কথায় আছে, 'ঝড়ে বক মরে, ফকিরের কেরামতি বাড়ে'। তবে এখানে কার কেরামতি বাড়ছে? ফকিরের নাকি সুশীলের রূপ ধরে কোনো বহুরূপীর!
◼️ নামকরণ -
প্রচলিত এই কথাটির সাথে বইয়ের নামের মিল থাকায় শুরুতেই চিন্তা করতে থাকলাম বইয়ের ঘটনা কেমন হতে পারে। তবে গল্পটি পড়তে পড়তে উপলব্ধি করলাম নামকরণ একদম যৌক্তিক। বর্তমানের কিছু বই পড়ে দেখা যায় কাহিনীর সাথে নামের কোনো মিল নেই। তবে এই বইয়ে তেমনটা হয়নি। ঘটনাপ্রবাহ থেকে শুরু করে সবকিছু যেভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এর থেকে যথাযথ নামকরণ আর হতো না।
◼️ প্রচ্ছদ -
বইয়ের সূচনা থেকে উপসংহার পর্যন্ত প্রতিটি ঘটনার অর্থ বহন করছে প্রচ্ছদে। পুরো গল্পের ঘটনাপ্রবাহ সূক্ষ্মভাবে প্রচ্ছদের প্রতিটি কোণায় নিজের জায়গা করে নিয়েছে। নামকরণ এবং গল্পের সাথে প্রচ্ছদও একদম মানানসই।
◼️ কাহিনী সংক্ষেপ -
আধুনিকতা ও শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত একটি গ্রাম 'হুরমতিগঞ্জ'। গ্রামটির জন্ম কীভাবে হলো জানা নেই কারো। তবে কুসংস্কার ঠিকই জন্ম নিয়ে নিয়ে ডাল পালা ছড়িয়েছে পুরো গ্রামে। গ্রামে হঠাৎ আগমন ঘটে এক হুজুরের। কি তার পরিচয়, কোথা থেকে এসেছে কেউ জানে না কিছু। একসময় হুজুর আর মাতব্বর হয়ে ওঠে বন্ধু। এই দুজনের কথা গ্রামের মানুষের কাছে বেদ বাক্য।
অন্ধত্ব ও গোঁড়ামির যাতাকলে গ্রামের মানুষ কোনো অসুখ বিসুখে ডাক্তারের কিছু যায় না। হুজুরের ঝাঁড় ফুঁক, পানি পড়া এসবই তারা সবকিছু মনে করে। এসকল কিছুই বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় মাতব্বর পুত্র ওয়াহিদ এবং শহর থেকে আসা ডাক্তার ফাহমিদা। ডাক্তারের কাছে গেলে গুনাহ হবে, প্রয়োজনে মৃত্যু হোক তবুও ডাক্তারের কাছে যাওয়া যাবে না এমন বিভিন্ন কুসংস্কার যখন ডাল পালা ছড়িয়ে চরম রূপে বিস্তার লাভ করে ফাহমিদা তখন মুখ খোলে। সোচ্চার হয় হুজুর এবং মাতব্বরের বিরুদ্ধে। তবে যুগ যুগ ধরে কুসংস্কারের অন্ধকারে গ্রাস করে ফেলা গ্রামের মানুষকে বোঝানো কি এতোই সহজ? সবসময় রহস্য নিয়ে চলা হুজুরের আসল রহস্য কী? শেষ পর্যন্ত হুজুরের পরিণতিই বা কি হয়? মনে তৈরি হওয়া এতো এতো প্রশ্নের উপর বইয়েই আছে।
◼️ পাঠ প্রতিক্রিয়া ও পর্যালোচনা -
শাসকের নামে শোষণ করার প্রবৃত্তি যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। আর সেটা যদি গ্রামের অশিক্ষিত লোক তাহলে তো কথাই নেই। সভ্যতার বিকাশ হলেও সংস্কার এখনও পরিপূর্ণভাবে হয়নি তাই এখনও গ্রামের নিরীহ মানুষদের ইচ্ছেমতো নাচানো যায়।
পুরোটা বইয়ে লেখিকা তুলে ধরেছেন গ্রামীণ বাস্তব দৃশ্যপট। ক্ষমতার অপব্যবহার করে অন্যায় বিচার, ডাক্তারের চিকিৎসা না নেওয়া সবকিছুই তুলে ধরেছেন। এসবের পরিণতি এতোটাই ভয়াবহ মৃ'ত্যু পর্যন্ত ডেকে আনতে পারে।
'ধর্ম' মানুষের স্পর্শকাতর বিষয়। তাই ধর্মীয় গোঁড়ামির প্রচলন আছে যুগের পর যুগ। সভ্যতা এখন উন্নত হয়েছে, একটু সচেতনতাই পারে এ সমস্যা থেকে মানুষকে উত্তরণ করতে। তবে শিক্ষার আলোর থেকে বঞ্চিত জাতি কতোটা পিছিয়ে পড়ে সেটা এই বই থেকে বোঝা যায়।
পুরো বইয়ে ফাহমিদা আমার পছন্দের চরিত্র হিসেবে ছিল। ভয়াবহ পরিস্থিতিতেও যেভাবে হাল না ছেড়ে মনোবল ধরে রেখে লড়াই করেছে সেটা সবাই পারে না। আরেকটি পছন্দের চরিত্র হতে পারতো ওয়াহিদ। তবে লেখিকা যেহেতু তাকে প্রতিবাদী চরিত্র হিসেবে দেখিয়েছে তাই এই চরিত্রটা আরেকটু শক্তিশালীভাবে তুলে ধরা দরকার ছিল। শক্তিশালী চরিত্র হিসেবে এই চরিত্র আমাকে কিছুটা হতাশ করেছে।
শুরুতে ঘটনা যে ফ্লোতে আগাচ্ছিল মাঝপথে তাল কে'টে গেছে বলে মনে হচ্ছিল। শুরুর ফ্লো ধরে রাখতে পারেনি। বিশেষ করে সমাপ্তির অংশে বেশ তাড়াহুড়ো করা হয়েছে। আরেকটু গুছিয়ে সমাপ্তি চমৎকার হতো। ভালোবাসা মানুষকে নিয়ে যায় ধ্বং'সে'র শেষ প্রান্তে। তবুও মানুষ ভালোবাসে, ভালোবাসা চায়, এটাই বোধহয় জাগতিক নিয়ম। গ্রাম্য চিত্র, কুসংস্কার, ধর্মীয় গোঁড়ামি, বন্ধুত্ব, পারিবারিক অশান্তি, স্বামী স্ত্রীর অমিমাংসিত সম্পর্ক সবকিছু মিলিয়েই গল্প আগাতে পারে। সুখপাঠ্য বইটি পাঠক মনে আনন্দের জন্ম দিতে সক্ষম।
◼️ চরিত্রায়ন -
ঘটনাপ্রবাহের স্বার্থে গল্পে আগমন ঘটে বিভিন্ন চরিত্রের। তার মধ্যে কিছু অন্যতম চরিত্র নিয়ে কথা বলা যাক:
•ওয়াহিদ: গ্রামের প্রায় সবাই তাকে ভয় পায়। এক কথার মানুষ যা বলে তাই করে। শিক্ষিত, আধুনিক চিন্তাধারার হওয়ায় গ্রামের ছোট ছোট বাচ্চাকে পড়ায়। আরেকটি চমৎকার দিক ছিল মায়ের জন্য ভালোবাসা, পাঠক মুগ্ধ হবে এটা দেখে। সে চেষ্টা করে গ্রামে কুসংস্কার দূর করতে। কিন্তু এটার পক্ষে আর কতোটাই সম্ভব যেখানে সব মানুষ ডুবে আছে কুসংস্কারের সাগরে।
•ফাহমিদা: ডাক্তারি পাস করে এ গ্রাসে পোস্টিং হয় তার। গ্রামের মানুষগুলোকে খুব সহজেই আপন করে নেয়, তাদের ভালোর জন্য কাজ করে। গ্রামের মানুষ আধুনিক চিকিৎসার চেয়ে হুজুরের ঝাড়া ফু দেওয়াতেই বেশি বিশ্বাসী। তবুও সে চেষ্টা চালিয়ে যায় এবং একসময় আশার আলোও দেখতে পায়।
•তাহিরা: ভালোবাসা না পেয়ে উ!ন্মা!দ হয়ে গিয়েছিল এই মেয়ে। কারো সংসার ভাঙতেও দু মিনিট ভাবেনি। আমার পছন্দের চরিত্র হতেও গিয়ে হতে পারেনি এ চরিত্রটি। অতিরিক্ত কোনোকিছু জীবনে সুখকর হয় না, এই চরিত্রটি তার আরেকটি প্রমাণ।
•মাতব্বর: পরনারীতে মুগ্ধ হওয়া পুরুষের কাছে ঘরের নারী বিষাক্ত লাগে। মাতব্বরও তেমনি ঘরে নিজের বউ রেখে বাইরে যুবতী মেয়েদের দিকে লোলুপ দৃষ্টি দিয়ে রাখে। নিজের কথায় গ্রামের মানুষকে চালনা করে ডুবিয়ে রেখেছে গ্রামটাকে অন্ধকারে।
•জয়তুন: মাতব্বের নামমাত্র স্ত্রী। যার কোনো সন্মান ছিল না। সংসারটাকে ভালোবেসে পড়ে ছিল শুধু। কিন্তু ভাগ্যবিধাতা তার সাথে এক নি!ষ্ঠু!র খেলা খেলেছে।
• হুজুর: সকল প্রকার নেতিবাচক গুণে গুণান্বিত একটি চরিত্র। তার আসল পরিচয় কারো নেই। ধর্মকে পুঁজি করে দিন ব্যবসা করে চলেছে। গ্রামের মানুষের বিশ্বাস নিয়ে খেলছে দিনের পর দিন।
•জুলেখা: প্রথম থেকে এই চরিত্রটা রহস্যময় লেগেছে। কীসের এতো কষ্ট অপরূপ সুন্দরী এই রমনীর। যাকে জাগতিক কোনো চিন্তা-ভাবনা স্পর্শ করতে পারে না। আস্তে আস্তে অবশ্য সবকিছু পরিষ্কার হয়।
ছাড়াও ছিল ,হরকত,জসিমসহ আরো ছোট বড় বিভিন্ন চরিত্র যেগুলো ঘটনাপ্রবাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
◼️ প্রিয় লাইন-
•এতিম হওয়ার সুবিধা হচ্ছে সবার সহানুভূতি পাওয়া যায়। এতিম হওয়ার অসুবিধা হচ্ছে সবার লাথি ঝাটাও খাওয়া যায়। অনেকটা সহজলভ্য হতে হয়।
•মানুষের মন পাখি নয়, সংসারী। সে বন্ধন ভালবাসে। কেউ যখন তাকে বাঁধেন, তখন তার মন খারাপ হয়। নিঃসঙ্গ মানুষও সঙ্গ খুঁজে আপ্রাণ। পাখিকে একলা খাঁচায় রাখলে তার চোখের রঙ বদলে যায়। তার উদাস বিকেল কাটেনা। খাঁচা তার জন্য নয়। খাঁচা হলো মানুষের বসবাসের জন্য উপযোগী।
•যে কোনো শয়তান লোকের সবচেয়ে বড় শত্রু হলো তার বদমেজাজ। যার কারণে তার আসল চেহারা বের হয়ে পড়ে সবার সামনে।
•কেউ কেউ দয়া করতে করতে মহান হয়ে তারপর সুযোগ নেয়। আর কেউ সুযোগ নিয়ে মহান সাজে।
•পয়সা থাকলে সব করা যায়। সব জায়েজ আছে।
•মেয়েমানুষের সাহস কম। ইজ্জতের ভয়, স্বামীর ভয়, সংসারের ভয়।
◼️ বানান ও অন্যান্য -
কোনোকিছু এক নাগাড়ে পড়তে গিয়ে বানান ভুল দেখলে হোঁচট খেতে হয়, পড়ার মধ্যে একটা বাঁধার সৃষ্টি হয়। কিছু বানান ভুল পরিলক্ষিত হয়েছে পড়তে গিয়ে আবার টাইপিং মিস্টেকও হতে পারে সেগুলো তবে চেক করা প্রয়োজন ছিল।
বইয়ের মলাট, বাঁধাই কোনোকিছুতে খুঁত ধরার উপায় নেই।
◼️ পরিশেষে -
লেখিকার লেখার ধরণ বেশ ঝরঝরে। শব্দচয়নও চমৎকার, সেই সাথে সুন্দরভাবে বর্ণনা করে ঘটনা এগিয়ে নিয়ে গেছে। বহুদিন পর অন্য ধারার লেখা পড়লাম, ভালো লেগেছে আমার কাছে। আশা করছি ভবিষ্যতে আরো চমৎকার কিছু পাবো উনার কাছ থেকে।