পল্লব বসু'র লেখার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল অনেকদিন আগে— 'অভিশপ্ত গুপ্তধন' নামক বইটির মাধ্যমে। বুদ্ধিদীপ্ত প্লট এবং স্বচ্ছন্দ লেখনীর সমন্বয়ে সেই বইয়ে তিনি পেশ করেছিলেন সংকেতের ব্যাখ্যা, মনস্তত্ত্ব, পর্যবেক্ষণ মেশানো রহস্যভেদের আখ্যান। আলোচ্য বইয়ে সেই ভিন্টেজ লেখককে আবিষ্কার করলাম, তবে এবার সাইফার হয়ে এসেছিল মানবদেহ এবং মানবমন। এই বইয়ে আছে একটি উপন্যাস এবং আটটি রহস্য-কাহিনি। তারা হল~ উপন্যাস: জাতক চক্র (শ্রীপর্ণা'র রহস্যভেদ); গল্প: ১) অন্তরালে (শ্রীপর্ণা'র রহস্যভেদ); ২) ব্রট ডেড (শ্রীপর্ণা'র রহস্যভেদ); ৩) চৌধুরীবাড়ির ধাঁধা (অতনু-জয়ন্ত-বলাকা ত্রয়ী'র রহস্যভেদ); ৪) চোখের আড়ালে (ত্রয়ী'র রহস্যভেদ); ৫) মৃত্যু আলিঙ্গন (ত্রয়ী'র রহস্যভেদ); ৬) কণ্ঠহার উদ্ধার (ত্রয়ী'র রহস্যভেদ); ৭) পুজোর ডায়েরি (আত্রেয়ী'র রহস্যভেদ); ৮) অতীতের আয়না (শ্রীপর্ণা'র রহস্যভেদ)। বইয়ের সবচেয়ে জটিল এবং অভিনব কাহিনি নিঃসন্দেহে উপন্যাসটি। তবে অন্য গল্পগুলোতেও মাথা খাটানোর খোরাক আছে যথেষ্ট পরিমাণে।
আমার কী-কী ভালো লাগল? প্রথমত, এই গল্পগুলোর মধ্যে যে ধরনের অপরাধ এবং তার উদ্ঘাটন দেখানো হয়েছে, তা বাংলায় পড়ার সুযোগই হয় না। প্রতিটি কাহিনিতেই অপরাধী যেভাবে জাল-বিস্তার করেছে, তা সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ এবং চিকিৎসাবিজ্ঞান ও ফরেন্সিক জ্ঞান ছাড়া ভেদ করা অসম্ভব হত। এরা সত্যিকারের মেডিকেল থ্রিলার। এমনকি যেখানে আপাতভাবে অপরাধের সন্ধানটুকুও পাওয়া যায়নি, সেখানেও পর্যবেক্ষণ ও শারীরবৃত্তীয় জ্ঞান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। ফলে এই গল্প বা উপন্যাসগুলো পড়ার সময় রুদ্ধশ্বাস রহস্যভেদের পাশাপাশি নানা তথ্য ও বিশ্লেষণ অজ্ঞাতসারেই মনে ঢুকে পড়েছে, এমনকি গেঁথেও গেছে। এই লেখাগুলোর সবচেয়ে বড়ো শক্তি এই বিশেষত্বটি। হয়তো এটি এই লেখার দৌর্বল্যও, কারণ বহু পাঠক মগজাস্ত্রের যে প্লেটনিক সংজ্ঞায় বিশ্বাস রাখেন, তার নিরিখে এরা কঠোর, জটিল, অনেকাংশে প্রসিডিওরাল। দ্বিতীয়ত, এই গল্পগুলোতে রহস্যভেদী হয় পুলিশ নয়তো তাদের সঙ্গে থাকা বিজ্ঞানমনস্ক ছাত্রছাত্রীরা। তারা আদ্যন্ত বে-আইনি কায়দায় সন্দেহভাজনদের গোল করে বসিয়ে রহস্য-উদঘাটনের নামে তাদের অপমান করে না। এমনকি পুলিশ না হলে জেরাও করে না তারা। বরং পর্যবেক্ষণ, অধীত জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতার সাহায্যে তারা অপরাধীর মনটাকে বুঝতে চেষ্টা করে। গাঁজাখুরি রহস্যগল্পে পরিপূর্ণ বাংলা সাহিত্যে এমন রহস্যভেদীদের সাদরে স্বাগত জানাতেই হয়।
আমার কী-কী খারাপ লাগল? ১. বইটিতে প্রুফ দেখার কাজটি মোটেও ভালোভাবে করা হয়নি। 'ব্রট ডেড'-কে 'ব্রড ডেড' লেখা, 'চেইন স্মোকার'-কে 'চেঞ্জ স্মোকার' লেখা, সর্বত্র 'ওঁর' লেখা [ক্ষেত্রবিশেষে ওঁ-ও চোখে পড়েছে!], বাক্যগঠনে সরলীকরণের অভাব— এমন নানা জিনিস দেখে খারাপ লাগল। ২. রাজনৈতিক মদতপুষ্ট অপরাধীদের আচরণ, উন্মত্ত জনতার কীর্তিকলাপ— এ-সব লিখতে গিয়ে লেখক প্রায়ই পরিমিতিজ্ঞান হারিয়ে ফেলেছেন। বুঝতে পারি যে এই অংশগুলোতে তাঁর আবেগ লেখনীকে গ্রাস করেছে। একইভাবে রোমান্সের নানা কথা বলতে গিয়েও লেখকের বর্ণনা অত্যন্ত স্থূল হস্তাবলেপের মতো মনে হয়েছে। অন্যত্র তাঁর কলম স্ক্যালপেলের মতো করে চলেছে বলেই এই বিচ্যুতিগুলো দৃষ্টিকটূ লেগেছে।
সামগ্রিকভাবে বলতে পারি, যদি আপনি বুদ্ধিদীপ্ত, শারীরবিজ্ঞান ও জৈব-রসায়নের পাশাপাশি মানবমনের অন্ধকার দিক নিয়ে লেখা একঝাঁক টানটান রহস্যকাহিনি পড়তে চান, তাহলে এই বইটিকে আপন করে নিতে পারেন। নিরাশ হবেন না বলেই আমার অনুমান।
#bookish_subhajit #আমার_বইপড়া_২০২২ #শুভর_আলোচনায় 📚বই- জাতকচক্র এবং 📚লেখক- পল্লব বসু ( Pallab Basu ) 📚প্রকাশনা- রা প্রকাশন ( রা প্রকাশন ) 📚মুদ্রিত মূল্য- ৩০০/- 📚 পাতা- ২২৪ টি 📚 প্রচ্ছদ, বিন্যাস ও অলংকরণ- ধীমান পাল 📚 পেপার ব্যাক --------------------------------------------- 📌 লেখনী সারসংক্ষেপ সম্পর্কে- Thrillers are like life, more like life than you are.. - Graham Greene এই কথাটা বড্ড বাস্তব হয়ে উঠেছে এই বই এর জন্য। কারণ অবশ্য লেখকের লেখনী ক্ষমতা। যাই হোক এই বই এর সম্বন্ধে বলার আগে এর সূচিপত্র টা একটু বলে নিই। 👓 সূচিপত্র- ধরুন আপনি একম একটা বই চাইছেন যেখানে আপনি যেমন রহস্য পাবেন, রোমাঞ্চ পাবেন, আবার তার সাথে একটু অন্য স্বাদ ও পাবেন। তাহলে এই বই আপনার জন্য। এখানে যেমন আছে অ্যাডভেঞ্চার ঠিক তেমনই আছে রহস্য, আর আছে মেডিকেল থ্রিলার। এখানে আছে একটি উপন্যাস ও ৮ টি গল্প। ১.) জাতক চক্র ( পুলিশ অফিসার শ্রীপর্ণার ফাইল থেকে) [ উপন্যাস, মেডিকেল ক্রাইম থ্রিলার] ২.) অন্তরালে (পুলিশ অফিসার শ্রীপর্ণার ফাইল থেকে) ৩.) ব্রড ডেড (পুলিশ অফিসার শ্রীপর্ণার ফাইল থেকে) ৪.) চৌধুরী বাড়ির ধাঁধা (ত্রয়ীর অভিযান ১) ৫.) চোখের আড়ালে (ত্রয়ীর অভিযান ২) ৬.) মৃত্যু আলিঙ্গন (ত্রয়ীর অভিযান ৩) ৭.) কন্ঠহার উদ্ধার (ত্রয়ীর অভিযান ৪) ৮.) পুজোর ডায়েরি ( পুলিশ অফিসার আত্রেয়ীর ফাইল থেকে) ৯.) অতীতের আয়না ( পুলিশ অফিসার শ্রীপর্ণার ফাইল থেকে) যেহেতু সূচিপত্র বেশ বড়ো তাই সবকটা নিয়ে আলোচনা করবোনা। তবে উপন্যাস টা সংক্ষেপে বলার চেষ্টা করবো। এবং তার সাথে শ্রীপর্ণা , ত্রয়ী ও আত্রেয়ী এর পরিচয় দেবো কয়েকটা কথায়। 👓 প্রথমেই বলি উপন্যাস টা নিয়ে। এই উপন্যাস জাতকচক্র শব্দের বিশ্লেষণ করলে হয় জাতক এবং চক্র। আর জাতক অর্থ হলো জন্মগ্রহণকারী। আর চক্র হলো আবর্ত। অর্থাৎ এই নামকরণ এর থেকেই বোঝা যাচ্ছে এখানে জন্ম সংক্রান্ত ঘটনার উল্লেখ আছে। একদমই তাই । এই উপন্যাস এর কেন্দ্রীয় চরিত্র হলেন বিশিষ্ট ব্যাবসায়ী সর্বজিত। আর ওনার সন্তানরা। হঠাৎ একদিন অদ্ভুত ভাবে মারা যান সর্বজিত বাবু। আর সেই কেস এর ভার গিয়ে পড়লো পুলিশ অফিসার শ্রীপর্ণার উপর। আর একদিকে MRI করতে গিয়ে কমায় চলে গিয়ে মারা গেলেন বিশিষ্ট বন্ধ্যাত্ব বিশেষজ্ঞ ডাঃ হিমাংশু রুদ্র। তার সাথে সাথে নিরুদ্দেশ হলেন ডেন্টিস্ট ডাঃ অর্জুন এর সহকারী সুখময় সাহা। আর এই কেশ এসে পড়ে শ্রীপর্ণার বন্ধু মালার হাতে। এবার তদন্ত যত এগোতে থাকে তত এই আপাত বিচ্ছিন্ন ঘটনা দুটি যেন একে অপরকে জড়িয়ে ধরতে থাকে। এবং অবশেষে কী হলো? শ্রীপর্ণা কী পারবে এই সমস্যার সমাধান করতে? নাকী নিজেই স্বীকার হবে সেই ঘটনার? সর্বজিত বাবুর মুখে শোনা নিলু কে? কীই বা তার ইতিহাস? সর্বজিত খুনের মোটিভ কী? কেন পলাতক সুখময় সাহা? ইত্যাদি রোমহর্ষক কিছু প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে এই উপন্যাস। যেহেতু এই উপন্যাস একটি মেডিকেল ক্রাইম থ্রিলার, তাই এর থেকে আর বেশি বলবো না। কাহিনীর পরতে পরতে আছে রোমাঞ্চকর অনুভূতি। আর আছে অভিনবত্ব। মেডিকেল থ্রিলার এর একটা অন্য রকম বিভৎসতা ফুটে উঠেছে লেখাতে। 👓 এবার বলি শ্রীপর্ণা সম্বন্ধে, এই শ্রীপর্ণার সম্পর্কে বলতে গেলে এককথায় বলতে হয় সুপার ওম্যান। অসম্ভব ক্ষুরধার বুদ্ধি। প্রখর দৃষ্টি। জাঁদরেল পুলিশ অফিসার। আর এখানে ত্রয়ী অভিযান এর মোট চারটি গল্প আছে, প্রতিটি গল্পই অসম্ভব ভালো। প্রতিটির মধ্যেই আছে একটা টান টান উত্তেজনা, একটা অ্যাডভেঞ্চার। এখানে ত্রয়ী হলো তিন বন্ধু। অতনু, জয়ন্ত আর বলাকা, এই তিনজনের বিভিন্ন কৃত্তিকলাপ এর কাহিনী বর্ণনা করা আছে গল্প গুলিতে। যেমন প্রথম গল্প অর্থাৎ চৌধুরী বাড়ির ধাঁধা তে আমরা দেখতে পায় জয়ন্ত ��র মামার বাড়ি চৌধুরী বাড়িতে এক ধাঁধার সন্ধান। যার পিছনে আছে এক রোমাঞ্চকর ঘটনা। একই ভাবে মৃত্যু আলিঙ্গন এর ক্ষেত্রেও তাই। এবার বলি পুলিশ অফিসার আত্রেয়ীর কথা। এই বই এর আত্রেয়ীর একটাই মাত্র কেশ আছে। আর এটাও একটা মেডিক্যাল থ্রিলার। এখানেও আমরা দেখতে পায় প্রেমের লাল গোলাপে কাঁটার মতো এক নোংরা ষড়যন্ত্রের কথা, যা বিশ্বাস ধ্বংশ করে প্রেমের। যাই হোক বেশ ভালো গল্পটা। আর আত্রেয়ীর বুদ্ধি মত্তাও প্রংসশনীয়। অত্যন্ত ভালো ওবশারভেশন ক্ষমতা। এই ছিলো মোটামুটি বই এর সামগ্রিক বিষয় বস্তু। এবার ভালো লাগা খারাপ লাগা গুলো নিয়ে আলোচনা করি। ---------------------------------------------------- 📌 ভালো লেগেছে- ১.) লেখকের লেখনী ক্ষমতা অসাধারণ। ভাষার ব্যাবহার মুগ্ধ করবে যে কোন পাঠককে। অত্যন্ত বলিষ্ঠ এবং নির্মেদ ঝড়ঝড়ে লেখা। কোন অংশে অপ্রাসঙ্গিক ভাষা খরচ করেননি। ২.) তথ্য এবং অভিনবত্ব। লেখক নিজে একজন স্বনামধন্য ডাক্তার । তাই ওনার লেখার মধ্যে যে তথ্য এবং অভিনবত্ব থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। আর সেটাই আমাদের মত পাঠকদের চাহিদা। লেখক সেই চাহিদা পূরণে সক্ষম হয়েছেন। ৩.) প্রতিটি কাহিনীর যে রহস্য রোমাঞ্চ জাল ছড়িয়েছে তা সত্যিই বাংলা সাহিত্যে পড়ার সুযোগ বিশেষ হয়না। আর প্রতিটি গল্পে অপরাধীর যে বিচক্ষণতার সাথে জাল বিস্তার করেছেন তাতে সত্যিই মেডিকেল সায়েন্স এর জ্ঞান না থাকলে খুঁজে পাওয়া বড্ড চাপের ব্যাপার। দূর্ধর্ষ প্রতিটি গল্পের প্লট। ---------------------------------------- 📌 ভালো লাগেনি- ১.) বেশ কিছু জায়গায় জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে চরিত্রের আধিক্যের কারণে। ২.) বই এর প্রুফ চেকিং আরও মনোযোগ দিয়ে করতে হতো। বেশ কিছু চোখে লাগার মত বানান ভুল যেমন আছে তেমন বেশ কিছু জায়গায় কোটেশন, স্পেশ এর গন্ডগোল ও আছে। এই দিকে নজর দেওয়ার প্রয়োজন আছে। ৩.) বই এর বাঁধন ছিমছাম করার প্রয়োজন আছে। কারণ বাঁ দিকের পাতার লাইনের শেষ দিক, আর ডান দিকের পাতার লাইনের শুরুর দিক বেশ কষ্ট করে পড়তে হচ্ছে। তাতে পড়ার গতি বারবার কেটেছে। ------------------------------------------------- 📌 প্রচ্ছদ- প্রচ্ছদটি এর কালার কম্বিনেশন বেশ ভালো লাগলেও এর সাথে বিষয়বস্তুর এর যোগাযোগ আমি বুঝতে পারিনি। যাই হোক প্রচ্ছদ সহ লেখার ক্যালিওগ্রাফি আমার ভালো লেগেছে। 📌 বাঁধন- বাঁধন বেশ ভালো এবং মজবুত হলেও ছিমছাম না। তাই পড়ার অসুবিধা হয়েছে। 📌 পাতার মান- অত্যন্ত সুন্দর এবং উন্নত মানের পাতা। ধন্যবাদ রা প্রকাশন কে এত সুন্দর ভাবে বইটিকে উপস্থাপন করার জন্য। ----------------------------------------------- 📌 বই এর ওভার অল রেটিং- ৩.৫/০৫ ⭐⭐⭐✨ ------------------------------------------------ 📌 লেখক এর আরও নতুন নতুন বই পড়ার অপেক্ষায় রইলাম 😍😍😍 ------------------------------------ ধন্যবাদ সকলে ভালো থাকুন সুস্থ থাকুন। আর অবশ্যই সাহিত্যে থাকুন।