাতির সম্রাট সেটা এই উপন্যাসের টুইস্ট।
❛দাবনিশ আখ্যান : আসমানের আঁধার❜ উপন্যাসের ভালোলাগার পাশাপাশি কিছু অতি নাটকীয়তা রয়েছে। যা কিছুক্ষেত্রে কাহিনির গতি নিম্নদিকে ধাবিত করেছে। আলোচনা করা যাক–
● প্রারম্ভ—
উপন্যাসের শুরুতে দুইটি ম্যাপ দেখতে পাবেন। একটি মান্দুব দ্বীপের আরেকটি ভাসমান ভূখণ্ডের। প্রয়োজনীয় ছিল অবশ্যই। তবে কাহিনির শুরুর প্রথম দুই অধ্যায় ভালো লাগেনি। শুরুটা জমেনি বলা যায়। ভাসমান ভূখণ্ডের যে গঠন সেটা ম্যাপ আর প্রচ্ছদের ফ্রন্ট পার্ট দেখে মনে ছেপে নিয়েছি, লেখকের বর্ণনায় এই বিষয়টি মিসিং লেগেছে। কাহিনির মূল প্রোটাগনিস্ট ইব্রারের পরিচয় পর্ব অতটা মনঃপূত হয়নি। অর্থাৎ শুরুতে হুকড করার মতো কিছু না পেলেও দুই অধ্যায় পর থেকে লেখকের লেখায় প্রাণ এসেছে। এরপর আর তেমন সমস্যা দেখা যায়নি। তাই উপন্যাসের শুরু করতে ধৈর্য রাখবেন, মনোযোগ ধরে দুই অধ্যায় পড়া শেষে কাহিনিতে সহজে ঢুকতে পারবেন।
● গল্প বুনন—
গল্প বুননে লেখকের পারদর্শীতা ভালো তবে সেটাকে আরও শানিত করার প্রয়োজন ছিল। শুরুর দিকে যেটা করার দরকার সেটা করতে উনি কিছুটা ব্যর্থ। প্রথম ইমপ্রেশনস যেভাবে হওয়া দরকার সেভাবে হয়নি। এক্ষেত্রে কাহিনিতে ঢুকতে অনীহা আসতে পারে, এমনিতে আকর্ষণ করার মতো এলিমেন্ট তেমন ছিল না।
তবে কয়েক অধ্যায় যাওয়ার পর সিকুয়েন্স সুন্দর করে সাজিয়েছেন। আবার ইমোশন তৈরির পূর্বে সেটাকে খতমও করেছেন। অর্থাৎ কোনো ঘটনার প্রবাহ ঘটার আগে সেটা থামিয়ে দিয়েছেন একইসাথে কোনো চরিত্রের প্রতি অনুভূতি তৈরি করার পূর্বে আঘাত করে চুরমারও করেছেন। এসব ছোটোখাটো দিকগুলো গল্প বুননে বাধা সৃষ্টি করেছে।
আশা করছি দ্বিতীয় পার্টে লেখক বিষয়গুলো কাটিয়ে উঠতে পারবেন।
● লেখনশৈলী—
সাহিত্যের ফুলঝুরি, ভারী শব্দ, যৌগিক বাক্য এইরকম কিছু লেখনশৈলীতে ছিল না। লেখনশৈলীর যে দিকটি বেশি আকৃষ্ট করেছে সেটি হচ্ছে পুরোপুরি বাংলা ভাষা নির্ভর। লেখক অপ্রয়োজনে তো দূরে থাক, প্রয়োজনে বাক্যে ইংরেজি ঢুকিয়ে পাণ্ডিত্য দেখাতে যাননি। প্রাঞ্জল বাক্য দিয়ে পুরো উপন্যাস লেখেছেন সাথে ওয়ার্ল্ড বিল্ডিং করার জন্য যেসব উপকরণ এনেছেন সবকিছু সোজা বাংলায় বর্ণনা করেছেন।
সংলাপে দিকেও এই বিষয়টি বিশেষ নজরে রেখেছেন। পুরো উপন্যাস যদি আপনি এক বসায় শেষ করতে পারেন তাহলে লেখনশৈলীর জন্য সেটা অনায়াসে সম্ভব। টানা পড়া যায়, প্রথম দুই অধ্যায় কিছুটা বিভ্রান্তি তৈরি করলে সেটা সহজে কাটিয়ে দারুণভাবে পুরো গল্প উপস্থাপন করেছেন।
● বর্ণনাভঙ্গি—
লেখনশৈলী যতটা পোক্ত ছিল সেদিক থেকে বর্ণনাভঙ্গি আরও স্ট্যাবল হওয়া ডিজার্ভ করে। তবে পারিপার্শ্বিক বর্ণনা, অ্যাকশন সিকোয়েন্স সিনেম্যাটিক স্টাইল ফুটিয়ে তুলেছেন ভালোভাবে। গতানুগতিক ছাপ স্পষ্ট। চরিত্রদের প্রভাব, চিন্তা-ভাবনা, গঠন, মনস্তাত্ত্বিক ক্রিয়াকলাপ দক্ষতার সাথে বর্ণনা করার চেষ্টা করেছেন। উপন্যাসের সংলাপে ফ্যান্টাসি ফ্লেভার মিসিং লেগেছে। কেমন যেন সাধাসিধা ভাব, পাঞ্চ লাইনের অভাব। তার ওপর সেকেন্ডারি ওয়ার্ল্ডে রবীন্দ্রসংগীত ঢুকানো ঠিক হজম হলো না।
যা-ই হোক, ফ্যান্টাসি উপন্যাসে বর্ণনা হচ্ছে একজন লেখকের মূল অস্ত্র। কারণ যে গল্প বিল্ডাপ করেছেন সেটা সম্পূর্ণ লেখকের মস্তিষ্ক প্রসূত। সেদিক থেকে সাবলীলতা না থাকলে পাঠকের কাহিনিতে ঢুকে কল্পনা করতে বেগ পেতে হয়। লেখক এইদিকে খেয়াল রেখেছেন। তবে কিছু জায়গায় আরেকটু বেটার হতে পারত।
● চরিত্রায়ন—
চরিত্রের ছড়াছড়ি থাকলেও ফোকাসে ছিল কয়েকজন চরিত্র। ইব্রার চরিত্রটি ছিল উপন্যাসের মূল কারিগর। মান্দুব দ্বীপের সকল দায়িত্ব কাঁধে বয়ে নিয়ে যাওয়া এক সাহসী যোদ্ধা। আসমান থেকে নেমে আসা পোকাদের বিরুদ্ধে তার লড়াই করার মানসিকতা ও যোদ্ধা দলের নেতা হওয়ার সব উপকরণ দিয়ে অকুতোভয় এক চরিত্র লেখক তৈরি করেছেন। সুপারহিরো ভাইব পেয়েছি। সহযোগী হিসেবে রাশাদ পছন্দের চরিত্র হলেও টাইম পেয়েছে কম। এছাড়া আশিয়া, হারান চাচা, নাইভা তো আছেই। বিশেষ দুটো চরিত্রের কথা উহ্য রাখছি। একটি ইব্রার আবেগ, আরেকটি ক্ষমতা।
তবে ইব্রার মনস্তাত্ত্বিক বিষয়গুলো লেখক দক্ষতার সাথে তুলে এনেছেন। যে-কোনো পাঠক কিছুক্ষেত্রে এই চরিত্রের সাথে নিজেকে রিলেট করতে পারবে। অতি না��কীয় দিক বাদ দিয়ে। এছাড়া অ্যান্টাগনিস্টের ভূমিকায় কায়াস হাম্মাম কাহিনিতে ভালোই ইমপেক্ট ফেলেছে। তাই বলে পুরো গল্পে ইব্রার বিপরীতে কোনো চরিত্র নেই? অবশ্যই আছে, সে ধাক্কা খাওয়ার জন্য কাহিনির শেষ পর্যন্ত তো অপেক্ষা করতেই হবে।
● সমাপ্তি—
❛দাবনিশ আখ্যান : আসমানের আঁধার❜ প্রথম খণ্ড হিসেবে সমাপ্তি ভালো লেগেছে। অর্থাৎ পরের খণ্ড শুরুটা যে নতুন কোনো বার্তা নিয়ে আসছে সেটা বোঝায় যাচ্ছে। কাহিনির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একতরফা সাসপেন্স থাকলেও শেষে এসে সেটার গতিপথ পালটে গিয়ে টেস্টে কিছুটা চেঞ্জ এনেছে।
● খুচরা আলাপ—
সমন ক্রিয়ার মাধ্যমে লেখক আমাদের কাহিনির মধ্যে ভিন্ন এক জগতের সাথে পরিচিত করিয়েছেন। যেখানে লড়াই করতে হয়েছে এমনকিছু সত্তার সাথে যার দরুন কিছুটা রোমাঞ্চকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সে-ই সত্তাগুলো হচ্ছে—তাইউস পাখি, হিমাঙ্কুব, নিয়তি শায়কা, আনাতুব বানসী ইত্যাদি। কী তাদের ক্ষমতা তা না হয় উপন্যাস পড়ে জানবেন।
সবকিছু বিবেচনা করে নতুন এক জগতে নিজেকে আবিষ্কার করে ভালো সময় উপভোগ করতে উপন্যাসটি পড়তে পারেন৷ বাংলায় ফ্যান্টাসি জনরার মৌলিক কাজ খুবই কম, তাই নিজ বিবেচনায় বইটি পড়ে প্রতিক্রিয়া জানানো ভালো হবে।
➢ লেখক নিয়ে কিছু কথা—
লেখক তানজিরুল ইসলাম ভাইয়ের প্রথম উপন্যাস পড়া। ফ্যান্টাসির পাশাপাশি সায়েন্স ফিকশনে লেখকের ভালো দখল রয়েছে। ওনার সায়েন্স ফিকশন থ্রিলার ‘প্রজাপতি বসে আছে মাত্রায়’ আলোচিত হলেও পড়া হয়নি। শুরুটা ফ্যান্টাসি দিয়ে হলেও পুরোপুরিভাবে ভালো বলা যাবে না। ফ্যান্টাসির চেয়েও রূপকথার ছাপ ও সুপারহিরো ভাইব বেশি মনে হয়েছে। ফ্যান্টাসি ফ্লেভার ছিল কম। তবে আশা করছি, দাবনিশ সিরিজের পরবর্তী বইগুলোতে ফ্যান্টাসির মাত্রা আরও শক্তপোক্ত হবে৷
● সম্পাদনা ও বানান—
কয়েক জায়গায় বাক্যের অসামঞ্জস্যতা নজরে এসেছে, যেগুলো চাইলে সহজ করা যেত। কয়েকটি উদাহরণ দিচ্ছি—
১৩ পৃ: মাটি থেকে দুই হাতে খামচে একটা গামলার সমান এক চাপ অখণ্ড মাটির দলা তুলে আনলে স্বাভাবিকভাবে যেরকম হবার কথা, অনেকটা সেরকম। [ভাসমান ভূখণ্ডের গঠন আরেকটু সহজ করে দেওয়া যেত না?]
২০ পৃ: ‘ইহলীলা সাঙ্গ’ কী? এইটা ভবলীলা সাঙ্গ হবে না?
২১ পৃ: আসমানের পোকা-কে ‘জিনিস’ সম্বোধন না করে অন্য প্রাণী জাতীয় কিছু সম্বোধন করলে হতো না? পোকা তো আর বস্তু না তাই না? ভয়ংকর জীবটা, বিদঘুটে জীবটা এই জাতীয় কিছু?
২০৩ পৃ: গোলকধাঁধার দরজার সমন ক্রিয়া বিশেষ এক ধরণের সমন ক্রিয়া। এখানে, ‘গোলকধাঁধার দরজা একধরনের বিশেষ সমন ক্রিয়া’ লেখকে বেটার হতো না?
এছাড়া আরও কিছু জায়গায় এইরকম অসামঞ্জস্য রয়েছে সাথে কিছু জায়গায় উপামার ভুল প্রয়োগ চোখে লেগেছে।
ছিলো, গেলো, ঠাণ্ডা, ঘন্টা, এগুতে, নাকি, কিনা, নাচক (নাকচ), দূর্বল, ধ্বক, কাচ/কাঁচা, উড়ু (উরু), সফেদ চাপ দাঁড়ি (দাড়ি), হৃদপিণ্ড, অভস্ত-সহ বানান ভুলেরও শেষ ছিল না। আরেকটু যত্ন নিয়ে প্রুফ রিড করার দরকার ছিল।
২১৭ পৃ : ‘কা’ একধরনের রহস্যময় শক্তি। এখন এই ‘কা’-কে লেখা হয়েছে যথাক্রমে—কাকে, কাই, কার এইভাবে। যদি কা-কে, কা-ই, কা’র এইভাবে লেখা হলে আলাদাভাবে ‘কা’ বিষয়টি অনুধাবন করা যেত।
আরেকটি বিষয় খটকা লেগেছে, দ্বীপের জনসংখ্যা ৫০০ উল্লেখ করা হয়েছে। ওইদিকে কিছু মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে, একদিনে সেটা ৫২ জনে গিয়ে ঠেকেছে। তারপরেও জনসংখ্যা কমতে দেখা যায়নি। পরবর্তীতে বিভিন্ন কারণে সেটাকে ৫০০ জনসংখ্যার মার্জিন ধরে বিবেচনা করেছে। এই দিকটি গোলমেলে লাগল।
● প্রচ্ছদ, অলংকরণ, লেটারিং—
❛দাবনিশ আখ্যান : আসমানের আঁধার❜ বইটির প্রচ্ছদ জুনাইদ ইসলাম ইশমাম। সিম্পলের মধ্যে সুন্দর, ফ্রন্ট কাভার যতটা ভালো লেগেছে ব্যাক ততটা লাগেনি৷ কাহিনির গভীরতা অনুযায়ী আরও অনেককিছু প্রচ্ছদে ফুটিয়ে তোলা যেত।
বইয়ের ভেতরে কয়েকটি আর্টওয়াক রয়েছে যেগুলো এঁকেছেন গুণী শিল্পী ওয়াসিফ ভাই। ওনার আর্টওয়াকগুলো সবসময় পছন্দের। কাহিনির নির্দিষ্ট অংশটুকু সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
উপন্যাসের নামলিপি করেছেন জুলিয়ান ভাই। ❛দাবনিশ আখ্যান : আসমানের আঁধার❜ লেটারিং পছন্দের একটি কাজ হয়েছে। ফ্যান্টাসি একটা ভাইব বজায় রেখেছেন কাজটি করার সময়। ইউনিকও লেগেছে।
● মলাট, বাঁধাই, পৃষ্ঠা—
❛দাবনিশ আখ্যান : আসমানের আঁধার❜ বইয়ের প্রোডাকশন কোয়ালিটি ছিল দারুণ। বাঁকানো স্পাইনের বইগুলো পড়তে আলাদা মজা। যে-কোনো স্টাইলে পড়া যায় পাশাপাশি কোয়ালিটিতেও পরিতুষ্টের ছাপ থাকে। কাগজের মান, শক্তপোক্ত বাঁধাইয়ের সাথে লাইন স্পেস ও ফন্ট সাইজ যথাযথ।
➠ বই : আসমানের আঁধার - দাবনিশ আখ্যান #১ ➠ লেখক :তানজিরুল ইসলাম ➠ জনরা : এপিক ফ্যান্টাসি ➠ প্রথম প্রকাশ : ডিসেম্বর ২০২০ ➠ টাইপোগ্রাফি : লর্ড জুলিয়ান ➠ অলংকরণ : ওয়াসিফ নূর ➠ প্রচ্ছদ : জুনাইদ ইসলাম ইশমাম ➠ প্রকাশনা : চিরকুট প্রকাশনী ➠ মুদ্রিত মূল্য : ৩৫০ টাকা মাত্র ➠ পৃষ্ঠা : ২৫৮
ফ্যান্টাসি বই। ওয়ার্ল্ড বিল্ডিং মোটামুটি ভালো, তবে ছড়ানো ছিটানো লেগেছে। স্পেশালি বইয়ের বেশিরভাগ অংশ অস্পৃশ্য দেশের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা নিয়ে। সিরিজের প্রথম বই হিসেবে কিছুটা ছাড় দেয়া উচিৎ হলেও সমালোচনার কিছু জায়গা রয়েছে। প্রথমত, শব্দচয়ন, বাক্যগঠনে ঠিক ফ্যান্টাসি ফিল আসেনি। আমার মনে হয় সম্পাদনার সময় বাক্যের গাঠনিক পরিবর্তন আনলে ফ্যান্টাসি বর্ণনা বেশ মানাতো।
এছাড়াও, বইটা ছোট। ক্যারেক্টার ডেপথ আরেকটু দিলে মন্দ হত না। নেক্সট বইয়ের জন্য নানা অপশন ওপেন রাখা হয়েছে। লেখককে বলব পরবর্তী বই আরেকটু বড় করতে, বর্ণনা বাড়াতে, বর্ণনাশৈলী আর শব্দচয়ন পরিবর্তন করতে। আশা করি নেক্সট বইয়ে মূল ভূখণ্ড এক্সপ্লোর করা হবে৷ এধরনের ওয়ার্ল্ড বিল্ডিং নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। সিরিজে কয়টা বই থাকবে জানি না, তবে অন্তত পাঁচটা না থাকলে মন ভরার কথা না। পরের বইগুলোর জন্য শুভকামনা।
গল্পটা খারাপ না, বেশ ভালো। ভালো দিকগুলো হলো- চমৎকার plot, পুরো গল্প জুরে tone maintain করতে পেরেছে। আর খারাপ দিকগুল- সবগুলো চরিত্র কেমন জানি সাদামাটা হয়ে গেছে। চরিত্র ভালো ছিল, কিন্তু সেটা dialogoue এ প্রকাশ করতে পারিনি ঠিকমত। এ কারনে চরিত্রগুলো সাদামাটা লেগেছে। কিন্তু সবথেকে খারাপ লেগেছে যে বিষয়টা, সেটা হচ্ছে fighting scene। মানলাম এটা fantasy, তাই বলে তো ইব্রার(গল্পের মুল চরিত্র) এরকম শক্তিশালী হতে পারে না। বোধহয় লেখক manga fighting style- টা copy করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু সেটা বইতে apply করলে বাজে দেখায়। এইজন্যই manga visual আর বই literature। ইব্রারের প্রতি একটু নজর দেয়া উচিৎ ছিল লেখকের। একেবারে all good বানিয়ে দিয়েছে। উচিৎ ছিল flaws দেয়া, কেননা ত্রুটি চরিত্রকে আরও বাস্তবিক করে তুলে। কেউ কখনো perfect হতে পারে না। এছাড়া সবই মোটামটি ভালো লেগেছে।